উচ্চশিক্ষা বিদেশে শিক্ষা

প্রবাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া

শিক্ষক নিয়োগ, ছবিসূত্র: ওএমএইচ (http://oam.ph/wp-content/uploads/2014/08/Scheduled-for-a-group-interview-heres-how-you-can-stand-out-Open-Access-Marketing.jpg)
লিখেছেন গৌতম রায়

এনায়েতুর রহীম: আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগে আমরা যখন বিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন একটি কথা প্রায়ই শুনতাম- ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী। যার অর্থ, পৃথিবীর কোনোকিছুই মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে নয়; মানুষ ঘরে বসেই জানতে পারছে পৃথিবীর কোথায় কী হচ্ছে। পঁচিশ বছর আগের কথাটি এখন আরও স্পষ্টভাবে আমরা বুঝতে পারি। পৃথিবী এখন আর ছোট হয়ে আসছে না, পৃথিবী ইতোমধ্যে ছোট হয়ে গিয়েছে। আগের চেয়ে অনেক সহজে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ প্রতি মুহূর্তে জানতে পারছে অন্য প্রান্তগুলোতে কী কী ঘটছে।

এনায়েতুর রহীম

আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগে আমরা যখন বিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন একটি কথা প্রায়ই শুনতাম- ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী। যার অর্থ, পৃথিবীর কোনোকিছুই মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে নয়; মানুষ ঘরে বসেই জানতে পারছে পৃথিবীর কোথায় কী হচ্ছে। পঁচিশ বছর আগের কথাটি এখন আরও স্পষ্টভাবে আমরা বুঝতে পারি। পৃথিবী এখন আর ছোট হয়ে আসছে না, পৃথিবী ইতোমধ্যে ছোট হয়ে গিয়েছে। আগের চেয়ে অনেক সহজে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ প্রতি মুহূর্তে জানতে পারছে অন্য প্রান্তগুলোতে কী কী ঘটছে।

তথ্যের সহজলভ্যতা জীবনে এনেছে অসম্ভব গতি। যার সুফল আমরা সমাজের নানাক্ষেত্রেই দেখতে পাই। এই গতি যেমন মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রমকে বদলে দিয়েছে, তেমনি শিক্ষাক্ষেত্রেও যেন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীদের ব্যাচেলর্স ও মাস্টার্স শেষে উচ্চ-শিক্ষার্থে বিদেশে যাওয়া একটি সহজাত প্রত্যাশা। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন আর সেই সাথে তথ্যের সহজলভ্যতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সাথে ধারণা করা যায় যে, বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীরা আগের তুলনায় এখন অধিক সংখ্যায় পড়াশুনা করতে বিদেশে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই পিএইচডি প্রোগ্রামে আসছে এবং ডিগ্রি শেষ করে আবার দেশে ফিরে যাচ্ছে। আবার একটি অংশ সংশ্লিষ্ট দেশেই থেকে যাচ্ছে। যারা থেকে যাচ্ছে, তাদের বড় একটি অংশ প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ পাচ্ছে, আবার অনেকেই পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করছে। প্রবাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেন, ধারণা করা যায় তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশের কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।

লেখাটির উদ্দেশ্য

আমার লেখটি মূলত প্রবাসে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় শিক্ষকতা সম্পর্কে আমার যে সামান্য অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা সবার সাথে শেয়ার করার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসব দেশে কীভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়, তা খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। আমি গ্র্যাজুয়েট-শিক্ষার্থী হিসেবে শিক্ষক নিয়োগ কমিটিতে কাজ করেছি; আবার শিক্ষক হিসেবেও শিক্ষক নিয়োগ কমিটিতে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন শিক্ষার্থী হিসেবে কীভাবে শিক্ষক নিয়োগ কমিটিতে আমি কাজ করলাম! সেটি একটু পরেই বলছি।

এই লেখার দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। একটি প্রত্যক্ষ, আরেকটি পরোক্ষ। পরোক্ষ উদ্দেশ্যটি হলো, আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে পাঠকমহল আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে অন্যদের একটি তুলনা করার সুযোগ পাবেন। উন্নত বিশ্বের তুলনায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কোথায়, আমাদের পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন বা পরিবর্ধনের প্রয়োজন আছে কি-না বা অদূর ভবিষ্যতে তার প্রয়োজন হতে পারে কি-না- এই লেখাটি সেটি বিবেচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে বলে ধারণা করি।

