উচ্চশিক্ষা গবেষণা

শিক্ষা ও গবেষণায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়: পর্ব ২

কাপিৎসা
লিখেছেন গৌতম রায়

১৫ ডিসেম্বর, ১৯৫৫। সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভকে লেখা একটি চিঠি পড়ছিলাম। লেখক কাপিৎসা। কাপিৎসা ১৯৭৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি লো-টেম্পারেচার ফিজিক্সে একজন পাইওনিয়ার।

কী বলেছিলেন কাপিৎসা?

লম্বা এই চিঠিতে কাপিৎসা সোভিয়েত রাশিয়ায় বিজ্ঞানচর্চায় বিদ্যমান সমস্যাগুলো নিয়ে লিখেছেন। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই সমস্যাগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তৎকালীন সোভিয়েত সমস্যাগুলোকে দশ দিয়ে গুণ করলে আজকের বাংলাদেশের কাছাকাছি পৌঁছানো যেতে পারে।

চিঠির একটি বড় অংশ গবেষণা বরাদ্দ প্রসঙ্গে। কাপিৎসা একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। উদাহরণটি একখণ্ড জমির। জমিতে ফসল ফলাতে হলে তার পরিচর্যা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত সার, সেচ ইত্যাদির প্রয়োজন। কাপিৎসা এই সমস্ত উপাদানকে গবেষণা বরাদ্দের সাথে তুলনা করেছেন। তারপর তিনি যেটি লিখেছেন সেটিই হচ্ছে আসল কথা।

পর্যাপ্ত সার এবং সেচ সুবিধাযুক্ত একখণ্ড জমি; কিন্তু কোন ধরনের ফসলের আবাদ হওয়া প্রয়োজন আর কোনটি আগাছা সে সম্পর্কে নেই কোন ধারণা। এ অবস্থায় কী হতে পারে?


কাপিৎসা একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। উদাহরণটি একখণ্ড জমির। জমিতে ফসল ফলাতে হলে তার পরিচর্যা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত সার, সেচ ইত্যাদির প্রয়োজন। কাপিৎসা এই সমস্ত উপাদানকে গবেষণা বরাদ্দের সাথে তুলনা করেছেন। তারপর তিনি যেটি লিখেছেন সেটিই হচ্ছে আসল কথা।


প্রাকৃতিক নিয়মেই আগাছা অত্যন্ত শক্তিশালী। উদ্দেশ্য এবং উপলব্ধিহীন গবেষণা বরাদ্দ প্রকৃত এবং মানসম্পন্ন গবেষকদের চেয়ে আগাছাদের অনেক বেশি শক্তিশালী করে গড়ে তোলে। কাপিৎসার দৃষ্টিতে সোভিয়েত রাশিয়ায় ঠিক এই ঘটনাটি ঘটছে। কাপিৎসার ভাষায় “The situation which has arisen here during recent years is as follows: the weeds, profiting from the weakness of our bureaucratic system, have grown so strong that they have begun to retard the development of healthy science and the situation has become threatening.”।

কী ঘটছে বাংলাদেশে?

আমাদের নীতিনির্ধারকদের যে ধরনের জ্ঞানগম্যি, তাতে বর্তমানে দেশে এটাই ঘটছে। ভবিষ্যতে উপলব্ধিহীন বরাদ্দ বৃদ্ধিতে এটি আরও প্রবল হবে।

একটিবারের জন্যও যেন এটি না ভাবা হয় যে আমি বরাদ্দ বৃদ্ধির বিপক্ষে। অত্যন্ত পক্ষে। বর্তমান গবেষণা বরাদ্দ অপ্রতুল বললেও কিছু বলা হয় না। বৃদ্ধি পাওয়া উচিৎ বহুগুণে। কিন্তু তার সাথে প্রয়োজন, জ্ঞান, ইনসাইট এবং যোগ্য মানুষের যোগ্য পদে আসীন হওয়া।

নানাবিদ সঙ্কটের মধ্যে আমরা আছি। এর ভেতর অর্থসঙ্কট অন্যতম। কিন্তু প্রথম সঙ্কট নয়। প্রধান সঙ্কট তো মোটেই নয়। প্রধান সঙ্কটটি মানবিক সঙ্কট, মানসিকতার সঙ্কট। এক কথায় নৈতিকতার সঙ্কট।

বেতন বৃদ্ধি কি সমাধান?

