শিক্ষা ও বৈষম্য শিশুর বিকাশ

একীভূত শিক্ষা এবং বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা

একীভূত শিক্ষা
লিখেছেন গৌতম রায়

একীভূত শিক্ষা কাকে বলে? একজন শিক্ষার্থীর বয়স অনুযায়ী তার চারপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন তাকে বিদ্যালয়ে আহ্বান করে, শ্রেণিকক্ষ স্বাগত জানায়, কোনোকিছু শেখাতে ও জ্ঞান বিতরণ করতে উৎসাহী হয়, তাকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী বিদ্যালয়ে অবদান রাখার এবং বিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দেয় তার শারীরীক, মানসিক, সামাজিক, গোত্রগত, জাতিগত এবং ধর্মীয় পার্থক্যকে বিবেচনা না করে, তখন তাকে আমরা একীভূত শিক্ষা বলে আখ্যায়িত করে থাকি।

প্রতিটি শিশুরই প্রয়োজন অন্যের সাথে ভাব বিনিময় করা, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা। বিদ্যালয় জীবনের সকল কর্মকাণ্ডে নিজকে জড়িত রেখে সুবিধা পাওয়া ও অবদান রাখাও শিশুর প্রয়োজন। যে শিশুটি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, তার অধিকার আছে ব্যক্তিগত সহযোগিতা পাওয়ার— নিয়মিত শ্রেণিকক্ষ থেকে, বিদ্যালয়ের সকল কর্মকাণ্ড থেকে।

একীভূত শিক্ষা কীভাবে শিক্ষার্থীর উন্নতি ঘটায়?

সকল শিক্ষার্থীই একীভূত শিক্ষার মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে। কারণ একীভূত শিক্ষা তাদের:

  • (ক) ব্যাক্তিগত সামর্থ্যের উন্নয়ন ঘটায়;
  • (খ) একই বয়সের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজ নিজ উদ্দেশ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করে;
  • (গ) তাদের অভিভাবকদেরকেও বিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে;
  • (ঘ) বিদ্যালয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং বিদ্যালয়কে নিজ স্থান ভাবার সংস্কৃতি তৈরি করে;
  • (ঙ) ব্যক্তিগত ভিন্নতা গ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি করে, জোরাজুরি বা চাপাচাপি করে কোনোকিছু করানোর সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসতে সহায়তা করে;
  • (চ) ব্যাক্তিগত চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী বৃহত্তর পরিসরে তাদেরকে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টির সুযোগ সৃষ্টি করে;
  • (চ) বৃহত্তর পরিসরে কমিউনিটিকেও বৈচিত্র্য গ্রহণ করার জন্য প্রভাবিত করে।

একই কমিউনিটির শিক্ষার্থীরা একত্রে শেখে, খেলাধুলা করে, একত্রে প্রতিপালিত হয় এবং বেড়ে ওঠে। অতএব একীভূত শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বহুমুখী চাহিদা পূরণ করা সহজ হয়।

একীভূত শিক্ষাপদ্ধতি সব শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার মাধ্যমে পাঠ সরবরাহ করে, অন্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে এবং বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের করে। যখন শিক্ষার্থীদের আলাাদা শ্রেণিতে রাখা হয় এবং আলাদাভাবে শিখন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়, তখন অন্যের কাছ থেকে  শেখার, সহযোগিতা করার এবং সম্পর্কন্নোয়নের সুযোগ আর শিক্ষার্থীরা সেভাবে পায় না।


প্রতিবন্ধী শিশু ও শিক্ষার্থীর অভিভাবকগণও আশা পোষন করেন যে, তাদের সন্তানদের যাতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা একই দৃষ্টিতে দেখে। একইভাবে তারা চান যে, সমাজ, কমিউনিটির ও বিদ্যালয়ের সবাই তাদের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিতে না তাকাক। বিদ্যালয় ও চারপাশের সমবয়সীরা তাদেরকে ভালোভাবে গ্রহণ করুক, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হোক, তারা  সুস্থ ও স্বাাভাবিক জীবনযাপন করুক।


