শিক্ষক ও শিক্ষা শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা শিক্ষাব্যবস্থা শিশুর বিকাশ

অরিত্রীরা কেন হারায়?

মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ছবিসূত্র: বিডিনিউজ২৪.কম
মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ছবিসূত্র: বিডিনিউজ২৪.কম
লিখেছেন গৌতম রায়

অশোকা মাহবুবা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা শেক্সপিয়র বড্ড আগে জন্মে গিয়ে বেঁচে গেছেন। ভাবুন তো, এ যুগে জন্ম নিয়ে যদি বিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তি হতে যেতেন, তাহলে কেমন হতো? বনেদী পরিবার— তাই কম নম্বর পেয়েও হয় কোনো না কোনো কোটা পদ্ধতিতে কিংবা বিশাল ডোনেশানে ভর্তি হয়ে যেতেন স্বনামধন্য কোনো এক বিদ্যালয়ে। তারপর? অঙ্কে গোল্লা খেয়ে শিক্ষকদের কাছে কি নাযেহালটাই না হতেন! বাড়ি থেকে দাদা-বাবাদের ডেকে এনে ‘ছেলে অঙ্কে গোল্লা পায়’ বলে একগাদা কথা শোনাতেন শিক্ষকরা। সেই রবীন্দ্রনাথের মানসিকতা তখন কী হতো ভাবুন তো? পুরো ক্লাসের সামনে মাথা গোঁজ করে খাতা নেয়া ছেলেটির কি কখনো রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠা হতো?

গণিত কিংবা পদার্থ বিজ্ঞান ছাড়া কি কারোর মেধার যাচাই হয় না? কে তৈরি করলো বলুন তো এই নিয়ম? ভ্যান গঁগ তাহলে কী ছিলেন? লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি? তাই তো বলি, এ-যুগে কেন এতো এতো ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়, কিন্তু কোনো রবীন্দ্রনাথ কেন তৈরি হয় না?

সেদিন এক অনলাইন পত্রিকা মারফত জানতে পেলাম বিজ্ঞানে দুর্বলতার কারণে শিক্ষকদের কাছে হেনস্থার শিকার চৈতি নামের এক কিশোরীর আত্মহত্যার খবর। রবীন্দ্রনাথও কি তাহলে আত্মহত্যাই বেছে নিতেন? নাকি বিদ্যালয়ের সহ-অধ্যক্ষ (ভি.পি.)-এর কাছে পা ধরে ক্ষমা চেয়ে উপরের ক্লাসে সুযোগ দেয়ার অনুরোধ জানাতেন ঠাকুরবাড়ির মুরুব্বিরা? যে-যুগে গণিত কিংবা পদার্থ বিজ্ঞান না পারলে মেধাবী বলা হয় না, শিক্ষকরা হেয় করেন ক্লাসে, সে-যুগে রবীন্দ্রনাথের হাল কী হতো ভাবতেই শিউরে উঠছি।

গণিত কিংবা পদার্থ বিজ্ঞান ছাড়া কি কারোর মেধার যাচাই হয় না? কে তৈরি করলো বলুন তো এই নিয়ম? ভ্যান গঁগ তাহলে কী ছিলেন? লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি? তাই তো বলি, এ-যুগে কেন এতো এতো ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়, কিন্তু কোনো রবীন্দ্রনাথ কেন তৈরি হয় না?

অরিত্রীর জীবনে যা ঘটেছে তা কিন্তু প্রথম না। মৃত্যুর এই মিছিলে আরও নাম আছে। তবে আশা করবো যেনো অরিত্রীই শেষ হয়। সামান্য ভুল; হ্যাঁ, ভুলই বলবো, অপরাধ নয়; আর সেই ভুলেই জীবন দিতে হলো এই কিশোরী বয়সে। অরিত্রীর দোষ নিয়ে সমালোচনা চলছে সর্বত্র। সেদিন তো অনলাইনে এক শিক্ষকের লেখা দেখে রীতিমতো কৌতুক অনুভব করলাম। তিনি আচ্ছামত পিণ্ডি চটকালেন এ-যুগের অরিত্রীর মতো জেনারেশনকে। এরা কথা শোনে না, পড়াশোনা করে না, নকল করে, সারাক্ষণ মোবাইল চালায়, এমনকি কারো কারো নাকি ভিডিও লিঙ্কও পাওয়া যায় ইত্যাদি।

