দুর্নীতিতে বাংলাদেশ বেশ কয়েকবার পুরো বিশ্বে দখল করেছে শীর্ষস্থান! বাংলাদেশে বড় বড় প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতি যেন নিত্যদিনের ব্যাপার। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের এ-ধরনের দুর্নীতির পেছনে নিরক্ষর নন, বরং যারা প্রচলিত শিক্ষাধারায় শিক্ষিত তাদের দিকেই সবসময় অভিযোগের তীরটি আসে।

প্রচলিত শিক্ষায় যারা শিক্ষিত, তারাও নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সময়ের শিক্ষার্থী। সেখান থেকে বেশ দীর্ঘদিন ধরে একটি আলোচনা বিভিন্ন মহলে বেশ জমজমাট— সেটি হলো, দেশের এত দুর্নীতির দায় কার? শিক্ষক কি তাঁর শিক্ষার্থীর অন্যায়ের দায় এড়াতে পারেন?

বলা হয়ে থাকে, শিক্ষক সমাজ যদি তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতার পরিপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারতেন, তাহলেই কিন্তু দেশের দুর্নীতি, অনাচার উল্লেখযোগ্যহারে কমে যেতো।

কিন্তু, দুর্নীতির পেছনের মূল জায়গাগুলোকে কী আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি? উত্তর হচ্ছে, ‘না’! শিক্ষককে সরাসরি তার নিজের শিক্ষার্থীদের দুর্নীতির দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পূর্বে বেশকিছু আলোচনা জরুরি। 

ঠিক যে দৃষ্টিকোণে দায়টা শিক্ষককে দেওয়া হয়

এই আলোচনা শুরুর পূর্বে মুরাদুল ইসলাম নামে এক লেখক ও চিন্তকের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা একটি কথা দিয়ে শুরু করা যাক: 

দেশের লোকজন যে খারাপ, দুর্নীতিবাজ হইয়া উঠে, এতে শিক্ষকদের কি দায় নাই? ছাত্র বড় হইয়া ভালো করলে শিক্ষক যদি ক্রেডিট নেয়, তাইলে খারাপ ছাত্রদের দোষের দায় কেন তাদের উপর কিছুটাও বর্তাবে না?

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেশের মানুষকে খারাপ হওয়ার পেছনে শিক্ষককে দায়ী করা হয়ে থাকে। আপাতঃদৃষ্টিতে এই ভাবনায় বিশেষ কোনো সমস্যা না থাকলেও এটা ভাবনাটি মূলত অদূরদর্শী।

কোনো একজন শিক্ষকের শিক্ষার্থী যখন সমাজের তথাকথিত সম্মান-মর্যাদার নিরিখে বড় পর্যায়ে পৌঁছে যান, তখন অধিকাংশক্ষেত্রেই শিক্ষক তাঁকে নিজের শিক্ষার্থী বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন।

কিন্তু, কোনো শিক্ষকের শিক্ষার্থী যখন চুরির দায়ে কিংবা বিদেশে চার হাজার কোটি টাকা পাচারের মামলায় কিংবা অপকর্মের দায়ে দণ্ডিত হন, তখন কি সেই দায়ের ভাগিদার শিক্ষকেরও হওয়া উচিৎ নয়?

আর সেক্ষেত্রে শিক্ষকের কি সত্যি তখন বলা উচিৎ যে, আমার শিক্ষার্থীই এগুলো করেছে! এ দায় আমারও? মূলত সেই দৃষ্টিভঙ্গিই এই লেখার পটভূমি। 

সফলতা আর নৈতিকতা কি সমার্থক? 

