বই

ফ্রান্সিসকো গার্দিয়া ফেরার: আধুনিক বিদ্যালয়ের ধারণা, চর্চা ও বিবর্তন – পর্ব ১

ফ্রান্সিসকো গার্দিয়া ফেরার
ফ্রান্সিসকো গার্দিয়া ফেরার

ফ্রান্সিসকো গার্দিয়া ফেরার লিখেছিলেন The Origin and Ideals of the Modern School বইটি। ইন্টারনেট থেকে বইটি ডাউনলোড করার পর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ছিলো— ফেরার বইটিতে যা যা লিখেছেন, সেগুলোকে কেন্দ্র করে আলোচনা এগিয়ে নেয়া। যেকোনো বই নিয়ে আলোচনা করতে হলে প্রথমে পুরো বইটি পড়ে শেষ করতে হয়।

বইটি প্রথমবার শেষ করার পর সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হলো, কারণ প্রাথমিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে বর্তমান আলোচনার কলেবর বইয়ের চেয়েও বড় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। অপরদিকে, ফেরারের এই আধুনিক বিদ্যালয়ের (modern school) মূল বৈশিষ্ট্যসমূহই যদি আলোচনার একমাত্র বিষয়বস্তু হয়, তাহলে কোন পরিপ্রেক্ষিতে এবং কেন এ-ধরনের বিদ্যালয় বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছিল, তা উহ্য থাকার সংশয় থাকে। সম্ভাবনা থাকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফেরারের চিন্তা ও দর্শনকে না মেলানোরও। ইতোমধ্যে ফেরারের ব্যক্তিগত জীবন ও কর্ম সম্পর্কে অন্তর্জালের মাধ্যমে কিছুটা জানার সুযোগ হয়। তাতে মনে হয়, ফেরারের ব্যক্তি ও কর্মজীবনের ঘটনাদির সঙ্গে বইটির সংযোগ না ঘটালে একদিকে যেমন তাঁর প্রতি অন্যায় করা হবে, তেমনি বইটির বিষয়বস্তুর দার্শনিক দিকটিও উপেক্ষিত হবে।

এরকম পরিসরে এক লেখাতে সবকিছু তুলে আনা কঠিন; বিশেষত বক্তব্য প্রকাশে যদি লেখকের সীমাবদ্ধতা থাকে। তাছাড়া কোনো পাঠকই কি লেখকের পুরো কাজের শতভাগ বুঝতে পারার দাবি করতে পারে? পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি লেখকের সঙ্গে ভিন্ন হয়ে যায় বলেই প্রতিটি লেখাই নতুন হিসেবে আবির্ভূত হয়। ফলে ফেরারের বক্তব্যের সবটুকুই বুঝতে পেরেছি, সে দাবি এখানে করতে চাই না। রক্ষণশীল এ মনোভাবে একসময় সিদ্ধান্ত নিই— ফেরারের এই বইটি অনুবাদ করবো এবং বর্তমান লেখাটি তারই এক মুখবন্ধ হিসেবে কাজ করতে পারে। কিংবা মুখবন্ধ হিসেবে পরবর্তীতে নির্বাচিত না করলেও ফেরার সম্পর্কে এটি একটি আলাদা লেখা হয়েই থাকতে পারে।

বাংলা ভাষায় ফেরার সম্পর্কে জানার সুযোগ এতোই কম যে, একমাত্র উইকিপিডিয়ায় কয়েক লাইনের একটি ভুক্তি ছাড়া ফ্রান্সিসকো গার্দিয়া ফেরার সম্পর্কে আর কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি, বা অন্তত আমি পাইনি। ইংরেজি ভাষাতে কিছু কিছু থাকলেও অন্তর্জালের বিশালতার কথা চিন্তা করে পরিমাণটিকে সামান্যই বলতে হবে। বইটি যদি বাংলায় অনুবাদ করা যায়, সেক্ষেত্রে ফেরার ও তাঁর চিন্তাভাবনাকে সহজেই পাঠক বুঝতে পারবেন। পাশাপাশি বর্তমান লেখাটি থেকে ফেরারের কর্ম ও চিন্তার সূত্রাবলীর একটি ধারণাও পাওয়া যাবে। বলা বাহুল্য, এখানে ফেরারের বক্তব্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বর্তমান লেখক কখনও কখনও জাজমেন্টাল হতে পারেন, কখনও বা লেখকের নিজস্ব ধারণাকে ফেরারের সঙ্গে মিলিয়ে বক্তব্য উপস্থাপিত করা হতে পারে।

এও বলে রাখা ভালো, পুরো লেখায় লেখক ইচ্ছে করেই আলাদা করে অ্যাকাডেমিক পদ্ধতিতে সূত্রপ্রদানের রীতিতে যাননি। মূলত উইকিপিডিয়া ও অ্যানার্কিস্ট আর্কাইভ থেকে ফ্রান্সিসকো গার্দিয়া ফেরার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। আধুনিক বিদ্যালয়-বিষয়ক বাদবাকি আলোচনার সূত্র ফেরারের বই এবং লেখকের নিজস্ব জ্ঞান ও ধারণা।


