উচ্চশিক্ষা গবেষণা শিক্ষক ও শিক্ষা

শিক্ষা ও গবেষণায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়: পর্ব ১

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লিখেছেন গৌতম রায়

এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের হিসেব মতে, দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৩। এর ভেতর একটি বড় অংশ খয়রাতি বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক বিবেচনায় অনুমোদন পেয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। কিন্তু এটিই একমাত্র চিত্র নয়। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এসব অনাচারের ভেতর দিয়েও মান বজায় রাখার চেষ্টা করছে। সংখ্যায় হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও নিয়োগ প্রক্রিয়া

নিয়োগ প্রক্রিয়ার কথাই বলি। প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় স্বচ্ছ। বিশেষ করে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মোটাদাগে যেখানে পিএইচডি ও পোস্ট-ডক করা যোগ্য প্রার্থীদের বিবেচনায় আনতেই চায় না, সেখানে এই ধরনের প্রার্থীদের প্রথম সারির প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কদর রয়েছে।

এর ফলে যেটি দাঁড়িয়েছে তা হলো, প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ফ্যাকাল্টির মান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টিদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ব্র্যাক, নর্থ সাউথসহ আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি তালিকা ও তাদের অ্যাকাডেমিক ক্রেডেনশিয়াল দেখলে কেউ এ-কথা অস্বীকার করতে পারবেন না। এটিই এখন বাস্তবতা।

আজকের লেখার একটি অংশ এই প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে। সরকারি নির্দেশনায় ইউজিসি দেদারসে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছে। অনুমোদন দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার ক্ষমতা নেই। ঢালাওভাবে এ ক্ষমতা রহিত করা হয়েছে। এটি বড় এক অবিচার। দেশসেরা কিছু গবেষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। কিন্তু তারা পিএইচডি করাতে পারবেন না!


শুভবুদ্ধি এবং স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ থাকলে ইউজিসির এ নিয়ম পরিবর্তন করা উচিৎ। যিনি পিএইচডি করাতে চান, তাঁর অ্যাকাডেমিক প্রোফাইল, প্রস্পেক্টিভ ফেলোর অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা, বিদ্যমান রিসার্চ লজিস্টিক ইত্যাদি বিবেচনা করে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য অনুমোদন দেওয়া উচিৎ। বেসরকারি না পাবলিক তা কোনো দিক থেকে একটি বস্তুনিষ্ঠ নিয়ামক হতে পারে না।


মুড়ি-মুড়কির একদর নয়, ঘোল আর ঘি এক বস্তু নয়। শুভবুদ্ধি এবং স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ থাকলে ইউজিসির এ নিয়ম পরিবর্তন করা উচিৎ। যিনি পিএইচডি করাতে চান, তাঁর অ্যাকাডেমিক প্রোফাইল, প্রস্পেক্টিভ ফেলোর অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা, বিদ্যমান রিসার্চ লজিস্টিক ইত্যাদি বিবেচনা করে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য অনুমোদন দেওয়া উচিৎ। বেসরকারি না পাবলিক তা কোনো দিক থেকে একটি বস্তুনিষ্ঠ নিয়ামক হতে পারে না।

বৈষম্য রিসার্চ গ্র্যান্টেও

শুনতে পাই, রিসার্চ গ্র্যান্ট অ্যালোকেশনের ব্যাপারেও নাকি বিপুল বৈষম্য আছে। প্রতিশ্রুতিশীল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যকাল্টিরা রিসার্চ গ্র্যান্টের ব্যাপারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টিদের সমান হকদার। এখানে যেকোনো ধরনের বৈষম্য নিন্দনীয়। এটিও বন্ধ করতে হবে।

আমার একজন ফেইসবুক বন্ধু একটি প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। তিনি দেশসেরা মলিকিউলার বায়োলজিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভেতর একজন। সম্প্রতি তিনি একটি রিসার্চ গ্র্যান্টের জন্য আবেদন করেন। তাঁকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়– বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক এ গ্র্যান্টের জন্য প্রধান গবেষক হিসেবে আবেদন করতে পারবেন না। কত বড় অসভ্যতা! আইডিয়া তাঁর, তিনি যোগ্যতম, কিন্তু তিনি প্রধান গবেষক হতে পারবেন না। এ-সমস্ত রিসার্চ গ্র্যান্ট অ্যালোকেশন কমিটিতে কারা আছেন তা জানতে ইচ্ছে করে। আমি তাদের শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে সন্দিহান।