বিদ্যালয়ে একীভূত শিক্ষা

যেসব বিদ্যালয় একীভূত সংস্কৃতি চালু করেছে, সেসব বিদ্যালয় প্রদর্শন করতে পেরেছে যে, সব ধরনের শিক্ষার্থীদের জন্য এক সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার্থীদের সেখানে সব ধরনের শক্তি ও সামর্থ্যের মূল্যায়ন করা হয়।

শারীরিক, মানসিক কিংবা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরাও বুঝতে পারে তাদেরকে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে না। তারা তাদের অন্য নিয়মিত সহপাঠীদের মতোই শিক্ষাগ্রহণ করছে এবং এর ফলে তাদের মানসিক শক্তি অনেক বেড়ে যায়। তাদের সমস্যাসঙ্কুল জীবনের গ্লানি তারা অনেকটাই ভুলে যায় এবং অন্যের প্রতি নির্ভরশীলতার চিন্তাও কমে যায়।

প্রতিবন্ধী শিশু ও শিক্ষার্থীর অভিভাবকগণও আশা পোষন করেন যে, তাদের সন্তানদের যাতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা একই দৃষ্টিতে দেখে। একইভাবে তারা চান যে, সমাজ, কমিউনিটির ও বিদ্যালয়ের সবাই তাদের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিতে না তাকাক। বিদ্যালয় ও চারপাশের সমবয়সীরা তাদেরকে ভালোভাবে গ্রহণ করুক, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হোক, তারা  সুস্থ ও স্বাাভাবিক জীবনযাপন করুক।

শ্রেণিকক্ষ, বিদ্যালয়, কর্মসূচি, কার্যাবলী ও পাঠসমূহ এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয় একীভূত শিক্ষায় যাতে সকল শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ ও শিক্ষাগ্রহণ করে। এটি বিভিন্নভাবে ও পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের কৌশলও খুঁজতে থাকে যাতে সকল শিক্ষার্থী কার্যকরভাবে শ্রেণিকক্ষের সকল কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের পারস্পরিক বন্ধুত্ব এবং শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

একীভূত শিক্ষার পদ্ধতি

একীভূত শিক্ষা এক ধরনের চিন্তা করার পদ্ধতি। সেখানে কীভাবে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে সৃষ্টিশীল হতে পারে বিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহনের মাধ্যমে তাও আলোচ্য। এখানে শিক্ষকদেরকেও সৃষ্টিশীল হতে হবে কতোভাবে শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষাদান করা যেতে পারে সকল ধরনের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে।

ধরা হয়ে থাকে যে, একীভূত শিক্ষা সকল শিক্ষার্থীরাই শিখবে, সকল শিক্ষার্থীই স্বাভাবিকভাবে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ করবে। সবাই উপযুক্ত শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবে, তাদের প্রয়োজন ও বয়স অনুযায়ী শিক্ষাক্রম পাবে। সবাই সহ-পাঠক্রমিক ও অতিরিক্ত পাঠক্রমিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবে। সবাই সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বাড়িতে, বিদ্যালয়ে ও কমিউনিটিতে পাবে। 

পরিবেশে যাতে আত্ম-সাহায্যমূলক দক্ষতা অর্জন করতে পারে সেগুলো নিশ্চিত করা হয় একীভূত শিক্ষার মাধ্যমে। প্রতিটি শিশুর শিক্ষাগ্রহণের মৌলিক অধিকার রয়েছে। তাদেরকে গ্রহণযোগ্য পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে সমাজকে, রাষ্ট্রকে।

প্রতিটি শিশুরই রয়েছে কিছু অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য, আগ্রহ, সামর্থ্য এবং জানার বা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা। কোনো দেশের শিক্ষাপদ্ধতি এবং শিক্ষাসংক্রান্ত কর্মসূচিগুলো এমনভাবে সাজাতে এবং বাস্তবায়িত করা প্রয়োজন যাতে এসব বৈশিষ্ট ও প্রয়োজনীয়তার বিশাল বিচিত্রতা গভীরভাবে স্থান পায়। যাদের বিশেষ ধরনের শিক্ষার চাহিদা রয়েছে, তাদেরকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকার দিতে হবে যেখানে শিশুসুলভ এবং শিশুবান্ধব শিক্ষাতত্ত্বের মাধ্যমে তারা অ্যাডকাডেমিক ও সামাজিক দক্ষতাগুলো অর্জন করবে।

