উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনো প্রতিটি শিক্ষার্থীরই স্বপ্ন থাকে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশ করা। কারো বিশ্ববিদ্যালয়ে, কারো বুয়েট, মেডিকেল কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির স্বপ্ন থাকে। ক্ষেত্রবিশেষে খুব সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থী হয়তো বিদেশে উচ্চশিক্ষার কথা ভাবে। তবে আমাদের সিংহভাগ শিক্ষার্থীরই স্বপ্ন থাকে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়ন করা। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির এই পথটা কি সুগম?

উত্তর হলো, না, মোটেও তা নয়। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করেই উচ্চমাধ্যমিকের জ্ঞান দিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যায় না। কারণ উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা বিষয়ে পড়াশোনা পুরোপুরি একই নয়। সেজন্যই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার আগে আমাদের মধ্যে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তির মহোৎসব। গ্রাম কিংবা মফস্বল শহরে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের ভর্তি কোচিংয়ের জন্য পাড়ি জমাতে হয় ফার্মগেটে কিংবা বিভাগীয় বড় শহরগুলোতে।

অবশ্য বর্তমানের বড় বড় ভর্তি কোচিংগুলো তাদের পসরা সাজিয়ে বসেছে প্রায় প্রতিটি শহরে! সর্বনিম্ন ৮-১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২০/৩০ হাজার টাকা লাগে কেবল কোচিংয়ের ফি! এরপর? বাইরে গিয়ে থাকা, নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানো কিংবা হালের চিকনগুনিয়া, ডেঙ্গু কিংবা টাইফয়েড সব মিলিয়ে রীতিমতো একটি যুদ্ধ। বারো বছরের নির্ঘুম পড়াশোনার পুরষ্কার কি তাহলে এই যুদ্ধ?

আলোচ্য বিষয়সমূহ

উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বনাম গুণগত শিক্ষা!

বিশ্বব্যাপি শিক্ষাক্ষেত্রে আলোচিত একটি প্রত্যয় হলো গুণগত শিক্ষা। গুণগত শিক্ষার বিভিন্ন আঙ্গিতে অসংখ্য সংজ্ঞায়ন লক্ষ্য করা যায়। এসব সংজ্ঞার মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি হলো, “গুণগত শিক্ষা হলো সেই শিক্ষা যা শিক্ষার্থীদের পরবর্তী স্তরের জন্য প্রস্তুত করে তোলে”। ঠিক এই সংজ্ঞার আলোকে বিবেচনা করলে আমাদের দেশের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সিংহভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আপনি কোনদিকে ফেলবেন? আমাদের সিংহভাগ উচ্চমাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানগুলো কি তাদের শিক্ষার্থীদের পরবর্তী স্তর তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তুত করে তুলছে?

যার উত্তর হলো, না। সুতরাং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে আমাদের দেশে কলেজ নামের যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, তাদের সিংহভাগই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে তাদের কার্যক্রমগুলোকে। কলেজগুলোর ভূমিকা কি কেবল তাহলে পরীক্ষা নেওয়া কিংবা ফর্ম ফিলাপ করিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা?

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ও কলেজের শিক্ষার মধ্যে এতো ফারাক কেন?

বর্তমানে আমাদের ভর্তি পরীক্ষার অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য এইচএসসি স্তরের শিক্ষা যথেষ্ট নয়। এইচএসসির পড়াশোনা, পরীক্ষা পদ্ধতির সাথে ভর্তি পরীক্ষার পড়াশোনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রশ্নের প্যাটার্ন থেকে শুরু করে পড়াশোনাও আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা প্রস্তুতির জন্য আরেকটু ভিন্ন কাঠামোর, ভিন্ন আঙ্গিকে পড়াশোনার দরকার পড়ে যা এইচএসসির মাধ্যমে যথেষ্ট হয় না। সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়াশোনার মধ্যে এত ফারাক কেন? কেনই বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ও কলেজে পড়াশোনার মধ্যে সামঞ্জস্য নেই!

