আলোচ্য বিষয়সমূহ
একুশ শতকে বাংলাদেশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ-ক্ষেত্রে আত্মীকৃত পরিভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম দুইটি শব্দবন্ধ হলো একীভূত শিক্ষা ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি। শিক্ষাব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি স্তরেই একীভূত শিক্ষার বাস্তবায়নে সর্বাধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত লক্ষ্যদল হিসেবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও কাজ হচ্ছে। বর্তমান লেখাটি একীভূত শিক্ষাবিষয়ক প্রকল্প কিংবা শব্দকোষ নিয়ে নয়; বরং, নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতা আমাকে এটি লিখতে বাধ্য করেছে।
পেশায় আমি একজন শিক্ষক প্রশিক্ষক। আমার প্রশিক্ষণার্থীরা সকলেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁরা মূলত চাকরিকালীন পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উদ্দেশ্যে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোতে প্রশিক্ষণ নিতে আসেন। কিছুদিন আগে প্রশিক্ষণ অধিবেশন চলাকালে একজন প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষক তাঁর এক সতীর্থকে মজার ছলে ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন’ বললেন। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলেও পুরো ব্যাচে ততক্ষণে হাসির রোল।
ঘটনাটি হয়তো কয়েক সেকেন্ডের। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সাধারণও। কিন্তু ‘শিক্ষা’-বিষয়ে পড়াশোনাই হোক, বা একদশক উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা – বিষয়টিকে এড়িয়ে যেতে পারিনি। পারিনি কেবল এটুকু বলে অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতে যে, একজন শিক্ষকের মুখে এ ধরনের ভাষা প্রত্যাশিত নয়। বিষয়টি আমাকে ব্যথিত করার পাশাপাশি গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।
বাংলাদেশে কাউকে অপমান বা উপহাস করার জন্য ‘প্রতিবন্ধী’, ‘অটিস্টিক’ কিংবা ‘রোহিঙ্গা’- এ-জাতীয় শব্দের ব্যবহার নতুন নয়। তাই ঘটনাটি আমাকে খুব বেশি বিস্মিত করেনি; বরং অস্বস্তি ও ক্ষোভ তৈরি করেছে এক ভিন্ন কারণে। যাঁরা হাসছিলেন, তাঁরা সবাই শিক্ষক। এমন একটি প্রশিক্ষণকক্ষে তাঁরা বসে আছেন, যেখানে তাঁদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়নও হওয়ার কথা। এক্ষেত্রে আমারও দায় অস্বীকারের সুযোগ নেই।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, গত কয়েক দশকে আমরা কি সত্যিই অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার পথে এগিয়েছি, নাকি শুধু অন্তর্ভুক্তির ভাষাটি শিখেছি?
বাংলাদেশে কাউকে অপমান বা উপহাস করার জন্য ‘প্রতিবন্ধী’, ‘অটিস্টিক’ কিংবা ‘রোহিঙ্গা’- এ-জাতীয় শব্দের ব্যবহার নতুন নয়। তাই ঘটনাটি আমাকে খুব বেশি বিস্মিত করেনি; বরং অস্বস্তি ও ক্ষোভ তৈরি করেছে এক ভিন্ন কারণে। যাঁরা হাসছিলেন, তাঁরা সবাই শিক্ষক। এমন একটি প্রশিক্ষণকক্ষে তাঁরা বসে আছেন, যেখানে তাঁদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়নও হওয়ার কথা।
শব্দ বদলেছে
সময়ের সঙ্গে আমাদের ভাষা বদলায়। সমাজ বদলালে ভাষায়ও তার প্রতিফলন ঘটে। বর্তমানে মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই অপেক্ষাকৃত মার্জিত শব্দের ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। কাউকে আঘাত বা হেয় না করার উদ্দেশ্যে অপেক্ষাকৃত মার্জিত বা কোমল শব্দ ব্যবহারের প্রবণতাকে ভাষাবিজ্ঞানে Euphemism বা সুভাষণ বলা হয়।
দৈনন্দিন জীবনে এর বহু উদাহরণ আছে। বেকার শব্দের পরিবর্তে চাকরিপ্রার্থী, বৃদ্ধ-এর পরিবর্তে প্রবীণ বা সিনিয়র সিটিজেন, মৃত-এর পরিবর্তে প্রয়াত – এসব শব্দ আমাদের ভাষায় মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। শব্দের এই পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের মর্যাদা রক্ষার একটি সচেতন প্রচেষ্টা।
বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিবর্গের উন্নয়ন ও একীভূত শিক্ষার ক্ষেত্রেও গত কয়েক দশকে ভাষায় পরিবর্তন এসেছে। প্রতিবন্ধী শব্দের বদলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি – এ ধরনের শব্দবন্ধ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পরিসরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে ‘বিশেষ শিক্ষা’ নামে একটি পৃথক বিভাগই রয়েছে যেখানে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান পদ্ধতি ও কৌশল শেখানো হয়। দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানও সে পথে এগোচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের Special Education Needs and Disability (SEND) Framework সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
অর্থাৎ, আমরা শুধু শব্দ বদলাইনি; প্রাতিষ্ঠানিক ভাষাতেও অন্তর্ভুক্তির একটি নতুন অভিধান তৈরি করেছি। সেই অভিধান ব্যবহারিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে ম্যানুয়াল, কর্মশালা, প্রশিক্ষণসহ আয়োজনেরও কমতি নেই আমাদের। কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্নটি: শব্দ বদলেছে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে কি?
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বললেই কি মর্যাদা বাড়ে?
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শব্দবন্ধটি শুনতে নিঃসন্দেহে অপেক্ষাকৃত কোমল। অনেকের কাছে এটি প্রতিবন্ধিতা শব্দটির চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। কাউকে আঘাত না করার সদিচ্ছা থেকেই হয়তো শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়েছিল; কিন্তু সদিচ্ছা আর ফলাফল সবসময় এক হয় না।
২০১৬ সালে Cognitive Research: Principles and Implications জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৫৩০ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা হয়, ব্যক্তির অবস্থাকে ‘বিশেষ চাহিদা’ এবং ‘প্রতিবন্ধিতা’- এই আলাদা দুটো শব্দে প্রকাশ করলে তাদের প্রতি অন্যদের আচরণে পার্থক্য দেখা যায় কিনা? গবেষণায় দেখা যায়, ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন’ হিসেবে বর্ণিত ব্যক্তিদের অনেক ক্ষেত্রেই ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটি দ্বারা বর্ণিত ব্যক্তিদের তুলনায় বেশি নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। গবেষকদের সিদ্ধান্ত ছিল, ‘বিশেষ চাহিদা’ একটি কার্যকর সুভাষণ নাও হতে পারে।
এর মানে অবশ্য এই নয় যে, প্রতিবন্ধিতা অথবা বিশেষ চাহিদা এর কোনো একটি শব্দ ব্যবহার করলেই কেউ অসম্মানজনক আচরণ করছেন। এক্ষেত্রে মূলত ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের নিজেদের পছন্দের ভাষাকে সম্মান করা জরুরি। বরং গবেষণাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভাবতে শেখায়: কোনো শব্দকে মার্জিত করলেই কি তার মাধ্যমে তৈরি হওয়া সামাজিক ধারণাও মার্জিত হয়ে যায়?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আন্তর্জাতিক অধিকার কাঠামোতে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তি’ শব্দটিই ব্যবহৃত হয়। জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক সনদে প্রতিবন্ধিতাকে শুধু ব্যক্তির শারীরিক বা মানসিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়নি; বরং সেই বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামাজিক ও পরিবেশগত বাধার মিথস্ক্রিয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
অর্থাৎ, এখানে লক্ষ্য কাউকে ‘বিশেষ’ করে তোলা নয়; লক্ষ্য হলো এমন সব বাঁধা দূর করা, যা একজন মানুষকে অন্যদের সাথে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে বাঁধা দেয়।
এর মানে অবশ্য এই নয় যে, প্রতিবন্ধিতা অথবা বিশেষ চাহিদা এর কোনো একটি শব্দ ব্যবহার করলেই কেউ অসম্মানজনক আচরণ করছেন। এক্ষেত্রে মূলত ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের নিজেদের পছন্দের ভাষাকে সম্মান করা জরুরি। বরং গবেষণাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভাবতে শেখায়: কোনো শব্দকে মার্জিত করলেই কি তার মাধ্যমে তৈরি হওয়া সামাজিক ধারণাও মার্জিত হয়ে যায়?
