২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পর থেকে এ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা যেন পিছু ছাড়ছে না। আর এর পেছনে যৌক্তিক কারণও রয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রমে থাকা নানা বিষয় নিয়ে যতো আলোচনা হচ্ছিলো, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলোচনা হলো পাবলিক পরীক্ষা কীভাবে গ্রহণ করা হবে, তার স্বরূপ কী হবে এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতীকের মাধ্যমে যে মূল্যায়ন, সেটি কীভাবে অ্যাডজাস্ট করা হবে।

প্রথমেই বলা প্রয়োজন যে, নতুন শিক্ষাক্রমে এতো বিশাল পরিবর্তন যেখানে করা হলো, সেখানে পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে কর্তৃপক্ষ খুব একটা চিন্তা যে করেননি, সেটি কিন্তু বার বার প্রকাশ পাচ্ছে। সচেতন অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বিষয়টি বার বার তুলছেন বিভিন্ন ফোরামে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমরা একটি কথা শুনে আসছি যে, নতুন শিক্ষাক্রমে আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত পরীক্ষা হবে না, সেটির মাধ্যমে যে মূল্যায়ন সেটি সঠিক নয়।

লিখিত পরীক্ষা হলেই বাজারে নোট-গাইডের ব্যবসা শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত পরীক্ষা না থাকায় নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করছে না। শিক্ষার্থীরা কোনো বাধ্যবাধকতার মধ্যে নেই। একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মাইল্ড বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকতে হয়। পরীক্ষা বা পড়াশুনার অত্যাধিক চাপ নয়, তবে এক ধরনের তাগিদের মধ্যে থাকতে হয়। কারণ, এই বয়সে নিজেরা এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য উপযুক্ত নয়।

তাছাড়া প্রতিযোগিতা যাতে অসুস্থতা সৃষ্টি না করে, সেটিকে কীভাবে পরিমার্জন করে সুস্থ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যায়, নতুন শিক্ষাক্রমে সেটি নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন ছিলো। 

আমরা যারা শিক্ষা নিয়ে মাঠে কাজ করি, শিক্ষাবিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করি, তারা কিন্তু বারবার বলে আসছি নতুন শিক্ষাক্রমে লিখিতভাবে খুবই ভালো কিছু বিষয় রয়েছে, কিন্তু বাস্তবের সাথে এর মিল অনেক কম। এই শিক্ষাক্রমকে অর্থবহ করতে হলে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ লিখিত পরীক্ষা থাকতেই হবে।

আমরা যতোই বলি, নতুন শিক্ষাক্রমের সাথে সংশ্লিষ্টরা ততোই শক্ত অবস্থানে চলে যাচ্ছিলেন যে, লিখিত পরীক্ষা মানে মুখস্থ, লিখিত পরীক্ষা মানে প্রাইভেট পড়া, লিখিত পরীক্ষা মানে নোট-গাইডের ব্যবসা। কোনোটিই কিন্তু থেমে নেই, শুধু থেমে গেছে শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহ, বইপড়া আর বিদ্যালয়ের প্রতি আকর্ষণ। এমনটি হয়েছে যে, বহু শিক্ষার্থী কোনো ধরনের বই দেখে পড়তে পারছে না, এটি আমি নিজে ঘুরে ঘুরে দেখেছি, দক্ষতা আর যোগ্যতা অর্জন তো দূরের কথা।

নতুন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী দায়িত্ব নেয়ার পর বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। তিনি নতুন শিক্ষাক্রমে মূল্যায়নসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে একাধিক সভা করেছেন এনসিটিবি কর্মকর্তাদের সাথে। শিক্ষাবিদ, অভিভাবকসহ বিভিন্ন মহলের উদ্বেগ, অসন্তোষ এবং লিখিত পরীক্ষা যুক্ত করার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই তিনি নতুন শিক্ষাক্রমে মূল্যায়নপদ্ধতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

গত ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, শিক্ষাবর্ষ মাত্র শুরু হয়েছে। ধারাবাহিক মূল্যায়নের কাজগুলোও শুরু হয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রমে কাজ করতে গিয়ে যদি কোনো সমস্যা মনে হয়, তাহলে পরিবর্তন অবশ্যই আসবে। গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে শিক্ষামন্ত্রী এনসিটিবি এবং শিক্ষা কারিকুলামের সঙ্গে যুক্ত কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তিদের নিয়ে বৈঠক করে তিনি মূল্যায়ন পদ্ধতির বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে চান।

একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে জন-অসন্তোষ নিরসনে তা যাচাই-বাছাইয়ের পরামর্শ দেন। এরপরই ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যায়নপদ্ধতি ও শিক্ষাক্রম নিয়ে ১৪ সদস্যবিশিষ্ট সমন্বয় কমিটি গঠনের কথা জানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন কমিটি একটি সুপারিশ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে, যোগ্যতা ও কার্যক্রমভিত্তিক মূল্যায়নের পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা রাখতে হবে এবং এই দুই অংশের মধ্যে আন্তসম্পর্ক বজায় রাখতে বলেছে।

তবে, নতুন শিক্ষাক্রমে বই যেভাবে তৈরি করা হয়েছে, তাতে কতোটা সেটি সম্ভব হবে সেটি একটি প্রশ্ন। হাতে-কলমে যে মূল্যায়ন হবে, তার ওয়েটেজ বা গড় ভারিত্ব হবে ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে লিখিত অংশের ওয়েটেজ হবে ৫০ শতাংশ। চূড়ান্ত মূল্যায়নে সনদ/ট্রান্সক্রিপ্টের ৭ পর্যায়ের স্কেলে যোগ্যতা ও পারদশির্তার সূচক অভিভাবক ও অংশীজনের অবহিত করারও সুপারিশ করেছে কমিটি।

এই সাত পর্যায়ের স্কেল সম্পর্কে বিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক পুরোপুরি অন্ধকারে। কবে সবগুলো আলোর মতো স্পষ্ট হবে, সেই আশায়ই সংশ্লিষ্টরা বসে আছেন। ৫০ শতাংশ লিখিত পরীক্ষার কথা বলা হলো ২৬ মার্চ ২০২৪, এপ্রিলেও একই কথা চলছে। কিন্তু ১৪ মে ২০২৪ বাংলাদেশের প্রায় সমস্ত পত্রিকায় দেখলাম, ১৩ মে সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে এক সভায় পাবলিক পরীক্ষায় মূল্যায়ন  নিয়ে আলোচনা ও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয় যে, নতুন শিক্ষাক্রমে এসএসসি পরীক্ষার সামষ্টিক মূল্যায়নের লিখিত অংশের ওয়েটেজ হতে যাচ্ছে ৬৫ শতাংশ। আর কার্যক্রমভিত্তিক অংশের ওয়েটেজ হবে ৩৫শতাংশ।

কার্যক্রম বলতে বোঝানো হচ্ছে, অ্যাসইনমেন্ট করা, উপস্থাপন, অনুসন্ধান, প্রদর্শন, সমস্যার সমাধান করা, পরিকল্পনা প্রণয়ন ইত্যাদি। আরও সহজ করে বললে হাতে-কলমে কাজ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও এনসিটিবির কর্মকর্তাগণ। মাননীয় কর্মকর্তাদের নিকট সবিনয় জানতে চাই যে, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণ নতুন শিক্ষাক্রমে আসলে কোন পদ্ধতিটি অবলম্বন করবেন, তাদের কি আসলেই বিভ্রান্ত হওয়ার কথা নয়? 

ঘটনা এখানেই শেষ নয়, এই ৬৫ শতাংশ পরীক্ষার মার্কিং কীরকম হবে। সেটি কি মার্কিংই থাকবে, নাকি গ্রেডিং হবে, নাকি নম্বর সিম্বলে রূপান্তরিত করা হবে? এ আলোচনা কিন্তু দেখলাম সেখানে অনুপস্থিত। আবার এই নিয়ে কথা হবে, কয়েক মাস কেটে যাবে তখন সংশ্লিষ্টরা আবার কিছু খসড়া সিদ্ধান্ত নেবেন। এভাবে সময় তো বসে থাকছে না।

বিদ্যালয়গুলোর ও শ্রেণিকক্ষগুলোর বাস্তব অবস্থা জানার জন্য আপনারা একটু গোপনে গিয়ে যদি দেখেন, তাহলে দেখতে পাবেন, নতুন শিক্ষাক্রমে পড়াশুনার আসলে কী হাল হয়েছে। অনেকে বলছেন যে, এগুলো তো কোন সিদ্ধান্ত নয়, শুধু সময় ক্ষেপণ!

যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম চালুর পর এ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের যেসব আলোচনা, তার সবই লিখিতভাবে অর্থাৎ থিওরিটিক্যালি পজিটিভ, ভীষণ ইতিবাচক। যেসব কথা পরিকল্পনায় যেভাবে লেখা আছে সেগুলো অবশ্যই সুন্দর, সেটি নিয়ে আমরা কতোটা আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে পারি? 

