আলোচ্য বিষয়সমূহ
প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষায় (এসএসসি, এইচএসসি/সমমান) বসে, আর তাদের ভবিষ্যৎ ঝুলে থাকে কয়েকটি নম্বরের ওপর। ফল প্রকাশের পর প্রতিবারই একটি চেনা দৃশ্য ফিরে আসে— কোনো শিক্ষার্থী নিশ্চিত, তার উত্তর সঠিক ছিলো, তবু নম্বর কম এসেছে। কেউ সন্দেহ করে যোগে ভুল হয়েছে, কারো মনে হয় কোনো উত্তরই হয়তো মূল্যায়নের বাইরে থেকে গেছে। এসব সন্দেহ নিরসনের একমাত্র আইনি পথ বোর্ড চ্যালেঞ্জ, বা খাতা পুনঃনিরীক্ষণ।
প্রশ্নটা তাই সহজ, উত্তরটা ততোটা নয়: এই ব্যবস্থা কি সত্যিই শিক্ষার্থীর ন্যায্য অধিকার রক্ষা করে, নাকি এটি এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা, যেখানে ফি জমা পড়ে, কিন্তু খাতা আসলে কীভাবে মূল্যায়ন হয়েছিল তা কখনো জানা যায় না?
OECD-র ২০২৩ সালের শিক্ষা প্রতিবেদন আর ইউনেস্কোর ২০২২ সালের বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন, দুটোই একই জায়গায় এসে মেলে। মূল্যায়নে স্বচ্ছতা না থাকলে শিক্ষার্থীর আস্থা ক্ষয় পায়, আর সেই ক্ষয়ের প্রভাব পড়ে শিক্ষার সামগ্রিক মানের ওপর। তাহলে বাংলাদেশ এত বছর কেন একটি সীমিত পদ্ধতিতে আটকে রইলো? আর, যেটি এই মুহূর্তে বেশি জরুরি প্রশ্ন, এ-বছর ঠিক কী বদলালো?
সেই প্রশ্নগুলো ধরেই এই লেখা এগোবে। বর্তমান ব্যবস্থা আসলে কীভাবে কাজ করে, ২০২৬ সালে সরকার কোথায় হাত দিয়েছে, অন্য দেশ কীভাবে একই সমস্যা সামলেছে, আর বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে।
বাংলাদেশের পুনঃনিরীক্ষণ ব্যবস্থা: পুরনো কাঠামো ও ২০২৬ সালের রূপান্তর
দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষা চলে ১১টি শিক্ষা বোর্ডের হাত ধরে—ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, যশোর, বরিশাল, সিলেট, কুমিল্লা, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, কারিগরি ও মাদ্রাসা বোর্ড, সবাই আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির ছাতার নিচে। নামে একে পুনঃনিরীক্ষণ (re-scrutiny) বলা হলেও দীর্ঘদিন এটি প্রকৃত অর্থে পুনর্মূল্যায়ন (re-evaluation) ছিল না।
নতুন কোনো পরীক্ষক বসে শিক্ষার্থীর উত্তর আবার পড়তেন না, শুধু যোগফল ঠিক আছে কি না, কোনো উত্তর বাদ পড়ে গেছে কি না, মার্কশিটে সংখ্যা ভুল বসেছে কি না, এইটুকুই দেখা হতো। অর্থাৎ ভুল যদি নম্বর টোকাতেই হয়ে থাকে তবেই ধরা পড়ত, উত্তরের গুণগত বিচারে গলদ থাকলে তা রয়েই যেত।
এই ছবিটা এবার একটু নড়েছে। ২০২৬ সালের ফল প্রকাশের অনুষ্ঠানেই শিক্ষামন্ত্রী ড. এ এন এম এহছানুল হক মিলন একটি লক্ষণীয় ঘোষণা দেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, মন্ত্রী স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, শুধু ট্যাবুলেশন শিট নয়, শিক্ষার্থীর মূল উত্তরপত্র যাচাই করে দেখা হবে যাতে সে প্রাপ্য নম্বর পায়, এবং এই কাজের জন্য একটি পর্যালোচনা কমিটিও গঠিত হবে।
তাঁর নিজের ভাষায়: “আগে শুধু ট্যাবুলেশন শিট পরীক্ষা করা হতো… শিক্ষক সঠিক নম্বর দিয়েছেন কি না তা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ ছিল না। এবার আইনগতভাবে প্রতিটি শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।”
