দক্ষতা ও উন্নয়ন

চাকরির জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি

চাকরি, ছবিসূত্র: যুগান্তর
চাকরি, ছবিসূত্র: যুগান্তর

আলেয়া পারভীন লীনা

দেশে বাড়ছে পাশের হার, বাড়ছে পাশ করা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মানসিকতায় এসেছে বিরাট পরিবর্তন। তারা এখন আর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। মোটামুটি আয় করার মতো বয়স হলেই তারা খুঁজতে থাকে কাজ, যা থেকে নিজের খরচটুকু নিজে তুলতে পারে। এই যে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার মানসিকতা, এটি খুবই ইতিবাচক।

তাছাড়াও আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেকেই উদ্যোক্তা হতে চায়। উদ্যোক্তা হতে বা চাকুরি পেতে উভয়ের জন্যই প্রয়োজন যথাযথ প্রস্তুতি। আর সেই প্রস্তুতিটুকু এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শুরু করতে হয় জীবনের একদম প্রথম থেকে। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? চাকরির বাজারে এই প্রস্তুতি কি নিচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা?

আমাদের দেশের এখনও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ক্যারিয়ার ও চাকরির পার্থক্য জানে না। ক্যারিয়ার বলতে প্রায় সবাই একটি চাকরি জোগাড় করাকেই বুঝে। আমাদের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোও এ-বিষয়ে খুব একটি সচেতন করছে না শিক্ষার্থীদেরকে।

ক্যারিয়ার বলতে বুঝায় একটি পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত পেশাগত জীবন, যেখানে প্রস্তুতি নিয়ে এগুতে হয়। ক্যারিয়ারের শুরুতে জানা থাকতে হয় আমি কী চাই, কোন কাজটি আমার জন্য প্রযোজ্য এবং আমি কী হতে চাই। আর এই হতে চাওয়াকে মেলাতে হবে নিজের ক্ষমতার সাথে। অর্থাৎ, চাইলেই হবে না, আমার ভেতরে সেই কাজটি করার মতো যথেষ্ট আগ্রহ বা ভালোবাসা আছে কিনা জানতে হবে সেটিও।

সেটি যদি জানা থাকে, তবেই সেই লক্ষ্যে পৌছাতে কী কী প্রস্তুতি নিতে হবে, কীভাবে নিতে হবে এবং কতোটা সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে, সেসব বিষয় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগুনো যায়। দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, আমাদের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই চায় কোনোভাবে একটি চাকরি বা কাজ জোগাড় করে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করতে। কাজটি যদি ভালো না বাসা যায়, তাহলে সে-কাজ করে সামনে আগানো যায় না। জীবনে কিছু হতে চাওয়ার টার্গেট না থাকলে প্রস্তুতিও থাকে শূন্য।

মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করার সুবাদে এমন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীন চাকরিপ্রার্থীদের দেখা পাই হরহামেশাই। যদিও দেশের অর্থনৈতিক ও শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতায় ক্যারিয়ার প্ল্যান করে আগানো অত্যন্ত কঠিন; তবুও দিন পাল্টাচ্ছে। এখন দেশে কাজের সুযোগের জায়গায় এসেছে অনেক বৈচিত্র্য। নিজেকে তাই তৈরি করতে হবে নানাধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত করে। কেবল পাস করেই ভালো চাকরি পাওয়া যাবে এমনটি ভাবার দিন এখন আর নেই।


শিক্ষার্থী-অবস্থায় যে বিষয় পড়ছেন, সে বিষয়ে নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রাখা চলবে না। চাকরির বাজারের লড়াইয়ে নামার আগে জানতে হবে বাজারের চাহিদাগুলো কী? চাকরিদাতারা কী কী যোগ্যতা দেখতে চান প্রার্থীদের মাঝে?

কেউ যদি ক্যারিয়ার গড়তে চায় অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কাজ করে কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে অবশ্যই প্রস্তুতি নিতে হবে বাজারের দিকে নজর দিয়ে। কী কী প্রস্তুতি নেয়া যায়?

আমি মনে করি, এর জন্য নিজের সাধারণ বুদ্ধি ও সাধারণ উপলব্ধিগুলোকে কাজে লাগালেই পাওয়া যাবে উত্তর। যেমন, শিক্ষার্থী-অবস্থায় যে বিষয় পড়ছেন, সে বিষয়ে নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রাখা চলবে না। চাকরির বাজারের লড়াইয়ে নামার আগে জানতে হবে বাজারের চাহিদাগুলো কী? চাকরিদাতারা কী কী যোগ্যতা দেখতে চান প্রার্থীদের মাঝে?

