উচ্চশিক্ষা

ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করবেন, কিন্তু শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ না করলে?

রাজনীতি
রাজনীতি; ছবিসূত্র: hbr.org
লিখেছেন গৌতম রায়

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতির, বিশেষত সরকারী ছাত্র সংগঠনের বর্তমান কাজকর্ম দেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবিটি জোড়ালো সামাজিক ভিত্তি পাচ্ছে। সেই দাবি বিশ্লেষণে কিংবা ঘটনা ব্যাখ্যায় এমনভাবে ছাত্র রাজনীতিকে দোষারোপ করা হচ্ছে যেন ছাত্র রাজনীতি একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, এর সাথে আগে-পরে কোনোকিছুর সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, ধরুন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, ছাত্র রাজনীতির এই মুহূর্তে কতিপয় শিক্ষার্থী ছাড়া সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী শ্রেণিটি কারা? অতি অবশ্যই প্রশাসনিক ও দলীয় দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা। ফলে শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে এক মিথোজীবিতার সম্পর্কে জড়িয়ে থাকে।

উদাহরণস্বরুপ, ধরুন একজন শিক্ষক কেন রাজনীতি করেন? আদর্শের জন্য উত্তর হলে সেটি এখন অনেক বেশি ইউটোপিয়ান শোনাবে। কারণ এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আপনি খুঁজে পাবেন না যেখানে আদর্শ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়নি। এটি মূলত ঘটে পদ-পদবির তুলনায় প্রতিযোগিতা বেশি হয়ে যাওয়ায় প্রতিযোগীর সংখ্যা কমানোর উপায় হিসেবে।

ফলে আমি আদর্শের যে ভাগের হয়ে থাকছি, সেটি যদি ক্ষমতায় থাকে তাহলে আমার সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায়। এ-কারণে শিক্ষক রাজনীতির একটি বড় উদ্দেশ্য হয় বর্তমানের কিছু সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ। কারণ এই রাজনৈতিক পরিচয় শেষ পর্যন্ত জোড়ালোভাবে বহন করতে পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু পাবার পথ সুগম হয়।


এ-কারণে শিক্ষক রাজনীতির একটি বড় উদ্দেশ্য হয় বর্তমানের কিছু সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ। কারণ এই রাজনৈতিক পরিচয় শেষ পর্যন্ত জোড়ালোভাবে বহন করতে পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু পাবার পথ সুগম হয়।


বর্তমানের সুযোগ-সুবিধার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় দলীয় আনুগত্যকে নিঃসন্দেহাতিত বলে প্রমাণ করা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে নানা নেতৃস্থানীয়দের সাথে আপস ও দরাদরির মাধ্যেমে তাদের এজেন্ডার বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা। কিন্তু প্রতিযোগিতা তো খুব তীব্র!

ফলে প্রতিপক্ষকে নানাভাবে স্টিগমাটাইজ করা (সেটি নিজ আদর্শের অন্য অংশের হলে আরো বেশি, কারণ তারা ঘনিষ্ট প্রতিযোগী), আঞ্চলিকতা, ধর্ম ইত্যাদির ব্যবহার হয়ে যায় রাজনীতির প্রধান কৌশল। কিন্তু রাজনীতিতে যাকে আমার প্রয়োজন (উর্ধ্বতন/অধস্তন উভয়েই), তাকে নানাভাবে রক্ষা করবার চেষ্টা করি সেটা নির্লজ্জভাবে হলেও।

ফলে যখন ক্ষমতার পট পরিবর্তন হয় (সেটি নিজ দলের খণ্ডিত আদর্শ, কিংবা অন্য দলের আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হোক না কেন), তখন ক্ষমতাসীন হয়ে আমি দুরন্ত হয়ে যাই নিকট অতীতের বঞ্চনার কথা মনে করে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আর যেন বঞ্চনার স্বীকার না হতে হয়, সেজন্য ক্ষমতাকে আরো পাকাপোক্ত করতে বা যতদূর সম্ভব টেনে নিয়ে যেতেও একইভাবে কাজ করতে হয়। এভাবে ব্যক্তি পরিবর্তন হয়, কিন্তু ব্যবস্থাটি চলতে থাকে এবং দিনের পর দিন আরো নির্লজ্জ হয়ে পড়ে।

প্রশ্নটা হলো, একজন শিক্ষক সবসময় কি শুধু ক্ষমতা বা পদ পাবার জন্য দলীয় রাজনীতি করে? না, অনেক শিক্ষক আছেন যারা কোনো পদের জন্য দলীয় রাজনীতি করেন না। তাহলে কি শুধু মতাদর্শের জন্য তিনি দলীয় রাজনীতি করেন? বর্তমান দলীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটিও একধরনের ইউটোপিয়া নয় কি? সেক্ষেত্রে দলীয় ভুল বা অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি কথা বলেন না কেন?