কথাটি শুনতে বড় প্রতিশ্রুতির মতো, আর আসলেই তা এই লেখায় বারবার তোলা সবচেয়ে পুরনো অভিযোগের সরাসরি জবাব। তবে একটি শর্ত থেকেই যাচ্ছে— বাস্তবায়নের পুরো পদ্ধতি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তাই সত্যি হলে কথাটি ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
আবেদনের পথও বদলেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা বোর্ডের বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক পুরনো টেলিটক এসএমএস পদ্ধতি এবার সম্পূর্ণ বাতিল, পুরো প্রক্রিয়া গেছে অনলাইন পোর্টালে (rescrutiny.eduboardresults.gov.bd), আবেদনের জানালা ১১ থেকে ১৭ আগস্ট। প্রতি পত্রে ফি ১৫০ টাকা, অর্থাৎ বাংলা বা ইংরেজির মতো দুই-পত্রের বিষয়ে দিতে হচ্ছে ৩০০ টাকা, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সেবা বা টেলিটকের মাধ্যমে।
দুটো পদক্ষেপ একসাথে দেখলে ইতিবাচক ছবিই ফুটে ওঠে। উত্তরপত্র প্রকৃতপক্ষে দেখার প্রতিশ্রুতি, আর একটি ট্র্যাকযোগ্য অনলাইন প্রক্রিয়া। কিন্তু দুটো প্রশ্ন এখনই তুলে রাখা দরকার। পর্যালোচনা কমিটি ঠিক কীভাবে গঠিত হবে, কারা তাতে থাকবেন, মূল পরীক্ষকের রায়ের বিপরীতে তাদের সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন হবে, এসবের কোনো স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই।
আর শিক্ষার্থী নিজে তার খাতার কপি দেখতে পাবে, নাকি শুধু বোর্ডের নিয়োজিত কমিটিই তা দেখবে, এই পার্থক্যটিও এখনো ধোঁয়াশায়। প্রকৃত পুনর্মূল্যায়ন চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় পদক্ষেপ, কিন্তু এতে সমস্যাটি পুরোপুরি ঘুচবে কি না, তা নির্ভর করছে ঠিক কীভাবে এটা বাস্তবে দাঁড়ায় তার ওপর।
পুরনো কাঠামোর কিছু সমস্যা অবশ্য এই সংস্কারের পরও অমীমাংসিত থেকে গেছে। ফল প্রকাশে প্রায়ই তিন-চার সপ্তাহ লেগে যায়, যে সময়ে শিক্ষার্থী ভর্তি বা অন্য কোনো সিদ্ধান্ত আটকে রাখতে বাধ্য হয়। পরিবর্তন না এলেও ১৫০ টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই, যা দরিদ্র পরিবারের জন্য নিছক লোকসান। অনলাইন পোর্টাল গ্রামীণ এলাকায় দুর্বল ইন্টারনেটের কারণে প্রায়ই আটকে যায়। আর ফল প্রকাশের পর নম্বর কেন বদলাল বা বদলাল না, তার কোনো ব্যাখ্যা এখনো মেলে না।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব: একটি মৌলিক প্রশ্ন
একটি ন্যায্য মূল্যায়ন ব্যবস্থার ভিত্তি স্বচ্ছতা— এটি কোনো নতুন কথা নয়। ইউনেস্কো ২০২২ সালে লিখেছে, মূল্যায়নে স্বচ্ছতা না থাকলে শিক্ষার্থী ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়, আর সেই আস্থা-ক্ষয় শেষমেশ শিক্ষার মানকেই টেনে নামায়। OECD একই বছরের এক পর্যালোচনায় বলেছে, শিক্ষার্থী নিজের মূল্যায়নকৃত খাতা দেখতে পারলে সে নিজের ভুল বোঝে, আর সেই বোঝাপড়া থেকেই ভবিষ্যতে উন্নতি সম্ভব হয়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন এই সুযোগটাই ছিল না। কোন উত্তর কত নম্বর পেল, কোন মানদণ্ডে বিচার হলো, কিছুই শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাত না। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের বাংলাদেশ শিক্ষাখাত পর্যালোচনাতেও এই জবাবদিহিতার অভাব ধরা পড়েছে। কোনো পরীক্ষক ভুল করলে তা ধরার উপায় প্রায় ছিল না, কারণ কোনো দ্বিতীয় স্বাধীন চোখ সেই খাতায় পড়ত না। ২০২৬-এর সংস্কার, যদি প্রতিশ্রুতিমতো কার্যকর হয়, এই নির্দিষ্ট গর্তটা আংশিক ভরাট করতে পারে, কারণ এখন অন্তত একটি পর্যালোচনা কমিটি মূল উত্তরপত্রে চোখ রাখছে। তবে পরীক্ষকের পরিচয় এখনো গোপন, আর বিষয়ভিত্তিক বিস্তারিত মূল্যায়ন গাইডলাইনের অভাবে একই মানের উত্তর একেক পরীক্ষকের হাতে একেক নম্বর পাওয়ার পুরনো সমস্যাও রয়ে গেছে।
শিক্ষার্থীদের অধিকার ও শিক্ষাগত ন্যায়বিচার
শিক্ষা মৌলিক অধিকার, আর ন্যায্য মূল্যায়ন সেই অধিকারেরই ভেতরের অংশ— ইউনিসেফ ২০২৩ ও ইউনেস্কো ২০২২ এই বিষয়ে একমত। বাংলাদেশে যখন কেউ কয়েক নম্বরের জন্য পাস-ফেলের রেখায় দাঁড়িয়ে থাকে, বা উচ্চশিক্ষার দরজা বন্ধ হয়ে যায় সামান্য এক-দুই নম্বরে, তখন এই ব্যবস্থার প্রতিটি ফাঁক তার জীবনে সরাসরি আঘাত করে।
তুলনা করার মতো একটা উদাহরণ আছে প্রতিবেশী ভারতে। ২০১১ সালে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট সিবিএসই বনাম আদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় মামলায় স্পষ্ট রায় দেয়, তথ্য অধিকার আইনের অধীনে প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজের মূল্যায়নকৃত উত্তরপত্র দেখার বা কপি নেওয়ার অধিকার আছে।
বাংলাদেশে এখনো এমন কোনো আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ২০২৬-এর প্রশাসনিক সংস্কার ভালো একটি পদক্ষেপ ঠিকই, কিন্তু তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্তরেই আটকে আছে, আইন নয়, বিধি। আর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যেমন সহজে আসে, তেমনই সহজে বদলেও যেতে পারে পরের যেকোনো মন্ত্রণালয়ের হাতে।
দরিদ্র পরিবারের জন্য ১৫০ টাকা ফি একটা বাস্তব বোঝা, বিশেষত যখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নম্বর অপরিবর্তিত থাকে বলে নানা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট-সংযোগের ঘাটতি অনলাইন আবেদনকে অনেকের জন্য একটা বাড়তি বাধায় পরিণত করে। আর প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কোনো বিবেচনার চিহ্ন এই ব্যবস্থায় এখনো চোখে পড়ে না।
মানসিক ও সামাজিক প্রভাব
মূল্যায়ন শুধু নম্বরের ব্যাপার নয়, এটি জড়িয়ে যায় মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক চাপ আর সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও। শিক্ষা-মনস্তত্ত্বের গবেষণা বলে, মূল্যায়নকে অস্বচ্ছ বা অন্যায্য মনে হলে শিক্ষার্থীর মধ্যে উদ্বেগ ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক মানসিক চাপ বেড়ে যায়।
প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে গত বছরের ফল প্রকাশের পর একাধিক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যাচেষ্টার উল্লেখ আছে। সংখ্যাটি যা-ই হোক, ঘটনাটাই বলে দেয় বাংলাদেশের পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মানসিক মূল্য কতটা ভারী।
