তিন ভুবনের শিক্ষা : দেশ-দেশান্তরে শিশু-শিক্ষার রকমফের

তিনটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তিন ভুবনের শিক্ষা বইটি লেখা হয়েছে। এ-ধরনের বই বাংলা ভাষায় নেই বললেই চলে। অন্য দুই দেশ ছাড়াও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে মোটামুটি একটি ধারণা পাওয়ার সুযোগ আছে এই বইয়ে। এটি বললে অত্যুক্তি হবে না যে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পৃথিবীর দুর্বলতম শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর একটি। এই বই পড়ে সেই ধারণা পোক্ত হওয়ার সম্ভবনা বাড়বে বৈ কমবে না।

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর আরও দুটো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কেও বলা আছে এই এক মলাটের ভিতর। এশিয়ারই একটি দেশ – জাপান, অন্যটি নেদারল্যান্ডস, ইউরোপ মহাদেশের একটি দেশ। না, তিন ভুবনের শিক্ষা বইয়ে শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কিত কোনো কল্পকাহিনী ছাপা হয়নি, কিংবা বই পড়ে বা আন্তর্জাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে লেখা কোনো বইও এটি নয়। প্রত্যেকে তাঁদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে উল্লিখিত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের জানার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাঁরা নিজেরা দেখেছেন, জেনেছেন, উপলব্ধি করেছেন, সুবিধা-অসুবিধাকে অনুধাবন করেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেছেন। বিদেশে অনেকে যান, থাকেন বছরের পর বছর, নিজেরা পড়াশুনা করেন, নিজের সন্তানদের পড়াশুনার ব্যবস্থা করেন; কিন্তু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সেসব অভিজ্ঞতা অন্যকে জানানোর কাজটি করে ওঠতে পারেন না। নিজের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা এবং সেগুলো থেকে উত্তরণের পথ বাতলানোর কাজে অনেক ধৈর্য, ইচ্ছাশক্তি, সাহসের দরকার হয়। এসবের সম্মিলন হয় না বলে এ-ধরনের কাজ খুব একটা চোখে পড়ে না। ব্যক্তিগত হাজারো ব্যস্ততা, গবেষণার চাপ, পরিবার-পরিজনের দায়ভার ইত্যাদি সব সামলে এ-ধরনের একটি প্রকাশনার জন্য এর সাথে যুক্ত সবাই ধন্যবাদ পেতেই পারেন। 

আগেই বলা হয়েছে, তিন ভুবনের শিক্ষা বইয়ের লেখক তিনজন। তিনটি অধ্যায়ে তিনটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে অবশ্য উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক শিক্ষার কথাই এসেছে বেশি, মাধ্যমিক সম্পর্কে কিছুটা। শিশু থেকে বাল্য বা কৌশোরের প্রারম্ভ পর্যন্ত এই তিন দেশের শিশুরা কীভাবে শিক্ষা গ্রহণ করে তার প্রামাণ্য দলিল এই গ্রন্থ।

তিন ভুবনের শিক্ষা বইটির সূচীতে তিন দেশের শিক্ষা নিয়ে তিনটি গদ্যের শিরোনাম আছে। এই শিরোনামগুলোতেই কোন দেশে কেমন শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত তার ধারণা পাওয়া যাবে। শিরোনামের মধ্যে লুক্কায়িত আছে শিশুদের প্রতি, এবং তাদের শিক্ষার প্রতি কোন দেশ কী মনোভাব পোষণ করে।

জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বলেছেন তানজীনা ইয়াসমিন। তিনি শিরোনাম দিয়েছেন ‘প্রতিটি শিশুই এক-একটি ফুল, প্রতিটি ফুলই স্বতন্ত্র’। ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী শিশুদের শিক্ষা’ শিরোনামের লেখাটি তানবীরা তালুকদারের, নেদারল্যান্ডসের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে। আর শেষটি, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে, শিরোনাম – ‘পাথরে লেখা আছে অধঃপতন’, লিখেছেন রাখাল রাহা। শিরোনামগুলো কষ্টকল্পিত কিংবা মনের মাধুরী মেশানো কোনো শিরোনাম নয়, উল্লিখিত দেশগুলোর সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার অনেকটুকু ধারণা এখানে ফুটে ওঠেছে। এসব দেশ তাদের শিশুদের সম্পর্কে, শিশুদের শিক্ষা সম্পর্কে কী ভাবে, কী করে এবং শিশুদের জীবনকে কীভাবে মূল্যায়ন করে শিরোনামেও তার কিছু ধারণা পাওয়া যাবে। 

