বাংলাদেশের শিক্ষা

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা: তিন

আবদুল্লাহ আল মামুন

ছয়

গবেষণাকর্ম নিয়ে একটি প্ৰশ্ন প্রায়ই উঠে আসে, সেটি হলো: গবেষণা কর্মের গুণগতমান না পরিমাণগতমান বেশি গুরুত্বের দাবিদার? অনেকে মনে করেন গুণগতমান, আবার অনেকে মনে করেন পরিমাণগতমান। আমি দুটোকেই সমান গুরুত্বের চোখে দেখে থাকি। আমার স্বপক্ষে কিছু যুক্তি উপস্থাপন করছি:

আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের world class research করতে বা করাতে স্ব স্ব গবেষণাক্ষেত্রের জার্নালগুলোর মান (Thomson Reuters কর্তৃক নির্ণীত impact factor) এবং পৃথিবীর অন্যান্য গবেষকদের গবেষণাকর্মের তুলনায় নিজের গবেষণাকর্মের মান (তাঁর যেকোনো গবেষণাকর্মের citation সংখ্যা, মোট citation সংখ্যা, impact point, h-index ও i10-index) জানাটা অতি জরুরি

আমাদের নবীন শিক্ষক ও তাঁদের অধীনে গবেষণারত শিক্ষার্থীদের (যাঁরা world class research করতে আগ্রহী) জন্যে গবেষণা কর্মের মানদণ্ড (যেমন citation number, impact factor, impact points, h-index এবং i10-index) সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু ধারণা প্রদানের চেষ্টা করছি:

আমি মনে মনে করি, আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের world class research করতে বা করাতে স্ব স্ব গবেষণাক্ষেত্রের জার্নালগুলোর মান (Thomson Reuters কর্তৃক নির্ণীত impact factor) এবং পৃথিবীর অন্যান্য গবেষকদের গবেষণাকর্মের তুলনায় নিজের গবেষণাকর্মের মান (তাঁর যেকোনো গবেষণাকর্মের citation সংখ্যা, মোট citation সংখ্যা, impact point, h-index ও i10-index) জানাটা অতি জরুরি। আমার মূল কথা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে world class research করার পরিবেশ গড়ে তুলতে, আমাদের শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নামতে হবে, এবং সেই সঙ্গে আমাদের শিক্ষার্থীদেরকেও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নামাতে হবে।

সাত

একজন গবেষক ও শিক্ষক নিজে যেমন সার্থক, সফল ও অর্থবহ জীবনের স্বপ্ন দেখে এসেছেন, ঠিক তেমনি তাঁর শিক্ষার্থীদের তাঁর নিজের চেয়েও অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখাতে হবে। সেই সঙ্গে সেই বড় বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথও দেখাতে হবে। একজন গবেষক ও শিক্ষককে তাঁর গবেষণাকর্মে ও শিক্ষকতায় সর্বদা সৎ ও আন্তরিক থাকতে হবে যেহেতু তিনি সত্য ও সুন্দর সন্ধানে, সেই সঙ্গে শুদ্ধ ও আকর্ষণীয় পাঠদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আমরা বড় বড় থিসিস অথবা অনেক গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করার চেষ্টা করে থাকি, কিন্তু existing literature-এ অর্ধেক বাক্য যোগ/বিয়োগ করাই যথেষ্ট আমাদের স্ব-স্ব গবেষণা ক্ষেত্রে একটি বিশাল জায়গা করে নেওয়ার জন্য। কিন্তু কোন গবেষণাকর্ম আমাদের এ অর্জন এনে দিবে, তা আমরা নিজেরাও জানি না।

আমরা বড় বড় থিসিস অথবা অনেক গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করার চেষ্টা করে থাকি, কিন্তু existing literature-এ অর্ধেক বাক্য যোগ/বিয়োগ করাই যথেষ্ট আমাদের স্ব-স্ব গবেষণা ক্ষেত্রে একটি বিশাল জায়গা করে নেওয়ার জন্য। কিন্তু কোন গবেষণাকর্ম আমাদের এ অর্জন এনে দিবে, তা আমরা নিজেরাও জানি না।

আমাদের একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে চোখভুলানো অট্টালিকা বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের একমাত্র নিয়ামক নয়। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের অন্যান্য জরুরি নিয়ামকগুলো হলো:

একটি বিশ্বমানের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয় গঠনে উপাচার্যের ভূমিকা অপরিসীম। আমার ২৭ বছরের গবেষণা ও শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ভূমিকার ওপর আমার নিজেস্ব কিছু কথা শেয়ার করছি:

আমার স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই যে, আমার প্রিয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে ৮০% নবীন শিক্ষকই অত্যন্ত মেধাবী ও শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা রাখে। কিন্তু নিয়োগকর্তারা অতি অভিজ্ঞ আম বিক্রেতাদের (যাদের কাজ হলো প্রতি পাঁচটি আমের মধ্যে কমপক্ষে একটি করে পচা আম ঢুকিয়ে দেয়া) মতো প্রতি চার-পাঁচজন যোগ্য মেধাবী শিক্ষকের সাথে একজন করে অযোগ্য শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দান করেন। একটি পচা আম নিয়ে আমার যতো না মাথাব্যথা, তার চেয়ে অনেক বেশি মাথাব্যথা এই জন্যে যে, একটি পচা আম বাকি আমগুলোকেও পচিয়ে ফেলতে পারে যেহেতু ব্যধি সংক্রামক, কিন্তু স্বাস্থ্য সংক্রামক নয়।

একটি বিশ্বমানের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয় গঠনে নবীন শিক্ষকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ। কারণ অধিকাংশ বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীরাই তাঁদের বড় বড় গবেষণাকর্ম তাঁদের ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সেই করেছেন (যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা স্বীকৃতি অনেক পরেই পেয়েছেন)। যেমন, Thomson তাঁর ৪১ বছর বয়সে (১৮৯৭ সনে) ইলেকট্রন আবিস্কারের জন্যে ৫৩ বছর বয়সে (১৯০৯ সনে) নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন; রাদারফোর্ড তাঁর ৩৩ বছর বয়সে (১৯০৪ সনে) মূলত এবং র‍্যাডিয়েশন আবিস্কারের জন্যে ৩৭ বছর বয়সে (১৯০৮ সনে) নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন; আইনস্টাইন তাঁর ২৬ বছর বয়সে (১৯০৫ সনে) ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্টের কোয়ান্টাম ব্যাখ্যার প্রদানের জন্যে ৪২ বছর বয়সে (১৯২১ সনে) নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন; বোর তাঁর ২৮ বৎসর বয়সে (১৯১৩ সনে) বোর অ্যাটম মডেল প্রদানের জন্যে ৩৭ বছর বয়সে (১৯২২ সনে) নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ইত্যাদি।

সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের সোনার বাংলার মেধাবী ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশ গিয়ে গবেষণার উপযুক্ত সুযোগ ও পরিবেশ পেয়ে এমন ভালো ভালো কাজ করছে, তা শুধু তাদেরকেই স্বনামধন্য করছে না, ধন্য করছে আমাদের, ধন্য করছে আমাদের বাংলা জাতিকে। আমাদের এই মেধাবী ছেলেমেয়েদের অনেকেই দেশে ফিরছে, আবার অনেকে দেশে ফেরছে না। স্বদেশে নিয়োগে অনিয়ম ও অবমূল্যায়নের অভিযোগ ছাড়াও তাদের দেশে না ফেরার পিছনে অনেক যুক্তি রয়েছে। সে যুক্তিতে আমি যাচ্ছি না। দেশে ফেরার জন্যে আমার একটিই যুক্তি রয়েছে। ধরা যাক, একটি শিশুকে একদিকে ছেঁড়া কাপড় পরা তার হতদরিদ্র মা হাত বাড়িয়ে ডাকছেন, অন্যদিকে বিশ্বসুন্দরী (যেমন, ঐশ্বরিয়া রায়) হাত বাড়িয়ে ডাকছেন। শিশুটি কার কাছে যাবে এবং কেন যাবে? আমার বিশ্বাস, ছেঁড়া কাপড় পরা তার হতদরিদ্র মায়ের কাছেই যাবে। কারণ নিজের মায়ের কোলই তার সবচেয়ে প্রিয় এবং নিরাপদ জায়গা। সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এই মাতৃভূমি কি মায়ের কোলের মতো আমাদের সবচেয়ে প্রিয় এবং নিরাপদ জায়গা নয়? পৃথিবীতে আছে কি এমন কোনো জায়গা যা আমাদের মাতৃভূমির চেয়েও বেশি প্রিয় এবং নিরাপদ?

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একজন আত্মউৎস্বর্গকৃত গবেষক ও শিক্ষক তাঁর আত্ম-উৎস্বর্গের স্বীকৃতি কোনো না কোনো এক রূপে, কোনো না কোনো একদিন অবশ্যই পাবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা (যা আমার পেশা থেকে নেশাতে পরিণত হয়েছে) নিয়ে আমার না বলা অনেক জমাটবাঁধা কথাই আমার হৃদয়ের কথা, আমার ভালোবাসার কথা। এ-জন্যেই আমার এ লেখা, যা কোনোভাবেই কাউকে কষ্ট দেয়ার জন্য নয়। তারপরও আমার এ লেখায় কোনোভাবে কেউ কোনো কষ্ট পেয়ে থাকলে আমাকে ক্ষমা করবেন।

আরও পড়ুন: প্রথম পর্ব এখানেদ্বিতীয় পর্ব এখানে

আবদুল্লাহ আল মামুন: অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

Exit mobile version