আমরা বলছি বাস্তব কথা নিয়ে। নতুন শিক্ষাক্রমে লিখিত কোনো পরীক্ষাই তারা রাখবেন না। পাবলিক পরীক্ষা কীভাবে হবে, সেটি নিয়ে যে শিক্ষাক্রম বা ব্যবস্থায় চিন্তা করা হয় না, সেটি যে কতো গলদে ভর্তি তার প্রমাণ আমরা বার বার পাচ্ছি।

এখন তাঁরা বলছেন, নতুন শিক্ষাক্রমে এক ঘণ্টার একটি লিখিত পরীক্ষা নেয়া হবে। তবে, বার বার নিজেদের স্থানটি ধরে রাখার জন্য বলছেন যে, সেটি আগের পরীক্ষার মতো হবে না। তারা যতোগুলো কথা বলতেন, তার মধ্যে একটি ছিল পরীক্ষার কোনো টেনশন শিক্ষার্থীদের মধ্যে থাকবে না।

পুরনো শিক্ষাক্রম অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের তিন ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিতে হতো। অর্থাৎ দশটি বিষয় হলে একজন শিক্ষার্থীকে ত্রিশ ঘণ্টার পরীক্ষা দিতে হতো। নতুন শিক্ষাক্রমে এখন দিতে হবে পঞ্চাশ ঘন্টার অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের পাঁচ ঘণ্টারপরীক্ষা দিতে হবে।

শিক্ষার্থীরা যখন এসএসসি পরীক্ষার সেন্টারে যাবে, তাদের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেন্টারে থাকতে হবে। এই দীর্ঘ সময় তারা কী খাবে? কোথায় খাবে? এ চিন্তা কিন্ত কর্তৃপক্ষ এখনও করেননি।

আমার সাথে দু’একজনের কথা হয়েছে। আমি যখন এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছি, তখন হালকা করে বলা হলো, খাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এতগুলো শিক্ষার্থীর খাবার আয়োজন কে করবে, কীভাবে করা হবে? মূল্যায়নের পরিবর্তে শত শত শিক্ষার্থীর খাওয়ার পেছনে যে আয়োজন ও সময় নষ্ট হবে সেটি হতে পারে পিকনিক, কোনো মূল্যায়ন নয়।

শুধু তাই নয়, এত শত শত কিংবা হাজার হাজার শিক্ষার্থীরা পাঁচ ঘণ্টা ধরে এক্সপেরিমেন্ট করবে, পরীক্ষা দিবে, তাদের সুপারভাইজ করার মতো এতো জনবল কি ওই সেন্টারের আছে?

বিষয়টি কিন্তু আরও এক জায়গায় ধোঁয়াশা রাখা হলো। পরীক্ষা কি সেন্টারে হবে না পার্শ্ববর্তী কোনো বিদ্যালয়ে হবে? বোর্ডের পরীক্ষা নিতে হবে, লিখিত পরীক্ষা নিতে হবে, এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে  কর্তৃপক্ষের এমন উত্তর। আমরা কিন্তু এখনও স্পষ্ট করে বুঝতে পারছি না যে, পাবলিক পরীক্ষা আসলে কোথায় হবে এবং কীভাবে হবে।

প্রথম বলা হলো, পাশের বিদ্যালয়ে পাবলিক পরীক্ষা হবে। পাশের বিদ্যালয়ে পরীক্ষা হওয়া মানে সেটি কোনো মূল্যায়ন নয়। দুই বিদ্যালয়ের মধ্যে যদি রেষারেষি থাকে, শত্রুতা থাকে, তাহলে মূল্যায়ন একরকম হবে। আবার যদি মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যন্ডিংয়ের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়, সেটিও কোনো মূল্যায়ন হবে না। বিষয়টি কিন্তু স্পষ্ট করা হয়নি।

আবার যখন আলোচনা হলো, তখন বলা হচ্ছে, পরীক্ষা হবে সেন্টারে। একটি সেন্টারে পরীক্ষার্থী থাকে কয়েক হাজার। প্রতিটি পরীক্ষার্থী যদি ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত পরীক্ষা দেয়, তাহলে সেটি মূল্যায়ন করা বা পর্যবেক্ষণ করার জন্য এত শিক্ষক কোথায় পাওয়া যাবে? এ চিন্তাও কিন্তু তারা করেনি।