শিক্ষার্থীর সফলতায় কিংবা ব্যর্থতায় শিক্ষকের ভূমিকা শীর্ষক আলোচনায় একটি জিনিস আমরা সবসময় ভুলে যাই, সেটি হলো সফলতা ও নৈতিকতা একই জিনিস নয়। একজন শিক্ষার্থী তার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের নিরিখে অনেককিছু অর্জন করতে পারেন কিংবা ক্যারিয়ারে সেই অর্থে ভালো কিছু নাও করতে পারেন। সেটি নির্ধারিত হয় অনেককিছুর ওপর।

সেক্ষেত্রে যে মানুষটি সমাজের নিরিখে ক্যারিয়ারে ভালো কিছু করতে পেরেছেন, তাকেই নৈতিকতার মানদণ্ড হিসেবে ভাবার যেমন অবকাশ নেই, আবার যে মানুষটি ক্যারিয়ারে সেই অর্থে ভালো কিছু করতে পারেননি, তাকে নৈতিকতা বিবর্জিত ভাবারও কোনো সুযোগ নেই।

প্রকৃত অর্থে সমাজের নিরিখে সফলতা এবং নৈতিকতা বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন ব্যক্তি অনেক সফল হয়েও যেমন নৈতিক গুণাবলীসম্পন্ন হতে পারেন, আবার একইভাবে দুর্নীতিবাজও হতে পারেন। আবার অন্য একজন যিনি ক্যারিয়ারে খুব ভালো কিছু করতে পারেননি, তিনিও নৈতিক গুণাবলীসম্পন্ন মানুষ হতে পারেন, আবার নাও হতে পারেন।

সুতরাং, শিক্ষার্থীর সমাজের নিরিখে সফলতা কিংবা ব্যর্থতায় শিক্ষকের ভূমিকা থাকলেও, সফল ও অনৈতিক এবং ব্যর্থতার জন্য শিক্ষক কি ক্রেডিট নেবেন নাকি নেবেন না? সেক্ষেত্রে শিক্ষকের দায়টা কোনক্ষেত্রে কতোটা?

শিক্ষক তো পরিবার ও সমাজেরই অংশ

শিক্ষক কিন্তু সমাজ ও পরিবারেরই অংশ। শিক্ষক কোনোভাবেই এর বাইরের কেউ নন। আর বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়েছে সমাজের প্রয়োজনে, সমাজের মানুষজনকে সেই সমাজের নিরিখে সামাজিকীকরণ করে তোলার জন্যই বিদ্যালয় নামক সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি।

তাই শিক্ষক নিজে নৈতিকতার শিক্ষায় যেমন সমাজ ও পরিবারের নীতি ও আদর্শের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়, আবার শিক্ষক নিজেও সমাজ পরিবর্তনের প্রভাবক হিসেবে কাজ করেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান করেন।

কোনো সমাজ ও পরিবার যদি নৈতিকভাবে বিচ্যুত হয়ে পড়ে, তাহলে শিক্ষক নিজেও প্রভাবিত হবেন এবং সেই প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়বে। এর বাইরে সামাজিকভাবে দেখতে বলে সামাজিক জীবনে শিক্ষকের বেশ বড় একটি প্রভাব থাকে। শিক্ষককে সামাজিক পরিবর্তনের এজেন্ট হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে, সেগুলোর জন্য শিক্ষক সরাসরি বাধ্য নন। তার মানে এগুলো হলো শিক্ষকের সামাজিক দায়বদ্ধতা, এগুলো ব্যত্যয় ঘটলে শিক্ষককে সামাজিকভাবে দায়বদ্ধতা পালনের অভিযোগ অভিযুক্ত করা যেতে পারে তবে নিঃসন্দেহে তাকে শিক্ষার্থীর দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত করার সুযোগ নেই। 

যেকোন স্তরের শিক্ষকের ভূমিকা আসলে কতটুকু? 

একজন শিক্ষার্থীর জীবনে একজন শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য।  কিন্তু সেটি আসলে কতটুকু?

আমাদের দেশের যে স্কুলিং সিস্টেম, সেক্ষেত্রে একজন শিক্ষকের মূল কর্তব্য হলো বিদ্যালয়ের রুটিন অনুসারে শিক্ষাক্রম নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি অনুসারে শিখন-শিক্ষণ কার্যক্রম কার্যকর করা, নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা গ্রহণ করা এবং পরিশেষে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফলাফল প্রদান করা।

এই আলোচনার ইতি টানলে মূলত দেখা যাবে, শিক্ষকের কাজ হলো নিয়মিত পাঠদান করা, পরীক্ষা নেওয়া, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং ফলাফল প্রদান। এগুলো শিক্ষক যদি সঠিকভাবে না পালন করেন তবে তিনি অভিযুক্ত হবেন। দেশের প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী তাকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যেতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীর দুর্নীতির দায়ে সরাসরি শিক্ষককে অভিযুক্ত করার সুযোগ নেই।

তাহলে শিক্ষক কী করতে পারেন?