তিন ভুবনের শিক্ষা বইতে অন্য দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে জানার পর যখন নিজের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে পড়বেন, যারপরনাই হতাশ হবেন। মনে হবে এদেশের শিশুরা অভিশপ্ত, স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে এসব নিষ্পাপ শিশুদের অজানা কোনো পাপের শাস্তি হিসেবে বাংলাদেশ নামক দেশের নারকীয় শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, এখানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান ধারা বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে একই বয়সের শিশুদের জন্য তিন-তিনটি ধারা (বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা শিক্ষা–ব্যবস্থা) সম্বলিত এ-রকম অদ্ভুত শিক্ষাব্যবস্থা আছে কি না আমার জানা নেই (ভারত, পাকিস্তান বাদে)। দেশ স্বাধীনের পঞ্চাশ বছর হতে চললো, আজো আমাদের শিশুদের জন্য একটি অবৈতনিক সর্বজনীন, বিজ্ঞানসম্মত, আধুনিক এবং বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে পারিনি। এই না-পারার মধ্যে যে লজ্জা, যে বেদনা থাকা উচিৎ তা কারো মধ্যে আছে বলে মনে হয় না। এই বই-পাঠ সেই লজ্জার অনুভূতি দিলেও দিতে পারে।

শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয়টিকে খুবই সতর্কতা ও সংবেদনশীলতার সাথে অনুধাবন করা জরুরি। এটা নিয়ে ফি-বছর পরীক্ষা চালানোর মধ্যে সুফলের চেয়ে কুফলই বেশি হওয়ার কথা। প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত তৈরি করে দেয়। শিশু ভবিষ্যতে কেমন নাগরিক হবে, এই দেশ, এই ভাষা, এই সমাজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে তার মনোভাব কী হবে, মানুষকে, এবং সর্বোপরি সে নিজেকে কীভাবে দেখবে, তার সেই দেখার চোখ, বোঝার অনুভূতি, বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা তৈরি করে দেয়ার ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশের একটি অন্যতম অবহেলিত খাত হলো প্রাথমিক শিক্ষা। একটি সুন্দর, সুখী, সৃজনশীল আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদের যে প্রচেষ্টা দেখা যায়, তা যৎসামান্যই।

এটা ঠিক, বাংলাদেশে পরিচালিত হয় পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের অবকাঠামোগত সংকট, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের অভাব, অপ্রতুল শিক্ষাবাজেট ইত্যাদির সমস্যা আছে। এসব সমস্যাকে আমাদের সীমাবদ্ধতা মেনেও শিক্ষাব্যবস্থাকে আরেকটু উন্নততর স্তরে নেয়া অসম্ভব হতো না, কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের। এর বাইরেও আরো অনেকগুলো অপশক্তি ও অব্যবস্থাপনা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে নিয়ে গেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে, স্বজনপ্রীতির কালো থাবায় প্রকৃত শিক্ষক ও শিক্ষা-মনস্করা কোণঠাসা এখানে, অশিক্ষিত বা আধাশিক্ষিত, অপরিণামদর্শী ও পয়সালোভীদের আগ্রাসনে শিক্ষার প্রকৃত আদর্শ ও উদ্দেশ্য আজ নির্বাসনে। রাখাল রাহার লেখার পরতে পরতে এই চিত্র পাওয়া যাবে। এটাতে দ্বিমতের সুযোগ নেই, কেননা আমরা অনেকেই কম-বেশি এ-ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি এবং এখনও যাচ্ছি।

