ভাষা শিক্ষা

ক্রিয়াপদের অন্তে ‘ও-কার’ দেওয়া নিয়ে হিমশিম

বাংলাদেশের শিক্ষা
বাংলাদেশের শিক্ষা
লিখেছেন গৌতম রায়

মোরশেদ হাসান

– লিমন ভাই, ক্রিয়াপদে ও-কার কোথায় দেব আর কোথায় দেব না, বলো তো? এ কী বিচ্ছিরি সমস্যা, বাবা।

: হা হা হা।

– হাসছ কেন?

: বারে হাসতেও পারব না?

– পারবে না কেন? কিন্তু হাসছ কেন, তা তো বলবে?

: হাসছি, কারণ তুই অকারণে ও-কার না দিয়েই তো সুন্দরভাবে এবং নিয়মমাফিক কথা বলছিস এতক্ষণ।

– মানে?

: মানে আবার কী! তুই এতক্ষণ ধরে যে কথাগুলো বললি সেখানে তো ও-কার দিসনি। যেমন, তুই বললি, ‘দেব’, ‘হাসছ’। ও-কার দিসনি তো ক্রিয়াপদে। তুই তো বলিসনি, ‘দেবো’, ‘হাসছো’। এটাই তো ভাষার স্মার্ট ও ইকনোমিক বহিঃপ্রকাশ।


এর মধ্য ক্রিয়াপদের অতীত ও ভবিষ্যৎ রূপে শেষ বর্ণে ও-কার বর্জনীয়। ‘বললো’-‘বলতো’-‘বলবো’ নয়, লিখতে হবে ‘বলল’-‘বলত’-‘বলব’।


– কোনটা ঠিক, সেটা ঠিকঠাক বলো?

: ‘দেব’, ‘হাসছ’ ঠিক। ক্রিয়াপদের অন্তে অযথা ও-কার যোগ করে শব্দকে মেদবহুল করা এখনকার নিয়মে বর্জনীয়, নীলা।

– আচ্ছা কোনো নিয়ম থাকলে আমাকে বলো, লিমন ভাই?

: বলছি। এজন্য আগে ক্রিয়ার কাল, যাকে তোরা ইংরেজিতে ‘Tense’ বলিস, আর পুরুষ, ইংরেজিতে বলে ‘Person’ সে সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।

– সে তো আছে বাপু। ‘Tense’ আর ‘Person’ জানে না, এমন কেউ আছে নাকি এখন!

: বেশ। তবে এবার আয়। ক্রিয়ার কাল কয়টি বল?

– বর্তমান কাল, অতীত কাল ও ভবিষ্যৎ কাল।

: গুড। এর মধ্য ক্রিয়াপদের অতীত ও ভবিষ্যৎ রূপে শেষ বর্ণে ও-কার বর্জনীয়। ‘বললো’-‘বলতো’-‘বলবো’ নয়, লিখতে হবে ‘বলল’-‘বলত’-‘বলব’।



– বুঝিয়ে বলো, লিমন ভাই।

: যেমন, আমি বলব (বলবো নয়), সে বলল (বললো নয়), সে বলত (বলতো নয়)। ক্লিয়ার, নীলা।

– আমি যাব অথবা যাবো, তুমি খাচ্ছ অথবা খাচ্ছো, তুমি খেয়েছ অথবা খেয়েছো— কী হবে?

: বস্তা বেঁধে সব ও-কার পানিতে ফেলে দাও।

– নিয়ম কী?

: নিয়ম হল, ঘটমান বর্তমান (Present continuous) ও পুরাঘটিত বর্তমান (Present perfect) রূপে শেষ বর্ণে ও-কার বর্জনীয়। ‘করছো’-‘বলছো’-‘খাচ্ছো’-‘যাচ্ছো’ নয়, লিখতে হবে ‘করছ’, ‘বলছ’, ‘খাচ্ছ’, ‘যাচ্ছ’। ‘করেছো’-‘বলেছো’-‘খেয়েছো’-‘গিয়েছো’ নয়, লিখতে হবে ‘করেছ’-‘বলেছ’-‘খেয়েছ’-‘গিয়েছ’।

– আচ্ছা ও-কার কোথায় দেব তা হলে?

: দ্যাখ, ক্রিয়াপদের সঙ্গে ও-কার দেব, বা দেব না এই দ্বিধায় বুক কাঁপে না এমন বীরপুরুষ খুব কমই আছে। তবে নিয়মমাফিক কথা বললে ক্রিয়াপদে ও-কার দেব আমরা শুধু সাধারণ বর্তমান কাল, বর্তমান অনুজ্ঞা ও ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞাতে মধ্যম পুরুষ কর্তা হলে।

ক্রিয়াপদের সঙ্গে ও-কার দেব, বা দেব না এই দ্বিধায় বুক কাঁপে না এমন বীরপুরুষ খুব কমই আছে। তবে নিয়মমাফিক কথা বললে ক্রিয়াপদে ও-কার দেব আমরা শুধু সাধারণ বর্তমান কাল, বর্তমান অনুজ্ঞা ও ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞাতে মধ্যম পুরুষ কর্তা হলে।

– লিমন ভাই, একটু ভয় করছে তোমাকে জিজ্ঞেস করতে। বর্তমান অনুজ্ঞা ও ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা কাকে বলে, বলো না?