প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্যটি তাদের জন্য যারা বিদেশে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় পিএইচডি শেষ করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিতে চান। এখানে সাফল্যের জন্য শুধু ভালো ফলাফলই যথেষ্ট নয়, সাথে আরও অনেক রকমের প্রস্তুতি নিতে হয়। কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়, সে সম্পর্কেও পরবর্তী কোনো লেখায় আমি একটি ধারণা দেয়ার চেষ্টা করব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে আমার এ লেখা। তবে ধারণা করি, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য কিংবা উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা প্রযোজ্য হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে ধারণা

শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা করার আগে দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু ধারণা দেয়া প্রয়োজন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে হাইস্কুলের পরের ধাপকে বোঝায়। এদের হাইস্কুল আমাদের কলেজ পর্যায়ের সমান; অর্থাৎ ১২ বছরের পাঠ। আমেরিকায় একজন হাইস্কুল পাশ করলে (এদের বলা হয় হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েট) সেটি আমাদের দেশের কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশের সমতুল্য। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়কেও অনেক সময় কলেজ বলে। তাদের ভাষায় এই কলেজ আবার দুই প্রকার- কমিউনিটি কলেজ যারা দুই-বছরের ডিগ্রি প্রদান করে; অন্যটি বিশ্ববিদ্যালয় যারা চার-বছরের ডিগ্রি প্রদান করে।

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থাৎ যারা চার-বছরমেয়াদি ব্যাচেলর ডিগ্রি দেয়, সেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে আমার আলোচনা সীমিত রাখবো।

শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া

এখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ একটি বিশ্বব্যাপি প্রক্রিয়া। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট দেশের এবং পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের যেকোন নাগরিক, যিনি এই পদের জন্য যোগ্য, তিনি আবেদন করতে পারেন। যার মানে হলো, আপনি বাংলাদেশে বসেও আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্য আবেদন করতে পারেন।

শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াটিকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, বিজ্ঞাপন এবং প্রাথমিক আবেদন এবং সেগুলোর যাচাই বাছাই; দ্বিতীয়ত, নিয়োগ কমিটি কর্তৃক প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য যোগ্য প্রার্থীদের একটি শর্টলিস্ট তৈরি করা; তৃতীয়ত, প্রার্থীদের টেলিফোনে সাক্ষাৎকার নেয়া এবং তাদের মধ্যে প্রথমকে তিনজন প্রার্থীকে ক্যাম্পাস সাক্ষাৎকারের জন্য আহবান করা; চতুর্থত, ক্যাম্পাস সাক্ষাৎকার এবং সব শেষে সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীকে চাকুরির অফার দেয়া। প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত লিখছি।

বিজ্ঞাপন ও বিজ্ঞাপনের ভাষা

এখানে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপনে পদ অনুযায়ি সর্বনিম্ন যোগ্যতা উল্লেখ করা থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সাধারণত সহকারি অধ্যাপক পদে নিয়োগ দিয়েই অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার শুরু হয়। বাংলাদেশের যেমন প্রথম পদটি প্রভাষকের, এখানে তেমনি প্রথম পদটি সহকারি অধ্যাপকের। যারা পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন অথবা অর্জনের পথে (শুধু থিসিস ডিফেন্স বাকি), তারা এসব পদের জন্য বিবেচিত হন। প্রভাষক পদের জন্য যেহেতু মাস্টার্স থাকাই যথেষ্ঠ, সেহেতু মাস্টার্স ডিগ্রিধারিরাও প্রভাষক পদের জন্য আবেদন করতে পারেন। এখানে স্থায়ী পদকে বলে টেনিউর ট্রাক (tenure track), যারা মানে হল পদটি স্থায়ী কিন্তু প্রাথমিক নিয়োগ হবে অস্থায়ীভাবে। বাংলাদেশে যেমন স্থায়ী পদের বিপরীতে প্রবেশনারি পদে নিয়োগ দেয়া হয়, অনেকটা সেরকম। সহকারি অধ্যাপক পদে নিযুক্ত একজন সাধারণত পাঁচ বছর পরে স্থায়ী পদলাভের জন্য আবেদন করতে পারেন। চাকুরি স্থায়ী হলে তাদের বলে টেনিউরড প্রফেসর। উল্লেখ্য, এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষককেই শিক্ষার্থীরা এবং সাধারণ মানুষেরা প্রফেসর ডাকে। অর্থাৎ ইউনিভার্সিটি প্রফেসর মানে হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক; প্রফেসর মানেই তিনি যে পদবি অনুসারে পুরোদস্তুর প্রফেসর, তা নাও হতে পারে। অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসরকেও বলে প্রফেসর, আবার অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরকেও বলে প্রফেসর।