অন্য দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বলার কিছু নেই। আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান, শিশুমনস্তত্ত্ব, শিশুকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া, প্রত্যেকটি শিশুকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ভাবা, শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ ও নিরাপত্তা ইত্যকার সবকিছুর সমন্বয় এই দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয়েছে। দিবাযত্ন কেন্দ্র, প্রাথমিক বিদ্যালয় সবগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ যত্ন ও আন্তরিকতাও পরিলক্ষিত হয়। তারা স্কুলকে শিশুদের জন্য আনন্দ ও ভালোবাসার এক চমৎকার স্থানে পরিণত করতে পেরেছেন। শিশুদের সুষম ও মানবীয় মূল্যবোধ তৈরিতে তারা সচেষ্ট। বিভেদ, ঘৃণা, হিংসা যাতে শিশুদের কোমল মনকে স্পর্শ না করে তার জন্য পিতা-মাতা, শিক্ষক সবাই সচেতন।

নেদারল্যান্ডসের অধিবাসীরা গর্ব করে বলতেই পারেন, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী শিশুদের বাস তাদের দেশে। শিশুদের জীবনকে আনন্দময়, মধুময় করার সব ব্যবস্থা এখানে করা হয়েছে। এখানে প্রাথমিক শিক্ষা আট বছর পর্যন্ত। বাচ্চাদের স্কুলে পরীক্ষা আছে, কিন্তু সেগুলো তাদের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করে না। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে একেক বিষয়ে একেক দিন পরীক্ষা হয়ে যায়। বাচ্চাদের কোনো স্কুল-ড্রেস নেই, কেননা গবেষণায় দেখা গেছে বাচ্চারা নিজেদের পছন্দের পোশাক পড়লে তা তাদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব গড়তে সহায়তা করে। এই দেশের বাচ্চাদের ছোট বেলায়ই শিখিয়ে দেয়া হয়, অন্যদের পোশাক-আশাক নিয়ে সমালোচনা করা ‘বৈষম্য’ করারই সামিল। আর ধর্ম, ভাষা, জামা-কাপড়, জাতীয়তা ইত্যাদি নিয়ে ‘বৈষম্য’ করলে আছে শাস্তির ব্যবস্থা, আছে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও। বাচ্চাদের নিজেদের কাজ নিজেদের করার মধ্যে দিয়ে স্বাবলম্বী করার প্রচেষ্টা একদম অল্পবয়স থেকে শুরু করা হয়।

জাপানের কিন্ডারগার্টেনেও শিশুদের সাবলম্বী করার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। খাওয়ানোর জন্য বাচ্চার ওপর জোরাজুরি করা হয় না, শারীরিক কষ্ট সহ্য করার জন্য দেয়া বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ। খালি গায়ে শীতের দিনে খোলা আকাশের নিচে রোদের আলোয় বসিয়ে রেখে ঠাণ্ডা সহ্য করার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। রাস্তার নিয়ম-কানুন ট্রাফিক সিগন্যাল, ট্রাফিক আইন, বাসে-ট্রেনে চড়ার নিয়মকানুন ইত্যাদি স্কুল থেকেই শেখে, ক্ষেত্রবিশেষে হাতে-কলমে শেখানোর জন্য তাদের বাহিরে নিয়ে যাওয়া হয়। বাচ্চাদের বাধ্যতামূলকভাবে নিজের এলাকায় ২০ মিনিট হাঁটা দূরত্বের স্কুলেই ভর্তি হতে হয় যাতে নিজেরা একা একা স্কুলে যেতে পারে। দল বেঁধেও যেতে পারে চাইলে, তবে অভিভাবকেরা যেতে পারবে না, পারবে না গাড়ি করেও পাঠাতে। নিয়মগুলোকে বানানো হয় এমনভাবে, যেন তা হয় শিশুবান্ধব, এবং তা করা হয় শিশুর সর্বোচ্চ বিকাশ ও শিশুর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তাকে ধর্তব্যে এনে। জাপানীরা পরিশ্রমী জাতি, সৎ; তাদের আন্তরিকতাও প্রশ্নাতীত, তবে তাদের সমাজে অন্যদের প্রবেশাধিকার দিতে তারা অনেকেই বেশ কুণ্ঠিত। অন্যদের তারা স্বাগতম জানায় সবসময়। তাদের দেশে এসে শিক্ষা নাও, ভালো গুণ থাকলে সেটা দিয়ে যাও, কিন্তু তাদের মূল্যবোধ, সংস্কৃতি যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য তাদের সমাজে বহিরাগতদের একীভূতকরণে দ্বিধান্বিত, অনেকটা নারাজ। অনেক শিক্ষক ভিনদেশিদের প্রতি এই ধরনের ‘বর্ণবাদী’ আচরণ লুকোতে পারেন না। এই ধরনের কিছু নেতিবাচক দিক ছাড়া জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা শিশুকে সুনাগরিক ও মানবিক মানুষ করার জন্য যথার্থ বলে মনে করেন লেখক।