প্রথমত, শিক্ষকের দায়িত্ব হবে তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনৈতিক পন্থা অবলম্বনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সেটি একেবারে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবনের সর্বোচ্চ স্তর অবধি।

পদক্ষেপ বলতে অবশ্যই শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন নয়। পদক্ষেপের মধ্যে হতে পারে আলাদা করে ডেকে বুঝিয়ে বলা, কাউন্সিলিং করা, মনোবৈজ্ঞানিক শাস্তি প্রদান করা ইত্যাদি। অর্থাৎ, শিক্ষককে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, তিনি কোনো ধরনের অন্যায় বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করেন।

শ্রেণিতে কেউ অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করলে তা যে তিনি সহজভাবে নেবেন না সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তাই তাঁর সামনে কোনো অন্যায় বা দুর্নীতি হলে তিনি তা শক্তহাতে প্রতিহত করবেন, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার ভিতকে দৃঢ়তর করতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, শিক্ষককে নিজেকে নৈতিকতার মানদণ্ডে আদর্শ মানুষ হিসেবে জীবনধারণ করতে হবে। শিক্ষক আসলে শিক্ষার্থীদের জীবনে রোল মডেল। শিক্ষক যা-ই করুন না কেন, সচেতন কিংবা অবচেতনভাবে শিক্ষার্থীরা তা অনুসরণ করে। সুতরাং শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেকে নৈতিক গুণাবলীসম্পন্ন মানুষ হিসেবে তুলে ধরাটাও শিক্ষকের দায়িত্ব! 

কিন্তু এতকিছুর করার পরেও যদি কোনো শিক্ষার্থী কোনরূপ নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার দায়ভার শিক্ষকদেরকে দেওয়াটাও কি নৈতিক হবে?

শিক্ষক একা কী করবেন?

মেসির বিশ্বকাপ জয়ের আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল করে বলা হলো, “মেসি একা কী করবে?” কথাটি ট্রল হিসেবে বলা হলেও শিক্ষার্থীর দুর্নীতির ক্ষেত্রে শিক্ষককে অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে এই প্রসঙ্গের অবতারণা করা যেতে পারে।

আমাদের বোঝার চেষ্টা করা উচিৎ, ঠিক কী কী কারণে মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে, মানুষ অপকর্মে জড়িয়ে যেতে পারে এবং কীভাবে সেগুলো থেকে উত্তরণের পথে এগোনো যেতে পারে। এই নিরিখে দেখতে গেলে দেখা যাবে সমাজে অপরাধ প্রবণতা সৃষ্টির পেছনে সবচেয়ে বড় দায়ী কে সেটি নির্ণয় করতে গেলে প্রথমে আসবে সমাজ কাঠামো, পারিবারিক কাঠামো, ব্যক্তির চাহিদা পূরণ ইত্যাদি।

এই তালিকা করতে গেলে সেটি অত্যন্ত বড় আলাপ হবে। তাহলে দেশের সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক কাঠামো, দেশের অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিসহ যেসব প্রধান কারণ দেশের মানুষের মধ্যে দুর্নীতির এক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে এবং তা কোনোটিই একা শিক্ষকের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

সেক্ষেত্রে শিক্ষক একা কী করবেন? আর কোন শিক্ষক কি কখনো ক্লাসে শেখান কীভাবে দুর্নীতি করতে হবে, চুরি করতে হবে? তাহলে যা শেখাননি তার ক্রেডিট (নেতিবাচক ক্রেডিট) তিনি কেন নেবেন? বা একা শুধু শিক্ষকের পক্ষে কতোটাই বা সম্ভব! 