প্রথম বলা হলো, বিদ্যালয় সবকিছু করবে। তারপর শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে বোর্ডগুলোর ভূমিকা কী হবে— এসব প্রশ্ন ওঠার পরে তারা বলছেন বোর্ড থেকেই প্রশ্নপত্র তৈরি করা হবে। আবার সাথে সাথে বলা হচ্ছে, পরীক্ষা আগের মতো হবে না। পুরো বিষয়টিতে কিন্তু গোলমাল লেগে আছে। যখনই তাদের প্রশ্ন করা হয়, তখন তারা সাথে সাথে একটি উত্তর দিয়ে দেন, তারা কিন্তু পরিকল্পনা প্রকাশ করার সময় সেগুলো বলছেন না। অর্থাৎ, এগুলো তাদের চিন্তায় আছে কি না সেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। 

প্রথম বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিকে ধাপে ধাপে কার্যক্রমভিত্তিক অংশের ওয়েটেজ বাড়ানো হবে। লিখিত অংশের প্রশ্নপত্র হবে কার্যক্রমের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল রেখে। অর্থাৎ প্রশ্ন হবে দুই অংশের মধ্যে আন্তসম্পর্ক বজায় রেখে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এখন এনসিটিবি দ্রুত আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষ করলে এটিকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পূর্বনির্ধারিত জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভায় তোলা হবে।

ওই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী লিখিত ও কার্যক্রমভিত্তিক মূল্যায়ন মিলিয়ে সময়টি পাঁচ ঘণ্টাই রাখা হয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী দশম শ্রেণি শেষে যে পাবলিক পরীক্ষা হবে, সেটির নাম এখনকার মতো মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষাই রাখা হচেছ। তারা কিন্তু পরীক্ষার নামসহ সবই উল্টে দিতে চাচ্ছিলেন। এবং বাস্তবতার কথা অনেকক্ষেত্রে চিন্তা না করে অনেককিছু বলেই যাচ্ছেন, বিদ্যালয় ও শিক্ষার করুণ দশার কথা কিন্তু চিন্তা করছেন না।

আমরা জানি, দশম শ্রেণি শেষে যে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, সেটির নাম ১৯৬২ সাল থেকেই মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষা নামে পরিচিত। শিক্ষাক্রম-সংশ্লিষ্টরা নিজেদের জায়গাটি ঠিক রাখার জন্য বলেই যাচ্ছেন, শিক্ষার্থীদের অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক মূল্যায়নের ধরন এখনকার মতো থাকছে না।

নতুন শিক্ষাক্রমে মূল্যায়ন কীভাবে থাকছে তাও ঠিকমতো বলছেন না। যা বলছেন তার অনেক কিছুই বাস্তবের সাথে মিল নেই। দেশের প্রেক্ষাপটের সাথে মিল নেই। আর লক্ষ লক্ষ শিক্ষক তো বুঝতেই পারছেন না, তারা তালগোল পাকিয়ে বসে আছেন।

আন্তর্জাতিক পরীক্ষা ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেলে’ লিখিত পরীক্ষা আছে। পিসায় লিখিত পরীক্ষা আছে। আন্তর্জাতিক অন্যান্য পরীক্ষা যেমন আইইএলটিস এগুলোর সবকিছুর উপরে ওঠে আমাদের শিক্ষাক্রম-সংশ্লিষ্টরা বলেই যাচ্ছেন, ওগুলো কোনো পরীক্ষাই নয়, ওগুলো শুধু ব্যবসা।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন শিক্ষাক্রমে মাধ্যমিক পরীক্ষা হওয়ার কথা। কিন্তু নতুন শিক্ষাক্রমে লিখিত পরীক্ষা না থাকায় সেটি কোন পদ্ধতিতে হবে, তার কাঠামো এখনো ঠিক না হওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বুঝতে উঠতে পারছেন না। পরীক্ষা পদ্ধতি ঠিক না হওয়ায় দশম শ্রেণির পাঠ্যবই লেখার কাজও আটকে আছে।

অথচ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এই শ্রেণির শিক্ষার্থীরা নতুন শিক্ষাক্রমে নতুন পাঠ্যবইয়ে পড়াশুনা করবে। সেটিও দেখছি, খুব তাড়াহুড়ো করে করতে হবে। তাড়াহুড়ো করা মানে ভুলের ছড়াছড়ি। এখানে ভালো বা মন্দ নিয়ে কথা নয়, কথা হচ্ছে আমরা হঠাৎ করে পূর্বের শিক্ষাক্রমের পুরোটাই পরিবর্তন কেন করলাম? আমরা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ তৈরি করছিলাম না? শিক্ষার্থীরা বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাচ্ছিলেন না? হঠাৎ করে কেন সমস্ত বিল্ডিং ভেঙ্গে দিয়ে নতুন ডিজাইনের বিল্ডিং করতে নেমে গেলাম?