: নীলা, এই যে তুই বললি, “বলো না”— এই যে অনুরোধ বা মিনতি করে বললি, “বলো না”—এটাকেই বলে অনুজ্ঞা। এজন্যই তুই ও-কার যোগ করে ‘বলো’ বলেছিস। তুই বলিসনি, ‘বল’।

– বর্তমান অনুজ্ঞা ও ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞার সংজ্ঞা ও উদাহরণসহ বলো, লিমন ভাই।

: বেশ, বলছি।

বর্তমান অনুজ্ঞা: বর্তমান কালের আদেশ, অনুরোধ, উপদেশ প্রভৃতি বোঝাতে যে ক্রিয়ার রূপ ব্যবহৃত হয় তাকে বর্তমান অনুজ্ঞা বলে। যেমন: এখনই এ কাজটি করো। এখন তুমি যাও।

ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা: ভবিষ্যৎ কালের আদেশ, অনুরোধ, উপদেশ, আশীর্বাদ, প্রার্থনা প্রভৃতি বোঝাতে যে ক্রিয়ার রূপ ব্যবহৃত হয় তাকে ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা বলে। যেমন: কাল সকালে একবার এসো। বিকালের ট্রেন ধরে যেয়ো।

ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞায় (কর্তা তুমি হলে) ক্রিয়াপদে ‘-য়ো’ বসে। যেমন: যেয়ো, খেয়ো, চেয়ো, দিয়ো। বর্তমান অনুজ্ঞার ক্ষেত্রে (কর্তা তুমি হলে) ক্রিয়াপদে ‘-ও’ বসে। যেমন: যাও, খাও, চাও, দাও।

বাক্যে উদাহরণ: চিঠি দাও (বর্তমান অনুজ্ঞা)। চিঠি দিয়ো (ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা)।

– লিমন ভাই, ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞার ক্রিয়াপদে সংযুক্ত ও-কার বুঝলাম। কিন্তু বর্তমান অনুজ্ঞাতে যাও, খাও, চাও, দাও– তে তো ও-কার নেই।

: আহা, কথা তো একই। ‘ও’ হল স্বরবর্ণ। আর স্বরবর্ণ সংক্ষিপ্ত আকারে ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে যুক্ত হলে তাকে বলে ‘কার’। যেমন, আ স্বরবর্ণের কার চিহ্ন আ-কার; তেমনি ও স্বরবর্ণের কার চিহ্ন ও-কার।

– আচ্ছা বুঝলাম। তবে বর্তমান অনুজ্ঞাতে, তুমি করো, তুমি পড়ো— একে ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞাতে কীভাবে বলব?

: ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞাতে বলবি— তুমি কোরো, তুমি পোড়ো। এভাবে বর্তমান অনুজ্ঞাতে— ‘বসো’, ‘আসো’, ‘ভাবো’, ‘দ্যাখো’ হলে ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞাতে হবে ‘বোসো’, ‘এসো’, ‘ভেবো’, ‘দেখো’।

– আচ্ছা বুঝলাম, লিমন ভাই। এখানেই শেষ তা হলে।

: না, আর একটু আছে।

– আচ্ছা শুনি।

: আ-কারান্ত প্রযোজক (ণিজন্ত) ধাতুর পরে ‘আন’ প্রত্যয় যুক্ত হলে ‘আনো’ হয়। যেমন: জানা+আন=জানানো। এরূপ: শোনানো, ভাসানো, খাওয়ানো, দেখানো, থামানো, চালানো, ভাজানো, বানানো ইত্যাদি।

– বুঝলাম না, লিমন ভাই।

: বুঝিয়েই তো বললাম। যেমন, গতকালের ‘দেখানো’ পথে পথ চলবে। গাড়ি চালানো অবস্থায় ড্রাইভারের সঙ্গে অকারণে কথা বলবে না।

– আর?

: দ্বি-দল ধাতুর কোনো রূপের দ্বিতীয় ধ্বনিদলে যদি ব্যঞ্জন থাকে, সেই ব্যঞ্জনে ও-কার দিতে হবে। যেমন— এগোবে, পিছোবে, ঘুমোল, ফুরোল ইত্যাদি।

– হুম।

: হতাশ হলে হবে, নীলা? যা এবার সুন্দর করে চা বানিয়ে আন। সকালের বানানো চা আবার দিস না।

– সকালের বানানো চা এখন দেব কেন?

: বুঝিসনি, নীলা? একটু আগে যে পড়ালাম ‘বানানো’!

– ও আচ্ছা। একেবারে হাতে-কলমে পড়ানো। হা হা হা। বোসো, চা নিয়ে আসছি।

: এই নীলা, বসো হবে না কি বোসো হবে?

– তুমি তো বসেই আছ, তবে আবার বসতে বলব কেন? চা বানাতে সময় তো দিতে হবে, চুলায় পানি চড়াতে হবে। অতএব, ধৈর্য ধরে ‘বোসো’।

মোরশেদ হাসান: পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞ। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন।

লেখাটি কতোটুকু পছন্দ হয়েছে?

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

মন্তব্য লিখুন