বিদেশে না গিয়েও, না থেকেও সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা, জীবনধারা, মুল্যবোধ, শিক্ষাবিষয়ক চিন্তাভাবনা সম্পর্কে জানতে হলে তিন ভুবনের শিক্ষা বইটি পড়তে হবে। এই বই নিজের দেশের অবক্ষয়ী শিক্ষাব্যবস্থার সাথে উন্নতদেশের শিক্ষাপদ্ধতির ধরন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণালাভে সহায়তা করবে। শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে সংবেদনশীল, মানবিক ও দক্ষ নাগরিক তৈরি করা যায় তার একটি পরিচ্ছন্ন ধারণা পাওয়া যাবে। আমাদের পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে কেন অসহিষ্ণুতা, দুর্নীতি, কেন আমরা দিন দিন পিছিয়ে পড়ছি, তার উত্তর এই বইয়ে সরাসরি নেই, কিন্তু আমাদের অপরিকল্পিত অগোছালো অযত্নে গড়া শিক্ষাব্যবস্থায় যে তার বীজ উপ্ত আছে তা বুঝে নিতে সমস্যা হবে না।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে অন্য দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার যে পার্থক্য সেটি সহজে ঘুচবার নয়। সেটি হুবুহু একই রকম হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এর চেয়ে ভালো শিক্ষাব্যবস্থা যে সম্ভব নয়, তাও নয়। এগুলো নিয়ে মতান্তর থাকতেই পারে। এই বইয়ের অনেক উপাদান আমাদের সেই শিক্ষাভাবনাকে উস্কে দেবে। এই ধরনের প্রতিতুলনা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলোকে স্পষ্ট করতে সহায়তা করবে। 

তিন ভুবনের শিক্ষা বইয়ের বাঁধাই, প্রচ্ছদ, বানান ইত্যাদি সবকিছুতে যত্নের ছাপ ছিল। তবে, কিছু বিষয়ের কিংবা একজাতীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি চোখে পড়েছে প্রায় প্রত্যেকের লেখায়। গদ্যের সাবলীলতার অভাব চোখে পড়েছে কোনো কোনো জায়গায়, যার কারণে এক নাগাড়ে পড়তে গিয়ে বেগ পেতে হয়েছে। এটি অবশ্যই একান্তই ব্যক্তিগত মত। সবার ক্ষেত্রে একই রকম নাও মনে হতে পারে। যেমন, ‘’এখন বইতে দুটো আলাদা এঙ্কেট (Enquête) দেয়া আছে একটি বাবা-মা পূরণ করবে, আরেকটি সন্তান পূরণ করবে…” (পৃষ্ঠা-৯৯) এখানে এই এঙ্কেট শব্দটি দ্বারা আসলে কী বুঝাচ্ছে বলা কঠিন। কিন্তু এই শব্দটির বাংলা অর্থ দেয়া যেত। শব্দটি মূলত ফরাসি থেকে ওলন্দাজ (ডাচ) ভাষায় কৃতঋণ শব্দ। শব্দটি ওলন্দাজ শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যার সাধারণ অর্থ জরিপ (Survey), আর  উচ্চারণ  ‘অঁকেত’। এ-ধরনের ছোটখাট দুয়েকটি বিষয়কে সহজবোধ্য করে দেয়া গেলে পাঠ আরও আরামদায়ক ও সহজবোধ্য হত। 