কাগজে অন্তর্ভুক্তি, কথায় উপহাস
আমার দেখা সেই প্রশিক্ষণকক্ষের ঘটনাটিই আবার মনে পড়ে। যে শিক্ষক তাঁর সহকর্মীকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বলে হাসির উদ্রেক করলেন, তিনি হয়তো জানেন যে প্রতিবন্ধী শব্দটি ব্যবহার করা এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি হয়তো প্রশিক্ষণে শুনেছেন একীভূত শিক্ষা, অন্তর্ভূক্তি, প্রবেশগম্যতার… এমন আরও অনেক কোমল শব্দ।
অর্থাৎ, তাঁর শব্দভাণ্ডার আধুনিক হয়েছে। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি? আগে কাউকে অপমান করতে বলা হতো ‘প্রতিবন্ধী’। এখন একই অপমানের উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন’। তাহলে কি আমরা সত্যিই ভাষা বদলেছি? নাকি শুধু অপমানের অভিধানটি আধুনিক করেছি?
এই জায়গাতেই সুভাষণ বা মার্জিতকরণের একটি বড় অন্তরায়। কোনো শব্দ যখন শুধু নীতিমালা, প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল, সেমিনার বা বক্তৃতার ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকে, তখন সেটি খুব সহজেই একটি ‘ভদ্র শব্দ’ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেই শব্দের পেছনে যদি মানুষের প্রতি সম্মান, সমতা ও সহমর্মিতার বোধ না থাকে, তাহলে তা কেবল ভাষার সাজসজ্জা। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা আসলে শব্দের প্রকল্প নয়; এটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রকল্প, বাস্তবায়নের প্রকল্প।
একটি শিশু হুইলচেয়ার ব্যবহার করে। তাকে আমরা ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন’ বললাম কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো, বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ কি তার জন্য ব্যবহারযোগ্য? শ্রেণিকক্ষ কি তার অংশগ্রহণের উপযোগী? শিক্ষক কি প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছেন? সহপাঠীরা কি তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে? মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কি তার প্রয়োজন অনুযায়ী যুক্তিসংগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে?
একজন অটিস্টিক শিশুকে আমরা কোন শব্দে উল্লেখ করছি, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাকে অন্যরকম বলে দূরে সরিয়ে রাখছি, নাকি বৈচিত্র্যকে শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করছি? জাতিসংঘের প্রতিবন্ধিতা-সংক্রান্ত অধিকার কাঠামোর মূল দর্শনও এখানেই— প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে করুণা বা দয়ার বস্তু হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে দেখা।
শিক্ষক না বদলালে পরিবর্তন আসবে কোথা থেকে?
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শিশু প্রতিবন্ধিতা, বৈচিত্র্য কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ সম্পর্কে প্রথম ধারণাগুলোর একটি বিদ্যালয় থেকেই পেতে পারে। শিক্ষকের ভাষা, সহপাঠীর আচরণ, পাঠ্যবইয়ের উপস্থাপন, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ— সবকিছু মিলে শিশুর মনে তৈরি হয় একটি ধারণা: কে স্বাভাবিক চাহিদাসম্পন্ন আর কে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন?