শিক্ষক শিক্ষাব্যবস্থার একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র

দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক অবস্থার জন্য শিক্ষাব্যবস্থার অনেক বড় প্রভাব থাকে। শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠার পেছনের সামাজিক কারণ হলো দেশের রীতিনীতি অনুসারে শিক্ষার্থীদের অভ্যস্থ করে তোলা। আরো সহজভাবে বললে, ওই সমাজের নিরিখে দায়িত্বশীল একজন সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।

শিক্ষাব্যবস্থা যেমন সামাজিক প্রেক্ষাপটের দ্বারা প্রভাবিত হয়, অন্যদিকে সমাজ জীবনও শিক্ষাব্যবস্থার দ্বারা প্রভাবিত হয়। শিক্ষাব্যবস্থায় থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মন্ত্রণালয়ের অধিনস্ত বিভিন্ন অধিদপ্তরসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, থাকে এনসিটিবি, নায়েম, পুরো শিক্ষাপ্রশাসন কাঠামো, শিক্ষানীতি, শিক্ষা আইন, শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক সহায়িকা, শিক্ষকসহ অসংখ্য উপাদান।

পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নকারী হলেন শিক্ষক। কিন্তু পুরো সিস্টেমের ওপর শিক্ষকের তেমন কোনো প্রভাব থাকে না বললেই চলে।

তাহলে দেশের মানুষের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা বা অপরাধগ্রস্থতার জন্য শিক্ষাব্যবস্থার দিকে আঙুল তোলা যেতে পারে। তবে শিক্ষক একাই শিক্ষাব্যবস্থার মূল উপকরণ নয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।  

শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১র আলোকে নৈতিক শিক্ষা 

শিক্ষাব্যবস্থার আমূল-পরিবর্তন নিয়ে আসা শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১ নিয়ে নানামহলে নানাবিধ আলোচনা-সমালোচনা চলছে। শিক্ষাক্রম রূপরেখায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় যোগ্যতাকে চারটি উপাদানের সমন্বয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সেগুলো হলো: মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, দক্ষতা ও জ্ঞান।

এই শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়নের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই চার ধরনের মূল যোগ্যতার বিকাশ ঘটবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছে। দেশপ্রেম, পরমত সহিষ্ণুতা, শ্রদ্ধা, সহমর্মিতার মতো  মূল্যবোধের মধ্যে একটি আলোচিত একটি হচ্ছে শুদ্ধাচার। শুদ্ধাচার সম্পর্কে শিক্ষাক্রমে বলা হয়েছে: 

শুদ্ধাচার মানে নিজের কাছে দায়বদ্ধ থেকে যেকোনো পরিস্থিতিতে নৈতিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত  এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পরীবিক্ষণ ছাড়াই নিজ দায়বদ্ধতা থেকে নৈতিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নেয়াই শুদ্ধাচার।

আবার শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে দশটি মূল যোগ্যতা অর্জিত হবে বলে ধরা হয়েছে তার দশ নম্বরে রয়েছে, ধর্মীয় অনুশাসন, সততা ও নৈতিক গুণাবলি অর্জন এবং শুদ্ধাচার অনুশীলনের মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানব-কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারা।

সুতরাং, শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পদক্ষেপের দক্ষতা ও মূল্যবোধ জাগ্রত হবে।

তাই নৈতিকতা কিংবা নৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টিকে শিক্ষাক্রমের রূপরেখা ২০২১-এর অন্যতম কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সমগ্র শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব গুণাবলী বিকশিত হবে।

শিক্ষক যা শেখাননি তার দায় তিনি কেন নেবেন?

শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার বহু পদ্বতি ও কৌশল নিয়ে মূল্যবোধ শিক্ষায় আলোচনা করা হয়। কিন্তু মূল্যবোধ শিক্ষা কি নিশ্চিত করতে পারে এই শিক্ষার্জনের শেষে শিক্ষার্থীরা অবশ্যই নৈতিকতা অর্জন করে ফেলবে!

ধরা যাক, কোনও একটি ক্লাসে অত্যন্ত গঠনমূলক পন্থায় নৈতিকতা, মূল্যবোধের শিক্ষা প্রদান করা হলো। শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে দারুণ একটি ক্লাস হলো, কিংবা একটি সেমিস্টার শেষ হলো, সেক্ষেত্রে এই কোর্সে অংশগ্রহণকারী কোন শিক্ষার্থী যদি জীবনের কোনও একটি পর্যায়ে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেন, তবে তার দায়ভার কি ওই শিক্ষকের ওপর বর্তাবে?

