প্রাকশৈশব উন্নয়ন ও প্রাকপ্রাথমিক শিক্ষা প্রাথমিক শিক্ষা

প্রাথমিক শিক্ষক: সবচেয়ে সংবেদনশীল পেশাজীবী

বর্ণমালা

জগজ্জীবন বিশ্বাস

সমাজে যত ধরনের পেশাজীবী রয়েছেন, সমাজ বিনির্মাণে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তবু যদি প্রশ্ন করা হয় সমাজ বিনির্মাণে সবচেয়ে সংবেদনশীল কাজটি কারা করছেন? আমি বলবো, শিক্ষকেরা, বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষকবৃন্দ। কেনোনা, সমাজের মূখ্য সঞ্চালক মানুষ তৈরির কাজটি তাঁদের হাতে অনেকাংশে ন্যাস্ত। আর প্রাক-প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল স্তরের শিক্ষকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সংবেদনশীল কাজটি করছেন প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষকেরা।

শিক্ষার এ-স্তরেই রচিত হয় ভবিষ্যৎ মানুষের ভিত। অথচ শিক্ষার এই স্তরটি আমাদের দেশে এখনও ততোখানি গুরুত্ব পায়নি, যতোটুকু গুরুত্ব পাওয়ার কথা। আপনি কৃষক, কামার, কুমার, জেলে যে-ই হোন, আপনার পেশার জন্য প্রয়োজন ওই বিশেষ কাজের পারদর্শিতা। অন্যথায় আপনার কাছ থেকে ভালো কাজ আশা করা যাবে না।

আপনি নিশ্চয়ই চান আপনার সন্তান আপনার চেয়ে অগ্রসর মানুষ হোক। কিন্তু তাকে তৈরির জন্য আপনি যার ওপর নির্ভর করছেন সেই শিক্ষক কি ততখানি অগ্রসর? তা যদি না হয়, তবে আপনার চাওয়াটাকে আপনি অগ্রাধিকার দেননি।

যে পেশা যতো বেশি সংবেদনশীল, সে পেশার জন্য প্রয়োজন ততো বেশি দক্ষতা। কিন্তু এক্ষেত্রে লক্ষণীয় একমাত্র ব্যতিক্রমটি এই শিক্ষকতা পেশার বেলায় ঘটে চলেছে এদেশে বহুদিন ধরেই। প্রাক-প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সব স্তরে দেশ-বিদেশের একাধিক খ্যাতিমান শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাবিষয়ে অধ্যয়ন ও শিক্ষক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি একথা বলছি।

আপনি নিশ্চয়ই চান আপনার সন্তান আপনার চেয়ে অগ্রসর মানুষ হোক। কিন্তু তাকে তৈরির জন্য আপনি যার ওপর নির্ভর করছেন সেই শিক্ষক কি ততখানি অগ্রসর? তা যদি না হয়, তবে আপনার চাওয়াটাকে আপনি অগ্রাধিকার দেননি। এই সহজ ভাবনাটিই আমাকে শিক্ষকতা পেশার প্রতি সবসময় আনত রেখেছে। শিক্ষক পিতার সন্তান হিসেবে, শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসেবে সর্বোপরি একজন শিক্ষক হিসেবে আমি শিক্ষকতার মহত্ত্বকে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেছি। একাধিক উন্নত দেশের শিক্ষাকে খুব কাছে দেখার সুযোগ আমার এই উপলব্ধিকে আরও দৃঢ়তা দিয়েছে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা-বিষয়ে স্নাতক পড়াকালীন সময়েই আমি ঠিক করি শিক্ষা নিয়েই কাজ করব। সেই থেকে প্রায় দুই দশক ধরে শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে আমার কাজ। ২০১২ সালে জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে সেদেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণে ডিপ্লোমা করার জন্য গিয়েছিলাম। হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ১৮ মাসের শিক্ষাকাল এবং সেখানকার একটি ন্যাশনাল কিন্ডারগার্টেনে এক বছরের গ্লোবাল টিচার হিসেবে কাজ করার সুযোগ আমাকে হাতেকলমে জাপানের শিশুশিক্ষা সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়।