তাই শিক্ষক প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা শেখানোর অর্থ শুধু বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধিতা, তাদের বৈশিষ্ট্য বা শিক্ষণ-কৌশল শেখানো নয়। শিক্ষককে নিজের ভাষা ও আচরণ নিয়েও ভাবতে শেখানো জরুরি। একজন শিক্ষক যদি বলেন, ‘ও তো বিশেষ চাহিদার শিশু’, কিন্তু পরক্ষণেই তাকে আলাদা করে বসান, তার সক্ষমতা সম্পর্কে কম প্রত্যাশা করেন কিংবা সহপাঠীদের হাসির সময় নীরব থাকেন— তাহলে তাঁর ব্যবহৃত ‘বিশেষ চাহিদা’ শব্দটি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক?
অন্যদিকে, একজন শিক্ষক যদি ‘প্রতিবন্ধিতা’ শব্দটি ব্যবহার করেও বলেন, ‘প্রতিটি শিশুর শেখার অধিকার আছে; প্রয়োজন হলে আমরা পরিবেশ ও পদ্ধতি পরিবর্তন করব’, তাহলে কোন শিক্ষক আসলে বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক?
আমাদের বুঝতে হবে যে, ভাষা যেমন দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ, তেমনি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিরও একটি মাধ্যম। তাই শব্দ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শব্দের সঙ্গে আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার মিল না থাকলে ভাষা কেবল মুখোশ হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের দরকার শব্দের চেয়ে বেশি কিছু
তাই প্রতিবন্ধী বলব, নাকি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বলব, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বলব, না অন্য কোনো শব্দ ব্যবহার করব, এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই শেষ কথা নয়। প্রথম কাজ হলো মানুষকে তার পরিচয় দিয়ে অপমান করা বন্ধ করা।
‘প্রতিবন্ধী’, ‘অটিস্টিক’, ‘রোহিঙ্গা’ কিংবা অন্য কোনো পরিচয়কে গালি বা উপহাসের উপাদান বানানো বন্ধ করতে হবে। কোনো মানুষের পরিচয়কে অপমানের ভাষায় পরিণত করা মানে শুধু সেই মানুষটিকে নয়, সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি পুরো জনগোষ্ঠীকেই হেয় করা।
দ্বিতীয়ত, আমাদের বুঝতে হবে যে, ভাষা যেমন দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ, তেমনি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিরও একটি মাধ্যম। তাই শব্দ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শব্দের সঙ্গে আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার মিল না থাকলে ভাষা কেবল মুখোশ হয়ে দাঁড়ায়।
তৃতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণে একীভূত শিক্ষা শুধু একটি বিষয় হিসেবে পড়ানো যথেষ্ট নয়। এটিকে একটি দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের অনুশীলন হিসেবে দেখতে হবে। প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষককে শুধু জানতে হবে না ‘কী বলা উচিত’; তাঁকে বুঝতে হবে কেন কিছু বলা উচিত নয় এবং সেই ভাষার পেছনে কী ধরনের সামাজিক ধারণা কাজ করে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষকে অপমান করার ভাষা শুধু একটু ভদ্র হয়েছে? নাকি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কাউকে অপমান করার প্রয়োজনটাই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে?
প্রতিবন্ধী শব্দের জায়গায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বসিয়ে আমরা হয়তো ভাষাকে কিছুটা কোমল করেছি। কিন্তু যদি সেই শব্দ দিয়েই কাউকে নিয়ে হাসি, তাচ্ছিল্য বা অপমান প্রকাশ করি, তাহলে আমাদের পরিবর্তন আসলে কতটুকু? শব্দ বদলানোর পর এবার হয়তো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময়। কারণ সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের পরিচয় তার অভিধানে নয়, তার মানুষের আচরণে।
লেখক পরিচিতি
শামীমা ফেরদৌস তন্বী একজন শিক্ষক প্রশিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষা পেশাজীবী। একীভূত শিক্ষা, প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ, শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন ও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন তাঁর আগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষাক্রম উন্নয়ন, গবেষণা ও শিক্ষাকার্যক্রম বাস্তবায়নে তাঁর এক দশকের বেশি কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

