উচ্চশিক্ষা

যত দোষ সান্ধ্যকোর্স? : পর্ব ১

সান্ধ্যকোর্স
সান্ধ্যকোর্স
লিখেছেন গৌতম রায়

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য সান্ধ্যকালীন কোর্স না রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন তাঁর সমাবর্তন বক্তৃতায়। ‘বাবু যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুন। ’ সঙ্গে সঙ্গে মঞ্জুরি কমিশন ‘সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধ করা বাঞ্ছনীয়’ ইত্যাদি নির্দেশ দিয়ে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সব সান্ধ্যকোর্স বন্ধ করে দেয়া কি উচিৎ হবে?

সান্ধ্যকোর্সের বিপক্ষে আছে প্রধানত বাম ঘরানারা শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রথম যুক্তি হচ্ছে, সান্ধ্যকোর্সের কারণে দিবাকোর্সের ক্ষতি হচ্ছে। শিক্ষকেরা ঠিকঠাকমতো ক্লাস নিচ্ছেন না। ফলপ্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে। দ্বিতীয় যুক্তি হচ্ছে, সান্ধ্যকোর্সের বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে। সান্ধ্যকোর্স পড়িয়ে শিক্ষকেরা ফোকটে টুপাইস কামিয়ে নিচ্ছেন।

সান্ধ্যকোর্সের পক্ষে আছেন যে শিক্ষকেরা, তাঁরা বলছেন, অভিযোগগুলো মিথ্যা। প্রথমত, যে সব বিভাগে সান্ধ্যকোর্স নেই, সেসব বিভাগেই সাধারণত ফল প্রকাশে বিলম্ব হয়। দ্বিতীয়ত, একেক জন শিক্ষক একেকটা কোর্স থেকে প্রতি সেমিস্টারে (৬ মাসে এক সেমিস্টার) লাখ খানেক টাকা যদি পেয়ে থাকেন, তবে প্রতি মাসে পাচ্ছেন ২০ হাজার টাকা। নিয়ম করে দেওয়া হয়েছে, কোনো শিক্ষক বছরে সর্বোচ্চ তিনটি কোর্স পড়াতে পারবেন। শিক্ষকেরা যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়ান, তবে তাঁরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াবেন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর ক্ষেত্রেও অবশ্য নিয়ম আছে: দুইটির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয় না।


সান্ধ্যকোর্সের বিপক্ষে আছে প্রধানত বাম ঘরানারা শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রথম যুক্তি হচ্ছে, সান্ধ্যকোর্সের কারণে দিবাকোর্সের ক্ষতি হচ্ছে। শিক্ষকেরা ঠিকঠাকমতো ক্লাস নিচ্ছেন না। ফলপ্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে। দ্বিতীয় যুক্তি হচ্ছে, সান্ধ্যকোর্সের বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে। সান্ধ্যকোর্স পড়িয়ে শিক্ষকেরা ফোকটে টুপাইস কামিয়ে নিচ্ছেন।


সান্ধ্যকোর্সের বাণিজ্যিকীকরণের অভিযোগ অনেকটা ভর্তিপরীক্ষায় শিক্ষকদের আয়-সংক্রান্ত কুসংস্কারের মতো। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন, ভর্তিপরীক্ষা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করেন। প্রকৃতপক্ষে যেসব শিক্ষক ভর্তিপরীক্ষার ডিউটি করেন, তাঁরা প্রতি পরীক্ষায় মাত্র ২ হাজার টাকা আয় করেন এবং পরীক্ষা হয় প্রতি বছর ৪/৫টি। যে অল্প কয়েকজন শিক্ষক ভর্তিপরীক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যাঁরা জড়িত তাঁরা কয়েক মাসের পরিশ্রমের বিনিময়ে লাখখানেক টাকা পেলেও পেতে পারেন।

একেক জন শিক্ষক প্রতি মাসে যদি নিজের যোগ্যতা ও শ্রমের বিনিময়ে দুটি কোর্স থেকে হাজার চল্লিশেক টাকা আয় করেন, সেটা কি খুব বেশি? প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তিদের বিবিধ উপরি আয় ও গোপন দুর্নীতি থেকে প্রাপ্ত অর্থ কিংবা ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের বিপুল আয়ের সঙ্গে তুলনা করলে শিক্ষকদের এই আয় অকিঞ্চিৎকর। তদুপরি শিক্ষকদের এই আয় নিজেদের ঘর্মজাত এবং শতভাগ হালাল।

তৃতীয়ত, আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে, বাংলাদেশ সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বলেছিল, স্বনির্ভর হতে। স্বনির্ভর হতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দুটি রাস্তা খোলা ছিল: ১. ছাত্রবেতন বৃদ্ধি করা এবং/অথবা ২. সান্ধ্যকালীন বা সপ্তাহান্তের কোর্স চালু করা।

ছাত্রবেতন বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়, কারণ তা করা হলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করে তুলবে। তাদেরও যুক্তি আছে। জনকল্যাণকামী দেশে শিক্ষা কেন টাকা দিয়ে কিনতে হবে? জনগণকে শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব সরকারের। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষা অবশ্যই ‘নামমাত্র মূল্যে বিতরণ’ করতে হবে।

অনন্যোপায় হয়ে কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয় রাস্তাটি বেছে নিয়েছিল, শুরু হয়েছিল সান্ধ্যকালীন কোর্স। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে কিংবা বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকোর্স নেই। যে সব বিশ্ববিদ্যালয় শহর থেকে দূরে অবস্থিত, সেখানে সান্ধ্যকোর্স পড়ানোর সুযোগই নেই। আঙ্গুরফল টক! যে শিক্ষকদের সান্ধ্যকোর্স পড়ানোর সুযোগ নেই, কিংবা যে সব শিক্ষক আর্থিকভাবে সচ্ছল, সান্ধ্যকোর্স পড়ানোর প্রয়োজন নেই, তারাই মূলত সান্ধ্যকোর্সের বিপক্ষে।


