বাড়িদক্ষতা ও উন্নয়নইন্টার্নশিপ হতে পারে সমাজ বদলের হাতিয়ার

ইন্টার্নশিপ হতে পারে সমাজ বদলের হাতিয়ার

পেশা-শিক্ষার একটি অংশ হলো ইন্টার্নশিপ। আমরা পাঠ্যপুস্তকে যা শিখি, তা পরিপূর্ণ করার জন্য দরকার ব্যবহারিক শিক্ষা। আর এই ব্যবহারিক শিক্ষার আরেক নাম ইন্টার্নশিপ। পেশা-শিক্ষা যেমন, ডাক্তার, প্রকৌশলী কিংবা শিক্ষাবিজ্ঞানে পরিপূর্ণ জ্ঞান আহরণের একটি উপায় হলো ইন্টার্নশিপ। আর তাই ডাক্তার, প্রকৌশলী কিংবা শিক্ষাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদেরকে একটি নির্দিষ্ট সময় যথাক্রমে হাসপাতাল, ফার্ম কিংবা স্কুলে কাজ করতে হয়।

শিক্ষাবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী হওয়ার সুবাদে আমাকেও কিছুদিন (ছয়মাস) একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতে হয়েছিল। আমি মনে করি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু সময়ের মাঝে ঐ ছয়মাসকে অনায়াসে যুক্ত করা যায়। শুধু আমি না, আমার সাথে করা আমার ব্যাচের প্রায় সবারই একই মত। আমরা যাদের ক্লাশ নিয়েছি তারাও তখন খুব আনন্দের সাথে ক্লাশ করত। তাদের মুখ দেখে এবং চলে আসার সময় তাদের কান্না দেখেই তা বোঝা গেছে। আমি যখন ঢাকার একটি নাম করা স্কুলে প্র্যাকটিস টিচিং করতে গিয়েছিলাম তখন একটি বিষয় নিয়ে খুব আফসোস হতো।

আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু করার আগ পর্যন্ত যে কয়টি ধাপ অতিক্রম করেছি তার সব কয়টিই ছিল গ্রামে। আর গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে যাদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি (তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি), তাদের বেশিরভাগই স্থানীয় কলেজ থেকে অনেক দিন আগের ডিগ্রি পাশ করা। নিত্যনতুন জ্ঞান সম্পর্কে অনেকের ধারণা খুবই কম। আর প্রাইমারির শিক্ষকদের কথা নাই বা বললাম। তবে তাদের মাঝেও দু-একজন ছিলেন শিক্ষক হিসেবে অসাধারণ। কিন্তু তাও হাতেগোনা কয়েকজন। তাই আফসোস হতো। আমরা বিনা পয়সায় শিক্ষকতা করছি এমন কিছু স্কুলে, যারা সব দিক দিয়েই সেরা। তাদের শিক্ষকরাও অনেক জানেন। অথচ আমার গ্রামের শিক্ষার্থীরা আমাদের মতো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের সান্নিধ্য পেলেই ধন্য হতো। সেখানে তাদের জন্য কিছুই করতে পারছি না।