এই চাপ পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গোটা ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। পরীক্ষা ব্যবস্থাকে অস্বচ্ছ মনে হলে মানুষ সরকারি শিক্ষার ওপর আস্থা হারায়, আর কোচিং সেন্টার বা বিকল্প মূল্যায়নের দিকে ঝোঁকে, যা শেষ পর্যন্ত সমতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে, কারণ কোচিংয়ের খরচ সবার সাধ্যে কুলোয় না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: অন্য দেশগুলো কী করে
বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা বোঝার একটা ভালো উপায় হলো অন্য দেশের দিকে তাকানো। যুক্তরাজ্যে A-level ও GCSE-তে শিক্ষার্থীরা ‘রিভিউ অব মার্কিং’ বা আপিল করতে পারে। ক্যামব্রিজ অ্যাসেসমেন্ট বা পিয়ারসনের মতো সংস্থা সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে স্বতন্ত্রভাবে ভিন্ন এক পরীক্ষক দিয়ে খাতা আবার দেখায়, আর নম্বরে পার্থক্য পেলে বেশিটাই টিকে থাকে।
ভারতে সিবিএসই ব্যবস্থা ধাপে ধাপে এগোয়। প্রথমে শুধু নম্বর-যাচাই, তারপর চাইলে খাতার ফটোকপি, শেষে নির্দিষ্ট প্রশ্নের পুনর্মূল্যায়ন, প্রতিটি ধাপের আলাদা মূল্য দিয়ে। ফিনল্যান্ডে জাতীয় পরীক্ষা এমনিতেই কম, তবে যেখানে হয় সেখানে শিক্ষার্থী নিজের খাতা দেখতে পায় এবং শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি বসে কথা বলতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার রাজ্যভিত্তিক বোর্ডগুলোতেও সাধারণ নিয়ম একই রকম— খাতার কপি পাওয়া যায়, আর একটি স্বতন্ত্র কমিটি আপিল দেখে। সিঙ্গাপুরে GCE O-level ও A-level-এ ‘গ্রেড রিভিউ’-এর আওতায় স্বতন্ত্র পরীক্ষক ফের মূল্যায়ন করেন, বেশি নম্বর এলে সেটাই টেকে।
এসব অভিজ্ঞতা একসাথে রাখলে শিক্ষাটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। নিজের খাতা দেখার বা কপি নেওয়ার অধিকার, একই পরীক্ষকের বদলে স্বতন্ত্র পুনর্মূল্যায়ন, আগে থেকে জানানো মানদণ্ড, আর একটা স্বাধীন আপিল ব্যবস্থা— এই কয়েকটি উপাদান একসাথে থাকলেই প্রকৃত ন্যায্যতা দাঁড়ায়। ২০২৬-এর বাংলাদেশি সংস্কার এই তালিকার প্রথম দুটোর দিকে একটা পা বাড়িয়েছে বলা যায়, বাকিগুলো এখনো অনুপস্থিত।
তবে এটাও মনে রাখা দরকার, যুক্তরাজ্য বা সিঙ্গাপুরের মতো তুলনামূলক ছোট জনসংখ্যা আর উন্নত অবকাঠামোর ওপর গড়ে ওঠা ব্যবস্থা বাংলাদেশের বিশাল পরীক্ষার্থী-সংখ্যায় এক লাফে বসানো যাবে না, পর্যায়ক্রমে এগোতে হবে। স্বাধীন পুনর্মূল্যায়ন ব্যবস্থা খরচসাপেক্ষ, ভর্তুকি বা ফি-সমন্বয় ছাড়া চলবে না। আর ডিজিটাল মূল্যায়নের জন্য যে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট আর বিদ্যুৎ দরকার, তা দেশের সব অঞ্চলে এখনো সমান নেই।
বাংলাদেশের জন্য নীতিগত সংস্কারের বিকল্প
২০২৬-এর পদক্ষেপের বাইরে আরও কিছু পথ খোলা আছে। উত্তরপত্রের সম্পূর্ণ ডিজিটাল স্ক্যানিং ও অনলাইন অ্যাক্সেস চালু হলে শিক্ষার্থী নিজেই নিজের খাতা দেখতে পারবে। প্রাথমিক বিনিয়োগ ও তথ্য-সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশ যেহেতু অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ও ফল প্রকাশ ইতিমধ্যে সামলে নিয়েছে, এই পথে প্রশাসনিক সম্ভাব্যতা কম নয়।
