দেশে প্রায় দুই শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়, তারপরও যখন আরও এগারোটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আবেদন উত্থাপিত হয়, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে– এই দেশে বিশ্ববিদ্যালয় আসলে কী জিনিস? এটা কি কোনো শিল্প-কারখানা কিংবা বিপনী বিতান-দোকানপাটের মতো?
কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কি গাড়ি-বাড়ির মতো যে তোমারও আছে, আমারও আছে? একটি দেশে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় আছে, অথচ আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং-এ অবস্থান প্রায় নেই বললেই চলে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড-খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক সনদকে ফাউন্ডেশন কোর্সের মান ধরছে সিঙ্গাপুর।
আবার যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) প্রকাশিত ২০২৫ সালের বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং অনুযায়ী বিশ্বের সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানই স্থান পায়নি। এ তালিকায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শুরুতে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৫৮৪তম অবস্থানে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৫’-এও সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পায়নি। এ তালিকায় প্রথম অবস্থানে থাকা গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে ৮০০ থেকে ১ হাজারের মধ্যে।
এ অবস্থায় দেশে নাকি আরও এগারোটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেল। যদিও শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয়তা দেখা হবে।
সংবাদটি পড়ার পর আমার ভেতর নানা ভাবনা-দুর্ভাবনা দোল খেতে লাগলো। সবচেয়ে বড় দাগে যে প্রশ্নটি সামনে এলো, সেটি হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? আমাদের রাষ্ট্র, নীর্তিনির্ধারকগণ কি বুঝেন যে, একটি জাতি বিনির্মাণের দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের, সেটি এতো সস্তা হয়ে গেল কীভাবে? অথবা আমাদের উচ্চশিক্ষার দর্শন, প্রয়োজনীয়তা, মান, গবেষণা ইত্যাদি নিয়ে আমরা আসলে আর কবে ভাববো?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, এর লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক তত্ত্ব ও গবেষণা রয়েছে। উনিশ শতকের বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদ কার্ডিনাল জন হেনরি নিউম্যান উচ্চশিক্ষা নিয়ে তাঁর The Idea of a University গ্রন্থে বেশকিছু মতামত বা প্রস্তাব তুলে ধরেছিলেন।
নিউম্যানের চিন্তার সারৎসার ছিলো এমন যে, বিশ্ববিদ্যালয় হবে সমাজের সব স্তর থেকে আসা শিক্ষার্থীদের একটি মিলনকেন্দ্র, যেখানে তারা একসঙ্গে নিজেদের চিন্তা ও জ্ঞান ভাগ করে নিতে পারে। স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং নিত্যনতুন ভাবনার বিকাশ ঘটাতে পারবে।
নিউম্যানের চিন্তা ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি অনুসন্ধিৎসু, একটি জিজ্ঞাসু মনোভাব তৈরি হবে। তারা নিজেদের সিদ্ধান্তগুলো যাচাই করতে পারবে, ভুলগুলো সহজেই বুঝতে পারবে এবং সেগুলো থেকে শিখে আরও উন্নত হতে পারবে।
নিউম্যানের ভাবনা ছিলো যে, বিশ্ববিদ্যালয় হবে এমন এক অনুপম জ্ঞানতীর্থ যেখানে সবাই একে অপরের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পাবে; পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সহনশীলতার একটি প্লাটফর্ম গড়ে উঠবে। সবমিলিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে একটি নির্মল সুন্দর, স্বচ্ছ ও প্রাণবন্ত জ্ঞানচর্চার পরিবেশ যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে শেখার আনন্দ উপভোগ করতে পারবে।
এদিকে একই প্রসঙ্গে ভিলহেম ভন হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনটি শর্তের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে প্রথম শর্তটি ছিলো, বিশ্ববিদ্যালয় হবে শিক্ষা ও গবেষণার এক অতুলনীয় সমন্বয়স্থল, যেখানে গবেষণালব্ধ জ্ঞান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দ্বান্দ্বিকতার মধ্যদিয়ে সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ভিত্তি পাবে। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টি ছিল তাঁর দ্বিতীয় শর্ত। হামবোল্টের তৃতীয় শর্ত ছিল, প্রশাসনিক আঙ্গিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। হামবোল্ট ও নিউম্যানের ভাবনা-চিন্তার সাথে তুলনা করলে খুব সহজেই অনুমান করা যায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা।
এবার রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হই। বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপত্তি সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য হলো, “… বিশেষ দেশ, বিশেষ জাতি যে বিদ্যা সম্বন্ধে বিশেষ প্রীতি, গৌরব ও দায়িত্ব অনুভব করেছে তাকেই রক্ষা ও প্রচারের জন্যে স্বভাবতই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সৃষ্টি”। এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী তা বুঝাতে রবীন্দ্রনাথ বলেন, “সর্বজনীন চিত্তের উদ্দীপন, উদবোধন, চারিত্রসৃষ্টি”। রবীন্দ্রনাথের চিন্তার আলোকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিচার করলে হতাশার পাহাড় শুধু বাড়তেই থাকবে।
