গবেষণা

গবেষণা কী এবং কেন?

গবেষণা, ছবিসূত্র: উইকিপিডিয়া
গবেষণা, ছবিসূত্র: উইকিপিডিয়া
লিখেছেন গৌতম রায়

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রায়ই একটি প্রশ্ন শুনতে হয়— গবেষণা কী, কীভাবে গবেষণার প্রস্তাব লিখতে হয়, গবেষণা করার শুরুটা কীভাবে করতে হয় ইত্যাদি। এসব প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত কিছু উত্তর দেয়া নিয়েই আজকের এই লেখা।

একজন গবেষক যেকোনো নতুন সমস্যা সমাধান করতে চান এবং বিশ্বকে সেটি পরিচয় করিয়ে দিতে চান। গবেষকরা যে সমস্যার সমাধান নিয়ে ব্যাস্ত থাকেন, সেসব সমস্যার সমাধানের পদ্ধতিগত প্রক্রিয়াকে বলা হয় গবেষণা।

সাধারণ দৃষ্টিতে, গবেষণা হচ্ছে একধরনের পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনা একটি পুনরাবৃত্তিমূলক প্রক্রিয়া। যেকোনো গবেষণা সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া ব্যর্থ হওয়ার সুযোগই বেশি। তাই সঠিকভাবে পরিকল্পনা আপনার গবেষণাটিকে সাফল্যের সেরা সুযোগ এনে দিতে পারে।

সঠিক পরিকল্পনা থাকার পরও আপনি ব্যর্থ হতে পারেন। তাই আপনাকে এই পরিকল্পনার মাঝে কখনো কখনো কিছু ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কিন্তু কেন? কারণ আমরা এমন বিষয় নিয়ে গবেষণা করি, যার ফলাফল কী হবে তা আমাদের জানা নেই। তাই, আমাদের পরিকল্পনাগুলোকে সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন করতে হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের দিকে অগ্রসর হতে থাকি। এটিও খেয়াল রাখতে হবে, যেকোনো গবেষণাই দীর্ঘ সময় নিতে পারে, তাই এর জন্য দরকার পরিকল্পনা এবং অধ্যবসায়।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে, গবেষণা হচ্ছে নতুন জ্ঞান আবিষ্কার করার একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া যেখানে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া ব্যবহার করে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা যেটি জ্ঞান বিকাশে ভূমিকা রাখবে।

গবেষণা একধরনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যা শুরু হয় হাইপোথিসিস বা অনুমিত সিদ্ধান্ত থেকে এবং একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফলাফল সংগ্রহ করে সেগুলোকে বিশ্লেষণ করে সেই অনুমানের ওপর একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গবেষণায় এই হাইপোথিসিস পরবর্তীতে একটি ফ্লো চার্ট তৈরিতে সাহায্য করে। এটি গবেষককে সাহায্য করে কী কী বিষয়ের ওপর অধ্যয়ন করতে হবে, কীভাবে গবেষণাটি এগিয়ে নিতে হবে, কীভাবে ফলাফলকে বিশ্লেষণ করে সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ইত্যাদি।

গবেষণার সময় সংগৃহীত তথ্য কেবল তখনই কার্যকর বলে ধরে নেয়া হয় যখন গবেষণার ফ্লো চার্ট সঠিক এবং গবেষণা প্রটোকল সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়। গবেষণা করা সময় প্রটোকলে যে পদ্ধতির কথা বলা আছে এবং বর্ণিত ফ্লো চার্টটি যদি সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় তাহলে গবেষণার ফলাফল অন্যের কাছে নির্ভুল এবং অর্থবহ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলবে।

গবেষণায় প্রটোকল অনুসরণ করা এবং ফ্লো চার্টটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই একই পদ্ধতি অনুসরণ করে অন্য গবেষকরা পুনরায় এই ফলাফল তৈরি করতে পারবেন।

গবেষণা যে বিষয়ের ওপর করা হচ্ছে তা কতটুকু ভালো সেটি অনেকটাই নির্ভর করছে একজন অভিজ্ঞ গবেষককে নিয়োগ দেয়ার ওপর। তাঁকে বলা হয় প্রধান গবেষক। তাঁর তত্ত্বাবধানে অন্যান্য গবেষকদের নিয়োগ দেয়া, তাঁদেরকে প্রধান গবেষকের দেয়া পরিকল্পনা অনুসরণ করা, এবং প্রাপ্য ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা সেটা সঠিক কিনা এবং সেই ফলাফল যেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবসম্মত হয় সেদিকে খেয়াল রাখা।

গবেষণা প্রস্তাব কী?

একটি গবেষণা প্রস্তাবে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় থাকতে হয়। সেগুলো হলো: ভূমিকা, গবেষণার বিষয়ভিত্তিক পর্যালোচনা, লক্ষ্য, গবেষণা-বিষয়ক প্রশ্ন, গবেষণার পদ্ধতি, ফলাফলের বৈধতা নিরূপণ, নৈতিক প্রশাসনিক কাঠামো এবং গবেষণার ফলাফল।

ভূমিকা

প্রথমেই জানতে হবে ভূমিকা অংশে কী থাকবে? আপনি যে গবেষণা নিয়ে কাজ করেছেন, কীভাবে সমাধান করেছেন সেটি সম্পর্কে প্রথমেই বলতে হবে। আপনি এই গবেষণা করে কী ফলাফল পেলেন এবং আপনার এই গবেষণার ফলাফল কীভাবে ভবিষ্যতে সহায়তা করবে সেটিও বলতে হবে।