শিক্ষাবিদের তকমাটুকু ফেরারের কপালে জুটেনি তেমনভাবে, বিশেষ করে অ্যাকাডেমিক পরিমণ্ডলে। ফেরারের আমলে সবচেয়ে বিখ্যাত শিক্ষাচিন্তুক ছিলেন ফ্রেডারিক ফ্রোয়েবল কিংবা মিখাইল বুখানিন। তাঁরা যেটুকু আলোয় এসেছেন, সে তুলনায় ফেরার অনেকটাই পাদপ্রদীপের বাইরে। ফেরারের পরিচয়টুকু নিশ্চিত হতে পারলে তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গে বইটির একটি যোগাযোগ ঘটানো সম্ভব হবে।


ফ্রান্সিসকো ফেরার গার্দিয়া: নৈরাজ্যবাদী নাকি শিক্ষাবিদ?

ফেরারকে নৈরাজ্যবাদী বলা হতো। বইয়ের প্রথম অধ্যায়গুলোতে ফ্রান্সিসকো গার্দিয়া ফেরার কীভাবে আধুনিক বিদ্যালয়ের সূত্রপাত ঘটালেন বলে যেসব বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে তাঁকে নৈরাজ্যবাদী বলা যাবে কিনা, তা নিয়ে তর্ক তোলার অবকাশ রয়েছে বিস্তর। তাঁকে বিপ্লবী বা বিদ্রোহী বলা যাবে কি? এ-প্রশ্নের উত্তর একটু পরেই খোঁজা হবে। তবে বর্তমান লেখায় নৈরাজ্যবাদী শব্দের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যাওয়া নিষ্প্রয়োজন; কারণ ফেরারকে যে-সময় নৈরাজ্যবাদী বলা হতো, তখনকার নৈরাজ্যবাদের তাত্ত্বিককাঠামোর সঙ্গে এখনকার কাঠামোর কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাছাড়া ফেরার আদৌ নৈরাজ্যবাদী কিনা এ প্রশ্নের সুরাহাটুকুও কি জরুরি? নৈরাজ্যবাদী নাম দিয়ে তাঁকে মারা হয়েছে কিনা— এ বিতর্কও দীর্ঘদিনের।

অপরদিকে, শিক্ষাবিদের তকমাটুকু ফেরারের কপালে জুটেনি তেমনভাবে, বিশেষ করে অ্যাকাডেমিক পরিমণ্ডলে। ফেরারের আমলে সবচেয়ে বিখ্যাত শিক্ষাচিন্তুক ছিলেন ফ্রেডারিক ফ্রোয়েবল কিংবা মিখাইল বুখানিন। তাঁরা যেটুকু আলোয় এসেছেন, সে তুলনায় ফেরার অনেকটাই পাদপ্রদীপের বাইরে। ফেরারের পরিচয়টুকু নিশ্চিত হতে পারলে তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গে বইটির একটি যোগাযোগ ঘটানো সম্ভব হবে। সৃষ্টি ও স্রষ্টাকে একজায়গায় মেশানো ঠিক কিনা সে বিতর্ককে সামনে রেখেই বলা যায়, স্রষ্টা যদি নিজের দর্শনকে মাথায় রেখে সৃষ্টিকে বিকশিত করেন, তাহলে সেক্ষেত্রে সৃষ্টি থেকে স্রষ্টাকে আলাদা করা কঠিন এবং ক্ষেত্রবিশেষে অসম্ভবও। আধুনিক বিদ্যালয়ের ধারণা ও চর্চাকে সামনে রেখে তাই ফ্রান্সিসকো গার্দিয়া ফেরারকে আলাদা করা যেমন কঠিন, তেমনি ফেরারের নামের সঙ্গে সবার আগে যে চিন্তাটুকু মস্তিষ্কে পরশ বুলিয়ে দিয়ে যাবে, তা হচ্ছে আধুনিক বিদ্যালয়, মানে স্পেনের তৎকালীন আধুনিক বিদ্যালয়।