যদি বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে হয়, তাহলে তার প্রস্তুতির জন্য যেভাবে যতটুকু পড়াশোনার দরকার, সেটা এইচএসসি পরীক্ষায় কেবল উত্তীর্ণ নয়; বরং সকল সাবজেক্টে এপ্লাস পাওয়ার জন্যও লাগে না! তারমানে ভর্তি পরীক্ষার পড়াশোনার কাঠিন্যের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে এই স্তরে অতিরিক্ত সাহায্যের দরকার পড়ে। যার ফলে শিক্ষার্থীরা পরনির্ভরশীল হয়ে ওঠে, আর যেই সুযোগটা নিয়ে গড়ে উঠেছে হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য।

শিক্ষা আইনে উচ্চশিক্ষার বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা

সাংবিধানিকভাবে দেশে একটি শিক্ষা আইন প্রণয়নের কথা থাকলেও নানাকারণে দীর্ঘ সময়েও আলোর মুখ দেখেনি বহুল আকাঙ্ক্ষিত শিক্ষা আইন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা আইনের খসড়া অনুমোদিত হয়েছে যা “ শিক্ষা আইন ২০২২” হিসেবে পরিচিত।

শিক্ষা আইনের চতুর্থ অধ্যায়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আলোচনায় ৩২ অনুচ্ছেদে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির যোগ্যতা নিয়ে বলা হয়েছে, “ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তির যোগ্যতা।-

(১) দ্বাদশ শ্রেণি বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীগণ স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির জন্য যোগ্য বিবেচিত হইবে।

(২) দেশের সকল স্তরের সরকারি ও বেসরকারি কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ভর্তির জন্য যথাযথ নীতি প্রণয়নপূর্বক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করিতে পারিবে।”

উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের জন্য যথাযথ নীতি প্রণয়নপূর্বক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করতে পারবে বলে শিক্ষা আইনের এই অনুচ্ছেদে এসেছে। ভর্তি পরীক্ষার রূপরেখা ন্যস্ত করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপরে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেখা গেছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতার জন্য ভর্তি পরীক্ষা এবং কলেজের পড়াশোনার মধ্যে ফারাক তৈরি হয়েছে, যার ফলে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য!

জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা

শিক্ষানীতি ২০১০’র উচ্চশিক্ষা অনুচ্ছেদের কৌশলসমূহের প্রথম কৌশলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা বিষয়ে বলা হয়েছে, “বিভিন্ন ধারার মাধ্যমিক শিক্ষা সফলভাবে সমাপ্তি করার পর মেধা, আগ্রহ ও প্রবণতার ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহনের সুযোগ লাভ করবে”। তবে মেধা, আগ্রহ ও প্রবণতার পরিমাপ কিভাবে হবে সেটার সুনির্দিষ্ট কোন বর্ণনা শিক্ষানীতিতে অনুপস্থিত।

শিক্ষাক্রম ২০২২ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা

উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার মধ্যে সম্মিলনে ঘটানোর বিষয়ে শিক্ষাক্রমে সুনির্দিষ্ট কিছু নেই। শিক্ষাক্রমে একাদশ দ্বাদশ শ্রেণি নিয়ে আলোচনার ভূমিকায় বলা হয়েছে, “এই পর্যায় শেষে শিক্ষার্থী স্নাতক বা উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পায়, আবার একটি বড় অংশের শিক্ষার্থী কর্মজগতে প্রবেশ করে। তাই যারা স্নাতক স্তর কিংবা কর্মজগতে প্রবেশ করবে তাঁদের জন্য এ স্তরের শিক্ষাক্রম এমনভাবে বিন্যস্ত করা হবে যেন তাদের অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি উচ্চ শিক্ষা এবং ভবিষ্যত কর্মজগতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়”। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার গতিপ্রকৃতি কেমন হবে তা নিয়ে বিশেষ কোন নির্দেশনা শিক্ষাক্রমে নেই।

উচ্চমাধ্যমিকে কোচিং কিংবা টিউশনের জয়গান

জাদুর শহর ঢাকার কথা বাদই দিলাম। এইচএসসির জন্য রাজশাহীর বিজ্ঞান বিষয়ক একটি কোচিং সেন্টারের কথা বলি। সারাদিন চলে বিভিন্ন ব্যাচের ক্লাস। সকাল ছয়টা থেকে শুরু করে রাত আটটা অবধি চলে বিভিন্ন ব্যাচের ক্লাস। একদল শিক্ষার্থীরা যায়, যেতে না যেতেই চলে আসে আরেকদল! সারাদিন এভাবেই চলে!