ভিডিও লিঙ্ক বলতে শিক্ষক কী বুঝিয়েছেন বড় জানতে সাধ হয়। তবে কৌতুকবোধ করার কারণ হলো, ব্যক্তিগতভাবে এই শিক্ষককে আমি যতোদুর জানি যিনি গতবছর আমার সন্তানের টেস্ট পরীক্ষার সময় তার প্রিয় এক শিক্ষার্থীকে তের নম্বর, জ্বি ঠিক পড়েছেন, তেরটি নাম্বার দিয়ে পাশ করিয়ে টেস্টে উত্তীর্ণ করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আর অন্য একজনকে সাত নম্বরের জন্য আটকে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওই শিক্ষার্থীর মা-বাবা সব বিষয় জানতে পেরে প্রভাবশালী লোক নিয়ে এসে শিক্ষককে অনুরোধ করে রি-টেস্টের ব্যবস্থা করেন। কথিত আছে, এই শিক্ষক নাকি ছাত্রীদের তেমন পছন্দ করেন না বলে ক্লাসে প্রায়ই তাদের কটুক্তি করতেন। এরকম প্রতিষ্ঠিত কলেজে এসব আসলে খুবই সাধারণ ঘটনা যা অহরহ ঘটছে। এমনকি শিক্ষকের ইচ্ছানুযায়ী ফেল করিয়ে দেয়ার দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে কেউ খাতা চ্যালেঞ্জ করলে সেই খাতা গায়েব হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে থাকে অনেকক্ষেত্রে। সম্ভবত এ কারণেই সেই শিক্ষক মহোদয় এসব ঘটনাকে দুর্নীতি ভাবতে পারেননি; বরং শিক্ষার্থীদেরকেই দুর্নীতিবাজ মনে করেছেন।

অরিত্রীর জীবনে যা ঘটেছে তা কিন্তু প্রথম না। মৃত্যুর এই মিছিলে আরও নাম আছে। তবে আশা করবো যেনো অরিত্রীই শেষ হয়। সামান্য ভুল; হ্যাঁ, ভুলই বলবো, অপরাধ নয়; আর সেই ভুলেই জীবন দিতে হলো এই কিশোরী বয়সে।

সন্তান প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে পড়ার দরুন এ-হেন তুচ্ছ ঘটনাবলীর চাক্ষুষ সাক্ষী এবং ভুক্তভোগী হয়ে আছি দীর্ঘ কয়েকটি বছর। সন্তানের বিজ্ঞানে দুর্বলতার জন্য শ্রেণিশিক্ষক অন্য শিক্ষকদের ডেকে এনে তাকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বলতেন, “ওকে বিজ্ঞান বিভাগে দিবেন না। বিজ্ঞান পারে না তারপরেও বার বার বিজ্ঞান নেয়!”

অন্য শিক্ষকদের সামনে এরকম অপমানেও ভেঙ্গে পড়েনি আমার সন্তান। কিন্তু পারতো তো, সেদিনই ফিরে এসে অরিত্রী কিংবা চৈতির মতো কিছু ঘটিয়ে দিতে! তাতে কার কী আসতো যেতো? ক্ষতি তো যা হওয়ার আমার হতো। মজার ব্যাপার হলো, সেই শিক্ষকের আশায় গুড়েবালি দিয়ে সন্তান কিন্তু জিপিএ ফাইভ পেয়ে বিদ্যালয়ের নিয়মেই বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে নবম শ্রেণিতে ওঠে। আসলে এই রাগের কারণ ছিলো খুব সামান্য। সেই শিক্ষককে কয়েক মাস বাচ্চাদের বাসায় পড়ানোর দায়িত্ব দিয়েছিলাম। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই যখন বুঝলাম তিনি না পড়িয়েই পরীক্ষার আগে প্রশ্ন বলে দিয়ে পাশ করানোর সহজ পদ্ধতির চিন্তা করছেন, তখন বাদ দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। আর সেটিই আমার সন্তানের জন্য কাল হয়েছিলো।