সব বিল্ডিং ভেঙ্গে দিয়ে নতুন বিল্ডিং সেগুলোর চেয়ে অনেক অনেক ভালো হবে, সেটি নিজেরাই অনুমান করে নিজেরাই এর প্রচারে নেমে গেলাম। কিন্তু একটি পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টাও না করে নতুন বিল্ডিং হওয়ার অপেক্ষায় সবাইকে রেখে দিলাম। পূর্ববর্তী শিক্ষাক্রমে আমাদের প্রয়োজন ছিলো প্রশ্নপত্রের ধরন পরিবর্তন করা, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজ থেকে লিখে ফললাভ করে।

আরেকটি দরকার ছিলো, প্রাকটিক্যাল কিছু বিষয় যেগুলো একুশ শতকের স্কিলসের সাথে যায় সে ধরনের কিছু চালু করা। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো শিক্ষকদের প্রণোদনা বাড়ানো, বেতন ভাতা বাড়ানোর দিকে জোর দেয়া এবং যারা ইতিমধ্যে শিক্ষকতায় আছেন, তাদের অ্যাকাডেমিক ও পেডাগজিক্যাল দিকগুলো প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পড়াশুনা করানোর মাধ্যমে উন্নত করার।

আর শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হচ্ছে (যেমন, এনটিআরসি-এর মাধ্যমে নিয়োগ) সেগুলো প্রশংসীয় এবং ধীরে ধীরে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে মজা পায় না, সেজন্য শুধু শিক্ষকরাই দায়ী নন। এসব জায়গায় কাজ করার দরকার ছিলো। এগুলোকে পাশ কাটিয়ে হঠাৎ করে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে এলাম।

যারা নতুন শিক্ষাক্রমে এগুলো বাস্তবায়ন করবেন, যাদের ওপর এগুলো প্রয়োগ করা হবে, তাদের প্রকৃত অবস্থা ঢাকঢোল না পিটিয়ে গভীরভাবে ও নিরপেক্ষভাবে জানার এবং অবলোকন করার দরকার ছিলো। কর্তৃপক্ষ সেদিকে যায়নি। আমরা দেখতে পাচ্ছি, তারা বিষয়টি যেহেতু চালু করেছেন, যেকোনো মূল্যে তার বাস্তবায়ন করতেই হবে। তাতে শিক্ষার্থীদের অবস্থা আর শিক্ষার অবস্থা যাই হোক!

এর ভালো দিকগুলো তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। নতুন শিক্ষাক্রমে সব বিষয়কে তো আমরা খারাপ বলতে পারি না। আমাদের দেখতে হবে অনুমিত সিদ্ধান্ত এবং সেগুলোর কথা চিন্তা করেই আত্মতৃপ্তি লাভ করার মধ্যে ঢুকে যাওয়ার বিষয়টি। ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত একটি শ্রেণিতে তিন-চার পাঁচজন শিক্ষার্থী পড়তে পারে, পড়ে, লিখে, ক্লাসের কাজ করে। বাকিরা তো শ্রেণি অনুযায়ী অনেক পেছনে পড়ে আছে। তাদের প্রয়োজন রেমিডিয়াল ক্লাস, বহু ব্যাকক্লাস। 

এ বছর যারা নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে, তারাই ২০২৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেবে। তারা এই শিক্ষাক্রমে পড়ে কী অর্জন করতে যাচ্ছে? একটি বিষয় বার বার অনুশীলনের মাধ্যমে কিছু অর্জন করা যায়। কিন্তু, সেই অনুশীলন তো হচ্ছে না!

লিখিত পরীক্ষা না থাকায় নতুন শিক্ষাক্রমে থাকা এই বিষয়টি সমালোচনার মুখে পড়ে। অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। কিন্তু তাদের প্রতিবাদে শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তারা অদ্ভুতভাবে নীরব থাকেন। ফলে শিক্ষাক্রম নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। অথচ নতুন শিক্ষাক্রমে মূল্যায়ন আছে, পাস-ফেল আছে, প্রতিদিনের পাঠদান আছে, পাঠের পূর্বপ্রস্ততি আছে, আবার শিক্ষককেও ফলাফল দিতে হয়।

অর্থাৎ ঠিক নিয়ম মেনে সন্তানকে পড়িয়ে বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে অভিভাবকদের। সব মিলিয়ে অভিভাবকরা সন্তানের পড়াশোনা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে পারবেন। মোটকথা, শিক্ষাক্রম নিয়ে সবার ইতিবাচক ভূমিকা তৈরি হবে।