তাহলে কি এই সকল শিক্ষার্থীরা কলেজে আসে না? আর এলে কীভাবে তারা কলেজ চলাকালীন বিভিন্ন বিষয়ের প্রাইভেট কিংবা কোচিংয়ে আসা-যাওয়া করে। কলেজগুলোর আসলে ভূমিকাটা কী? এটা সত্যি যে, অধিকাংশ কোচিং সেন্টারগুলোতে পড়াশোনা হয়। তাহলে নামসর্বস্ব কলেজগুলোকে তুলে দিয়ে বরং কোচিং সেন্টারগুলোকেই জাতীয়করণ করা উচিৎ নয় কি? কোচিং বাণিজ্য জয়গানই বা কেন হলো? বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত করে তোলা তো অনেক পরের কথা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি অনেক কলেজেই ক্লাসও হয় না ঠিকঠাক!

খ্যাতনামা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা

বিভিন্ন দেশে স্নাতক ভর্তিচ্ছুদের ভর্তি পরীক্ষা ঠিক কী উপায়ে হয় এটাকে সাধারণীকরণের সুযোগ নেই বললেই চলে। তবে বিশ্বের আর কোন দেশে এই ভর্তি পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের এতবেশী হয়রানি কিংবা ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে এতবড় বাণিজ্যের সুযোগ আছে বলে জানা নেই।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেই যদি দেখি, ওদের ওয়েবসাইট বলছে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির জন্য প্রথমে তাদের কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে আবেদন করতে হয়। সেক্ষেত্রে পছন্দের কোর্স পছন্দ করে আবেদন করতে হয়, কেন ওই কোর্সে পড়তে চান সেটা বলতে হবে। প্রাথমিক আবেদনের সময়ই আসলে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ওখানে সরবরাহ করতে হয়। তারপরে একটি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সেখান থেকে শর্টলিস্ট করা হয় এবং সর্বশেষে সাক্ষাতকারের মাধ্যমে যদি ওদের মনে হয় শিক্ষার্থী ওই কোর্সের যোগ্য, তাহলে তারা ভর্তির সুযোগ প্রদান করবে।

নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও কাছাকাছি দেখা গেছে। সরাসরি ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকলেও স্টেটমেন্ট অব পারপাস  দিয়ে কেন্দ্রীয় আবেদনের মাধ্যমে আবেদন করা এবং সর্বশেষ সাক্ষাতকারের মাধ্যমে ভর্তির সুযোগ প্রদান করা হয়। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর স্থানীয় কমিউনিটির সাথে সম্পৃক্ততা, কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস, লিডারশিপসহ অন্যান্য দক্ষতার ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়।

বিশ্বের অধিকাংশ খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীর ঝোঁক বা প্রবণতা পরীক্ষা করা হয়। কোন শিক্ষার্থী সত্যিই ওই বিষয়ে বা কোর্সে অধ্যয়নের মানসিকতা রাখে কি না সেগুলো পরীক্ষা করা হয়। হার্ডিঞ্জ ব্রিজে গার্ডার কতটির মতো প্রশ্নের মাধ্যমে নয়!

কোটা পদ্ধতি নাকি অভিশাপ!

শিক্ষানীতি ২০১০’র উচ্চ শিক্ষা অনুচ্ছেদের কৌশলসমূহের তৃতীয় কৌশলে বলা আছে, “কোটা পদ্ধতি বা অন্য কারণে নূন্যতম যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হবে না ”। শিক্ষানীতি সুস্পষ্টভাবে কোটা পদ্ধতির আলোচনা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পরে পত্রিকায় নিউজ হতে দেখা যায় যে, ফেল করেও পোষ্য কোটাতে ভর্তি হলেন এতজন শিক্ষার্থী।

ইতিবাচক বৈষম্য সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া, কিংবা অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি ইতিবাচক বলেই সর্ব মহলে আলোচিত হয়; কিন্তু পোষ্য কোটা পদ্ধতি ঠিক কী কারণে আজও অব্যাহত তা বোধগম্য নয়। ন্যূনতম যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করে ভর্তির প্রক্রিয়া কোনভাবেই প্রত্যাশিত নয়। এ-ধরনের কোটা পদ্ধতি হতাশার সৃষ্টি করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

স্রোতের বিপরীতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গল্প!

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে প্রস্তুতির জন্য হোক কিংবা গুণগত মানের শিক্ষার জন্য হোক, দেশের অধিকাংশ কলেজ যেখানে নামসর্বস্ব ভূমিকায়, সেখানে স্রোতের বিপরীতেও কিন্তু রয়েছে বেশ কিছু কলেজ। ব্যক্তিগতভাবে আমার যেসব প্রতিষ্ঠানকে চেনা বা জানার সীমিত হলেও সুযোগ হয়েছে এদের মধ্যে রাজশাহী কলেজ, পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, নটরডেম কলেজ, হলিক্রস, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা কলেজ ইত্যাদি।

আমার বিশ্বাস, এই সংখ্যা আরো বাড়বে, কিন্তু এর বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে আমার জানার সুযোগ হয়নি। রাজশাহী কলেজ কিংবা নটরডেম কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের রোল মডেল। এমন প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সত্যিই পারে, তবে বাকিরা কেন পারে না? সিংহভাগই কেন গুণগত শিক্ষা দিতে ব্যর্থ?