একীভূত শিক্ষা বিদ্যালয়ে প্রয়োগ

নিয়মিত বিদ্যালয়ে একীভূত শিক্ষার ধারণা ও কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়নই জাতি, ধর্ম, বর্ণ, প্রতিবন্ধী, অ-প্রতিবন্ধী নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্যমূলক আচরণ দূরীভূত করার উপযুক্ত উপায়। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা, ফলপ্রসূ শিক্ষার নিশ্চয়তা বিধান, শিক্ষার্থীদের দক্ষতাবৃদ্ধি এবং পুরো শিক্ষাকে কার্যকর ব্যায়ের আওতায় আনাও একীভূত শিক্ষার উদ্দেশ্যের মধ্যে পড়ে। আমরা একীভূত শিক্ষা নিয়ে অনেক কথা বলি, সভা-সেমিনারের আয়োজন করি অথচ খোদ ঢাকা শহরেই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য হুইলচেয়ার বা অন্য উপায়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশের ব্যবস্থা নেই।


একীভূত শিক্ষা সম্পর্কে বইয়ে কিছু লিখে দিয়ে কিংবা জাতীয় শিক্রাক্রমে অর্ন্তভুক্তির প্রস্তাব দিয়েই সন্তুষ্ট থাকা যাবে না, দেখতে হবে বাস্তবে কী ঘটছে। আমরা জাতীয়ভাবে বহু অর্থের অপচয় করি, সামাজিকভাবেও করি। কিন্তু সকল ধরনের শিক্ষার্থীদের একই শ্রেণিতে, একই বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে সমাজিক দায়িত্ব ও সর্বোপরি বিরাট এক মানবীয় দায়িত্ব পালন করতে পারি।


নামিদামি বিদ্যালয়গুলোতেই নেই, অন্যান্য বিদ্যালয় ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোর কথা না-হয় নাই বললাম। আমরা সভা-সেমিনারে এমনভাবে বিষয়টিকে উত্থাপন করি যে, তাতে মনে হয় একীভূত শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা সব কিছুই করে ফেলেছি। বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রবেশের যে ব্যবস্থা নেই, তা দেখারও কেউ নেই। অথচ বিষয়টি নিয়ে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনারে অনেক আলোচনা হয়, কথাবার্তা হয়।

আরেকটি বিষয় বড় করে দেখতে হবে সেটি হচ্ছে, প্রতিবন্ধী মেয়েরা আসলে আমাদের সমাজে দ্বিগুণ প্রতিবন্ধী। তাদের জন্য দরকার বিশেষ ব্যবস্থা ও বিশেষায়িত শিক্ষা। তাদের শুধু সাধারণ শিক্ষাই নয়; তথ্যপ্রযুক্তি ও বিশেষায়িত দিক নির্দেশনা পেতে হবে তাদের। এতে তারা ভবিষ্যতে দক্ষ ও বয়স্কা নারী হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

একীভূত শিক্ষা সম্পর্কে বইয়ে কিছু লিখে দিয়ে কিংবা জাতীয় শিক্রাক্রমে অর্ন্তভুক্তির প্রস্তাব দিয়েই সন্তুষ্ট থাকা যাবে না, দেখতে হবে বাস্তবে কী ঘটছে। আমরা জাতীয়ভাবে বহু অর্থের অপচয় করি, সামাজিকভাবেও করি। কিন্তু সকল ধরনের শিক্ষার্থীদের একই শ্রেণিতে, একই বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে সমাজিক দায়িত্ব ও সর্বোপরি বিরাট এক মানবীয় দায়িত্ব পালন করতে পারি।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিকে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

2 মন্তব্য

মন্তব্য লিখুন

5 × three =