গবেষণা দক্ষতা ও উন্নয়ন

গবেষণার নৈতিকতা বা এথিক্স

গবেষণায় হাতেখড়ি
গবেষণায় হাতেখড়ি

রাগিব হাসান

(গবেষণার নৈতিকতা ব্যাপারে দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে তেমন বেশি শেখানো হয় না। ফলতঃ অনেক জায়গায় এমনকি শিক্ষকদের মাঝেও এই বিষয়ে অজ্ঞানতাপ্রসূত নানা আনএথিকাল কাজের অভিযোগ পাওয়া যায়। অথচ গবেষণার ক্ষেত্রে এথিক্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এই লেখাটিতে তাই আলোচনা করা হয়েছে। )

গবেষণার ফলাফল নিয়ে গবেষণাপত্র বা রিসার্চ পেপার লিখার সময়ে একটা ব্যাপারে খুব কড়া নজর রাখতে হবে – লেখায় ব্যবহৃত কোনো কিছু যেন অন্য জায়গা থেকে কপি করা না হয়। রিসার্চ পেপারের ক্ষেত্রে plagiarism বা কুম্ভীলকবৃত্তি তথা সহজ কথায় কপি করা একেবারেই ভয়াবহ রকমের অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়। রিসার্চের ক্ষেত্রে নানা রেফারেন্স ঘেঁটে অন্যদের কাজের কথা লিখতে হবে বটে, কিন্তু প্রতিটি বাক্য আসলে নিজের ভাষায় লিখতে হবে, আর অন্যত্র থেকে নেয়া অংশ হুবুহু কেবল তখনই দেয়া যাবে, যখন সেটা উদ্ধৃতির মধ্যে থাকবে আর মূল লেখকের নাম উল্লেখ করতে হবে। এমনকি খুব সাধারণ বাক্যের ক্ষেত্রেও সরাসরি তুলে দেয়া যাবে না, নিজের ভাষায় লিখতে হবে।

উদাহরণ দেই।

ধরা যাক, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ডঃ আবুল গরুর উপরে একটা গবেষণাপত্রে লিখেছেন,

রিসার্চের ক্ষেত্রে নানা রেফারেন্স ঘেঁটে অন্যদের কাজের কথা লিখতে হবে বটে, কিন্তু প্রতিটি বাক্য আসলে নিজের ভাষায় লিখতে হবে, আর অন্যত্র থেকে নেয়া অংশ হুবুহু কেবল তখনই দেয়া যাবে, যখন সেটা উদ্ধৃতির মধ্যে থাকবে আর মূল লেখকের নাম উল্লেখ করতে হবে।

গরুর চারটি পা আছে। গরুকে মোটাতাজা করতে হলে দিনে চারবার করে ঘাস খাওয়াতে হবে।

এখন যদি গবেষক হাবুল তার পেপারে সরাসরি একই কথা লিখে গরুকে মোটাতাজা করা নিয়ে, তাহলে সেটা হবে চুরি।

ধরা যাক, হাবুল একটু সাবধান, সে এভাবে লিখলো,

গরুর চারটি পা আছে। গরুকে মোটাতাজা করতে হলে দিনে চারবার করে ঘাস খাওয়াতে হবে। [আবুল ২০১৩]

অর্থাৎ রেফারেন্স দিলো। এটাও কিন্তু গ্রহণযোগ্য না, কারণ এখানে লেখাটা যে আসলে আবুলের, তা উল্লেখ করা হয়নি উদ্ধৃতি চিহ্নের মাধ্যমে।

তাহলে কি হাবুল কখনোই আবুলের এই সংজ্ঞাটা দিতে পারবেনা? হ্যাঁ, পারবে, এটা হাবুল দুই ভাবে দিতে পারে –

তবে এই নিজের ভাষায় লেখারো একটা ব্যাপার আছে। বাক্যের কাঠামো ঠিক রেখে কেবল দুই একটা শব্দ পাল্টালে কিন্তু সেটা লেখাচুরির দায় এড়াতে পারে না। নিজের ভাষায় লেখা মানে পুরা ধারণাটাকে নিজের মতো করে বলা, যা আসল লেখার মতো শোনাবেনা।

আবুল বলেছেন, “গরুর চারটি পা আছে। গরুকে মোটাতাজা করতে হলে দিনে চারবার করে ঘাস খাওয়াতে হবে।”। [আবুল ২০১৩]