আবার কোন শিক্ষক যদি গবেষণার নৈতিকতা ক্লাসে শেখান এবং তারপরে কোন শিক্ষার্থী গবেষণা জালিয়াতিতে জড়ায় তাহলে সেটার দায়ভার কি শিক্ষকের? শিক্ষক কি তাঁর শিক্ষার্থীদের জালিয়াতি শিখিয়েছেন? যদি উত্তর না হয়, তবে যা শিক্ষক শেখাননি, তার দায়ভারে কি সত্যি শিক্ষককে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে? 

প্রাথমিক স্তরের ক্ষেত্রে শিক্ষক যা করতে পারেন

নৈতিকতার শিক্ষাটি শিশুর সহজাত নয়; বরং শিখন ও অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে সে নৈতিকতার শিক্ষা অর্জন করে। শিশু জন্মের পরে পরিবারের গণ্ডিতে নৈতিকতার শিক্ষার বড় একটি অংশ অর্জন করে। পারিবারিক গণ্ডি পেরোবার পরেই শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশ করে।

জ্ঞান বিকাশের তাত্ত্বিকদের মতে,  শিক্ষার্থীদের মানসিক গঠন অনেকটাই তৈরি হয় প্রাথমিকে স্তরে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ার সময় আমরা যা পড়ি বা শিখি, তা কিন্তু আমাদের মনে একটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে।

সেক্ষেত্রে  প্রাথমিকে যদি শিক্ষক বিভিন্ন পাঠের পাশাপাশি নৈতিকতা বিষয়ে আলোচনা করেন, তাহলে সেটি যেভাবে শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাপ ফেলবে, তা উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে সম্ভব এসে আর সম্ভব নয়। কারণ, শিক্ষার্থী ততোদিনে আর শিশু নেই, তার মানসিক ও জ্ঞানীয় বিকাশ প্রাথমিক পর্যায়ের মতো নেই বরং তা অধিকাংশই পরিণতিতে পৌঁছে গেছে। তাই শিক্ষার্থীদের নৈতিকতার বিকাশে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হচ্ছেন প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকবৃন্দ।

আবার এটিও মনে রাখতে হবে যে, প্রাথমিকের শিক্ষক পাঠ্যসূচির নির্ধারিত বিষয় পড়াবেন, নাকি নৈতিকতা শেখানো তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়বে, সেটিও একটা বিতর্কের বিষয়। এ-বিষয়ে শিক্ষাক্রমে সুনির্দিষ্ট সমাধান না থাকলেও শিক্ষাক্রম অনুসারে শিখন-শিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে শিক্ষকের মূল দায়িত্ব।

তবে প্রাথমিক স্তরেই যেহেতু শিশুর মানসিক বিকাশের ভিত স্থাপিত হয়ে যায়, তাই শিক্ষক যদি পড়ানোর সময় সংশ্লিষ্ট পাঠের সাথে নৈতিকতার শিক্ষাকেও সমন্বিত করে আলোচনা করেন, তবে তা শিক্ষার্থীর জন্য উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে। এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক গৌতম রায় বলেন,

প্রাথমিকের শিক্ষক ‘সুখী মানুষের জামা’ গল্পটি পড়ানোর পাশাপাশি কীভাবে অন্যের সম্পদ দুর্নীতির মাধ্যমে আহরণ না করাটা নৈতিকতার সমর্থক, সেরকম যদি কিছু কথা বলেন, তাহলে হয়তো শিক্ষার্থীরা উদ্দীপিত হবে। শিক্ষার্থীরা একইসাথে পাঠ্যবইও পড়বে পাশাপাশি নৈতিকভাবেও বিকশিত হবে।

মাধ্যমিক স্তরের ক্ষেত্রে শিক্ষক যা করতে পারেন

শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশের প্রাথমিক ভিত্তি প্রাথমিকে ঘটলেও পূর্ণতা পায় মূলত মাধ্যমিকে স্তরে। তাই শিক্ষার্থীদের নৈতিক আচরণের বিকাশের পরিপূর্ণতা অর্জনে বড় প্রভাবক হলো মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকবৃন্দ।