প্রথমত, আপনাকে একটি ইতিবাচক মনোভাবাপন্ন মানুষ হতে হবে। বইয়ের পাতায় দুনিয়ার সঙ্গে বাস্তবের অনেক পার্থক্য রয়েছে। কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে নিজেকে মূল্যায়ন করলে ভুল হবে। শেখার মানসিকতা না থাকলে ধরে নিতে হবে আপনি চাকরির বাজার থেকে অনেক দূরে আছেন। কাজ কতোটা জানেন তার চেয়েও প্রয়োজন না জানাকে স্বীকার করেন কিনা এবং জানার মতো মানসিকতা ধারণ করেন কিনা। ইতিবাচক মনোভাব মানেই সবকিছুতে হ্যাঁ বলতে পারা নয়; নিজের জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে বাড়াতে নতুন কিছু শিখতে চাওয়ার মনোভাবকে বুঝানো হয়।

অনেক শিক্ষার্থীকে দেখা যায়, তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে এসেছেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বকেই বড় করে দেখতে। পাশাপাশি সবকিছু জানার একটি মনোভাব নিয়েও অনেকে সাক্ষাৎকার দিতে যান। এ-ধরনের মনোভাব নেতিবাচক প্রার্থী হিসেবে নিজেকে অন্যের কাছে তুলে ধরে।

একটি ছোট উদাহরণ দিই। একবার দেশের একটি অন্যতম বড় ও প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করা একজন শিক্ষার্থী এসেছিলেন সাক্ষাৎকার দিতে। বিজনেস অ্যানালিস্ট হিসেবে এন্ট্রি লেভেলের চাকরির সাক্ষাৎকার। নিজের বিশ্ববিদ্যালয় হওয়াতে আমার একটু সফট কর্নারও ছিলো। জিজ্ঞেস করেছিলাম, এমএস এক্সেল কেমন পারেন? উত্তরে জানালেন, খুব একটি পারেন না, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে তিনি বন্ধুদের সহায়তায় অ্যাসাইনমেন্ট করেছেন।

অবাক হলাম যে, ফিন্যান্স থেকে পাস করে তিনি এক্সেল শিখেননি। চাকরির প্রতিযোগিতায় নেমেছেন অথচ প্রস্তুতি হিসেবেও তিনি এক্সেলের প্রাথমিক কাজ, অ্যানালিটিকাল রিপোর্টিং সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নিয়ে আসেননি। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, এ-নিয়ে তার মধ্যে কোনোপ্রকার অনুশোচনা দেখা যায়নি। বরং তিনি আমাকে কনভিন্স করার চেষ্টা করেছেন চাকরি পেলে শিখে নিতে পারবেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এই শিক্ষার্থীর উদাহরণ খেয়াল করলে যে বিষয়গুলো পাওয়া যায়, তা হলো:

১। চাকরির বাজার সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি অজ্ঞ। প্রতিযোগিতায় নামার আগে তিনি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে আসেননি যে সাক্ষাৎকার দিতে হলে কী কী বিষয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। যেকোনো চাকরির জন্য প্রযুক্তির প্রাথমিক জ্ঞান এখন অ আ ক খ জানার মতো প্রয়োজনীয়। তাই এমএস এক্সেল, ওয়ার্ড, পাওয়ারপয়েন্ট ইত্যাদি জানা থাকা অবশ্যম্ভাবী।

২। তার আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি আরেকটি বিষয়। তিনি জানেন না কিন্তু এ-নিয়ে একদম চিন্তিত না। চাকরি পেয়ে শিখে যাবো এবং নিজেকে মেধাবী বলে বার বার প্রমাণ করতে চাওয়া নেতিবাচক মানসিকতাকেই প্রমাণ করে। তার এই মনোভাব আমাকে বিরক্ত করছিলো।


আপনি কি চাকরি করে কেবল তিনবেলা খাবারের যোগান নিশ্চিত করতে চান, নাকি ক্যারিয়ার গড়ে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে নিজেকে যোগ্যতার মাপকাঠিতে উপরের দিকে নিয়ে যেতে চান সে বিষয়টি সম্পর্কে জেনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে।

৩। তিনি বসেছিলেন ক্যাজুয়ালি। সেটিও হয়তো বিষয় হতো না যদি তার দক্ষতা ও আচরণ আকৃষ্টি করার মতো হতো। তার উপস্থাপন দক্ষতা ছিলো দুর্বল। এই দক্ষতা কেবল পাওয়ারপয়েন্টে উপস্থাপনা নয়, নিজেকে উপস্থাপন করার দক্ষতাও। বাস্তবে, চাকরির বাজারে আমরা সবাই একেকজন পণ্য। শুনতে খারাপ মনে হলেও এটিই সত্যবচন।