নবম শ্রেণিতে উঠেও শান্তি ছিল না। যেহেতু বিজ্ঞানে তুলনামূলক দুর্বল, তাই ফর্ম শিক্ষক শঙ্কিত হয়ে গেলেন যেনো তার ফর্মে কোনো অঘটন না ঘটে। অঘটনটি এরকম যে— একেকটি সেকশনে একেক ফর্ম শিক্ষকের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকে যে কার ফর্ম কতো ভালো। এ-কারণে অনেক ফর্ম শিক্ষকই সেই শিক্ষকের মতো কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে বর্ধিত নম্বর দিয়ে পাশ করিয়ে তার ফর্মের পাশের সংখ্যা বাড়িয়ে গৌরববোধ করেন। এমনকি এসএসসিতে কার ফর্মে কতো গোল্ডেন সেটিও যুক্ত হয় শিক্ষকের গৌরবে। সুতরাং এরকম প্রতিযোগিতায় কোনো দুর্বল শিক্ষার্থী কোনো সেকশানে পাওয়া গেলে তা শ্রেণিশিক্ষকের চরম মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি তখন যথাসম্ভব চেষ্টা করেন দুর্বল শিক্ষার্থীটি থেকে নিস্তার পাওয়ার। আর এজন্য সেই পুরানো পদ্ধতি তো আছেই, কম নম্বর দিয়ে ফেল করিয়ে দেয়া। একে তো দুর্বল, তার ওপর নম্বর কম দিলে দু-তিনটি বিষয়ে অবধারিতভাবেই ফেল চলে আসে। ফলে পাশ না করায় তখন তাকে নতুন ফর্ম মাস্টারের ক্লাসে যেতে হয়। আশঙ্কামুক্ত হন সেই শিক্ষক। পরবর্তী শিক্ষক ধূর্ত হলে শিক্ষার্থীটির জীবনে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। আর শিক্ষক ভালো মানুষ হলে শিক্ষার্থী নিস্তার পায়।

আমার দুর্বল সন্তানটি যখন এ-হেন অবস্থার শিকার হয়, দুর্ভাগ্যক্রমে তখন ভি.পি.-স্যারের কাছে গিয়ে অনুরোধ জানিয়েছিলাম আরেকবার সুযোগ দিতে। অবাক হয়ে শুনলাম, তিনি আমার ব্যক্তিগত দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন নিয়ে কীভাবে ইঙ্গিত করলেন! সেটির সঙ্গে সন্তানের পাশ-ফেলের সম্পর্ক আজও আমি বুঝতে অপারগ।

আমার দুর্বল সন্তানটি যখন এ-হেন অবস্থার শিকার হয়, দুর্ভাগ্যক্রমে তখন ভি.পি.-স্যারের কাছে গিয়ে অনুরোধ জানিয়েছিলাম আরেকবার সুযোগ দিতে। অবাক হয়ে শুনলাম, তিনি আমার ব্যক্তিগত দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন নিয়ে কীভাবে ইঙ্গিত করলেন! সেটির সঙ্গে সন্তানের পাশ-ফেলের সম্পর্ক আজও আমি বুঝতে অপারগ। আচ্ছা, অরিত্রীর বাবার সাথেও কি এরকমই কিছু হয়েছিলো? তিনিও কি চোখে অশ্রু নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন শিক্ষকের দিকে? আজ অরিত্রীর দুর্ঘটনা দেখে ভাবি, ভাগ্যিস আমার সন্তান সেদিন আমার সঙ্গে ছিলো না!

না, আমার সাথে ফর্মমাস্টার চরম অন্যায় করার পরও ভি.পি. স্যার সেদিন কোনো সহানুভূতি দেখাননি; বরং তার চরম দুর্ব্যাবহারের সাক্ষী আছি। ফিরে এসে সন্তানকে নতুন উদ্যোমে মানসিক সহায়তা দেয়া শুরু করেছিলাম যেন কিছুতেই ভেঙ্গে না পড়ে। অরিত্রীর বাবার জন্য দুঃখ হয়, তিনি সেই সুযোগটুকুও পাননি!

অশোকা মাহবুবা: লেখক একজন উদ্যোক্তা। বুটিকস ও ক্যাটারিং নিয়ে কাজ করছেন। বিভিন্ন মিডিয়ায় মুক্ত লেখক হিসেবে শিক্ষার পাশাপাশি নানা বিষয়ে লেখেন।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

মন্তব্য লিখুন

1 × two =