কিন্তু হয়েছে ঠিক উল্টো। অর্থাৎ, মূল্যায়ন নিয়ে নতুন শিক্ষাক্রমে কী আছে তা নিয়ে তালগোল পাকিয়ে আছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও বিদ্যালয় এখনও অষ্পষ্টতা, ধোঁয়াশা ও অনুমাননির্ভর অনেক কিছুই করছে।

নতুন শিক্ষাক্রমে মূল্যায়নের জন্য আটটি উপকরণ রাখার সিদ্ধান্ত ছিল, যেমন— কুইজ, প্রতিবেদন, উপস্থাপন, প্রশ্নোত্তর, ব্যবহারিক, স্বমূল্যায়ন, সহপাঠী মূল্যায়ন ও প্রতিবেশি মূল্যায়ন। অর্থাৎ প্রশ্নোত্তর পর্বের নাম দিয়ে লিখিত পরীক্ষাও ছিল।

কিন্তু গত দুই বছরে কিছু অতি উৎসাহী কর্মকর্তা সাবেক শিক্ষামন্ত্রীকে খুশি রাখতে গিয়ে মূল্যায়নের আটটি অংশের মধ্যেই মাত্র কুইজ, প্রতিবেদন ও উপস্থাপন রেখে বাকি পাঁচটিকেই বাদ দিয়ে দেন। এর ফলে মূল্যায়ন থেকে হাতে-কলমের পরীক্ষা বাদ পড়ে।

কিছু জাতীয় দৈনিকে দেখলাম, সাংবাদিকগণ বলছেন, এনসিটিবির একজন কর্তাব্যক্তির প্রশ্ন শুনে হতবাক শিক্ষাবোর্ডে কর্মরত ও পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা। হতবাক হওয়ারই কথা। আমরা ফুটবল খেলা দেখি। সেখানে প্রতিযোগিতা আছে, ক্রিকেট দেখি সেখানে প্রতিযোগিতা আছে। এভাবে সব কাজেই প্রতিযোগিতা আছে।

কিন্তু নতুন শিক্ষাক্রমে আমরা বলছি শিক্ষার্থীরা কোনো প্রতিযোগিতা করবে না। একজন খেলোয়াড় যদি জানে যে, তাকে কোনো গোল করতে হবে না, তাহলে সে কতক্ষন খেলবে? সেই দশা হয়েছে আমাদের শিক্ষার্থীদের। বইয়ে বলা হয়েছে তারা আনন্দচিত্তে সারাদিন বইয়ের কাজ করবে কিন্তু পরীক্ষার চাপ তাদের সইতে হবে না।

একটি বিষয়কে বারবার অনুশীলন করতে হয় বিভিন্নভাবে, লিখে, পড়ে, আলোচনা, উপস্থাপনা, রিপোর্ট রাইর্টং ইত্যাদি করে। কিন্তু এখন যেটি হয়েছে, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে অনুশীলন করার সময় পাচ্ছে খুবই কম। একজন শিক্ষককে বিশেষ করে বড় ক্লাসে ডিসিপ্লিন মেনটেইন করতেই সময় চলে যায়, কখন তিনি শিক্ষার্থীদের দিকে ব্যক্তিগতভাবে খেয়াল রাখবেন?

এখানে আরেকটি কথা হচ্ছে, শিক্ষকদের নিজস্ব মূল্যায়ন এক বিদ্যালয় থেকে অন্য বিদ্যালয় শহর থেকে গ্রাম, ছোট শহর থেকে বড় শহর, ভালো প্রতিষ্ঠান থেকে অপেক্ষাকৃত কম মানের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মূল্যায়ন কখনোই এক হবে না। আর এটি হবে না বলেই একটি জাতীয় মানদণ্ড থাকতে হয়। বর্তমান শিক্ষাক্রমে যে বিশাল গ্যাপটি রয়েছে, তার বহু প্রমাণের মধ্যে এটি একটি বড় প্রমাণ।

এনসিটিবি থেকে বলা হচ্ছে গতবার অর্থাৎ ২০২৩ সালে আমরা পরীক্ষা নিয়েছি তিন দিনে, নাম ছিলো অ্যাসেসমেন্ট উৎসব। শিক্ষার্থীরা প্রথম দিন ইনস্ট্রাকশন পেয়েছে, দ্বিতীয় দিন ডেটা প্রসেস করেছে, তৃতীয় দিন চূড়ান্ত ফলাফল দিয়েছে।