ফিরে আসি বিজ্ঞাপনে। শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপনে পরিস্কারভাবে লেখা থাকে একজন প্রার্থীর কী কী যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পুরো বাছাই ও নিয়োগ প্রক্রিয়াতে এই বিজ্ঞাপনের শর্তগুলো পূরণ হচ্ছে কি-না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করা হয়। কোন প্রার্থীকে বাছাই থেকে বাদ দিতে হলেও বিজ্ঞাপনে উল্লিখিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বিবরণকে মাপকাঠি হিসেবে ধরে সেরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে থাকে।

বিজ্ঞাপনে অনেক সময় সাধারণ যোগ্যতা এবং বিশেষ যোগ্যতার কথা আলাদা আলাদাভাবে লেখা থাকে। সাধারণ যোগ্যতার মধ্যে থাকে আন্ডারগ্র্যাড (ব্যাচেলরস) এবং গ্র্যাজুয়েট লেভেলে (মাস্টার্স/পিএইচডি) পড়ানোর অভিজ্ঞতা এবং আগ্রহ, থিসিস সুপারভাইজ করার অভিজ্ঞতা ও আগ্রহ ইত্যাদি। বিশেষ যোগ্যতার মধ্যে থাকতে পারে বিশেষ কোনো সফটওয়্যারে দক্ষতা কিংবা বিশেষ কোনো কোর্স পড়ানোর অভিজ্ঞতা ইত্যাদি। কোনো কোনো পদে পড়ানোর ওপর বেশি জোর দেয়া হয়, আবার কোনো কোনো পদে গবেষণার ওপর বেশি জোর দেয়া হয়। আবার অধিকাংশ পদেই পড়ানো এবং গবেষণা উভয়ের ওপরই জোর দেয়া হয়। বিজ্ঞাপনে এসব বিষয় পরিস্কারভাবে লেখা থাকে। যেসব পদে পড়ানোর ওপর বেশি জোর দেয়া হয়, সেসব প্রার্থীদের অবশ্যই পড়ানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। আর যেসব পদে গবেষণাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়, সেসব প্রার্থীদের অনুদানপ্রাপ্ত গবেষণা কাজের অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন এজেন্সির কাছে গবেষণার জন্য প্রপোজাল তৈরির ও জমা দেয়ার অভিজ্ঞতাসহ অনুদান পাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়।

অনেক সময় ইউনিভার্সিটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইনে আবেদন করতে হয়। আবার অনেক সময় আবেদনপত্র ইমেইলে নিয়োগ কমিটির প্রধান বরাবর পাঠাতে হয়। আবেদনের জন্য যা যা লাগে সেগুলো হলো- আবেদনপত্র বা কাভার লেটার, অ্যাকাডেমিক সিভি, অ্যাকডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, পাবলিকেশনের প্রমাণ হিসেবে দুই/তিনটি জার্নাল প্রবন্ধের কপি বা এগুলোর প্রথম পাতার কপি, ৩-৫টি রেফারেন্স লেটার, স্টেইটমেন্ট অব টিচিং ফিলোসফি এবং স্টেইটমেন্ট অব রিসার্চ। আবেদনপত্রে উল্লেখ করতে হয় কেন এই পদের জন্য আপনি আগ্রহী হলেন, কেন আপনি যোগ্য এবং আপনাকে নিয়োগ দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কী কী লাভ হবে, সেসব সুন্দর করে সাজিয়ে লিখতে হয়। আবেদনপত্র সাধারণত এক থেকে দেড় পাতার মধ্যে হতে হয়। তবে এর কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই। যেহেতু একটি পদের জন্য কখনো কখনো ৫০ থেকে ৩৫০ পর্যন্ত আবেদন আসে, তখন এই আবেদনপত্র বা কাভার লেটারটি সারাংশ হিসেবে কাজ করে। তাই আমার মতে এটি এক থেকে দেড় পাতার মতো হওয়া উচিত, যাতে মোটামুটি সবকিছুই গুছিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করা যায়।