তিনি দেশসেরা মলিকিউলার বায়োলজিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভেতর একজন। সম্প্রতি তিনি একটি রিসার্চ গ্র্যান্টের জন্য আবেদন করেন। তাঁকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়– বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক এ গ্র্যান্টের জন্য প্রধান গবেষক হিসেবে আবেদন করতে পারবেন না। কত বড় অসভ্যতা! আইডিয়া তাঁর, তিনি যোগ্যতম, কিন্তু তিনি প্রধান গবেষক হতে পারবেন না।


সরকার এবং ইউজিসি (ইউজিসি সরকারের তল্পিবাহক ছাড়া আর কিছু নয়) ঢালাওভাবে বেসরকারি ইউনিভার্সিটির অনুমোদন দিয়ে চলেছে। অথচ এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতর অল্প কিছু সংখ্যক যারা প্রকৃত অর্থেই একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে চাচ্ছে, তাদের পথ রুদ্ধ করার সকল ‘নিয়মকানুন’ খাড়া। এই দ্বিচারিতা বন্ধ হওয়া উচিৎ।

দেশি শিক্ষক নাকি বিদেশি?

দেশের বাইরে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাকডিয়ারমিড ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড ন্যানোটেকনোলজি ও ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি, ওয়েলিংটন-এ কাজ করছি। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে অন্তত অর্ধেক গবেষক ও ফ্যাকাল্টি মেম্বার ছিলেন বিদেশি। একটি প্রতিষ্ঠানও ‘বিদেশি’ নিতে হবে বলে বিদেশি নেয়নি। প্রত্যেকটির উদ্দেশ্য ছিলো একটি— যে কাজের জন্য যিনি উপযুক্ত তাকে নিতে হবে। সেরা প্রার্থীকে বেছে নেওয়া। দেশি, বিদেশি, ধর্ম, রাজনীতির কোনো স্থান সেখানে নেই। পারলে আসবে, না পারলে বিদায়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো খুব পরিষ্কার করে জানিয়ে দেয় তারা সমসুযোগ চাকুরিদাতা। সকলের জন্য সমান সুযোগ। যিনি পারবেন তিনি থাকবেন। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বৈশিষ্ট্য ধারণ করা প্রয়োজন।

বেছে বেছে বিদেশি নিয়ে আসতে হবে এটি আবার কোন ধরনের অসভ্যতা? ভিজিটিং অ্যাকাডেমিকদের কথা বলছি না। সেটি অন্য প্রসঙ্গ। বহু যুগ আগে জাপানে কী হয়েছিল সেই উদাহরণ এখন আর প্রযোজ্য নয়। সময় পাল্টেছে।

যোগ্য প্রার্থীর যে খুব অভাব তা কিন্তু নয়। কথা হচ্ছে, দলবাজি আর তেলবাজির উর্ধ্বে উঠে যোগ্যতম প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার মুরোদ আছে কিনা। এটিই মূল সমস্যা। পারলে এদিকে চোখ দিন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে লাভ হবে না।

যেটি করা উচিৎ, তা হচ্ছে উন্মুক্ত বিজ্ঞাপন। দেশি, বিদেশি যে কেউ আবেদন করতে পারবেন। যিনি যোগ্যতম তিনি নিয়োগ পাবেন। দেশি হোক আর বিদেশি। এটি একমাত্র সমাধান। এই সমাধানের বাইরে যেকোনো পদক্ষেপ হচ্ছে সস্তা স্ট্যান্টবাজি। সস্তা স্ট্যান্টবাজি নিয়ে উচ্ছসিত হওয়ার সময় নেই।

আলোকোজ্জ্বল কয়েকজন শিক্ষক ও গবেষকের কথা

প্রতি বছর কয়েক ডজন পেপার রিভিউ করতে হয়। কয়েক ডজন এক কথায় না করে দিই। কিছু কিছু পাবলিশার্স আজকাল রিভিউয়ারদের কিছু সময়ের জন্য স্কোপাস ডেটাবেইজ ব্যবহারের সুযোগ দেয়। এই ডেটাবেইস অত্যন্ত সমৃদ্ধ, তথ্যের জন্য সোনার খনি। University of Rajshahi এবং Department of Physics, এই দুই ক্রাইটেরিয়ায় Affiliation search করে দেখছিলাম। সময়কাল ২০০৫–২০১৯। ২০০৫-এ দেশে ফিরে আসি। শুধু SCOPUS indexed peer reviewed জার্নালে প্রকাশিত আর্টিক্যাল বিবেচনা করা হয়েছে। প্রকাশনার দিক থেকে প্রথম দিকে আছেন প্রফেসর এ কে এম আজহারুল ইসলাম (৪৬), প্রফেসর এম আলফাজ উদ্দীন (৪৪), প্রফেসর আরুণ কুমার বসাক (৪২), প্রফেসর এ কে ফজলুল হক (৩৩) এবং জনাব এম এ হাদি (২৪)।