২০১৫ সালে অনেকের বেতন অনেক বেড়েছে। কাজকর্মে এই বেতন বৃদ্ধির কোন প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই? বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাবিমুখ সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষকদের ভেতর কে বেতন বৃদ্ধির পর গবেষণায় মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছেন?

দুঃখ পাই যখন দেখি, নৈতিকতার সঙ্কটকে বরাদ্দ দিয়ে মোকাবিলা করার একটি চেষ্টা চলে। বরাদ্দ ইতিবাচক ভুমিকা রাখতে পারে কিন্তু আসল সমস্যাটি তো সেখানে নয়। এই আসল সমস্যার সমাধান অনেক কঠিন। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান ছাড়া বর্ধিত বরাদ্দ দিয়ে সবচেয়ে বেশি যেটি হবে তা হচ্ছে আগাছার বাম্পার ফলন। এতে প্রকৃত ফসলের জন্য জায়গা হবে আরো সংকুচিত। যেখানে নৈতিকতার আদর্শমানের অস্তিত্ব নেই সেখানে আগাছার সাথে পেরে ওঠা খুব শক্ত।

র‍্যাংকিঙ-এর উত্তেজনা

বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে দুনিয়াজুড়ে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং প্রকাশিত হয়। বেশ উত্তেজনাময় সময়। র‍্যাংকিং বহুদিন ধরে আর উত্তেজিত করে না, একসময় করত। তবে এখন র‍্যাংকিং নিয়ে উত্তেজনা দেখে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়ি। উত্তেজনা ছোঁয়াচে।

আমার নিজের এসব নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। দুনিয়াজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ২৫,০০০। শুধু আমেরিকাতেই US Department of Education-এর হিসেব মতে অন্তত ৪,০০০ ডিগ্রি গ্র্যান্টিং প্রতিষ্ঠান আছে। এদের ভেতর অন্তত হাজারখানেক প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেওয়া যেতে পারে।

কানাডায় এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০০-এর ওপর। অর্থাৎ শুধু আমেরিকা ও কানাডাতেই সহস্রাধিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যাদের যে কোনোটির মান বাংলাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ভালো ছাড়া মন্দ হওয়ার কথা না। ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর কথা বাদ দিলাম। কাজেই হাজার খানেক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যে আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই (থাকার কথা নয়), তা দেখে কেউ বিস্মিত হলে, নিজে বিস্মিত হয়ে পড়ি।


আসলে বাংলাদেশে যে সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় নামে অবহিত করি, তার একটিও আদৌ বৈশিষ্ট্যের বিচারে বিশ্ববিদ্যালয় কিনা, সে ব্যাপারেই প্রশ্ন আছে।


আসলে বাংলাদেশে যে সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় নামে অবহিত করি, তার একটিও আদৌ বৈশিষ্ট্যের বিচারে বিশ্ববিদ্যালয় কিনা, সে ব্যাপারেই প্রশ্ন আছে। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যতো বড় পণ্ডিতই হোক না কেন, কোনো বিদেশিকে আমরা শিক্ষকতায় নিয়োগ দিই না। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আঞ্চলিকতার দাপট দেখা যায়। রাজনীতি, তথাকথিত চেতনা এবং ধর্মের ভিত্তিতে নিয়োগে অসচ্ছতা জেঁকে বসেছে। আমরা নাম দিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু বিশ্ব দূরে থাক, এই ক্ষুদ্র দেশটিকে রাজনীতি, আঞ্চলিকতা, ধর্ম ইত্যাদির উর্ধ্বে উঠে ধারণ করার ক্ষমতা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিরও নেই। নীচ রুচির গ্রাম্য মাতব্বরি স্টাইলে চলা কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়!