আমাদের দেশে গত কয়েক বছরে হু হু করে যে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তার মূলে ছিল রাজনৈতিক বিবেচনা। ফলে, হামবোল্ট, নিউম্যান আর রবীন্দ্রনাথের চিন্তাভাবনা দূরে থাক, হাল আমলের প্রধান যে দর্শন – জ্ঞানচর্চা এবং জ্ঞান সৃষ্টি – সেই লক্ষ্য থেকেই যোজন যোজন দূরে পড়ে আছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানগুলো।
সমাজের জন্য অবদান রাখা কিংবা উদারচিন্তার বিশ্বনাগরিক তৈরির যে উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের থাকার কথা তা যেন শুধুই বক্তৃতা-বিবৃতিতেই। এমনকি বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিশেষায়িত গবেষণা ও দক্ষ শ্রমিক উৎপাদনেও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই গ্র্যাজুয়েট উৎপাদনকারী একটি যান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি মূলত মানুষের মনন, বোধ ও মানবিকতার বিকাশের ক্ষেত্র। এখানে শিক্ষা মানে শুধু তথ্য আহরণ নয়, বরং নিজেকে চিনে নেওয়া, পৃথিবীকে নতুন করে দেখা, এবং প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্ন করার সাহস অর্জন করা।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় কেবল তার স্থাপনাতে নয়, তার সৃষ্টিতে। আর সেটি নির্ভর করে সেখানে কী ধরনের ভাবনা-চিন্তা জন্ম নিচ্ছে, কী ধরনের মানুষ তৈরি হচ্ছে, এবং সমাজে তারা কী ধরনের প্রভাব ফেলছে তার ওপর। যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষার্থীদের কেবল পেশাজীবী হিসেবে নয়, বরং সচেতন, মানবিক ও চিন্তাশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে, তখনই সেটি হয়ে ওঠে একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়।
একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় মানে একটি পূর্ণাঙ্গ মানবসত্ত্বা তৈরির প্রতিষ্ঠান। একজন তরুণকে তার সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য সর্বাঙ্গীনভাবে তৈরি করার প্রতিষ্ঠান। একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় মানে জ্ঞান, নিষ্ঠা, নীতি, নন্দনের চর্চা, বিশ্বের সাথে সংযোগ, সৃষ্টির উদ্বেলতা।
একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় মানে বিভেদ নয়, সংযোগ; বিভ্রান্তি নয়, বিতর্ক; হিংসা নয়, সহিষ্ণুতা। একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় মানে বোধ, বুদ্ধির জয়জয়কার। বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞানের তপস্যায় মনকে বাধামুক্ত এবং স্বাধীন করার জায়গা। এখানে নতুন আবিষ্কারের আনন্দ ছুঁয়ে যাবে প্রতিদিন। একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হবে দক্ষতার সাথে দর্শনের অপূর্ব সম্মিলনস্থল, যেখানে নিগূঢ় প্রাণশক্তিতে বেড়ে উঠবে উত্তর প্রজন্ম।
সেই প্রেক্ষাপটে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিত্র বিবেচনা করলে সামনে আসে শুধু রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি, হল দখল, জীবনের সাথে সম্পর্কহীন জ্ঞানের চর্চা, গবেষণার বদলে পদ দখল, নীতি ও বোধের চর্চার বদলে বিদ্বেষের ছড়াছড়ি।
আর সাম্প্রতিককালে ক্যাম্পাস মানে যেন ভয়, আতংক আর উদ্বেগের জায়গা। ক্যাম্পাস মানে স্বপ্ন পরিচর্চার বাগান নয়; স্বপ্ন ভঙ্গের আতংক। ক্যাম্পাস মানে উদভ্রান্ত একটা সময়। বড়ো বিমর্ষ লাগে, প্রাণহীন লাগে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে কেবল কিছু দালানকোঠা মনে হয় এগুলোকে।
আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন হয়ে গেছে রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় সম্পত্তি। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আছে বাজার উপযোগী পণ্য তৈরির নেশায়। ফলে বটগাছের মতো প্রজ্ঞা ও বোধের ডালাপালা মেলে সমস্ত সমাজ-সংসারের কাছে গৌরবের স্মারক হয়ে উঠার কথা যে ছেলে কিংবা মেয়েটির, সে হয়ে উঠে স্বপ্নছাড়া, হৃদয়হীন একটা মানুষ। ব্যাতিক্রম হয়তো দু’একটা আছে কিন্তু তাতে আশাবাদের সলতে জ্বলে উঠে না।
বাংলাদেশ এখন সাতান্ন হাজার বর্গমাইল নিয়ে। প্রায় হাজারখানেক কলেজে অনার্স আছে। অন্যদিকে, পাবলিক, প্রাইভেট মিলে দু’শোর মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দেশ আমাদের। অথচ রন্ধ্রেরন্ধ্রে দুর্নীতি। অফিস-আদালত থেকে হোটেল-রেঁস্তোরা কোথাও সততার চাষ নেই।
মানুষের বিবেকবোধ একেবারে শূন্যের কোঠায়। হিংসার উন্মত্ততা চতুর্দিকে। সর্বগ্রাসী লোভের আগুনে পুড়ছে মানুষ। এতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেশে এতো নীতিহীন মানুষ কেন তৈরি হচ্ছে? এতো লোভী, এতো ঘুষখোর, এতো হিংসায় উন্মত্ত মানুষ পৃথিবীর আর কোথাও কি আছে? তাহলে আমাদের গলদ কোথায়, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে।