অরুণ স্যার এবং আজহার স্যারকে অনেকেই চেনেন। তাঁরা দেশসেরা পদার্থবিদদের মধ্যে অন্যতম। আলফাজ স্যার বিভাগের বাইরে অনেকের কাছে অচেনা। এই মুহূর্তে দেশে এ্যাটমিক ফিজিক্সে তিনি একেবারে প্রথম সারির। আলফাজ স্যার বর্তমানে ইউজিসি প্রফেসর হিসেবে বিভাগে আছেন। অগ্রজপ্রতিম প্রফেসর এ কে ফজলুল হক অত্যন্ত চুপচাপ ধরনের মানুষ। বাইরের কথা বাদ দিই, বিভাগের ছাত্রছাত্রীরাও বোধহয় অনেকেই জানে না তিনি কতো বড় মাপের গবেষক। গবেষণা ধ্যানজ্ঞান এমন অল্প ক’জন মানুষ বিভাগে আছেন, তাদের ভেতর প্রফেসর ফজলুল হক একজন।

তবে তালিকায় যে নামটি সবচেয়ে বেশি আনন্দময় তা হচ্ছে আমার সহপাঠী বন্ধুবর এম আব্দুল হাদি। হাদি কিছুদিন আগে এমফিল শেষ করেছে। বর্তমানে পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণারত। হাদি তার প্রথম পেপারটি প্রকাশ করে সম্ভবত ২০১৩ সালে। ২০১৩ সাল থেকে হিসেব করলে হাদি পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে দেশের সবচেয়ে প্রলিফিক গবেষকদের একজন।


আজহার স্যার আর অরুণ স্যারকে নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। এদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ না হলে গবেষণার ধারকাছ দিয়েও বোধহয় হাঁটতাম না। রোল মডেল ছাড়া খুব একটা কিছু হয় না। আজকের বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই রোল মডেলদের বড় অভাব— যাদের দেখে অন্যরা শিখবে।


বলে রাখা ভালো, প্রফেসর আলফাজ উদ্দীন ও প্রফেসর এ কে ফজলুল হক পিএইচডি করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাদের কাজ বিশ্বমানের। বিশ্বমানের কাজ দেশে থেকে কঠিন তবে সম্ভব। অতীতে হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। মান গুরুত্বপূর্ণ এবং এই গুরুত্ব উপলব্ধি করা প্রয়োজন। মান না বুঝে ‘বিদেশি পিএইচডি’ নিয়ে এক ধরনের ফ্যাসিনেশন দানা বেঁধেছে তাই এই কথা বললাম। দেশ না বিদেশ তা মোটেই বড় কথা নয়, কাজটি কেমন তা বোঝা প্রয়োজন। বোঝার লোকের সংখ্যা অবশ্য দ্রুত কমছে; ধান্দাবাজ বাড়ছে।

বন্ধুবর আব্দুল হাদি অনেকদিন ধরে সরকারি কলেজে পদার্থবিজ্ঞান পড়াচ্ছেন। সম্প্রতি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছিলেন, হয়নি। বাজি ধরে বলতে পারি, দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শতকরা ৯০ জন উপাচার্যের থেকে তার গবেষণার রেকর্ড ভালো। ভালো বলেই বোধহয় হয়নি। খুব ভালো একজনকে নিলে ব্যপারটা কেমন যেন দেখায়, তাই না?

আজহার স্যার আর অরুণ স্যারকে নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। এদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ না হলে গবেষণার ধারকাছ দিয়েও বোধহয় হাঁটতাম না। রোল মডেল ছাড়া খুব একটা কিছু হয় না। আজকের বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই রোল মডেলদের বড় অভাব— যাদের দেখে অন্যরা শিখবে।

নিজ নামের পাশে SCOPUS ৫২ সংখ্যাটি দেখাচ্ছে। বিব্রতকর। অলস দিন কাটে। কৃতিত্ব যদি কিছু থাকে তা সম্পুর্ণ সহলেখকদের।

ড. সালেহ হাসান নকিব: অধ্যাপক, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

মন্তব্য লিখুন

seven − three =