আমাদের দেশে শিশুদের প্রতি যেরূপ আচরণ করা হয় তা অনেকক্ষেত্রে তাদের বিকাশের পরিপন্থী। শিশুদের যে একটি স্বতন্ত্র সত্তা আছে, তাদেরকেও যে একজন পরিপূর্ণ মানুষের মতো মূল্যায়ন করা উচিৎ, এটি আমরা অনেকে ভাবি না। শিশুদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা-ভালোলাগা-মন্দলাগাকে গুরুত্ব দেয়া দরকার। তাদের ওপর জোরপূর্বক কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া অনুচিত। শিশুদের চিন্তা-ভাবনা-মতামতকে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, আখেরে সবারই কল্যাণ হবে তাতে। বলতে দ্বিধা নেই, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরীক্ষার খারাপ রেজাল্ট করে আত্মহত্যায় শিক্ষার্থীদের দায় যতটুকু, তার চেয়ে বেশি দায় অভিভাবকদের, কিছুটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। এই বই পাঠ শিশুদের প্রতি আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন আনয়নে সহায়ক হতে পারে। 

তিন ভুবনের শিক্ষা বইটি শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার পড়া উচিৎ বলে মনে করি। 

বইয়ের নাম : তিন ভুবনের শিক্ষা  (তিন বাঙালি মা-বাবার অভিজ্ঞতায়)

লেখক :  তানজীনা ইয়াসমিন, তানবীরা তালুকদার, রাখাল রাহা 

প্রকাশক : শিশু ও শিশু রক্ষা আন্দোলন (শিশির)

প্রচ্ছদ : সব্যসাচী মিস্ত্রী 

প্রকাশকাল : ফ্রেবুয়ারী ২০১৯

মূল্য : ৩০০ টাকা 

বাণীব্রত রায়

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

Recent Posts

আপনার প্রত্যাশার চাপ কী ক্ষতি করছে আপনার সন্তানকে?

আমরা কি জা‌নি, পৃ‌থিবীর প্রায় কো‌নো বিখ্যাত মানুষই তাঁদের মা-বাবার প্রত্যা‌শিত উপায়ে বড় হননি? তাঁরা…

5 দিন ago

মাছুম বিল্লাহ: “শিক্ষা নিয়ে লেখালেখি করলে পরিবর্তন আসে, হয়তো সবসময় সেটি দৃশ্যমান হয় না”

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে লেখালেখি করছেন অনেকেই। প্রতিনিয়ত যারা শিক্ষা নিয়ে লেখালেখি করছেন, মাছুম বিল্লাহ তাঁদের…

6 দিন ago

করোনায় নেদারল্যান্ডসের শিক্ষা

করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুইডেনের পরে ইউরোপে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে আছে নেদারল্যান্ডস। সংক্রমণের উচ্চহার, মৃত্যু, ভ্যাক্সিনের…

3 সপ্তাহ ago

কেমন হওয়া চাই করোনা অতিমারীকালীন শিক্ষাবাজেট

করোনার অতিমারীতে যে সকল খাতের চরম ক্ষতি হয়েছে সেগুলো দৃশ্যমান, কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি দৃশ্যমান নয়।…

4 সপ্তাহ ago

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে পরীক্ষা : প্রস্তাব না সিদ্ধান্ত?

করোনা মহামারীর কারণে প্রায় পনের মাস যাবত দেশের সকল ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। প্রাথমিক ও…

1 মাস ago

মহামারির কালে শিক্ষা : পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি বিষয়ে অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও প্রস্তাব

২০১৯ সালের শেষের দিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয় পৃথিবীব্যাপী। ২০২০ সালের মার্চ মাসের দিকে বাংলাদেশে…

2 মাস ago