গবেষণার বিষয়ভিত্তিক পর্যালোচনা

এ অংশে আপনি যে গবেষণাটি করতে যাচ্ছেন, সে-ধরনের গবেষণা পূর্বে হয়েছে কিনা, হলে সেটি কারা করেছেন, সেগুলোর বিষয়বস্তু কী ছিলো, কীভাবে করা হয়েছে, কী পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে, গবেষণার ফলাফল কী ছিল ইত্যাদির ওপর আলোচনা করা হয়। এটি আপনাকে গবেষণার পদ্ধতি জানতে, আপনি কী করছেন, কেন করছেন এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সহায়তা করবে। তার অর্থ হলো, ইতিমধ্যে যতোটুকু গবেষণা হয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপ পাওয়া যাবে।

লক্ষ্য

এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অংশে আপনি আপনার প্রস্তাবিত গবেষণা থেকে আপনি কী অর্জন করতে চাইছেন তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতে হবে।

গবেষণা-বিষয়ক প্রশ্ন

অনেক গবেষণায় কিছু প্রশ্ন দিয়ে দেয়া হয় যেগুলোকে ব্যবহার করে গবেষকরা তাদের গবেষণাকে মূল্যায়ন করেন। তাই এই অংশে গবেষক এক বা একাধিক সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন দিয়ে দেবেন, যেটি ব্যবহার করে গবেষক কীভাবে সমস্যাটিকে সমাধানের চেষ্টা করছেন তা সংক্ষিপ্তভাবে জানিয়ে দেবেন।

গবেষণার পদ্ধতি

এ অংশে আপনি গবেষণা কাজ কী পদ্ধতি ব্যবহার করে সম্পন্ন করবেন সেটি উল্লেখ করতে হবে। আপনি চাইলে নতুন কোনো পদ্ধতি উপস্থাপন করতে পারেন, অথবা পূর্বে ব্যবহার করা হয়েছে এমন কিছুও ব্যবহার করতে পারেন। বিশেষত, আপনি কীভাবে আপনার উপাত্ত সংগ্রহ করবেন, পরিচালনা করবেন এবং বিশ্লেষণ করবেন তা এ অংশে সুস্পষ্টভাবে বলা থাকবে।

ফলাফলের বৈধতা নিরূপণ

আপনি যে পদ্ধতি ব্যবহার করবেন সেই পদ্ধতি সঠিক নাকি ভুল সেটি জানার জন্য আপনাকে পূর্ববর্তী কোনো গবেষণার ফলাফলকে আপনার দেয়া পদ্ধতি দিয়ে পুনরায় তৈরি করতে হবে। এতে আপনি যে পদ্ধতি আপনার গবেষণায় ব্যবহার করছেন সেটি আপনার প্রস্তাবিত গবেষণায় ব্যবহার করার মতো বৈধতা পাবে।

গবেষণার ফলাফল

আপনি এই অংশে আপনার গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করবেন, পর্যলোচনা করবেন, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটি ব্যাখ্যা করবেন। পাশাপাশি, আপনার দেয়া সুপারিশগুলো কীভাবে ভবিষ্যতে প্রভাব ফেলবে সেটিও পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যা করবেন।

নৈতিক প্রশাসনের কাঠামো

আপনি কীভাবে আপনার গবেষণা প্রস্তাবের কোনও সম্ভাব্য নৈতিক সমস্যা মূল্যায়ন, নিরীক্ষণ এবং তদারকি করবেন তার বিশদ কাঠামো উল্লেখ করতে হবে।

গবেষককে মনে রাখতে হবে, যেকোনো গবেষণাই কঠিন। তাই গবেষণা করার জন্য গবেষকের কিছু নির্ভরযোগ্য মানুষের প্রয়োজন হয়। দেখা যায়, গবেষককে তার গবেষণা-বিষয়ক প্রশ্ন সম্পন্ন করার জন্য ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে দক্ষ কিছু মানুষের কাছে যেতে হয় এবং সেই মানুষগুলোর সঠিক উত্তর গবেষণাকে সফল করতে পারে।

আমরা অনেকে মনে করি, গবেষণা মানেই হলো একটা নিঃসঙ্গ কাজ। কিন্তু আসলেই কি তাই? আপনি এমন কিছু সন্ধানের জন্য কাজ করছেন যা অন্য কেউ কখনও করেনি বা এ-সম্পর্কে কিছু জানা নেই। আপনার সেই গবেষণা সম্পর্কে কথা বলার জন্য আপনার কিছু নির্ভরযোগ্য মানুষ দরকার; যাদেরকে আমরা বলি সমালোচক। ভালো সমালোচকরা আপনার কথা শোনেন, আপনাকে খোলামেলাভাবে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে তাদের মতামত প্রদান করেন, এবং সক্রিয়ভাবে আপনার গবেষণায় অংশগ্রহণ করেন।

সবশেষে, আপনাকে জানতে হবে এবং জানাতে হবে আপনার গবেষণা কেন গুরুত্বপূর্ণ? এটি না হলে আমাদের মধ্যে অসন্তুষ্টি থেকে যায়। তাই, সেটিকে প্রকাশ করার দায়িত্ব নিতে হবে।

আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, গবেষণা শুধু যে এ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রেই অবদান রাখে তা নয়, বরং অর্থনীতি, সমাজ, পরিবেশ বা সংস্কৃতিতেও অবদান রাখে। তাই গবেষণার কাজটিকে যতো বেশি মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়, সে চেষ্টা থাকতে হবে।

ড. গৌতম সাহা: সহযোগী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

মন্তব্য লিখুন

five × 3 =