এই প্র্যাকটিস টিচিং করতে গিয়েই একটা বিষয় আমার মাথায় আসে। ডাক্তার, প্রকৌশলী কিংবা শিক্ষাবিজ্ঞান অথবা কৃষি শিক্ষায় একটি নির্দিষ্ট সময় বাইরের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে হয়। যা করা হয় শিক্ষার পরিপূর্ণতা আনয়নের জন্য। আর আমাদের সমাজে বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে এই কয়েকটি বিষয়ে একটু বেশি জানাশোনা লোকের বড় অভাব। হয়তো একজন এমবিবিএস ডাক্তার বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরি পেয়ে গ্রামের দিকে বদলী হয়ে গেল, কিন্তু গ্রামীণ সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে না নিতে পারার কারণে কিংবা ভবিষ্যৎ জীবনের কথা ভেবে নানাভাবে লবিং করে কয়েকদিনের মাঝেই চলে এল শহরে। কিংবা গ্রামে হয়তো নামে পোস্টিং কিন্তু নানাভাবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অফিস করেন মাত্র এক কিংবা দুইদিন। এটা যে শুধু ডাক্তারদের জন্যে প্রযোজ্য তাই না, প্রায় সব পেশায় এটা হয়ে থাকে। একজন সদ্য পাশ করা লোকের পক্ষে গ্রামে বাস করা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ জীবনের কথা ভেবে তাদের আর গ্রামে থাকা হয়ে উঠে না। ফলে গ্রামের উন্নয়ন স্থবির হয়ে থাকে। আমরা গ্রাম আর শহরকে যদি সাইকেলের দুই চাকা হিসেবে ধরে নেই তবে মনে রাখতে হবে- এক চাকা বড় আর আরেক চাকা ছোট হলে সেই সাইকেল সহজে চালনা করা যায় না। সাধারণ সাইকেলের চাকা এমন হয় না। শুধু সার্কাসের সাইকেলই এমন হয়। তাই আমাদের দেশের উন্নয়নের জন্য সাইকেলের দুই চাকাই সমান হওয়া দরকার। আর এটি করতে গেলে এসব উচ্চশিক্ষিত লোকদের কাছ থেকে গ্রামীণ মানুষের সেবা পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে কি ওইসব পাশ করা লোকদের জোর করে বা আইন করে গ্রামে ধরে রাখব? না, এটা হতে পারে না। যে কাজে আনন্দ নেই, সে কাজে সফলতা পাওয়া যায় না। তাহলে উপায় কী? উপায় হতে পারে ইন্টার্নশিপের শিক্ষার্থীরা। তাদের যদি প্র্যাকটিসের সময় গ্রামের দিকে যাওয়ার উপায় করে দেওয়া হয়, তাহলে অন্ততপক্ষে কিছুদিন গ্রামের মানুষ উচ্চশিক্ষিত কিছু লোকের কাছ থেকে সেবা পাবে। (এটা একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনা মাত্র, পরবর্তীতে এর খুঁটিনাটি বিষয়, সমস্যা – সম্ভবনা বের করা যাবে)।

আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি যে, একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে তখন তার মাঝে দেশপ্রেমের নেশা প্রবল হয়ে দেখা দেয়। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করি, তখন কতো চিন্তা মাথায় ভর করতো তার ইয়াত্তা নেই। মনে হতো এই এডুকেশন সিস্টেম পাল্টাতে হবে, এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। এরপর যখন প্র্যাকটিস টিচিং-এ গেলাম, তখন কত স্বপ্ন মাথায় ভর করতো। রাত জেগে জেগে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ পরিকল্পনা করা, উপকরণ তৈরি করাতে মত্ত হয়ে পড়তাম। এটা-ওটা ঘেটে তাদের জন্য লেকচার তৈরি করতাম। আর সেই আমরাই যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করি তখন হয়ত কাজের চাপে আর নানান চাপে এ কাজ আর করা হয় না। তখন দায়সারাভাবে ক্লাশ নিতে পারলেই বাঁচি।