তার মানে তো যথাযথ মনিটরিং ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গুণগত মানের কলেজ শিক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। অবকাঠামো বা মানবীয় সম্পদ বিবেচনায় আমাদের কলেজ লেভেলে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, সেগুলো যে আসলে অপচয়ই হচ্ছে সেটা বললে বোধ হয় খুব একটা ভুল হবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে বাণিজ্য কার জন্য? কার কল্যাণে?

বিকেলে ফার্মগেটের বড় ওভারব্রিজের আশপাশটার দিকে যদি খেয়াল করে থাকেন, তাহলে দেখবেন লক্ষ লক্ষ ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ছুটছে কোচিং সেন্টারে কিংবা ফিরছে কোচিং সেন্টার থেকে। পুরো জায়গাটাই কোচিংয়ের হাটবাজার বললেও ভুল হবে না। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে মফস্বল শহর কিংবা প্রান্তিক পর্যায় থেকে কোচিংয়ে আসার উদ্দেশ্য কী? নিশ্চয়ই শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত মেডিকেল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিতে সহায়তা করার জন্য।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি কোটি টাকার ভর্তি বাণিজ্য মূলত কার কল্যাণে? তাহলে শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষাকে পুঁজি করে এতবড় ব্যবসাটা আসলে কীভাবে দাঁড়ালো? কলেজগুলো কি পারতো না বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য তাদের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করে তুলতে, নয়তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কী পারতো না তাদের ভর্তি পরীক্ষার প্রক্রিয়াকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে যার জন্য এই কোচিংয়ের দরকারই না পড়ে? নাকি পুঁজিবাদের প্রবল স্রোতে বাণিজ্যিকীকরণের জন্যই এই ফারাকটুকু জিইয়ে রাখা হয়!

সবার জন্য উচ্চশিক্ষা?

সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় জেলায় মহল্লায় মহল্লায় যে-হারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোয়ার চলছে, তা থেকে বলাই যেতে পারে হয়তো সবার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয় হতে চলেছে! অবশ্যই গুণগত মান ধরে রাখতে পারলে সংখ্যাগত দিক থেকে এগিয়ে যাওয়া নিশ্চয়ই মন্দ কিছু নয়। সেই আলোচনা ভিন্ন। কিন্তু উচ্চশিক্ষার প্রবেশাধিকার কি সত্যিই সবার জন্য হচ্ছে?

সবার জন্য বলতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, অর্থনৈতিক অবস্থা, গোত্র নির্বিশেষে সবার জন্য সুযোগের সমতা সৃষ্টি করা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সদ্য ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ভর্তি কোচিং, ভর্তি পরীক্ষার ধকল, দুর-দুরান্তের জার্নির ধকল সব মিলিয়ে একজন মধবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের জন্য কি সত্যিই সুযোগের সমতার সৃষ্টি হচ্ছে?

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮’র “গ” অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।” সংবিধানের এই অনুচ্ছেদটি মূলত সুযোগের সমতায়ন সম্পর্কিত।

অনুচ্ছেদটির শেষাংশ লক্ষ্য করলে দেখা যায়,“শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোন কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না” এই অংশটির মাধ্যমে আসলে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা সম্পর্কিত বিষয়কে বোধহয় মেলানোর সুযোগ সীমিত।

কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তির পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য যে জটিলতা সেটা কি “বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীনে’র” সমতূল্য নয়? তাহলে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তির পরে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি বিশেষ করে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য সংবিধান অবমূল্যায়নের সমতূল্য নয় কি?

জোন অব প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা!