জাপানের শিশুশিক্ষাকে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত শিশুশিক্ষার একটি বলে গণ্য করা হয়, যার ওপর ভিত্তি করে সেদেশের সংস্কৃতি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। আমার গবেষণার বিষয় ছিল, “Teachers Preparation for the Quality of Early Childhood Education and Care in Japan”। এই গবেষণায় আমি জানার চেষ্টা করেছিলাম জাপানে শিক্ষক তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে। শিক্ষকতা পেশায় আগত নতুনদের সেই গল্পটি জেনে রাখা দরকার যে, একটি দেশ তার ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে যে শিশুশিক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে সেখানে শিক্ষক তৈরির প্রক্রিয়াটি কেমন। যাতে করে তারা নিজেদেরকে শিক্ষক হিসেবে সেই লক্ষ্যে এগিয়ে নেবার স্বপ্ন রচনা করতে পারেন।

জাপানে শিক্ষক তৈরির জন্য বিশেষায়িত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় যেমন আছে, তেমনি অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টিচার এডুকেশনের সুযোগ রযেছে। এই ডিপ্লোমা বা আরও উচ্চতর অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা থাকলে তবেই ‘টিচিং লাইসেন্স’ পাওয়া যায়।

শিক্ষকতা সেখানে খুবই সম্মানের। আর হবেই বা না কেন? শিক্ষক হওয়ার জন্য যে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়, তা মোটেও সহজসাধ্য নয়। বিদ্যালয় পাশ করার পরই শিক্ষক হওয়ার চেষ্টা শুরু করতে হয়। শিশুশিক্ষায় নিযুক্ত হতে চাইলে শিশুশিক্ষার সংশ্লিষ্ট এক বা একাধিক বিষয়ে ডিপ্লোমা নিতে হয় সবার আগে। সেজন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশেষায়িত কলেজে ভর্তি হতে হয়।

জাপানে শিক্ষক তৈরির জন্য বিশেষায়িত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় যেমন আছে, তেমনি অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টিচার এডুকেশনের সুযোগ রযেছে। এই ডিপ্লোমা বা আরও উচ্চতর অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা থাকলে তবেই ‘টিচিং লাইসেন্স’ পাওয়া যায়। অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা ও ব্যবহারিক দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের ‘টিচিং লাইসেন্স’ দেওয়া হয়, যার মেয়াদও বিভিন্ন রকমের।

এই ‘টিচিং লাইসেন্স’ সময়ে সময়ে নবায়ন করা লাগে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে। ‘টিচিং লাইসেন্স’ পেলে তবেই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা যায়। অতঃপর কোনো অভিজ্ঞ শিক্ষকের সাথে এক বছর শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ করতে হয়। ওই শিক্ষক এক বছরের কাজের ওপর নির্ভর করে প্রত্যয়ন দেন শিক্ষক হতে পারবেন কিনা। তারপর নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের পর নির্দিষ্ট সময় পরপর নিয়মিতভাবে তাকে যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে হয়। একজন শিক্ষক কোনোপ্রকার অসততার দায়ে দোষী হলে তার ‘টিচিং লাইসেন্স’ বাতিল করা হয় এবং তিনি আর কখনোই শিক্ষক হতে পারেন না। এই হলো মোটাদাগে শিক্ষক হওয়ার প্রক্রিয়া।

এবারে একজন কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকের দৈনন্দিন কাজের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। আমি যে কিন্ডারগার্টেনে গ্লোবাল টিচার ছিলাম, সেখানে পাঁচ বছর বয়সীদের ক্লাসে একজন মূল শিক্ষকের সাথে সহায়ক হিসেবে আমাকে কাজ করতে হতো। ওই শ্রেণির মূল শিক্ষক মিসেস ইউকির দিনের কার্যক্রম শুরু হতো সকাল আটটায়, শিশুরা বিদ্যালয়ে আসার ঠিক এক ঘণ্টা আগে। আর শেষ হতো দিনের কাজ শেষ করার পর, তবে প্রায়ই তা সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়াতো।