টেলিফোন ইন্টারভিউ

আবেদন করার পর এইচআর অফিস সেগুলো প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ কমিটির কাছে পাঠানো হয়। নিয়োগ কমিটিতে একজন প্রধান এবং তার সাথে ৪/৫ জন ফ্যাকাল্টি সদস্য, একজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধি এবং একজন একুইটি অফিসার থাকেন। এই কমিটি ইউনিভার্সিটি অনুসারে ভিন্ন হতে পারে। অনেক ইউনিভার্সিটির নিয়োগ কমিটিতে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকেন না। একুইটি অফিসারের দায়িত্ব হলো প্রতিটি আবেদনকারীকে সমানভাবে দেখা হচ্ছে কি-না, কাউকে কোনো বাড়তি সুবিধা দেয়া হচ্ছে কি-না, বা কাউকে ধর্ম, বর্ণ, জাতীয়তা, সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন ইত্যাদির বিচারে বাদ দেয়া হচ্ছে কি-না তা দেখা।

কমিটির প্রতিটি সদস্য প্রতিটি প্রার্থির আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করেন। তারপর সবাই একসাথে বসে সবার মতামতের ভিত্তিতে একটি শর্টলিস্ট তৈরি করা হয়। এই শর্টলিস্ট তৈরি করতে অনেক সময় একটি ফরম ব্যবহার করা হয় যেখানে প্রতিটি প্রার্থীর স্কোর করা হয়। এই স্কোরের ভিত্তিতে সাধারণত ৫-৭ জন প্রার্থীকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়। এরপর তাঁদেরকে টেলিফোন ইন্টারভিউয়ের জন্য যোগাযোগ করা হয়।

টেলিফোন ইন্টারভিউকে দ্বিতীয় স্তরের বাছাই বলা চলে। একটি সাধারণ প্রশ্নপত্র থাকে যেখানে ৭-১০টি প্রশ্ন থাকে যা শর্ট লিস্টেড প্রার্থীদের টেলিফোনে জিজ্ঞেস করা হয়। উল্লেখ্য, নিয়োগ প্রক্রিয়ার ইন্টারভিউগুলো প্রথাগত ভাইভা পরীক্ষার মতো নয়। এখানে ইন্টারউভিউতে একজন প্রার্থীকে সাবজেক্ট সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান পরীক্ষা করা হয় না। প্রশ্নগুলো অন্যরকম হয় যার দ্বারা প্রার্থী পদটির জন্য কতোটা যোগ্য বা ফিট, ডিপার্টমেন্ট এবং ইউনিভার্সিটি তাঁর কাছে থেকে কতোটা পেতে পারে, তাঁকে নিলে ডিপার্টমেন্টের প্রয়োজন মিটবে কি-না, এসব জানার চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় প্রার্থী কাগজে-কলমে অনেক শক্ত হয়ে থাকে; কিন্তু টেলিফোন ইন্টারভিউতে দেখা যায় তার কমিউনিকেশন স্কিল ততটা ভালো না কিংবা দেখা গেল বিশেষ একটি যোগ্যতা যেটি পদটির জন্য থাকতেই হবে, প্রার্থীর সেটি নেই, কিংবা সেটিতে প্রার্থী ততটা আগ্রহী নন বা গ্রহণযোগ্যভাবে সেটিকে উপস্থাপন করতে পারলেন না।
সকল প্রার্থীকেই একই প্রশ্ন করা হয় এবং সেই উত্তরগুলোকে অডিওতে রেকর্ড করা হয় কিংবা কাগজে লেখা হয়। সবার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়ে গেলে পরবর্তীতে নিয়োগ কমিটি মিটিঙে বসে তিনজন প্রার্থীকে চূড়ান্ত সাক্ষাৎকারের জন্য বাছাই করা হয়। চূড়ান্ত সাক্ষাৎকারকে সাধারণত ‘ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ’ বলা হয়ে থাকে। এই ধাপে প্রার্থীকে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা হয় এবং তাঁকে দিনব্যাপি সাক্ষাৎকার এবং নানা কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে যাচাই করা হয়।