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা আর কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাকে বোধ হয় ভাইগটস্কির বিখ্যাত জোন অব প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট থিওরির সাথে কিছুটা হলেও মেলানো যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা আর কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাকে বোধ হয় ভাইগটস্কির বিখ্যাত জোন অব প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট থিওরির সাথে কিছুটা হলেও মেলানো যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা আর কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাকে বোধ হয় ভাইগটস্কির বিখ্যাত জোন অব প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট থিওরির সাথে কিছুটা হলেও মেলানো যেতে পারে। আমাদের প্রচলিত ভর্তি পরীক্ষা ব্যবস্থাটি আমার কাছে মনে হয় ভাইগটস্কির সেই জোন অব প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট’র মতো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতিটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য সেই জোন অব প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্টের মত যা শিক্ষার্থীরা নিজেরা একা একা পারে না, কিন্তু কারো সাহায্য নিয়ে করতে পারে। সেই সাহায্যের জায়গাগুলো নিয়ে ভর্তি কোচিংগুলো। গড়ে তুলেছে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য!

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা যদি জোন অব প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্টের মতোই হয়, তাহলে সেখানে সাহায্যকারীর ভূমিকাটা তো হওয়াই উচিৎ ছিলো কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকদের। অথবা ভর্তি পরীক্ষাগুলোকে ঠিক সেই লেভেলে নিয়ে নিয়ে যাওয়ারই প্রয়োজনটা কী ছিলো? পরনির্ভরশীলতা! ভর্তি পরীক্ষাকে কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার সমতূল্য করে তুললে কি খুব সমস্যা হতো?

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা : রূপরেখা কেমন হতে পারে?

বারো বছরের শিক্ষাজীবন অতিক্রম করে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের জন্য যে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, সেই ভর্তি পরীক্ষা হওয়া উচিৎ ছিলো ভর্তি উৎসব! কিন্তু সেটি হয়ে দাড়িয়েছে ভর্তিযুদ্ধের নামান্তর। বিভিন্ন সময়েই পত্র-পত্রিকায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার যে প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত হয় সেটা কি মেধা বা প্রবণতার সঠিক মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট?

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা যে প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়, সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশই মূখস্থনির্ভর এবং জ্ঞানীয় পর্যায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমাদের ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের প্রবণতা মূল্যায়ন করে তাকে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয় না বললেই চলে। সেক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি যেভাবে হতে পারে বলে আমি মনে করি:

প্রথমত, ভর্তি পরীক্ষার পাঠ্যসূচী এবং কলেজের পড়াশোনার মধ্যে সমন্বয়সাধন করতে হবে। যেন কলেজে পড়াশোনা সঠিকভাবে সমাপ্তি করলে পারলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, ভর্তি পরীক্ষার প্রধান অবলম্বন হিসেবে মূখস্থনির্ভর প্রশ্নের পরিবর্তে উচ্চতর দক্ষতামূলক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বহুনির্বাচনী পরীক্ষার পরিবর্তে লিখিত পরীক্ষার মূল্যায়ন এখানে যথাযথ হতে পারে।

তৃতীয়ত, যেকোনো কোর্সে ভর্তির পূর্বে ওই বিষয়ে শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও প্রবণতার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। সেক্ষেত্রে সাক্ষাতকার একটি উল্লেখযোগ্য প্রক্রিয়া হতে পারে।

চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা বিকেন্দ্রীকরণ করে শিক্ষার্থীদের হয়রানি কমাতে হবে। দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমনভাবে গুণগত মানে উন্নীত করতে হবে যার ফলে গুণগত উচ্চশিক্ষার সুযোগ হয়। বড় ভূমিকা পালন করতে হবে কলেজ পর্যায়কে। কলেজের শিক্ষাকে এমনভাবে বির্নিমাণ করতে হবে যা শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করে তুলতে পারে।

পঞ্চমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যকে প্রতিহত করে শিক্ষার্থীদের এইচএসসির পড়াশোনা এবং ভর্তি পরীক্ষার পড়াশোনার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে।

ষষ্ঠত, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা সম্পর্কিত সকল প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সবধরনের বৈষম্যকে দূরীভূত করে নিশ্চিত করতে হবে সুযোগের সমতায়ন।

পরিশেষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কিংবা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার মধ্যে সমন্বয়হীনতা মূলত দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান অসমতারই ক্ষুদ্র প্রতিফলন। প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার গতিপথকে করতে হবে সমন্বিত, সৃষ্টি করতে হবে একীভূত পরিবেশ। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব কিংবা চলমান অর্থনৈতিক দূরাবস্থা অতিক্রম করে সোনার বাংলা গড়তে শিক্ষার সকল স্তরে গুণগত শিক্ষার বিকল্প নেই।

Sending
User Review
4.25 (4 votes)

লেখক সম্পর্কে

শামস আল গালিব

শামস আল গালিব

শামস আল গালিব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

মন্তব্য লিখুন