একটি পুরোপুরি স্বাধীন পরীক্ষা আপিল বোর্ড গঠিত হলে মূল মূল্যায়ন প্রক্রিয়া থেকে সত্যিকারের পৃথকীকরণ আসবে, যদিও নতুন প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে সময় আর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুটোই লাগবে সমান তালে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক ত্রুটি শনাক্তকরণ নম্বর-যোগ বা বাদ-পড়া উত্তরের মতো প্রযুক্তিগত ভুল দ্রুত ধরতে পারে, তবে উত্তরের গুণগত বিচারে মানুষের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। আর মানসম্মত মূল্যায়ন গাইডলাইন আর বহিঃস্থ গুণগত নিশ্চয়তা যোগ হলে ভিন্ন পরীক্ষকের ভিন্ন মানদণ্ডের পুরনো সমস্যাটা অনেকটাই কমে আসতে পারে।
সংস্কারের পথে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ
একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তিন ধাপে দাঁড় করানো যায়। প্রথম এক-দুই বছরে দরকার ২০২৬-এ ঘোষিত পুনর্মূল্যায়ন ব্যবস্থার পূর্ণ, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। কতোজন আবেদন করল, কতোজনের নম্বর বদলাল, এই তথ্য প্রকাশ্যে আসা উচিত।
শিক্ষার্থীকে একটা সংক্ষিপ্ত মার্কিং-ব্রেকডাউন দেওয়া যেতে পারে; পরিবর্তন না এলেও অন্তত আংশিক ফি ফেরতের ব্যবস্থা রাখা দরকার; আর ফল দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশের লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া উচিত। পরের তিন-পাঁচ বছরে লক্ষ্য হতে পারে উত্তরপত্রের সম্পূর্ণ ডিজিটাল স্ক্যানিং, একটি স্বাধীন পরীক্ষা আপিল বোর্ড, পরীক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক মানসম্মত প্রশিক্ষণ, আর দরিদ্র শিক্ষার্থীর জন্য ফি মওকুফ।
আর পাঁচ থেকে বিশ বছরের দিগন্তে দেখা উচিত উত্তরপত্র দেখার অধিকারকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে আইনি অধিকারে তোলার সম্ভাবনা, ঠিক যেমনটা ভারতে তথ্য অধিকার আইনের মধ্য দিয়ে ঘটেছিলো। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের বহিঃস্থ গুণগত নিশ্চয়তা ব্যবস্থা পুরোপুরি দাঁড় করানো।
উপসংহার: অগ্রগতি প্রকৃত, কিন্তু অসম্পূর্ণ
বাংলাদেশের পুনঃনিরীক্ষণ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন একটা সীমিত, প্রযুক্তিগত-ত্রুটি-কেন্দ্রিক কাঠামোয় বন্দি ছিল, যেখানে প্রকৃত মূল্যায়নের ভুল কখনো ধরা পড়তো না। ২০২৬-এ সরকার এই সমস্যার মুখোমুখি সরাসরি দাঁড়িয়েছে, উত্তরপত্র সত্যিকারের পুনর্মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি আর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে তোলা, এই দুটোই বাস্তব ও স্বাগত জানানোর মতো অগ্রগতি, আর এই লেখাতেই বারবার তোলা পুরনো অভিযোগের সরাসরি জবাব বটে। তবু অগ্রগতিটা সম্পূর্ণ নয়।
পর্যালোচনা কমিটির স্বাধীনতা কতটা, শিক্ষার্থী নিজের খাতা দেখতে পাবে কি না, ফি ফেরতের ব্যবস্থা হবে কি না, আর এই অধিকার আইনি রূপ পাবে কি না, এই প্রশ্নগুলো এখনো খোলা।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা একটা কথাই বারবার বলে—স্বচ্ছ ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক মূল্যায়ন শিক্ষার মান আর শিক্ষার্থীর আস্থা, দুটোকেই বাড়ায়। বাংলাদেশ ২০২৬-এ একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পা ফেলেছে। এখন প্রশ্ন একটাই, এই পা ফেলা কি একটা সম্পূর্ণ, আইনি অধিকার-ভিত্তিক সংস্কারে গড়াবে, নাকি একটা বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ঘোষণা হয়েই থেকে যাবে? শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আর শিক্ষার মান—দুটোই এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