সেক্ষেত্রে এই পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা প্রাথমিকের তুলনায় বৌদ্ধিকভাবে তুলনামূলক অনেকটাই এগিয়ে থাকেন। ফলে এসময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা প্রদান করলে তা দ্বারা শিক্ষার্থীদের উদ্দীপিত হওয়ার প্রবণতা প্রাথমিকের তুলনায় অনেকটাই বেশি।

এক্ষেত্রেও শিক্ষক পাঠ্যবিষয়বস্তুর সাথে সাথে নৈতিকতার বিষয়গুলোকে মিলিয়ে আলোচনা করলে একই সাথে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবিষয় ও নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান করা সম্ভব। যেমন, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের মধ্যে কিংবা বিজ্ঞান বিষয়ে যখন পরিবেশ, পরিবেশের নানারূপ উপাদান সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা হয়, সেখানে শিক্ষক যদি পরিবেশ সংরক্ষণের সাথে দায়িত্ববোধ ও নীতিনৈতিকতাকে একত্র করে আলোচনা করেন, তাতে শিক্ষার্থীরা উদ্দীপিত হতে পারে।

পাশাপাশি ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাকে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবেই পড়ানো বলে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক একই সাথে বিষয় হিসেবে এবং অন্যান্য পাঠের সাথে মিলিয়ে নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান করতে পারেন।

উচ্চশিক্ষা স্তরের ক্ষেত্রে শিক্ষক যা করতে পারেন

উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মনোজগতে স্থায়ী পরিবর্তন তেমন আনতে পারেন না। কারণ এই স্তরে আসার আগেই শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ পরিপূর্ণতা অর্জন করে ফেলে। তাই এ স্তরে শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা তুলনামূলক কম হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা পদ্ধতি পড়ানোর সময় শিক্ষক যদি গবেষণার নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা লাভবান হবে। আবার সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অনেক অনুষদে মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে সরাসরি কোর্সের মাধ্যমে পড়ানো হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে শিক্ষক সরাসরি কোর্সের মাধ্যমে নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান করতে পারেন।

তবে এখানেও বিতর্কিত বিষয় হলো, উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষক কি শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা শেখাতে দায়বদ্ধ? নাকি তার দায়িত্বপ্রাপ্ত কোর্স পড়ানোর প্রতি দায়বদ্ধ? বিশ্ববিদ্যালয়সহ যেকোনো পর্যায়ে শিক্ষকদের শিখন-শিক্ষণ কার্যক্রমের সাথে শিক্ষাক্রমের একটি ভারসাম্য থাকতে হবে। শিক্ষাক্রমেই নির্ধারিত থাকতে হবে শিক্ষক কীভাবে নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান করবেন।

শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার বিকাশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদের তুলনায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। উচ্চশিক্ষা অর্জনের শিক্ষার্থীদের নৈতিক আচরণ ঠিক সেটিই প্রতিফলিত হয়, যা সে বিদ্যালয় থেকে শিখে এসেছে।

দুর্নীতি ও এর দায় : শেষ কথা

শিক্ষার্থীদের অনৈতিকতার ক্ষেত্রে এককভাবে কাউকে দায় করার বিশেষ কোনো সুযোগ নেই। আর সফলতা ও ব্যর্থতা সমার্থক শব্দ বা বিপরীত শব্দ নয়, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সফলতা বা ব্যর্থতাকে লেবেলিং করে শিক্ষককে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে।

শিক্ষার্থীদের অনৈতিকতায় যদি কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়, তবে সেখানে পরিবার, সমাজ, বিদ্যালয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা সবাইকে দাঁড় করাতে হবে। সেই দায়ভার একা শিক্ষকের কখনোই নয়!

আর নৈতিকতার বিকাশে যদি শিক্ষককে দায়ী করতেই হয়, সেক্ষেত্রে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা সবচেয়ে বেশি। তাই শিক্ষার্থীর ভালো কাজে ক্রেডিট শিক্ষক নিলেও শিক্ষার্থীর খারাপ কাজ কিংবা দুর্নীতির ক্রেডিট নিতে শিক্ষক বাধ্য নন।

Sending
User Review
5 (1 vote)

লেখক সম্পর্কে

শামস আল গালিব

শামস আল গালিব

শামস আল গালিব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

মন্তব্য লিখুন