শিশুরা বিদ্যালয়ে আসার আগেই তিনি প্রধান শিক্ষকের সাথে মর্নিং মিটিং সেরে শ্রেণিকক্ষটি আজকের দিনের জন্য প্রস্তুত করতেন। এখানে বলে রাখা দরকার, এই শ্রেণিতে আমাদের পড়ালেখার আদলে কোন পড়ালেখার বালাই নাই, সবই খেলা। অতএব শিশুরা কী কী খেলবে তার একটি পরিকল্পনা দিনের শুরুতেই শিক্ষক করে নেন। তারপর শিশুদেরকে স্বাগত জানাতে স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে যান।

শিশুরা বিদ্যালয়ে আসে সকাল নয়টায় এবং সাধারণত দুপুর ১:৩০ পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অবস্থান করে। শিশুরা বিদ্যালয় ত্যাগ করার পর শিক্ষক প্রতিটি শিশুর পর্যবেক্ষণ নোট ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্যাদি নিয়ে বিশ্লেষণ করতে বসেন এবং পরের দিনের জন্য কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেন। ন্যাশনাল কারিকুলাম স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী শিক্ষকগণই বিদ্যালয়ভিত্তিক কারিকুলাম প্রণয়ন করেন।

কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার মূল বিষয়গুলো হচ্ছে– স্বাস্থ্য (শারীরিক ও মানসিক), মানবিক সম্পর্ক, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, ভাষা (মাতৃভাষা আত্মীকরণ) ও প্রকাশভঙ্গি (অনুভূতির প্রকাশ)। এই পাঁচটি ক্ষেত্রের সকল শিক্ষায় শিশু তার খেলার মাধ্যমে লাভ করে থাকে। শিক্ষকের মূল কাজই হলো শিশুদের খেলার পরিবেশ ‍নির্বিঘ্ন করা এবং তাদের খেলার সাথী হওয়া।

আমাদের লেখাপড়া আর পরীক্ষানির্ভর শিশুশিক্ষা শিশুর সহজাত প্রবণতাগুলোকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিচ্ছে। জীবনধারণের অনিবার্য অনুষঙ্গ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস, প্রকৃতি ও পরিবেশ, কাজের আনন্দ, সহযোগিতা ও মানবিক সম্পর্কের মতো বিষয়গুলোকে পরিচর্যা না করে আমরা কেবল পড়ালেখা আর প্রতিযোগিতাকেই শিক্ষা বলে চালিয়ে দিচ্ছি!

পাশাপাশি প্রতিটি শিশুর গতিবিধি লক্ষ্য রাখা ও প্রয়োজনীয় নোট নেওয়া বা ছবি তুলে রাখা যা শিশুর জন্য পরবর্তী করণীয় নির্ধারনের জন্য সহায়ক। এই হলো মূল্যায়ন (Assessment for learning)। প্রথম শ্রেণি থেকে শিশুরা পড়ালেখা শুরু করে; কিন্তু সেখানেও আমাদের মতো পরীক্ষা আর প্রতিযোগিতা নেই। একজন শিশু পড়ালেখা শুরুর আগেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ব্যবহারিক দিকগুলি শিখে নেয় এবং অনেকটা স্বনির্ভর মানুষ হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে আমাদের লেখাপড়া আর পরীক্ষানির্ভর শিশুশিক্ষা শিশুর সহজাত প্রবণতাগুলোকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিচ্ছে। জীবনধারণের অনিবার্য অনুষঙ্গ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস, প্রকৃতি ও পরিবেশ, কাজের আনন্দ, সহযোগিতা ও মানবিক সম্পর্কের মতো বিষয়গুলোকে পরিচর্যা না করে আমরা কেবল পড়ালেখা আর প্রতিযোগিতাকেই শিক্ষা বলে চালিয়ে দিচ্ছি! যদিও আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষার লক্ষ্য “শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, মানবিক, নান্দনিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগিক বিকাশ সাধন এবং তাদের দেশাত্মবোধে, বিজ্ঞানমনস্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্নদর্শনে উদ্বুদ্ধ করা।”  

জগজ্জীবন বিশ্বাস: লেখক খুলনা সদর থানা রিসোর্স সেন্টারে ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কর্মরত। জাপান থেকে পিজিডি ইন টিচার ট্রেনিং ও ইউকে থেকে এমএ ইন এডুকেশন সম্পন্ন করেছেন।

লেখাটি কতোটুকু পছন্দ হয়েছে?

Leave a Comment

14 − one =