তথ্যসূত্র
Bangladesh Affairs. (2025, July 9). SSC Board Challenge 2025: Application opens July 11 for re-scrutiny. https://bangladeshaffairs.com/ssc-board-challenge/
Bangladesh Bureau of Educational Information and Statistics (BANBEIS). (2024). Education statistics of Bangladesh 2023-24. Ministry of Education, Government of the People’s Republic of Bangladesh.
Cambridge Assessment. (2024). Review of marking and appeals: Guidance for candidates. Cambridge International Examinations.
Central Board of Secondary Education (CBSE). (2026). Re-evaluation of answerbook for exam 2026. https://www.cbse.gov.in/newsite_old/rchk.html
eBoardResults. (2025). HSC Board Challenge Result 2025. https://eboardresultsgovbd.com/hsc-board-challenge/
Ministry of Education, Government of Bangladesh. (2025). Education board regulations and examination rules 2025. Dhaka: Government Press.
OECD. (2023). Education at a glance 2023: OECD indicators. OECD Publishing.
OECD. (2022). OECD reviews of evaluation and assessment in education. OECD Publishing.
Pearson. (2023). Appeals and reviews of marking: Guide for students. Pearson Edexcel.
Prothom Alo. (2026, August 11). SSC result re-scrutiny begins: How to apply, as outlined by education boards. https://en.prothomalo.com/youth/education/vu9bivwmsv
Prothom Alo. (2025, August 15). SSC result: 12 students attempt suicide after result publication. https://www.prothomalo.com/bangladesh
RTI Foundation. (2026). RTI for CBSE / State Board re-evaluation records 2026. https://righttoinformation.wiki/rti-for-cbse-re-evaluation-records-2026
Supreme Court of India. (2011). Central Board of Secondary Education v. Aditya Bandopadhyay, (2011) 8 SCC 497.
The Business Standard. (2026, August). SSC, equivalent exam candidates can seek re-evaluation of original scripts: Minister. https://www.tbsnews.net/bangladesh/ssc-equivalent-exam-candidates-can-seek-re-evaluation-original-scripts-minister-1511386
UNESCO. (2022). Global education monitoring report 2022: Non-state actors in education. UNESCO Publishing.
UNICEF. (2023). The state of the world’s children 2023: For every child, education. UNICEF.
Viral Bangladesh. (2026). Easy board challenge process Bangladesh 2026. https://www.viralbangladesh.com/board-challenge-process/
World Bank. (2023). Bangladesh education sector review: Challenges and opportunities. World Bank Group.
লেখক পরিচিতি
মোছা: মাকছুদা খাতুন বগুড়ায় এপিবিএন পাবলিক স্কুল ও কলেজে ভূগোল বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।