ফেরারের জন্ম ১৮৫৯ সালে। তিনি স্পেনিশ, আরও বিশেষ করে বললে—  কাতালান। মাত্র ৫০ বছর বয়সে, ১৯০৯ সালে ফ্রান্সিসকো গার্দিয়া ফেরার মারা যান, গুলি খেয়ে। বিচারের নামে প্রহসন যাকে বলা হয়, তাঁর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। স্পেনের তখনকার সামরিক জান্তা নৈরাজ্যবাদী ও বামপন্থীদের যুগপৎ আন্দোলনের সহচর হিসেবে ফেরারকে গ্রেপ্তার করে এবং বিচারের আয়োজন করা হয়। বিচারে তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ না পাওয়া গেলেও তাঁকে গুলিতে মারার নির্দেশ দেয়া হয়। ১৯০৯ সালের ১৩ অক্টোবর গুলি খাওয়ার আগে বলেছিলেন— “আমি নিষ্পাপ। আধুনিক বিদ্যালয় দীর্ঘজীবি হোক।“ এ ঘটনার মধ্য দিয়ে রাতারাতি তাঁর দর্শন প্রতিষ্ঠিত হয়, তিনি পরিণত হন একজন আইকন হিসেবে এবং স্বাধীনচেতা শিক্ষার জন্মদাতা হিসেবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সামরিক জান্তা কেন তাঁকে মারার নির্দেশ দিলো? যে আন্দোলনের কারণে তাঁর এই পরিণতি, সেটির সবচেয়ে প্রবল রূপ শুরু হয়েছিল ১৯০৯ সালের ২৫ জুলাই তারিখে। মূলত এটি ছিল সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের আন্দোলন। দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষ সে-সময় উদগীরণ হয়েছিল মাত্র দিন কয়েকের মধ্যে। আন্দোলনে ত্রিশ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিল। সাধারণ ধর্মঘট বা হরতাল ছিল সেই দিনগুলোর নৈমিত্তিক বিষয়। ফলে ২ আগস্ট পর্যন্ত পুরো বার্সেলোনায় আস্তে আস্তে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। এ সপ্তাহটি পরবর্তী সময়ে বিয়োগান্তক সপ্তাহ হিসেবে পরিচিতি পায় এবং কাতালান বুর্জোয়ারা এর নাম দেয় জুলাই বিপ্লব। বিদ্রোহে যারা নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে ছিলেন, তাঁদের সহযোগী হিসেবেই ফেরারকে গ্রেপ্তার করা হয়; যদিও ফ্রান্সিসকো গার্দিয়া ফেরার সত্যিই সরাসরি বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন কিনা তা নিয়ে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর সামরিক আদালতে বিচার করা হয়েছিল। বিচারে ফেরারের বিদ্রোহে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ বের করতে পারেনি সামরিক জান্তা; কিন্তু বিচারের রায়ে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মারা হয়েছিল তাঁকে।

ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নৈরাজ্যবাদীদের প্রতিবাদের মাত্রা বাড়তে থাকে। তাঁকে মারার ঘটনাটি, বলা ভালো, প্রমাণ না পেয়ে বন্দুকের জোরে মারার ঘটনাটি যেভাবে আলোড়িত করে আশেপাশের দেশগুলোতে তাতে বলা যায়, ফেরারের মৃত্যু একদিক দিয়ে সফল। শুধু বাহ্যিক আন্দোলন নয়, আধুনিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে ফ্রান্সিসকো গার্দিয়া ফেরার যে চিন্তাভাবনার খোরাক দিয়েছেন, তাতে সবার আগে এবং স্বাভাবিকভাবে আকৃষ্ট হয়েছেন মুক্তচিন্তার মানুষেরা, উদারকামী ব্যক্তিবর্গ, নৈরাজ্যবাদী এবং বিশেষত বামমনস্ক কর্মীরা। স্পেনে এই গোষ্ঠীগুলো এখনও একত্রে সেক্যুলারিজম এবং প্রগতির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। এর রেশ তখন থেকেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে স্পেনের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও। বলে রাখা প্রয়োজন, ফেরার যুক্তিবাদী ও সেক্যুলার— দুটো শব্দকে আলাদা করে বিচার করতেন; যদিও তাঁর সখ্য ছিল উভয় দর্শনের মানুষদের সঙ্গেই।

ফেরারের মধ্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব কাজ করেছে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ১৫ বছর বয়সে পরিবারের দরিদ্রতার কারণে তাঁকে বার্সেলোনার এক ফার্মে কাজ করার জন্য পাঠানো হয়। ফার্ম-মালিকের চিন্তাচেতনার প্রভাব পড়ে ফেরারের ওপর। ওই ফার্ম-মালিক নিজে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ছিলেন, যা কিশোর ফেরারকে এমনভাবে অনুপ্রাণিত করে যে, পরবর্তীতে প্যারিসে যাওয়ার পর ফ্রান্সিসকো গার্দিয়া ফেরার সেখানে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। তবে কাজের ক্ষেত্র হিসেবে তিনি বেছে নেন শিক্ষাকে।

১৯০১ সালে স্পেনে ফিরে আধুনিক বিদ্যালয় শুরু করেন মূলত মধ্যবিত্ত শিশুদের পড়ানোর জন্য। বিদ্যালয়ের কাজ করতে করতেই ১৯০৬ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন রাজা ত্রয়োদশ আলফনসোর ওপর হামলায় ম্যাটিউ মরালের সহযোগী সন্দেহে; তবে কোনো প্রমাণ না থাকায় এক বছর পর মুক্তি পান। যদিও তাঁর অনুপস্থিতিতে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তিনি আবার বিদ্যালয় শুরুর উদ্যোগ নেন। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর তিনি আধুনিক বিদ্যালয়ের ধারণা নিয়ে বই লেখেন যা ১৯১৩ সালে নিকারবোকার প্রেস প্রথম প্রকাশ করে।

গৌতম রায়: সহকারী অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখাটি কতোটুকু পছন্দ হয়েছে?

Leave a Comment