তাই প্র্যাকটিস টিচিং-এর সময় যদি আমাদের মতো তরুণ শিক্ষার্থীদের গ্রামের দিকে কাজ করতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তখন আমরা উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে পারব। আর যদি নিজ নিজ গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয় না হলে নিজ উপজেলায় কাজ করতে পাঠানো হয়, তবে ওই ছয়মাস নিজ এলাকার মানুষকে সেবা দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। অথবা এমন হতে পারে, বাংলাদেশের কিছু এলাকা এখনও অন্যান্য এলাকা হতে অনুন্নত, সেই সব এলাকায় যদি ইন্টার্নশিপ করা শিক্ষার্থীদের ছয় মাস করে কাজ করতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তবে ওই এলাকার মানুষ ভালোরকম সেবা পাবে। ইন্টার্নশিপ করা শিক্ষার্থীরা খুব একটা ফাঁকি দেয় না, যেটা কর্মজীবনে প্রবেশ করা লোকেরা করে থাকে (অনেক সময় পরিস্থিতির চাপে)। এভাবে খুব সহজে আমরা একটা এলাকাকে উন্নত করতে পারি। আমি মনে করি, একটি এলাকায় যদি একবছর বা ছয়মাস ধরে কিছু মেধাবী লোক কাজ করে, তবে সেই এলাকা উন্নয়নের সিড়ি খুঁজে পাবে, যা দিয়ে পরবর্তীতে তারা উন্নয়নের চরম শিখরে পৌঁছাতে পারবে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা দায়িত্ববান ব্যক্তিরা কি এই বিষয়ে একটু ভেবে দেখবেন?

লেখক পরিচিতি

f349fe735f2100df391d7e467cad461f19dd319723c3b2b55c88f9344d688633?s=150&d=mp&r=g
মুশফিকুর রহমান

মুশফিকুর রহমান বাংলাদেশের শিক্ষা ওয়েবসাইটের একজন সহ-সম্পাদক।

আরও পড়ুন

মতামত

বিজ্ঞান চেতনা: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোন বিজ্ঞান শিখছে শিশুরা?

নাহিদ নলেজ বিজ্ঞান চেতনা নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা কী- এ সম্পর্কে বিস্তর কথাবার্তা আমাদের সবার জানা। সেই প্রাথমিক শিক্ষাটুকুই যদি গলদপূর্ণ হয়, তাহলে আর কী কথা...

দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আপনি কি সন্তুষ্ট?

মোঃ তৌফিক ইমাম চৌধুরী লিখেছেন বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা আছে তা নিয়ে কি আপনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট? প্রাথমিক কিংবা নিম্নমাধ্যমিক শ্রেণীতে একজনকে অনেকগুলো বিষয়ে পড়তে...
নতুন লেখার খবর পান ইমেইলে
বাংলাদেশের শিক্ষা প্রসঙ্গে নতুন লেখা প্রকাশিত হলে সেই খবর পৌঁছে যাবে আপনার ইমেইলে।

এই বিভাগের আরও লেখা

মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও মেধার বিকাশ

মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও স্মরণশক্তিকে মেধা বলে চালিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে...

ক্যাডেট কলেজে বর্ধিত টিউশন ফি মেধাবীদের পড়াশুনায় যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়

ক্যাডেট কলেজ একটি বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেখানে বর্ধিত টিউশন ফি কি মেধাবীদের পড়াশোনায় বাধা...

নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ও পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে অস্পষ্টতা

২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পর থেকে এ নিয়ে আলোচনা ও...

মানুষের দুর্নীতিবাজ হওয়ার পেছনে শিক্ষকের দায় কতটা?

দুর্নীতিতে বাংলাদেশ বেশ কয়েকবার পুরো বিশ্বে দখল করেছে শীর্ষস্থান! বাংলাদেশে বড় বড় প্রকল্পে বড়...

মুখস্থবিদ্যা কতোটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

নতুন শিক্ষাক্রমের প্রবর্তকেরা এবং তার সমর্থকরা এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে সবার আগে মুখস্থবিদ্যার ওপর...

নতুন শিক্ষাক্রম : জাপানের সাথে তুলনা কতোটুকু প্রাসঙ্গিক?

বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থার নতুন শিক্ষাক্রমের আবশ্যিক বিষয় জীবন ও জীবিকার ষষ্ঠ ও সপ্তম...

কেন ক্লাস করতে চায় না শিক্ষার্থীরা

শিক্ষার্থীরা কেন ক্লাস করতে চায় না এই প্রশ্নটি নতুন নয়। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি...

শিক্ষকের মান ও গুণগত শিক্ষা

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৩-এর প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, "কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার জন্য শিক্ষক: শিক্ষক স্বল্পতা পূরণ...