অর্থাৎ রেফারেন্স ও উদ্ধৃতিচিহ্ন দুইটাই ব্যবহার করে।

আরো ভালো হয়, যদি হাবুল নিজের ভাষায় লিখে।

গরু একটি চতুষ্পদ প্রাণী। ঘাস খেলে গরু মোটতাজা হয়। বিজ্ঞানী আবুলের মতে কেউ যদি তাঁর গরুকে মোটাতাজা করতে চান, তাহলে হলে সেই গরুটিকে প্রতিদিন চার বার করে ঘাস খাওয়াতে হবে। [আবুল ২০১৩]।

তবে এই নিজের ভাষায় লেখারো একটা ব্যাপার আছে। বাক্যের কাঠামো ঠিক রেখে কেবল দুই একটা শব্দ পাল্টালে কিন্তু সেটা লেখাচুরির দায় এড়াতে পারে না। নিজের ভাষায় লেখা মানে পুরা ধারণাটাকে নিজের মতো করে বলা, যা আসল লেখার মতো শোনাবেনা।

Self-plagiarism এর ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। এক কুমিরের ছানাকে ৬ বার দেখানোর গল্পের মতো নিজের লেখা একের পর এক পেপারে ব্যবহার করে চলা যাবে না।

প্লেজিয়ারিজমের ফলাফল গবেষণার জগতে ভয়াবহ। আজকের এই ডিজিটাল যুগে নকল করে কেউ পার পায়না। IEEE এর ক্ষেত্রে একটা ব্ল্যাকলিস্ট আছে – কেউ এভাবে ধরা পড়লে তার নাম সেই তালিকায় ঢোকানো হয়, এবং বছর ৫-১০ বা আজীবনের জন্য সব কনফারেন্স বা জার্নাল থেকে তাকে নিষিদ্ধ করা হয়।

দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার নানা দেশে এই ব্যাপারটা খোলাসা করা হয় না, ফলে শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। কয়েকদিন আগে ভারতের এক জার্নালের এক নিবন্ধে দেখলাম আমার একটা গবেষণাপত্র থেকে দুইটা প্যারাগ্রাফ হুবুহু কপি করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে জার্নালের সম্পাদকের কাছে লিখিত অভিযোগ পেশ করা হলে সেই পেপারটি সরিয়ে নেয়া হতে পারে, এমনকি জার্নাল থেকে লেখককে নিষিদ্ধও করা হতে পারে।

প্লেজিয়ারিজমের ফলাফল গবেষণার জগতে ভয়াবহ। আজকের এই ডিজিটাল যুগে নকল করে কেউ পার পায়না। IEEE এর ক্ষেত্রে একটা ব্ল্যাকলিস্ট আছে – কেউ এভাবে ধরা পড়লে তার নাম সেই তালিকায় ঢোকানো হয়, এবং বছর ৫-১০ বা আজীবনের জন্য সব কনফারেন্স বা জার্নাল থেকে তাকে নিষিদ্ধ করা হয়।

কাজেই রিসার্চের ক্ষেত্রে নৈতিকতা মেনে চলুন। কারো লেখা যথাযথ রেফারেন্স বা সাইটেশন সহ ব্যবহার করুন। আর আরেকটা ব্যাপার হলো, কোনো পেপারে কারো অবদান থাকলে তা স্বীকার করুন। অল্প অবদান থাকলে কৃতজ্ঞতা স্বীকার অংশে বলুন, আর অবদান ভালো হলে সহ-লেখক হিসাবে পেপারে তার নাম দিন। রিসার্চের ক্ষেত্রে এই রকমের এথিক্স বা নৈতিকতা বজায় রাখার একেবারেই কোনো বিকল্প নাই।

(মূল লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে লেখক রাগিব হাসানের “গবেষণায় হাতেখড়ি” বইতে, প্রকাশক আদর্শ প্রকাশনী। লেখকের অনুমতিক্রমে এখানে পুনঃপ্রকাশিত। বানানরীতি লেখকের নিজস্ব।)

রাগিব হাসান: সহযোগী অধ্যাপক, দি ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহাম, যুক্তরাষ্ট্র।

লেখাটি কতোটুকু পছন্দ হয়েছে?

Leave a Comment