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি কাজ করে, তা হচ্ছে একটা ভয়ের পরিস্থিতি? কিসের ভয়? যেমন ধরুন, আমি একটি নির্দিষ্ট দলীয় আমলে শিক্ষতার চাকুরিটা পেলাম। সামনে আমার প্রমোশন। এরকম একটি পরিস্থিতিতে প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অথবা পদে আসীন কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট কোনো অপকর্মের বিরুদ্ধে আন্দোলনে (যে আন্দোলন সাধারণত দলীয় বিপক্ষ গ্রুপ অথবা বিরোধী দলীয় লোকদের অংশগ্রহণ থাকে) এই শিক্ষকরা যাবেন?

আমি খুব বেশি হলে দলীয় বিপক্ষের গ্রুপের সাথে আন্দোলনে গিয়েছি। তখন আমার শুভাকাঙ্ক্ষী কোনো শিক্ষক এসে আমাকে বলছেন, ‘তুমি এই আন্দোলনে কেন, তোমার না সামনে প্রমোশন?’ তার অর্থ হচ্ছে, এখানে একটি ভয়ের রাজনীতি কাজ করে। আমি ক্ষমতাসীন গ্রুপের বিরুদ্ধে গেলে আমার প্রমোশন আটকিয়ে যেতে পারে। অথবা আমি একটা নির্দিষ্ট বাসা বরাদ্দ চাচ্ছি। এখন আমি দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ক্ষমতাসীন ব্যক্তির কাছে গেলাম সুপারিশের জন্য, না হলে সেটি হয়তো অন্য কাউকে বরাদ্দ দিয়ে দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে আমি কি বাসাটা বরাদ্দ পাবো যদি তিনি আমাকে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কাজে আমাকে সংশ্লিষ্ট হতে দেখেন? ফলে একটি ভয় বা স্বাভাবিক কিছু সুযোগসুবিধা প্রাপ্তির নিশ্চয়তাকে স্বচ্ছন্দ করার জন্য আমি কোনো বিশেষ পদ বা ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা ছাড়াও দলের বা দলের কোন নির্দিষ্ট গ্রুপের বাইরে যেতে চাই না।

আর যদি কোনো বিশেষ পদ বা ক্ষমতায় যায়, সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, আমি যে দায়িত্ব পেলাম তা সফলভাবে সম্পন্ন করা। এই সফলতার জন্য আমাকে এমনকিছু কাজ করতে হয় যা অনেকক্ষেত্রে বৈধ রাজনৈতিক পথে সম্ভব নয়। যেমন, ধরুন আমি কারো নামে একটি উড়োচিঠি দেব, আমি কাকে দিয়ে করাব? আমি উর্ধ্বতন বা সহকর্মী কাউকে দিয়ে নয় নিশ্চয়। আমার কিছু শিক্ষার্থীবাহিনী থাকতে হবে যারা বিশ্বস্ত, যাদেরকে দিয়ে এই কাজ করাতে পারি। বা কোনো কারণে আমার গুরুস্থানীয় উর্ধ্বতন কারো বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে, সেখানে আমার বিশ্বস্ত বাহিনী কাজে লাগালাম বিপক্ষ দলের বা গ্রুপের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে না নামাতে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে সেই বিশ্বস্ততার সম্পর্ক তৈরি করবো। সেটি প্রথমে রাজনৈতিক পরিচয় এবং পাশাপাশি এলাকা, ধর্ম, একই নেতার অনুসারী ইত্যাদি বিভিন্নভাবে। তার চেয়ে বড় বিষয়, তার এই কাজটি করার দলবল, ক্ষমতা ইত্যাদি থাকতে হবে। এরকম একটি গ্রুপ করতে তার টাকা, অস্ত্র ইত্যাদি লাগবে। এখন আমি যদি কোনো একটি অবস্থায় থেকে তাকে এই সুবিধাগুলো করে না দিই, সে আমার কাজ করে দিবে?