আমার মনে হয় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নয়; যেগুলো আছে সেগুলোকে সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই দরকার জাতীয় ঐক্যমত।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যদি বলি, তাহলে প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে একেকটি রাজনৈতিক দলের শাখায় পরিণত হয়েছে, সেখান থেকে উত্তোরণ ঘটাতে হবে যেকোনো মূল্যে।
তবে সার্বিকভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে মানসম্পন্ন করতে বাজেটের কোনো বিকল্প নেই। তাই আমাদের জাতীয় বাজেটে উচ্চশিক্ষার বাজেটকে পৃথক করে রাখতে হবে। গবেষণা হবে একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য উদ্দেশ্য।
ঢালাওভাবে সবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়/উচ্চশিক্ষা কিংবা জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় – এসব নীতি থেকে দূরে সরে আসতে হবে। তবে আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়কে সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধান যে কাজ সেটি হচ্ছে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ। বর্তমানে যে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রতিপত্তি, আর্থিক লেনদেনের রাজত্ব চলছে, সেখান থেকে সমূলে বেরিয়ে না আসলে সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়া যাবে না।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি চৌকস, সময়োপযোগী বেতন কাঠামোও নিশ্চিত করা জরুরি। কেননা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আদর্শ শিক্ষাদানকে বিঘ্নিত করে। শিক্ষকতা ঔজ্জ্বল্য ধরে রাখতে আর্থিক সাবলম্বীতার কোনো বিকল্প নেই।
সর্বোপরি, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি কিংবা সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রাণকেন্দ্রও, যেখানে তৈরি হবে আমাদের আগামীর বাংলাদেশ।
এর জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা, দক্ষ ও গবেষণামুখী শিক্ষক, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাক্রম, আধুনিক গবেষণা সুবিধা, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং শিক্ষার্থীবান্ধব নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি জাতীয় ও বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা প্রদান জরুরি। একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হবে এমন এক জ্ঞানতীর্থ, যেখানে শুধু জ্ঞান অর্জন নয়, বরং তা সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ তৈরি হয়।
আমাদের জন্য যে কথাটি ঘুরেফিরে আসছে সেটি হলো, সবার আগে বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক ছত্রছায়া থেকে মুক্তি দিতে হবে। জাতীয় স্বার্থে, একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়ে তোলার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানচর্চা এবং উদ্ভাবনের কেন্দ্রস্থলে রূপান্তর করতে হবে।
তবে শিক্ষকদের শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করা ছাড়া এসব উদ্যোগ সফল হবে না। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বৃহৎ একটি অংশের ভেতর যেভাবে অনৈতিকতার বীজ বপন হয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর সামনে তার ব্যক্তিত্ব, পাণ্ডিত্য নিয়ে আদর্শরূপে দাঁড়াতে না পারেন, একজন শিক্ষকের প্রজ্ঞার প্রদীপ যদি শিক্ষার্থীর জীবনে প্রভাব না ফেলতে পারে, তাহলে সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় অধরাই থেকে যাবে।
তবে যা গেছে তো গেছেই। এখন যদি ঘুরে দাঁড়ানো না যায়, তবে আমাদের ভবিষ্যত অধঃপতন কেউ ঠেকাতে পারবে না। পৃথিবীর তরুণরা এগুচ্ছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে প্রতিদিন নিজেরা নিজেদের অতিক্রম করছে। আমাদের তারুণ্যেরও মেধা এবং সম্ভাবনা কম নয়। আমাদের নীতিনির্ধারকদের উচিত তারুণ্যের সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত করার পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত করা।
আজকের বাংলাদেশকে নিয়ে তারুণ্যের যে হতাশা, মেধাবীদের দেশত্যাগের যে মিছিল, তা আমাদের আগামীর জন্য এক গভীর অমানিশার অশনি সংকেত। এই খাদের কিনারা থেকে আমাদের তুলে আনতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা।
শেষ করছি রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত আহবান দিয়ে (শিক্ষার হেরফের):
আমরা বিধাতার নিকট এই বর চাহি, আমাদের ক্ষুধার সহিত অন্ন, শীতের সহিত বস্ত্র, ভাবের সহিত ভাষা, শিক্ষার সহিত জীবন কেবল একত্র করিয়া দাও। আমরা আছি যেন―
পানীমে মীন পিয়াসী
শুনত শুনত লাগে হাসি।
আমাদের পানিও আছে পিয়াসও আছে দেখিয়া পৃথিবীর লোক হাসিতেছে এবং আমাদের চক্ষে অশ্রু আসিতেছে, কেবল আমরা পান করিতে পারিতেছি না।
লেখক পরিচিতি
প্রণবকান্তি দেব সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। পাশাপাশি তিনি একজন লেখক ও গবেষক। পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন এলামনাই। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা সাত।