ক্যাম্পাস সাক্ষাৎকার

টেলিফোনে সাক্ষাৎকার শেষে তিনজন প্রার্থীকে বাছাই করা হয় যাদের ক্যাম্পাসে ইন্টারভিউয়ের জন্য নিয়ে আসা হয়। এক্ষেত্রে সব প্রার্থীকে একইদিন একইসাথে নিয়ে আসা হয় না; বরং একেক প্রার্থীকে আলাদা আলাদাভাবে নিয়ে আসা হয়। ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া এবং থাকা-খাওয়ার খরচ সব ইউনিভার্সিটি বহন করে। প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারের আগের দিন বিকালে নিয়ে আসা হয় এবং ভালো মানের হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। প্রার্থীকে নিয়ে কমিটির দুই বা তিনজন সদস্য ডিনার করেন। মূলত তখন থেকেই সাক্ষাৎকার শুরু হয়। আসলে সাক্ষাৎকার না বলে পর্যবেক্ষণ বলা ভালো; কারণ স্বাভাবিক কাজকর্ম, যেমন ডিনার করা, একসাথে বসে আলোচনা করা এসবের মাধ্যমে প্রার্থীকে ভালো করে চেনা ও জানার সুযোগ হয়। সেই সাথে প্রার্থীর কোনো প্রশ্ন থাকলে সেসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ারও সুযোগ হয়।

ক্যাম্পাস সাক্ষাৎকারের দিনটি কাটে কর্মব্যস্ততায়। এদিন প্রার্থীকে নানাজনের সাথে একাধিক মিটিং করতে হয়। দিনের শুরু হয় সকালের নাশতা দিয়ে। নিয়োগ কমিটির দুইজন সদস্য প্রার্থীকে পূর্ব-নির্ধারিত রেস্তোরাঁয় নিয়ে যান এবং সেখানে নাশতা করা হয়। সেই সাথে হালকা পরিবেশে টুকটাক আলোচনা হয়। প্রার্থীকে ডিপার্টমেন্ট এবং ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়, ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়, ডিপার্টমেন্ট তার কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করে- সেসবও অল্পবিস্তর জানানো হয়। প্রত্যেকটি মিটিংই পূর্ব-নির্ধারিত। নাশতা শেষে প্রার্থীকে নিয়ে ক্যাম্পাসে আসা হয়। ক্যাম্পাসে এসে প্রার্থী নিয়োগ কমিটির সদস্যদের সাথে ফর্মাল মিটিং করেন। অন্যান্য কর্মকাণ্ডের মধ্যে থাকে রিসার্চ প্রেজেন্টেশন, ক্লাস নেয়া, ডিপার্টমেন্টের প্রধানের সাথে মিটিং, ডিন-এর সাথে মিটিং, গ্রাজুয়েট ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে মিটিং, লাঞ্চ, ক্যাম্পাস ও শহর ঘুরে দেখা এবং দিন শেষে হোটেলে ফিরে আসা।

নিয়োগ কমিটির সাথে সাক্ষাৎকারের সময় সব সদস্যের কাছে একটি বিশাল প্রশ্নপত্র থাকে। সেখানে ১০-১২টি প্রশ্ন থাকে যেগুলো একে একে প্রার্থীকে জিজ্ঞেস করা হয় এবং সদস্যরা নোট নিতে থাকেন। খুবই সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে এ আলোচনা শুরু হয়, যেমন, “আপনি কেন এই পদের জন্য আগ্রহী হলেন?” এরপর ধীরে ধীরে বিজ্ঞাপনে যেসব যোগ্যতার উল্লেখ ছিল, সে অনুসারে একের পর এক প্রশ্ন করা হয় এবং সেগুলোর উত্তর নোট করা হয়। সবশেষে প্রার্থীর কোনো প্রশ্ন আছে কি-না তা জিজ্ঞেস করা হয়। প্রশ্নগুলো এমন যে, এর মাধ্যমে ধারণা করা যাবে একজন প্রার্থী নির্দিষ্ট পদের জন্য কতোটা সুইটেবল। এখানে প্রার্থীর যোগ্যতা, কমিউনিকেশন স্কিল, টেম্পারমেন্ট, সিচুয়েশন হ্যান্ডল করার দক্ষতা, আগ্রহ, ব্যক্তিত্ব অ-নে-ক কিছু দেখা হয়। এক কথায় বলা যায়, প্রার্থী কতোটা সুইটেবল, কতোটা ডিপার্টমেন্টের সবার সাথে একসাথে কাজ করতে পারবে, কোনো পারসোনালিটির সমস্যা আছে কি-না- এরকম অনেক নন-অ্যাকাডেমিক এবং বিহেভিওরাল জিনিসও দেখা হয়। এই মিটিংটি সাধারণত এক ঘণ্টার মতো হয়ে থাকে। মিটিংয়ে সবাই একটি করে প্রশ্ন করেন অথবা কমিটির প্রধানই সব প্রশ্ন করেন। তবে যেভাবেই মিটিংটি পরিচালনা করা হোক না কেন, সব প্রার্থীর জন্য তা একইভাবে পরিচালিত হয়। একুইটি অফিসার এই মিটিংয়ে থাকেন, তবে তিনি কোনো প্রশ্ন করেন না। তিনি শুধু দেখেন প্রার্থীকে কমিটির সদস্যরা ফেয়ারলি ট্রিট করলেন কি-না।

ক্যাম্পাস সাক্ষাৎকারের পরবর্তী ধাপে প্রার্থী তার রিসার্চ প্রেজেন্টেশন দেন। এটি রিসার্চ টক। প্রার্থী তার রিসার্চ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটিকেই উপস্থাপন করেন। এসময় কমিটির সদস্য, ছাত্র-ছাত্রী, অন্য ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টি এবং আগ্রহী যে কেউই উপস্থিত থাকতে পারে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রার্থীকে কোনোভাবেই হ্যারাস করা হয় না বা কেউ কোনো উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করে প্রার্থীকে হয়রানি করার চেষ্টাও করে না। এমনকি প্রার্থী নার্ভাস হয়ে যদি কোনো উত্তর সঠিক নাও দেয়, তাহলেও তাকে সবার সামনে নাস্তানাবুদ করার সামান্যতম চেষ্টাও করা হয় না। এটি উল্লেখ করলাম এ কারণে যে, আমি বাংলাদেশে একবার দেখেছিলাম কীভাবে একজন অতিথি গবেষককে সেমিনারে নাস্তানাবুদ করা হয়েছিল। সেটি চিন্তা করলেই আমার লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে আসে।

রিসার্চ টকের পর হয়তো লাঞ্চ করা হয়, অথবা সময় থাকলে গ্র্যাজুয়েট ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে উন্মুক্ত মিটিং হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা তার সাথে নানা বিষয়ে কথা বলে। তার গবেষণার ক্ষেত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করে, প্রার্থী যদি শেষ পর্যন্ত নিয়োগ পান, সেক্ষেত্রে তার সাথে গবেষণা করার বিষয় নিয়েও অনেক সময় কথা বলা হয়।

অনেক ইউনিভার্সিটিতে প্রার্থীকে ক্লাস নিতে বলা হয়। সেটি ডামি ক্লাস হতে পারে যেখানে শুধু নিয়োগ কমিটির সদস্যরা শিক্ষার্থী হিসেবে উপস্থিত থাকেন। আবার প্রকৃত ক্লাসও হতে পারে। প্রার্থীকে কোন ধরনের ক্লাসে ক্লাস নিতে হবে তা আগে থেকেই জানিয়ে দেয়া হয় এবং অনেক সময় টপিকও বলে দেয়া হয়। প্রার্থীকে ২০-২৫ মিনিটের লেকচারের প্রস্তুতি নিয়ে আসতে বলা হয়। আমি দুটো ইউনিভার্সটিতে নিয়োগ পেয়েছিলাম। একটিতে রিসার্চ টক এবং দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাসে পড়াতে হয়েছিল। আরেকটিতে কোনো ডেমো ক্লাস নিতে হয়নি; শুধু রিসার্চ টক দিতে হয়েছিল। সাধারণত টিচিং এমফ্যাসিস থাকলে ডেমো ক্লাস নিতে দেয় আর রিসার্চ এমফ্যাসিস থাকলে বা আন্ডারগ্র্যাড লেভেলে না পড়াতে হলে ডেমো ক্লাস নিতে হয় না। তবে লেকচারার পজিশনের ক্ষেত্রে টিচিং টক বা ডেমো ক্লাস দিতেই হয়; কেননা লেকচারার পজিশনের মূল কাজই হলো পড়ানো।