যে শিক্ষকদের সান্ধ্যকোর্স পড়ানোর সুযোগ নেই, কিংবা যে সব শিক্ষক আর্থিকভাবে সচ্ছল, সান্ধ্যকোর্স পড়ানোর প্রয়োজন নেই, তারাই মূলত সান্ধ্যকোর্সের বিপক্ষে।


সান্ধ্যকোর্স পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের অন্যতম উৎস। সান্ধ্যকালীন কোর্স কিংবা কালিকুলামের অতিরিক্ত কোর্স থেকে যে আয় হয়, তার ৩০% ভাগ যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডে। কোর্স সমন্বয়কারী ৫%, ইনস্টিটিউটের পরিচালক কিংবা বিভাগের চেয়ারম্যান ৫%, কোর্স পরিচালনার জন্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পান ৫% বিভাগ বা ইনস্টিটিউটের উন্নয়ন খাতে যায় ১০%, এবং বাকি ৪৫% পান সংশ্লিষ্ট শিক্ষক। বিভাগ ও ইনস্টিটিউটভেদে এই হার সামান্য কমবেশি হতে পারে, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওভারহেড ও উন্নয়নখাতে অর্থের পরিমাণ একই থাকে।

সুতরাং কোনো কোর্সে যদি ১ লক্ষ টাকা টিউশন ফি পাওয়া যায়, ৩০,০০০ টাকা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডে, পরিচালক এবং কোর্স সমন্বয়কারী প্রত্যেকে ৫,০০০ টাকা করে পান, শিক্ষক পান ৪৫,০০০ টাকা। একেকটি কোর্স ভর্তি থেকে শুরু কবে সার্টিফিকেট দেওয়া পর্যন্ত ৬ মাসের মতো লাগে এবং আগেই বলেছি, কোনো শিক্ষকই প্রতি শিক্ষাবর্ষে তিনটির বেশি কোর্স পড়াতে পারেন না নিজের বিভাগে বা ইনস্টিটিউটে। অনেক ক্ষেত্রে ৩টি কোর্স পড়ানোর মতো শিক্ষার্থী ভর্তিও হয় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলোর পরিচালনা ও উন্নয়ন ব্যয়ের মূল উৎস সান্ধ্যকোর্স থেকে প্রাপ্ত অর্থ। আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের কথাই ধরা যাক। প্রতি মাসে ইনস্টিটিউটের পরিচালনা ও উন্নয়ন খাতে গড়ে লাখ তিনেক টাকার কম খরচ হয় না। ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠার বছর অর্থাৎ ১৯৭৪ সাল থেকে নতুন কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ সৃষ্টি করা হয়নি, কিন্তু গত ৪৫ বছরে এক তলা ইনস্টিটিউট ৪ তলা হয়েছে। সুতরাং অতিরিক্ত কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া অপরিহার্য এবং তাদের পারিশ্রমিক ইনস্টিটিউট থেকেই দেওয়া হয়। প্রায় প্রতি সপ্তাহে সেমিনার, বিভিন্ন ভাষাপ্রোগ্রামের অনুষ্ঠান, প্রকাশনা, বিভিন্ন উৎসব, দুস্থ শিক্ষার্থীদের অর্থসাহায্য, লাইব্রেরির পুস্তক ও লিসেনিং সেন্টারের যন্ত্রপাতি ক্রয়, অতিথি আপ্যায়ন, বিভিন্ন সভা পরিচালনার খরচ, ইনস্টিটিউটের ভিতরে-বাইরে মেরামত-রঙ-কসমেটিক পরিবর্তন ইত্যাদিতে প্রচুর খরচ হয়।


যারা সারাদিন কাজ করে তারা বিকালে বা সন্ধ্যায় ভাষা শিখতে আসে। আমরা কোন যুক্তিতে জনগণের কর্মরত অংশকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করবো?


বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হয়তো লাখ খানেক টাকা পাওয়া যায় প্রতি অর্থবছরে, যা দিয়ে ইনস্টিটিউট পরিচালনা করা অসম্ভব না হলেও কঠিন। তুমিসহ সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছি দিদি, টাকার যে অঙ্কগুলো বললাম, সেগুলো কমবেশি হতে পারে। চাঁদ দেখাচ্ছি, চাঁদের দিকে তাকাও, আমার আঙ্গুল মোটা কি চিকন সে বিচার করতে যেও না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষা দেওয়া যায় জীবনে মাত্র একবার। যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না কিংবা যারা পছন্দমতো কোর্সে ভর্তি হতে পারে না, তাদের অনেকেই সান্ধ্যকোর্সে ভর্তি হয়। আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল সান্ধ্যকালীন কোর্সের জন্যে। যারা সারাদিন কাজ করে তারা বিকালে বা সন্ধ্যায় ভাষা শিখতে আসে। আমরা কোন যুক্তিতে জনগণের কর্মরত অংশকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করবো? একজন শিক্ষার্র্থী তার পছন্দমতো বিষয়ে সুযোগ না পেয়ে ধরা যাক, পালি ভাষায় ভর্তি হয়েছে। এই ছাত্র যদি বাজারে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে, এমন কোনো বিষয়, যেমন ব্যবসায় প্রশাসনে ভর্তি হতে চায়, তবে তাকে বাধা দেওয়া হবে কোন যুক্তিতে? পৃথিবীর যে কোনো সভ্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়েই যে কোনো শিক্ষার্থী একাধিক বিষয় পড়তে পারে।

শিশির ভট্টাচার্য্য: অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

মন্তব্য লিখুন

four × 5 =