উদাহরণস্বরুপ, ধরুন আমি একটি হলের প্রাধ্যক্ষ হলাম। আমার উদ্দেশ্য, ক্ষমতায় থাকাকালে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া। অথবা, নিদেনপক্ষে দায়িত্বটি সফলভাবে সম্পন্ন করে আমার সিভিটিকে শক্ত করে ভবিষ্যতে আরো বড় কোনো জায়গায় যাওয়া। তাহলে আমি কী করবো?

সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের সাথে আপস করা। কেন? ভালোভাবে টিকে থাকা। আমি চাইবো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে ছাত্র সংগঠনের যে গ্রুপটির সম্পর্ক ভালো, তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে। এতে আমার সুবিধা হচ্ছে বর্তমানে নির্বিঘ্নে চলতে পারা, অন্যদিকে বড় কোনো জায়গায় যেতে চাইলে উর্ধ্বতন স্থানে তাদের সুপারিশ কাজে লাগানো।


বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিন্যাসে আমার রাজনৈতিক পরিচয় যতোদিন মুখ্য হয়ে থাকবে, ততোদিন শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় কোনো না কোনো ফর্মে মুখ্য হয়ে থাকবে। কাজেই ছাত্র রাজনীতি বন্ধের আগে প্রয়োজন শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি বন্ধ করা, তাহলেই কেবল ছাত্র রাজনীতি তার দলীয় কবল থেকে বের হয়ে আসবে।


যেমন, তারা হয়তো বললো, স্যার তো আমাদের পক্ষের লোক, অমুকদলের বা গ্রুপের শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দিতে বলেছিলাম বা পুলিশে দিতে বলেছিলাম, স্যার দিয়েছিলেন ইত্যাদি বা আরো শক্ত ধরনের সুপারিশ। ফলে আমি চাইবো হলে তার গ্রুপের আধিপত্য বজায় থাকুক। এই আধিপত্য ততো বেশি হবে যার গ্রুপ যতো বড়। সেক্ষেত্রে সে হয়তো ৫০ জন শিক্ষার্থীকে হলে উঠানোর জন্য সুপারিশ করলে আমি তার ব্যবস্থা করে দিলাম। বা হলে আধিপত্য বিস্তারের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধোর করার প্রয়োজনে বিশেষ রুম দরকার। আমি জেনেও না জানলাম।

কিংবা হলের বরাদ্দ বাজেট কোন খাতে ব্যয় হবে সে সুপারিশ নিলাম বা এরকম বিভিন্নভাবে তার আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য সাহায্য করলে আমার চলাটাও নির্বিঘ্ন হয়। শিক্ষার্থী নেতার সুবিধা হচ্ছে সে তার দলবাহিনী জায়গামতো শক্তি প্রদর্শন করতে পারে, বিভিন্ন ভাগবাটোয়ারায় বড় হিস্যা পায়।

এটি একটা উদাহরণ। এরকম যে অবস্থায় আমি থাকি না কেন, এই সম্পর্ককে আমি অস্বীকার করতে পারি না বাস্তব ক্ষমতার স্বার্থে। এভাবে আমি ও আমার শিক্ষার্থী-নেতা একটি মিথোজীবিতার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আমাদের একে অন্যের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করি। ফলে পুরো বিশ্বিবিদ্যালয়ের রাজনীতি হয়ে পড়ে এরকম পারস্পরিক বোঝাপড়ার এক জটিল বিন্যাস।

এই বিন্যাসে অন্তর্ভুক্ত হন সাংবাদিক, পুলিশ, স্থানীয় নেতা, কেন্দ্রীয় নেতা সবাই। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিন্যাসে আমার রাজনৈতিক পরিচয় যতোদিন মুখ্য হয়ে থাকবে, ততোদিন শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় কোনো না কোনো ফর্মে মুখ্য হয়ে থাকবে। কাজেই ছাত্র রাজনীতি বন্ধের আগে প্রয়োজন শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি বন্ধ করা, তাহলেই কেবল ছাত্র রাজনীতি তার দলীয় কবল থেকে বের হয়ে আসবে।

কাজী রবিউল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, নৃতত্ত্ব বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন