উচ্চশিক্ষা

সান্ধ্যকালীন কোর্স: নৈতিকতা বনাম বাস্তবতা

সান্ধ্যকালীন কোর্স; ছবিসূত্র: ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি
সান্ধ্যকালীন কোর্স; ছবিসূত্র: ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি
লিখেছেন গৌতম রায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে পরিচালিত সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়ে সমালোচনায় মহামান্য রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের অব্যবহিত পরেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তড়িঘড়ি এসব কোর্স বন্ধ ও নতুন বিভাগ খোলার ক্ষেত্রে যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন তা নিয়ে উচ্চশিক্ষার সাথে জড়িত সকল পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যেই আলোচনার ঝড় চলছে গত ক’দিন ধরে।

এই আলোচনা বা সমালোচনা কোনোটিই যেমন অমূলক নয়, তেমনি পক্ষ-বিপক্ষের কোনো যুক্তিই অবহেলা করার মতো নয়। তবে উচ্চশিক্ষার দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অভিভাবকত্বের গুণ ও মান নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটি একটি ভালো দিক। যদিও পুরো ঘটনায় এই কমিশনের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে স্বাধীনভাবে কাজ করার চেয়ে রাজনৈতিক সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর প্রবণতা আরো একবার প্রকাশ্যে প্রতীয়মান হলো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে মহামান্য আচার্য্য সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়ে নীতিগত যে সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন সেটি যেমন সর্বৈব সত্য, তেমনি এও সত্য যে, এই একই অভিযোগ প্রতিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রযোজ্য; যদিও সেখানে অবস্থার পরিবর্তনে সরকার বা মঞ্জুরি কমিশনের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। সেসব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শুধু পেশাগত কোর্স নয়, উচ্চশিক্ষার মূল ধাপ সম্মান শ্রেণির পড়াশোনাকেই বড় আপোষের জায়গা হিসেবে তৈরি করেছে।

সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কি তা জানে না? অবশ্যই সরকারি অর্থে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বা প্রত্যাশা থাকাই স্বাভাবিক, তবে বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবনার আদলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব আয় বাড়িয়ে সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর যে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে, তাতে কি শিক্ষার বেসরকারিকরণকেই উৎসাহিত করা হয়নি? এতো এতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন কি বর্ধিত মূল্যে শিক্ষা বিক্রির অনুমতি নয়? সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলোর প্রতি হঠাৎ বিরাগ এবং তড়িঘড়ি করে এগুলো বন্ধের ঘোষণা কি পরস্পরবিরোধী নয়?


সরকারি অর্থে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বা প্রত্যাশা থাকাই স্বাভাবিক, তবে বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবনার আদলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব আয় বাড়িয়ে সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর যে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে, তাতে কি শিক্ষার বেসরকারিকরণকেই উৎসাহিত করা হয়নি? এতো এতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন কি বর্ধিত মূল্যে শিক্ষা বিক্রির অনুমতি নয়?


নীতিগত দিকটি বাদেও আর্থিক যে বিষয়টি সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলোর সাথে জড়িত, সেটি এই আলোচনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ; কেননা রাষ্ট্রপতি গুটিকয়েক বয়োঃজ্যেষ্ঠ্য শিক্ষকের আর্থিক লাভের বিষয়টিও উল্লেখ  করেছেন। এটি সত্যি যে, এসব কোর্স সাধারণত জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বণ্টিত হয় এবং জ্যেষ্ঠ্য শিক্ষকরাই বেশি লাভবান হন। এটি যদি পুনর্বিবেচনা করা হয়, তাহলে হয়তো কনিষ্ঠ শিক্ষকরাও সমভাবে উপকৃত হতে পারেন; এবং এই দিকনির্দেশনাটি তাদের সীমিত ও বিকল্প আয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনতে সক্ষম।

তবে যেটি সবচেয়ে আপত্তিকর তা হলো, শিক্ষকদের পকেটভারী হওয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত অভিযোগ।   নিয়মানুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা অনুমতিক্রমে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, অন্যান্য শিক্ষা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সীমিতভাবে খণ্ডকালীন চাকুরি করতে পারলে নিজ বিভাগে সেই কাজ করে আর্থিকভাবে লাভবান হলে কর্তৃপক্ষের তাতে আপত্তি কেন? এই বক্তব্যে কোথায় যেন এক পুরোনো আমলাতান্ত্রিক অভিযোগ রয়েছে যেটি বিশেষ সরকারি কর্মকর্তারা, যাদের নিজস্ব মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, তারা প্রকাশ্যেই করেছেন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পকেট কি সত্যিই সরকারি কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধার সাথে তুলনা করার মতো ভারী হচ্ছে সান্ধ্যকালীন কোর্সে?  

কী হয় সান্ধ্যকালীন কোর্সের টাকায়? প্রতিটি বিভাগ এসব কোর্স থেকে অর্জিত টাকার ৪০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দেয়। একটি অংশ বিভাগের উন্নয়নের কাজে ব্যবহৃত হয় এবং বাকি একটি অংশে পাঠদানকারী ও পরীক্ষার কাজে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পারিতোষিক হয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতি যদিও একটি অংশ বিভাগে যায় বলে উল্লেখ করেছেন, সেটি দিয়ে কী হয় তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সেইসব বিভাগগুলি দেখেও কি কিছুই বোঝা যায় না?

বিশ্ববিদ্যালয় যে অংশটি পায় সেটিও কি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে আসে না? মহামান্য রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে কিন্তু সেই অংশটির কোনো উল্লেখ নেই, যদিও সান্ধ্যকালীন কোর্সের টাকায় অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও হয়। অবশ্যই চাকুরির বাজারে এসব কোর্সের চাহিদা ও প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে সীমিত পরিসরে অনুমোদন করতে হবে; তবে একেবারে বন্ধ করে দিলে পরোক্ষভাবে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

পরিবর্তে, আর্থিকভাবে লাভবান হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাদেরকে শিক্ষার্থী পড়াতে গিয়ে ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’-এর কথা ভাবতে হয়। অন্যদিকে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সান্ধ্যকালীন কোর্সের মাধ্যমে সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর না করে বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।

আমি নিশ্চিত, দু’-চারটি বাদে দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগে শুধু সরকারি টাকায় উচ্চশিক্ষার মানসম্পন্ন পরিবেশ ও সুযোগ সরবরাহ করা সম্ভব নয়। যে-কারণে প্রতিটি বিভাগ বিভিন্ন বেসরকারি উৎস, এলামনাই বা ব্যক্তিগত ট্রাস্ট থেকে প্রাপ্ত আয় দ্বারা প্রতিনিয়ত শিক্ষার মান উন্নয়নের চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেই চেষ্টার জন্য কোনো সাধুবাদ কি শিক্ষকরা পান কোথাও?   


পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা অনুমতিক্রমে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, অন্যান্য শিক্ষা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সীমিতভাবে খণ্ডকালীন চাকুরি করতে পারলে নিজ বিভাগে সেই কাজ করে আর্থিকভাবে লাভবান হলে কর্তৃপক্ষের তাতে আপত্তি কেন? এই বক্তব্যে কোথায় যেন এক পুরোনো আমলাতান্ত্রিক অভিযোগ রয়েছে যেটি বিশেষ সরকারি কর্মকর্তারা, যাদের নিজস্ব মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, তারা প্রকাশ্যেই করেছেন।


আসি বৈষম্যের কথায়। সান্ধ্যকালীন কোর্স মানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়া, সন্ধ্যায় বা ছুটির দিনে ক্যাম্পাস পার্কে পরিণত হওয়া— এসব যৌক্তিক কথা নয়। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি জানেন সান্ধ্যকালীন কোর্স না থাকলেও ক্যাম্পাসে সন্ধ্যার পর বা ছুটির দিনগুলোতে কী কী ‘এনভায়রনমেন্টাল ইস্যু’ থাকে। বরং সান্ধ্যকালীন কোর্সের কারণে ওই অতিরিক্ত সময়টায়ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পদচারণায় ক্যাম্পাস মুখর থাকে। এমনকি ছুটির দিনগুলোতেও নিয়মিত শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সহচর্য পেতে পারে যেটি অন্যথায় সম্ভব হতো না।

মূল বৈষম্যের জায়গাটি হলো, মেধা বা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা বিকল্প উপায়ে বেশি মূল্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতে পারেন। যে ডিগ্রিটি নিয়মিত শিক্ষার্থীরা প্রবল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা পাশের মাধ্যমে অর্জন করেন, সেটি অন্যরা তুলনামূলক কম চেষ্টায় অর্জন করতে সক্ষম হন। এছাড়াও, সান্ধ্যকালীন কোর্স বণ্টন নিয়ে প্রায় প্রতিটি বিভাগেই অনিয়ম ও নিয়ন্ত্রণের ঘটনা ঘটে বা বিভাগের টাকা নিয়ে দুর্নীতি হয়, যে কারণে সহকর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক ও কাজের পরিবেশ নষ্ট হয়।

এছাড়াও, অনেক শিক্ষক আছেন যারা সান্ধ্যকালীন কোর্সে ভীষণ নিয়মিত কিন্তু নিয়মিত কোর্সে ততোখানিই অনিয়মিত। কেউ ঠিক সময়মতো পড়ান না, কেউ শিক্ষাক্রম শেষ করেন না, কেউ নির্ধারিত সময়ে খাতা দেখেন না, বা পরীক্ষা-সংক্রান্ত কাজে কমিটির অন্য সদস্যদের সহযোগিতা করেন না। তবে সান্ধ্যকালীন কোর্স না থাকলেই যে তারা শুধরে যাবেন, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। নিবিড় পর্যবেক্ষণ, ভালো কাজের জন্য স্বীকৃতি এবং অবহেলার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা না করা হলে কখনোই এমন শিক্ষকরা কাজের ব্যাপারে আন্তরিক হবেন না।

যেহেতু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জনগণের করের টাকায় চলে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কম বা বেশি মেধাবী সবারই পড়ার অধিকার আছে। অনেকেই বিভিন্ন কারণে শিক্ষাজীবনের সব স্তরে মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেন না; তাই বলে কখনোই সেই সুযোগ পাবেন না— এটিও বৈষম্য। কেনোনা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের সকল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সমান অধিকার। যারা পড়তে আসেন বা যারা পড়াতে আসেন, সবাই রাষ্ট্রের অংশ।

তাই কঠোর মান নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন কোর্স সবার জন্যই মঙ্গলজনক হতে পারে, যেহেতু বিশ্বের প্রতিটি দেশে, প্রতিটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়েই বদলে যাওয়া যুগের সাথে সাথে পেশাজীবীদের পূর্বার্জিত জ্ঞান আধুনিকায়নের জন্য খণ্ডকালীন পড়াশুনার ব্যবস্থা রয়েছে।

মিলি সাহা: সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

মন্তব্য লিখুন

eighteen − 14 =