একটি পণ্য যতো সূক্ষ্মভাবে ও ভালোভাবে পরিশীলিত হয়, যতো দর্শনমুগ্ধ হয় এবং যতো বেশি বহুমাত্রিক ব্যবহারের ফিচার থাকবে, সেই পণ্য ততো মূল্যবান ও সহজে গ্রহণযোগ্য। আবার পণ্যের সবগুণ আছে, কিন্তু বিক্রেতা সেটিকে উপস্থাপন করতে পারলেন না। কিংবা এমনভাবে উপস্থাপন করলেন যে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার মতো প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোই হারিয়ে গেলো, তাতেও হবে না। একজন প্রার্থীকে কাজ করার জন্য প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও দক্ষতাগুলো অর্জন করতে হবে। একইভাবে, নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে সঠিক ও আকর্ষণীয়ভাবে।

অর্থাৎ, চাকরির আবেদন করার পূর্বে যে জায়গাগুলো সম্পর্কে প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে সেগুলো হচ্ছে:

১। নিজেকে জানতে হবে ভালোভাবে। কোন বিষয়ে আপনি দক্ষ বা কাজের আগ্রহ আছে, সে জায়গাটি আয়ত্ত করতে হবে। আপনি কি চাকরি করে কেবল তিনবেলা খাবারের যোগান নিশ্চিত করতে চান, নাকি ক্যারিয়ার গড়ে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে নিজেকে যোগ্যতার মাপকাঠিতে উপরের দিকে নিয়ে যেতে চান সে বিষয়টি সম্পর্কে জেনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। বিনিয়োগ করতে হবে নিজেকে চাকরির বাজারে উপযোগী করার জন্য।

২। চাকরির বাজারে লড়াইয়ের জন্য কী কী বিষয়ে নিজেকে দক্ষ করতে হবে সেগুলো জেনে নিয়ে যথার্থ প্রস্তুতি নিতে হবে।

৩। কেবল দক্ষ হলেই চাকরি পাওয়া যায় না। নিজেকে একজন সৎ, যোগ্য ও উপযোগী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ইতিবাচক মনোভাব ও শিখতে চাওয়ার মানসিকতা চাকরির অন্যতম পূর্বশর্ত।

৪। যে প্রতিষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দিতে যাবেন, সেই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিতে হবে।

৫। এখন দুনিয়া হচ্ছে প্রেজেন্টেশন বা উপস্থাপনার যুগ। যে বিষয়টি জানা আছে সেটিকে সুন্দর ও যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করতে জানা অন্যতম যোগ্যতা। পাশাপাশি যা জানা নেই সেটি স্বীকারে সততা থাকতে হবে। মিথ্যা বা জালিয়াতি দিয়ে বা প্রতারণা করে কোনো বিষয় সামাল দিতে চাওয়া উচিত নয়।


জীবনবৃত্তান্তে নিজের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য খুব ছোট ও টু-দ্য-পয়েন্টে লিখতে হবে। ইন্টার্নশিপ বা স্বেচ্ছাসেবী কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে সেগুলোকেও সুন্দর করে লিখতে ও বলতে জানতে হবে।

৬। কেন আপনি চাকরিটির জন্য যোগ্যতম প্রার্থী সে-সম্পর্কে শক্ত পয়েন্ট ঠিক করে রাখতে হবে।

৭। ভাষাজ্ঞান একটি অন্যতম বিষয়। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই সমান দক্ষতা থাকতে হবে। বাংলা আমার মাতৃভাষা বা আমি বাংলা ভাষায় পড়াশুনা করেছি বলে ইংরেজি জানি না, এটি একধরনের অযোগ্যতা। বাংলায় যেমন সুন্দর করে উপস্থাপন করতে জানতে হবে; ঠিক তেমনি ইংরেজিতেও ভাষাগত দক্ষতা দেখাতে হবে।

৮। জীবনবৃত্তান্তে নিজের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য খুব ছোট ও টু-দ্য-পয়েন্টে লিখতে হবে। ইন্টার্নশিপ বা স্বেচ্ছাসেবী কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে সেগুলোকেও সুন্দর করে লিখতে ও বলতে জানতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি কোনো সামাজিক বা গঠনমূলক কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত রাখলে সেটি ব্যক্তিত্বকে শক্ত করে। পাশাপাশি তা কাজ পরিকল্পনা, পরিচালনা ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাকে গড়ে তুলে। চাকরির বাজারে ইতিবাচক কোনো যোগ্যতাই ফেলনা নয়।

আলেয়া পারভীন লীনা: লেখক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ কর্মকর্তা। সমাজ ও রাজনীতির নানা বিষয়ে অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় নিয়মিত লিখেন। ‘আমাদের যা বলার ছিলো বলবে এবার বাংলাদেশ’ নামে তাঁর একমাত্র বই ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে।

লেখাটি কতোটুকু পছন্দ হয়েছে?

মন্তব্য লিখুন