বলা হচ্ছে, উপযুক্ত তথ্য-উপাত্ত পেলে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং অনেক ভালো হত। আমার তো মনে হয়, যে তরিকায় এ দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ হয়, উপাচার্য বাছাই করা হয়, সে সম্পর্কে উপযুক্ত তথ্য-উপাত্ত পেলে QS এবং THE-এর তালিকা থেকে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ নামটিই আগে কাটা যেত। র‍্যাংকিং অনেক পরের বিষয়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং

ব্যক্তিগতভাবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং একটি অবান্তর বিষয় বলে মনে করি। শুধু নিজ বিষয়ে যা জানি তা থেকেই বলছি। আমার সৌভাগ্য এবং একইসাথে দুর্ভাগ্য যে, দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে কী ধরনের পঠনপাঠন ও গবেষণা চলছে সে সম্পর্কে জানি। স্নাতক পর্যায়ে অধ্যায়নরত শতকরা ৯০ জন ছাত্রছাত্রী নিউটনের তৃতীয় সুত্র যে ভরবেগের নিত্যতার একটি ভিন্ন বয়ান তা বোঝে না। খাতায় লিখতে বললে দশ নম্বরের মডিফাইড ব্র্যাগ’স ল নিয়ে কয়েক পাতা লিখতে পারে। দশে নয় পায়। ব্ল্যাকবোর্ডে ছবি একে সিম্পল ব্র্যাগ’স ল ব্যাখ্যা করতে বললে একেবারে চুপচাপ। ইক্যুইলিব্রিয়াম স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্স দাড়িয়ে আছে লিউভিলের থিওরেমের ওপর। স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্সে থিসিস করা ছাত্রছাত্রীদের বড় অংশের থিওরেমটি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। শত শত উদাহরণ দেওয়া যায়। দিতে চাই না। ডিপ্রেসিং।


আমরা যারা শিক্ষক তাদের র‍্যাংকিঙের দিকে তাকানোর বিশেষ প্রয়োজন নেই। আমরা কী শিখেছি, কতোটুকু ছাত্রদের শেখাতে পারছি, সেটি আমাদের চেয়ে QS বা THE-এর ভালো জানার কথা নয়। এই জানাটাই সবচেয়ে বেশি দরকার। প্রয়োজন উপলব্ধির।


আর যাই হোক, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না সে এক বড় প্রশ্ন। তার উত্তর আছে। তবে সে কাহিনী আজ নয়।

যে কথাটি বলতে চাচ্ছি তা হলো, আমরা যারা শিক্ষক তাদের র‍্যাংকিঙের দিকে তাকানোর বিশেষ প্রয়োজন নেই। আমরা কী শিখেছি, কতোটুকু ছাত্রদের শেখাতে পারছি, সেটি আমাদের চেয়ে QS বা THE-এর ভালো জানার কথা নয়। এই জানাটাই সবচেয়ে বেশি দরকার। প্রয়োজন উপলব্ধির।

সমাধান কোন পথে?

আমাদের দেশে শিক্ষা ক্যান্সারে আক্রান্ত– স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়, সব। এই রোগ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় সম্মিলিত উদ্যোগ। দু’চারটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সমাধান নয়। ধরা যাক, আগামী বছর এশিয়ার প্রথম ৪০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেল। কী হবে? একদল মানুষের অর্থহীন আত্মশ্লাঘার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। অনর্থক হাঁকডাক শুনতে শুনতে কান ঝলাপালা হবে। কিন্তু ভেতরের ক্যান্সার সস্তা প্রসাধনীতে কতটুকু ঢাকা যাবে?

তাবৎ র‍্যাংকিং-এর চেয়ে, দেশের কোনো একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের কোনো একটি বর্ষের ছাত্রছাত্রীরা মৌখিক পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানের একেবারে প্রাথমিক এবং মৌলিক ধারণাগুলো সম্পর্কে কী ভাবছে, কতটুকু বলতে পারছে, কতটুকু আত্মস্থ করতে পারছে, তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমার জন্য একটি বড় Key Performance Indicator। আমাদের অবস্থা আমাদের চেয়ে ভালো আর কে জানে?

ড. সালেহ হাসান নকিব: অধ্যাপক, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

একটি মন্তব্য

  • এই উপলব্ধিহীন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তারপর ঝরে না পড়ে বরং ক্রমশ উন্নতি লাভ করতে থাকার পেছনে একটি বড় কারণ রয়েছে – বিভাগের নিজস্ব মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পরীক্ষার প্রশ্নগুলোতে মুখস্তবিদ্যার যাচাইয়ের প্রাধান্য থাকা।
    এটি মানবিক-কলা বিভাগগুলোকে যেমন পেয়ে বসেছে, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও নিতান্ত কম নয়।

মন্তব্য লিখুন

2 × 4 =