তিনটি ভাগে কাজটি করেছে। প্রতিদিন ক্লাস রুটিন অনুযায়ী সেগুলে হয়েছে। তবে, পরে আমরা জানতে পারি, একদিনে একাধিক বিষয়ের কাজ করা বেশ কঠিন হয়। তাই এখন আমরা বলেছি, একদিনে একটি বিষয় নিয়ে কাজ হবে। সেদিন আর অন্য বিষয়ে কাজ হবে না। তার মানে হচ্ছে, এটিও বিনা পরিকল্পনায় হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের ওপর শুধু পরীক্ষা-নিরীক্ষাই চালানো হচ্ছে।

নতুন শিক্ষাক্রমে নতুন মূল্যায়ন প্রস্তাবে শিক্ষার্থীদের একটি এক্সপেরিমেন্ট দেয়া হবে। শিক্ষার্থীরা সকাল দশটায় সেটি শুরু করবে। শেষ সময়ে এক ঘণ্টা বা বিষয় অনুযায়ী সোয়া ঘণ্টার একটি লিখিত অংশ থাকবে। বাকি সময় তারা কাজের মধ্যে যাবে। বিষয়টি আগের মতো তিন ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষা দেয়ার মতো নয়।

আরও বলা হয়, বিদ্যালয় যেভাবে মূল্যায়ন করে, সেভাবেই করবে। পাবলিক পরীক্ষায় বাইরের মূল্যায়নকারী অর্থাৎ অন্য স্কুলের শিক্ষক থাকবেন। ২০২৩ সালে ফাইনাল পরীক্ষা যেভাবে হয়েছে, আগামীতে সেভাবেই হবে এবং অবজারভেশন চেকলিস্ট অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে, তারপর তার একটি লিখিত রূপ জমা দেবে।

পাবলিক পরীক্ষা হবে অন্য কেন্দ্রে আর চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণির এই পরীক্ষা হবে নিজ নিজ স্কুলে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর পাঁচ ঘণ্টায় ছয়টি সেশন হবে। চার ঘণ্টা ব্যবহারিক। প্রথমে ওরিয়েন্টেশন দেয়া হবে। এই সেশনে একজন শিক্ষার্থীর দলগতভাবে কাজ করতে হবে। আবার প্রত্যেককে এককভাবে ব্যবহারিক কাজ করতে হবে। মূল্যায়নকারী বা শিক্ষকদের কাছে তাদের পারদর্শিতা দেখাতে হবে।

শেষ এক ঘণ্টা তত্ত্বীয় পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত হবে। তত্ত্বীয় পরীক্ষার উত্তরপত্র মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট এবং উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষার মতো পাবলিক পরীক্ষার মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট বোর্ডে পাঠানো হবে। এ বিষয় দুটোও কিন্তু প্রথমে বলা হয়নি। সাংবাদিকগণ প্রশ্ন করার পর অর্থাৎ বোর্ডের কী কাজ কিংবা বোর্ড থেকে প্রশ্নপত্র তৈরি করা না হলে স্ট্যান্ডার্ড রক্ষা করা যাবে না ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন করার পর তখন কর্তৃপক্ষ বোর্ডের কাজের কথা এভাবে ব্যাখ্যা করেছে।

নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে মার্কিং (চিহ্নিত) করার নিয়ম থাকবে না। রিপোর্ট ‘ভালো’, ‘অর্জনের পথে’ এবং ‘প্রাথমিক পর্যায়’ এমন তিন ভাগে ফলাফল হবে। চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মিডটার্ম ও ফাইনাল পরীক্ষা হবে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হবে চূড়ান্ত পরীক্ষার মাধ্যমে।

খসড়া অনুযায়ী মিডটার্ম ও বার্ষিক পরীক্ষায় সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে। ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হবে অন্য কেন্দ্রে। আর চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণির পরীক্ষা হবে নিজ বিদ্যালয়ে। ২০২৪ সালে জুন থেকে এ প্রক্রিয়ায় মূল্যায়ন হবে বিদ্যালয়ে। এসব উত্তর যখন সাংবাদিকগণ জিজ্ঞেস করেন, তখন শোনা যায় অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত কিন্তু বিদ্যালয় বা শিক্ষকগণ পাচ্ছেন না।

শিক্ষাক্রম-সংশ্লিষ্টরা এখন বলছেন, নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী এসএসসি পরীক্ষার মূল্যায়নে হাতে-কলমে কাজের পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষাও থাকছে। তবে লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও উত্তর দেওয়ার ধরন মুখস্থনির্ভর হবে না। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাক্রম অনুযায়ী যেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করবে, সেগুলো মূলত সৃজনশীল উপায়ে লিখতে হবে।