এর পর থাকে ডিপার্টমেন্ট হেড বা চেয়ার এবং ডিনের সাথে আলাদা আলাদা মিটিং। এই মিটিংগুলো গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় ডিপার্টমেন্টের হেড-এর ওপর দায়িত্ব থাকে যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচন করার এবং চাকুরি অফার দেয়ার। অনেক সময় ডিন এ কাজ করেন। নিয়োগ কমিটি ক্যাম্পাস ইন্টারভিউয়ের পরে তিনজন প্রার্থীর ভালো দিক এবং দুর্বল দিকগুলোর একটি সারাংশ তৈরি করে তা ডিপার্টমেন্ট হেড বা ডিনের কাছে পাঠায়। ডিন সিদ্ধান্ত নেন কাকে অফার দেয়া হবে। ডিন বা হেড-এর সাথে প্রার্থীর মিটিঙে তাঁরা অনেক সময় স্যালারির কথা জানান। অ্যাকাডেমিয়াতে (আমার জানামতে) কখনোই জিজ্ঞেস করে না আপনি কতো বেতন আশা করেন যা যেকোনো কোম্পানির চাকুরির ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। অ্যাকাডেমিয়াতে একটি নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো থাকে যেটি যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অফার করা হয়। এই মিটিংয়ে প্রার্থীকে কোন সেমিস্টারে কয়টি ক্লাস নিতে হবে বা কতটুকু রিসার্চ গ্র্যান্ট বাইরে থেকে আনতে হবে, এসব নিয়ে আলোচনা হয়। উল্লেখ্য যে, এই মিটিং কিন্তু বেতন বা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নেগোশিয়েশনের মিটিং নয়। নেগোশিয়েশন করতে হয় অফার দেয়ার পর।

ফাইনাল অফার

ডিন কিংবা ডিন এবং হেড মিলে যোগ্য প্রার্থিকে বাছাই করেন। এরপর প্রথানুযায়ি ফোনে প্রার্থীর সাথে যোগাযোগ করে অফার দেয়া হয়। তখন স্যালারি এবং কী কী সুবিধা দেয়া হবে, সেগুলো প্রার্থীকে জানানো হয়। প্রার্থীকে ৩ থেকে ৭ দিন সময় দেয়া হয় তার সিদ্ধান্ত জানাতে। এটি হলো নেগোশিয়েশনের সময়। প্রার্থী স্যালারি আরেকটু বেশি চাইতে পারেন, স্টার্টআপ মানি বেশি চাইতে পারেন, ট্রাভেল মানি চাইতে পারেন, রিলোকেশন খরচ বেশি চাইতে পারেন ইত্যাদি। অনেক সময় তারা যোগ্য প্রার্থীকে ধরার জন্য প্রার্থীর চাহিদা মোতাবেক অফার পরিবর্তন করেন। আবার অনেক সময় খুব বেশি পরিবর্তন বা পরিবর্ধনের সুযোগ থাকে না। সেক্ষেত্রে তারা সরাসরি বলে দেন যে, আমরা এতটুকু বাড়াতে পারি। পুরো ব্যাপারটি খুবই হৃদ্যতার সাথে সুন্দরভাবে নেগোশিয়েট করা হয়। এখানে দরদামের মতো সেরকম কিছু করা হয় না।

প্রার্থী অনেক সময় অফার গ্রহণ করেন না। সেক্ষেত্রে ডিন বা হেড ইচ্ছে করলে দ্বিতীয় নির্বাচিত প্রার্থীকে অফার দিতে পারেন, আবার নাও পারেন। এটা নির্ভর করে দ্বিতীয় প্রার্থী কতোটা যোগ্য তার ওপর। অনেক সময় এমন হয় যে, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে কোনো যোগ্য প্রার্থীই পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে নতুন করে পুনরায় নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়।

এ পর্বটি এখানেই শেষ করছি। পরবর্তীতে শিক্ষক পদের আবেদনে কীভাবে নিজের সফলতার সম্ভাবনাকে বাড়ানো যায় এবং নিয়োগের পরে একজন নতুন শিক্ষককে কী কী প্রক্রিয়া এবং প্রশিক্ষণের মধ্যদিয়ে যেতে হয়, তা নিয়ে লেখার ইচ্ছা রাখছি।

ড. এনায়েতুর রহীম: ইউনিভার্সিটি অব নর্দার্ন কলোরাডোতে ফলিত পরিসংখ্যানের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

2 মন্তব্য

মন্তব্য লিখুন