শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা শিক্ষা ও নৈতিকতা

শিক্ষা ও মানুষের চাওয়া-পাওয়া

শিক্ষা
লিখেছেন গৌতম রায়

শিক্ষা ও মানুষের চাওয়া-পাওয়া অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রত্যেক সন্তানের মাতাপিতাকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায়—  সন্তানের ব্যাপারে আপনার চাওয়া কী? হয়তো আমার মতোই বলবে, “সন্তান যেন মানুষের মতো মানুষ হয়”।

কিন্তু বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আমাদের এই চাওয়াটি তথাকথিত চাওয়া; প্রকৃত নয়। মনে হতে পারে, মানব সন্তানকে আবার মানুষ হতে হবে কেন? সে তো মানুষই! প্রকৃতপক্ষে মানুষই একমাত্র প্রাণী যাকে আবার নতুন করে মানুষ হতে হয়। অর্থাৎ তার ভেতরে যে মনুষ্যত্ব আছে, তাকে তৈরি করে নিতে হয়। আর এজন্যই বোধ করি মানুষের জন্য শিক্ষা দরকার, অন্য প্রাণীর জন্য নয়।

প্রবাদ আছে, “বাপে বানায় ভূত আর শিক্ষক বানায় পুত”। আরও একটি কথা আছে, “প্রাণ থাকলে প্রাণী হয়, কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না”। এ-থেকে এটিই বোঝা যায় যে, সব মানুষের ভেতর মানবসুলভ মন থাকে না। এটি অর্জন করতে হয়। মানুষকে মানুষ হতে হয় যার মাধ্যম হবে শিক্ষা।

জন্মগত দিক থেকে মানব শিশু ও অন্য প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য অনেক। অন্য সকল প্রাণী জন্মগতভাবেই তার নিজস্ব মৌলিকতা নিয়ে জন্মায়। কোনো মাংসাশী প্রাণীর বাচ্চা ভুল করে যেমন ঘাস খায় না, তেমনি কোনো তৃণভোজী প্রাণীর বাচ্চা ভুল করে মাংস খায় না।

ছোট একটি মুরগির বাচ্চাও জানে কে তার শত্রু, কে নয়। কাক, চিল, বাজ ইত্যাদি দেখে লুকিয়ে যায়। অর্থাৎ এগুলোর সবই তার স্বভাবজাত, নতুন করে এগুলো তাকে শিখতে হয় না। কিন্তু মানবশিশু জানে না কী তার খাদ্য। সামনে যা পায় তাই সে মুখে দেয়, এমনকি নিজের বিষ্ঠাও। জানে না কে তার শত্রু, কোনটি উপকারি আর কোনটি ক্ষতিকর।


আমরা আসলে কি আমাদের সন্তানকে মানুষ বানাতে চাই? নাকি আমাদের চাওয়া অন্য কিছু? কারণ মানুষের চাওয়ার সাথে তার কর্মের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যে মাছ কিনতে চায়, সে মাছের বাজার যায়। যে জুতা কিনতে চায়, সে জুতার দোকানে যায়; ফল চাইলে যায় ফলের দোকানে। আবার যে ভালোটা কিনতে চায়, সে কেনার সময় যথাসম্ভব যাচাই করে কেনে। আমরা কি কখনও যাচাই করে দেখছি যে, আমাদের সন্তানের কাছ থেকে আমাদের চাওয়াটা কী?


মানুষ ও অন্য প্রাণীর আচরণের মধ্যেও যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে, তার মূলে হলো মানুষ মানবিক গুণাবলী-সম্বলিত প্রাণী। সন্তানের প্রতি মায়ের যে ভালোবাসা, তা সব প্রাণীর মধ্যেই চিরন্তন। কিন্তু ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা, দয়া, করুণা, ত্যাগ, পরোপকার ইত্যাদি গুণাবলী শুধু মানুষের জন্যই সম্ভব। অন্যভাবে বলা যায়, এসব গুণাবলী অর্জনের মধ্যদিয়েই মানুষ হতে পারে ‘মানুষ’।

এখন একটু ভেবে দেখি, আমরা আসলে কি আমাদের সন্তানকে মানুষ বানাতে চাই? নাকি আমাদের চাওয়া অন্য কিছু? কারণ মানুষের চাওয়ার সাথে তার কর্মের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যে মাছ কিনতে চায়, সে মাছের বাজার যায়। যে জুতা কিনতে চায়, সে জুতার দোকানে যায়; ফল চাইলে যায় ফলের দোকানে। আবার যে ভালোটা কিনতে চায়, সে কেনার সময় যথাসম্ভব যাচাই করে কেনে। আমরা কি কখনও যাচাই করে দেখছি যে, আমাদের সন্তানের কাছ থেকে আমাদের চাওয়াটা কী?

বর্তমান শিক্ষা নিয়ে আমি খুব গভীরভাবে দেখেছি, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, কর্মকর্তা সকলের একটিই চাওয়া— ভালো রেজাল্ট। যার মানে হচ্ছে বেশি নম্বর এ, এ গ্রেড ইত্যাদি। শিক্ষার্থী তার পঠিত বিষয় থেকে কী শিখল, কতটা অর্জন করল, তার জীবনে অর্জিত জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটলো কি-না, তা কেউই আমরা যাচাই করি না।

আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য হয়ে গেছে সনদ অর্জন। আমি নিজে অনেক অভিভাবককে দেখেছি, ছেলে বা মেয়ে ভালো নম্বর পেয়েছে বলে এত খুশি হয়েছে যে সবাইকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে, ছেলেকে বা মেয়েকে পুরস্কৃত করছে। আবার যে কম নম্বর পেয়েছে, তার মাকে সেখানেই তাকে মারতে দেখেছি।

কিন্তু এই দুই অভিভাবকের কাউকেই তাদের ছেলে বা মেয়ে বিদ্যালয়ের লেখাপড়া থেকে অর্জিত জ্ঞানের কতটুকু তার উপলব্ধিতে জায়গা নিল, তার আচরণের কী পরিবর্তন হল, পঠিত বিষয় হতে সে কী কী গুণাবলী অর্জন করল ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে দেখিনি।

বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণিতে পাঠের বিষয়বস্তুর নির্বাচনের দিকে একটু লক্ষ্য করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। সব বিষয়ের কথা বাদ দিয়ে বাংলা বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য করি। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেখা যাক। আমি নিজে যতগুলো কবিতা পড়েছিলাম তার কিছু কিছু উল্লেখ করছি:

“সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি

সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি

আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে

আমি যেন সেই কাজ করি ভাল মনে।

ভাই বোন সকলেরে যেন ভালবাসি

এক সাথে থাকি যেন সবে মিলেমিশি

ভাল ছেলেদের সাথে মিশে করি খেলা

পাঠের সময় যেন নাহি করি হেলা।

সুখী যেন নাহি হই আর কারও দুখে

মিছে কথা কভু যেন নাহি আসে মুখে।

সাবধানে যেন লোভ সামলিয়ে থাকি;

কিছুতে কাহারে যেন নাহি দেই ফাঁকি।

ঝগড়া না করি যেন কভু কারোও সনে,

সকালে উঠিয়া এই বলি মনে মনে।”

শুধু এই একটি কবিতার বিষয়বস্তুও যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কৃতকার্য শিশুরা অনুধাবন করে এই গুণগুলো অর্জন করতে পারত বা আমরা করাতে পারতাম, তবে সোনার মানুষে দেশ ভরে যেত। এ ধরনের আরও কত শত কবিতাই না পাঠ্যবইয়ে আছে যার কিছু অংশ তুলে ধরছি:

“কুকুর আসিয়া এমন কামড় দিল পথিকের পায়…

কুকুরের কাজ কুকুর করেছে কামড় দিয়েছে পায়, তাই বলে

কুকুরকে কামড়ান কি মানুষের শোভা পায়?”

“পাকা হোক তবু ভাই পরেরও বাসা

নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা।”

“যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি

আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশিথে প্রদীপ ভাতি।”

“আপনাকে বড় বলে বড় সেই নয়

লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়

কিংবা

“আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে

কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।

মুখে হাসি বুকে বল তেজে ভরা মন

‘মানুষ হতেই হবে’ এই যার পণ।”

এসব কবিতা নির্বাচনের উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীর মধ্যে যাতে এসব উপলব্ধি জাগ্রত হয় এবং তারা যেন এসব গুণ অর্জন করে প্রকৃত মানুষ হতে পারে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা এসব শেখাই পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য। শিশুরাও খাতায় লিখে বাংলায় ১০০-তে ১০০ বা ৯৯ নম্বর পাওয়ার জন্য; কিন্তু সেই শিশুর জীবনে এসব গুণাবলির দশ শতাংশও থাকে না। এসব গুণ অর্জিত হলো কি-না তা আমরা কেউ যাচাই করেও দেখি না।

আমাদের চাওয়া তো আসলে ছেলেমেয়ে লেখাপড়া শিখে বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অফিসার হবে। ভালো মানুষ হবে এটা তথাকথিত চাওয়া, প্রকৃত চাওয়া নয়। তাই আমাদের চাওয়া যেমন, পাওয়াও হচ্ছে তেমন। লেখাপড়া শিখে ভালো নম্বর পেয়ে আমাদের দেশ ও সমাজে অনেক দক্ষ, জ্ঞানী, বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, বড় কর্মকর্তাও হয়েছে কিন্তু সেই হারে উল্লিখিত মানুষগুলো সৎ, গুণী, দয়ালু, নীতিবান ও ভালো মানুষ হতে পেরেছে কি?

দেশের গরীব জনসাধারণ টাকার অভাবে ভালো ও বড় ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করাতে পারে না। রোগীদের প্যাথলজিক্যাল টেস্টের ব্যাপারে ডাক্তারদের অতি আগ্রহের পেছনে রয়েছে মোটা অংকের কমিশন। ওষুধ কোম্পানির সাথে বাণিজ্য হচ্ছে এর চেয়েও ভয়াবহ আকারে।

এমন কিছু ঘটনা নিজ কানে শুনেছি যে শুধু টাকার কারণে অপারেশন করানো হয়েছে। রোগীর মৃত্যর পরও মৃতদেহকে অপারেশন করা হয়েছে শুধু টাকার আশায়। এসব ঘটনা অনেক না হলেও একেবারে বিরল নয়; অথচ ডাক্তারির মতো একটি মহৎ পেশা এতো নোংরা হয়ে গেছে ডাক্তারদের দক্ষতা বা জ্ঞানের অভাবে নয়; বরং তাদের সুন্দর মনমানসিকতার অভাবের কারণে।

একজন ডাক্তারের ভেতরে যদি একজন ডাকাতের মন থাকে, তবে সে ডাকাতের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর। ডাকাত যদি কাউকে মেরে ফেলতে চায় তার সামনে অনেক বাধা থাকে। তার ধরা পড়ার ভয় আছে, প্রতিরোধের ভয় আছে, বিচার ও সাজা পাবার ভয় আছে।

পক্ষান্তরে একজন ডাক্তার যদি কাউকে হত্যা করতে চায়, তবে তার সম্মুখে এসব বাধা নেই। তিনি শুধু স্বজ্ঞানে একটি ভুল ওষুধ প্রয়োগ করলেই রোগীর দফারফা হয়ে যাবে। তাই ডাক্তারের চাই সুন্দর মন, সেবার মানসিকতা, অন্যের উপকারের ইচ্ছা। তাই ডাক্তারকে শুধু শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ করে তুললেই হবে না; শিক্ষার মাধ্যমে তাকে সুন্দর মানুষও বানাতে হবে।

আজ আমাদের দেশের উন্নয়নের একটি বড় ক্ষেত্র হচ্ছে রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, সরকারি অফিস-আদালত, বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ ইত্যাদি। এসব উন্নয়নকাজ সরাসরি ইঞ্জিনিয়ার তত্ত্বাবধান করেন।

কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের অনেক দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার রয়েছে; কিন্তু এদেশে সরকারি অবকাঠামোগুলোর কী যে করুণ অবস্থা তা সবার জানা। বিদ্যালয় ভবন, সরকারি অফিস-আদালত বা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য সরকার যে টাকা বরাদ্দ দেয়, তাতে অন্তত এসব ভবন যেমন সুন্দর হবার কথা; তেমনি টেকসইও হওয়ার কথা।

শুধু প্রাথমিক শিক্ষার বিদ্যালয় ভবনগুলোকে এখানে উদাহরণ হিসেবে নিলে যথেষ্ট হবে। ইঞ্জিনিয়াররা সার্টিফিকেট দেওয়ার পর ভবন হস্তান্তর হয় কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে, দরজা জানালা ঘুণে ধরে, পলেস্তারা খসে পড়ে। যে ভবন ত্রিশ বছরেও কিছু হওয়ার কথা নয়; তা তিন বছর যেতে না যেতেই পুরাতন ভবনে পরিণত হয়।

এসব নিম্নমানের কাজের ব্যাপারে অনেক ফ্যাক্টর জড়িত থাকলেও আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের অসুন্দর মন অর্থাৎ তাদের অসততা ও লোভ যে অন্যতম ফ্যাক্টর তা মানতেই হবে। এখানেও প্রমাণিত হয়, দক্ষতা অর্জিত হলেও শিক্ষার দ্বারা ভালো মানুষ কিন্তু তৈরি হচ্ছে না। যে সৎ হবে, আমানতদার হবে, পরোপকারী হবে, মানবকল্যাণে সে কাজ করবে।

অনুরূপভাবে, অনান্য প্রায় সকল পেশায় ও চাকুরিতে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও একটি বড় অংশের একই অবস্থা। আমাদের দেশ যে দুর্নীতিতে কয়েকবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তা কিন্তু আমাদের নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডে নয়; বরং যারা উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন বড় ও দায়িত্বশীল পদে আছেন তাদের কর্মফলের প্রাপ্তি এটি।


যদিও আমরা বলি শিক্ষার মাধ্যমে আমরা মানুষ হতে চাই, কিন্তু প্রত্যেকের সম্মুখে আসল চাওয়া ভালো নম্বর ও একটি সার্টিফিকেট পাওয়া। আর যখনই আমাদের চাওয়া হবে সার্টিফিকেট ও নম্বর; তখনই মানুষ নীতিনৈতিকতা ও সততা থেকে দূরে চলে যাবে।


আমাদের এ শিক্ষার দ্বারা যদি প্রকৃত ভালো মানুষ তৈরিতে আমরা সফল হতাম, তাহলে আমাদের উন্নতি নিশ্চিত হতো। এটা স্বীকার করতেই হবে, সবক্ষেত্রে এখন ভালো মানুষের অভাব, মানুষের মতো মানুষের অভাব। এখন দেখা যাক আমাদের প্রত্যেকের চাওয়া কী?

যদিও আমরা বলি শিক্ষার মাধ্যমে আমরা মানুষ হতে চাই, কিন্তু প্রত্যেকের সম্মুখে আসল চাওয়া ভালো নম্বর ও একটি সার্টিফিকেট পাওয়া। আর যখনই আমাদের চাওয়া হবে সার্টিফিকেট ও নম্বর; তখনই মানুষ নীতিনৈতিকতা ও সততা থেকে দূরে চলে যাবে।

বাস্তবতা ও প্রকৃত শেখা যখন শিক্ষার্থীর চাওয়া হবে, তখন সেখানে নকল করার প্রবণতা থাকবে না। থাকবে না প্রশ্নপত্র ফাঁস করার আকাঙ্ক্ষা বা থাকবে না সাজেশনের জন্য প্রাইভেট ও কোচিঙের রমরমা ব্যবসা। আজ এসব ব্যবসার আয়োজন শিক্ষার্থীদের শেখাবার জন্য নয়; বরং তাদেরকে একটি ভালো সার্টিফিকেট পাইয়ে দেওয়া ও বেশি নম্বর পাওয়া।

শিক্ষার্থী শিখল কি-না, ভালো মানুষ হলো কি-না, তা আমরা কেউ দেখি না। শুধু ভালো রেজাল্টের আশায় অনেক অভিভাবককে দেখেছি তদবির করতে। তাদের ছেলে বা মেয়ে না শিখলেও ভালো নম্বর ভালো পেলেই সন্তুষ্ট!

আসলে আমরা যে সার্টিফিকেট চাই, তা চাই চাকুরি পাওয়ার যোগ্যতা হিসেবে। চাকুরি করতে পারার যোগ্যতা হিসেবে নয়। তাই সার্টিফিকেট দেখিয়ে আবেদনের যোগ্যতা পূর্ণ করে আবেদন করাতে পারলেই চলবে। পরে চাকুরি যেকোনোভাবে হোক যেমন, তদবির, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদির মাধ্যমে হয়ে যাবে। টাকা কামাই করা যাবে।

আমরা যে আসলে লেখাপড়া করে চাকুরি চাই, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়ে কর্ম চাই, তা সবক্ষেত্রে বলা চলে না। আমরা আসলে চাই টাকা। এমনকি আমাদের অনেকের অভিভাবকও চান তাদের সন্তান পয়সাওয়ালা হবে ও অনেক বড়লোক হবে। বাস্তবিক ক্ষেত্রেও হয়তো সন্তানের অনেক টাকাপয়সা হয়, কিন্তু অনেকক্ষেত্রে সুন্দর মন হয় না।

একটি উদাহরণ দিই। এক মায়ের ছেলে ডাক্তার হয়েছে এবং অল্প পয়সার ও গরীবদের বিনাপয়সায় চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। তার বাবা-মা সন্তানের ব্যাপারে হতাশা প্রকাশ করছে যে, এজন্য কি তোকে ডাক্তার বানালাম? তুই কোনো টাকা কামাই করিস না। ডাক্তার তো এ জন্য বানাতে চেয়েছিলাম যে, তোরও বড় বাড়ি হবে, গাড়ি হবে, অনেক টাকা হবে।

এ বক্তব্য শুধু ডাক্তারের মা-বাবার নয়, বেশিরভাগ সন্তানের মা বাবার; যার সন্তান হয়ত ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, কিংবা হয়েছে বড় কোনো কর্মকর্তা। আবার আমাদের চাকুরি পাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে বর্তমানে ঘুষ প্রদান ও গ্রহণের ব্যাপারটা এতই বেড়েছে যে চাকুরিতে ঢুকতেই যখন কয়েক লাখ টাকা দিয়ে ঢুকতে হচ্ছে, তখন চাকুরিটি যে জনসেবা বা কাজ করার জন্য নয়; বরং টাকা কামাই করার জন্য তাই প্রমাণ করে।

এসবের ফল হিসেবে আজ সবাই টাকা কামানোর দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সেটি ন্যায়ভাবে হোক বা অন্যায়ভাবে। তাই বর্তমানে আমরা ভালো মানুষের সঙ্কটে পড়ে যাচ্ছি।

তাই বর্তমান সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় দরকার আমাদের চাওয়ার মধ্যে পরিবর্তন। আমাদের চাওয়া সঠিক না হলে পাওয়ার মধ্যে সঠিক ও সুন্দরের আশা করা যায় না। ‘সন্তান আমার মানুষের মত মানুষ হোক’ এই চাওয়া শুধু মুখে না বলে মনেপ্রাণেই চাইতে হবে। আজ আমাদের ভুল চাওয়ার কারণেই সন্তান বড় অফিসার হয়, কিন্তু বাবা-মার দুঃখ বোঝে না। বর্তমানে নচিকেতার একটি গান এই চরম সত্যের দর্পণ:

“ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার

মস্ত ফ্লাটে যায় না দেখা এপার-ওপার

নানারকম জিনিস আসবাব দামি-দামি

সবচেয়ে কম দামি ছিলাম একা আমি মাত্র

ছেলের আবার আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম

আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম…”

আজ আমরা যে শিক্ষার্থী বেশি নম্বর পায়, তাকে পুরস্কৃত করছি। যে বিদ্যালয়ে বেশি এ+ পায়, সেটি আমাদের কাছে ভালো বিদ্যালয়। যে কোচিং থেকে মেডিকেল, বুয়েট, বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি ভর্তি হতে পারে, সেখানে অনেক টাকা খরচ করেও মা-বাবা তার আদরের সন্তানকে ভর্তি করাচ্ছে। অথচ এটা দেখছি না— সন্তানটি সুন্দর মনের মানুষ হচ্ছে কিনা।

আমরা যদি আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলামের ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতাকে পর্যালোচনা করে দেখি, তাহলে সেখানেও দেখা যাবে যে, নিম্নলিখিত যোগ্যতাগুলো মানুষের মানবীয় গুণাবলীর বিকাশের সাথে সম্পর্কিত।

  • (১) সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’য়ালা/সৃষ্টিকর্তার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন, সকল সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসায় উদ্দীপ্ত হওয়া।
  • (২) নিজ নিজ ধর্ম প্রবর্তকের আদর্শ এবং ধর্মীয় অনুশাসন অনুশীলনের মাধ্যমে নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলি অর্জন করা।
  • (৩) সকল ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
  • (১৩) মানবাধিকার, আন্তর্জাতিকতাবোধ, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বসংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী ও শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
  • (১৪) স্বাধীন মুক্ত চিন্তায় উৎসাহিত হওয়া এবং গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি অনুশীলন করা।
  • (১৫) নৈতিক ও সামাজিক গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমে ভাল-মন্দের পার্থক্য নিরুপণ এবং তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা।
  • (১৮) অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়ার মাধ্যমে ত্যাগের মনোভাব অর্জন এবং পরমতসহিষ্ণুতা সচেতন হওয়া।
  • (২১) নিজের কাজ নিজে করা এবং শ্রমের মর্যাদা দেওয়া।
  • (২২) প্রকৃতি, পরিবেশ ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে জানা ও ভালোবাসা এবং পরিবেশের উন্নয়ন ও সংরক্ষণে উদ্বৃদ্ধ হওয়া।
  • (২৭) মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত হওয়া এবং ত্যাগের মনোভাব গঠন ও দেশ গড়ার কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা।
  • (২৮) জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
  • (২৯) বাংলাদেশকে জানা ও ভালোবাসা।

অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, উল্লিখিত প্রান্তিক যোগ্যতাগুলো আদৌ অর্জিত হচ্ছে কি-না, তা আমরা শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের কেউই মূল্যায়ন করছি না বা মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করছি না। তাই শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থী ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান ইত্যাদিতে ভালো করলেও জীবনযুদ্ধে যে মানবিক গুণাবলীসমূহ প্রয়োজন তা অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে।

আমরা কর্মে নিয়োজিত হচ্ছি, দেশ ও সমাজের সদস্য হচ্ছি; কিন্তু আমার দ্বারা মানবতা উপকৃত হচ্ছে না। দেশকে ভালোবাসা, দেশের মানুষকে ভালোবাসা, ত্যাগের মহৎ গুণাবলী থেকে আমরা শূন্য। নিজের লোভ-লালসাকে সংবরণ করার ক্ষমতা অর্জনের পরিবর্তে জ্ঞানবুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে মানব কল্যাণের বদলে নিজ ইচ্ছাকে চরিতার্থ করতে আমরা পটু। নিজের কামনা-বাসনাকে পূর্ণ করতে যেকোনো হেন কাজে আমাদের বাধে না, বিবেকের তাড়না আমাদের নেই।

আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক বেঞ্জামিন ব্লুম তাঁর শিখনতত্ত্বে শিখনের উদ্দেশ্যসমূহকে প্রথমত ৩টি ক্ষেত্রে ভাগ করেছেন: (১) জ্ঞানমূলক ক্ষেত্র; (২) অনুভূতিমূলক ক্ষেত্র ও (৩) মনোপেশীজ ক্ষেত্র।

আমরা সাধারণত শিক্ষার মাধ্যমেও এই তিনটি ক্ষেত্রের উন্নতি চাই। তা হলো: জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি।

কিন্তু বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আমাদের চাওয়াপাওয়া শুধু জ্ঞান ও দক্ষতা— এই দুটো ক্ষেত্রেই ঘুরপাক খাচ্ছে। লেখাপড়া শেষ করে যারা কর্মে নিয়োজিত হচ্ছে, তা চাকুরি হোক, ব্যবসা হোক বা অন্যকিছু, সবার মাঝে জ্ঞান ও দক্ষতার কমতি না থাকলেও দৃষ্টিভঙ্গি তথা মানবীয় গুণাবলীর বড় অভাব রয়েছে।

তাই তো চাকুরিজীবির সাথে অসৎ, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ বিশেষণগুলো যুক্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীর সাথে যুক্ত হচ্ছে অসাধু, ধোঁকাবাজ, লোভী ইত্যাদি শব্দ যা আমাদের মনুষ্যত্ব অর্জনের দৈন্যতাকে প্রকাশ করছে।

বেশ কিছুদিন আগে ভারতের রায়বেরিলির এক জনসভায় প্রিয়াঙ্কা গান্ধী যে বক্তব্য দিলেন, তার কথার মাঝেও শিক্ষার দ্বারা যে ভালো মনের মানুষ তৈরি করাই প্রথম চাওয়া হওয়া উচিৎ তা বুঝা যায়। তিনি বলেছিলেন, “দেশ চালাতে গেলে ৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতির প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন এক দয়ালু মনের, যে মন মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হতে পারে, যা মানুষের সামান্য চাহিদা মেটাতে পারে।”

তাই আজ আমাদের চাওয়ার মধ্যে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। আমার সন্তানটিকে যেন শুধু জ্ঞানী, দক্ষ, কর্মকর্তা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সম্পদশালী বা বড়লোক বানাতে না চাই; বরং পাশাপাশি সে যেন সৎ, দয়ালু, স্নেহময়, মমতাময়, নির্ভিক, উদার, ক্ষমাশীল, ত্যাগী, দেশপ্রেমী ও সুনাগরিকের গুণাবলীসম্পন্ন সুন্দর মানুষ হয়। তাই বিদ্যালয়ে শুধু কত নম্বর পেলো, তা না দেখে তার মধ্যে বিষয়বস্তুর উপলব্ধি কতটুকু এল, তার আচরণে কতটুকু পরিবর্তন এল, সে কতটা সভ্য ও সুন্দর হলো, সে দিকেও শিক্ষকদেরকে লক্ষ্য রাখতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে অভিভাবককেও।

শিক্ষার মাধ্যমে সুন্দর জাতি গঠনের যে স্বপ্ন আমরা দেখি, তার বাস্তবায়ন চাইলে আমাদের সকলকে প্রথমে আমাদের চাওয়াকে সুন্দর করতে হবে। তবেই আমাদের প্রাপ্তি অনেক সুন্দর হবে।

মোঃ রেজাউল হক: জয়পুরহাট প্রাইমারি টিচার ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) সুপারিনটেনডেন্ট পদে কর্মরত। তিনি ২০১৩ সালে জাতীয় পর্যায়ে দেশের শ্রেষ্ঠ সুপারিনটেনডেন্ট নির্বাচিত হন।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

মন্তব্য লিখুন

nine + eighteen =