এটি আবার নতুন কী? আমরা তো তাই বলে আসছিলাম যে, শিক্ষার্থীরা যাতে না বুঝে শুধু মুখস্থ করে পাস না করে পরীক্ষায় সেই পদ্ধতিই থাকা প্রয়োজন। আর শিক্ষাক্রম-সংশ্লিষ্টরা বলে আসছিলেন, লিখিত কোনো পরীক্ষা থাকবে না, কারণ সেটি হলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মূল্যায়ন নাকি হয় না। তাঁরা বলছেন, বিভিন্ন শ্রেণিতে বছরজুড়ে শিখনকালীন মূল্যায়ন থাকবে। এর পাশাপাশি বছরে দুটি সামগ্রিক মূল্যায়ন হবে। অধিকাংশ শিক্ষক এবং বিদ্যালয় কিন্তু এখনও এই দুই মূল্যায়নের মধ্যে প্রকৃত তফাৎ বুঝতে পারছেন না।

সবশেষে বলা যায় যে, বর্তমান শিক্ষাক্রমটি আদর্শিক, অতি আদর্শিক। আমাদের বর্তমান যে শিক্ষার প্রেক্ষাপট, সেটির আলোকে এটি মানানসই তো নয়ই, বরং অবাস্তব।

চারদিকে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। বখাটে স্কুল শিক্ষার্থী, স্কুল পালানো, স্কুল ছেড়ে দেয়া ছেলেপেলেরাই কিশোর গ্যাংয়ের নামে পুরো সমাজকে গিলে খাচ্ছে। তারা তো এই সমাজেরই বাসিন্দা। তারা চারদিকে যা দেখছে তাই শিখছে। শিক্ষকদের অবস্থান দুর্বল করতে করতে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে যে, তারা এখন একটি শ্রেণিকক্ষই সামাল দিতে পারছেন না।

শিক্ষার্থীরা পড়তে চায় না, পড়তে পারে না, লিখতে চায় না, লিখতে পারে না। পড়া দিলে, কোনো কাজ করতে দিলে করতে চায় না। বিদ্যালয় ও শিক্ষক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভয়ে থাকেন, কারণ তাদের ইচ্ছে অনুযায়ীই স্কুল চলে। এই অবস্থায় শিক্ষার্থীরা পাস করছে, ক্লাস পার করছে, বিদ্যালয় পার করছে, মহাবিদ্যালয় পার করছে কিন্তু শিখছে না বিষয়, শিখছে না কোনো আদব-কায়দা, নিয়ম-কানুন।

এই পুরো বিশৃঙ্খল অবস্থাকে কীভাবে কিছুট নিয়মকানুনের মধ্যে, কিছুটা রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধ্যকতার মাধ্যে আনা যায়, সেসব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা এবং কাজ করার খুবই প্রয়োজন। এসবের কথা চিন্তা না করে বিশাল এক শিক্ষাক্রম এনে হাজির করেছি। কারা সেটি বাস্তবায়ন করবেন, কাদের ওপর বাস্তবায়ন করা হবে এবং কীভাবে করা হবে, সেসব বিষয় একটুও আমরা ভাবিনি। এসব বিষয় চিন্তা করে কিছু করা হলে শিক্ষকগণ একটি বিষয় শেখানোর জন্য যে প্রচুর অনুশীলন প্রয়োজন, সেই অনুশীলন কিছুটা হলেও করাতে পারতেন।

বর্তমান শিক্ষাক্রম এসে শিক্ষার্থীদের আরও অপার স্বাধীনতা দিলো— কিছুই করতে হবে না, কিছুই পড়তে হবে না শুধু ক্লাস ডিঙ্গাতে হবে। নিজে কিছু লিখে প্রকাশ করার দরকার নেই। কোনোকিছু পারার দরকার নেই। একজন শিক্ষক তাকে যেভাবে মূল্যায়ন করবেন, সেটিই তার আসল মূল্যায়ন।

শিক্ষাক্রমে যা যা লেখা আছে তার অধিকাংশই আদর্শিক কথা, অধিকাংশই ইউটোপিয়ান আইডিয়া।

Sending
User Review
0 (0 votes)

লেখক সম্পর্কে

মাছুম বিল্লাহ

মাছুম বিল্লাহ

মাছুম বিল্লাহ ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত রয়েছেন। তিনি সাবেক ক্যাডেট কলেজ, রাজউক কলেজ ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বর্তমানে তিনি ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মন্তব্য লিখুন