পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রাথমিক শিক্ষা

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা থেকে শিখন চাই, নাকি ফলাফল?

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা; ছবিসূত্র: ইত্তেফাক
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা; ছবিসূত্র: ইত্তেফাক

১৭ নভেম্বর ২০১৯ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এ বছর ২৯ লাখ ৩ হাজার ৬৩৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। এসব কোমলমতি শিশুদের জন্য শুভ কামনা। তাদের আগামীর পথচলা শুভ হোক। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানান শাখায় এদের পদচারণায় মুখরিত হোক আগামীর বিশ্ব।

শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা থাকা উচিত কিনা আমি সে প্রশ্নে যাচ্ছি না। এ ধরনের পরীক্ষা শিশুদের বিকাশে কী ধরনের ভূমিকা রাখছে তার ব্যবচ্ছেদও করছি না। আমি শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী নই, তাই সেটি নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো। যেহেতু আমি শিক্ষায় মূল্যায়ন ও গবেষণা নিয়া পড়াশোনা করেছি এবং এখনো এ বিষয় নিয়েই কাজ করছি, তাই বিষয়টি নিয়ে কিছু আলোচনার সূত্রপাত করি।

বলুন তো, আমরা আসলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নিচ্ছি কেন? শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করতে? নাকি জিপিএ ৫ কে পেলো আর কে পেলো না তার তালিকা তৈরি করতে? কতো শতাংশ শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির প্রান্তিক যোগ্যতা কতোটা অর্জন করলো তার চেয়ে আমাদের বড় আগ্রহ কতো শতাংশ এ প্লাস পেল বা কোন বিদ্যালয় থেকে কতো জন এ প্লাস পেল তার হিসাব নিতে।


আমরা আসলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নিচ্ছি কেন? শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করতে? নাকি জিপিএ ৫ কে পেলো আর কে পেলো না তার তালিকা তৈরি করতে? কতো শতাংশ শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির প্রান্তিক যোগ্যতা কতোটা অর্জন করলো তার চেয়ে আমাদের বড় আগ্রহ কতো শতাংশ এ প্লাস পেল বা কোন বিদ্যালয় থেকে কতো জন এ প্লাস পেল তার হিসাব নিতে।


অভিভাবক থেকে শুরু করে আমাদের সবার আগ্রহের জায়গা ওই এক জায়গায়। এ প্লাস কিংবা পাশের হারের গ্রাফটা কতোটা উর্ধ্বমুখী সেদিকেই আমাদের আগ্রহ। কেউ কেউ আবার আরেক ধাপ এগিয়ে এই ফলাফলের রাজনৈতিক মতাদর্শও বিচার করেন। আমলভিত্তিক আমলনামা তৈরি করেন। ফলে শিক্ষার্থীর শিখনকেন্দ্রিক আলোচনা চাপা পড়ে যায়। ফলাফলই হয়ে ওঠে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী বা এ-ধরনের পরীক্ষার মূল ইস্যু। তাই আমরা আসলে মূল্যায়নের প্রক্রিয়াটাকে গুরুত্ব না দিয়ে ফলাফলকে গুরুত্ব দিচ্ছি। আসলে উল্টোটা হলেই কিন্তু শিক্ষার উন্নয়নে এসব পরীক্ষা সহায়ক হতো।

এই ফলাফলটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় আমি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে আমাকে আতঙ্কিত করছে। সেটি হচ্ছে, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার মধ্য দিয়েই হয়তো জিপিএ-৫ কিংবা ভালো ফলাফলের আশায় কয়েক লাখ শিশু কীভাবে পরীক্ষায় নকল করতে হয় তা শিখে যাবে। শিক্ষা জীবনের শুরুতেই অনেকে লুকিয়ে নকল করা শিখবে, যার প্রয়োগ চলবে সমগ্র শিক্ষা জীবনজুড়ে। তারা হয়তো জানবেই না নকল করা অন্যায়।

এদের মধ্যে অনেকেই হয়তো নকল করেই জিপিএ ৫-ও পেয়ে যাবে। এই ফলাফল তাদের মধ্যে উচ্চাশা জন্ম দিবে এবং কালক্রমে শেখার আগ্রহ নষ্ট করে দিবে। তারা তাদের পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে এভাবেই পাস করার ফন্দি আঁটবে, যা সার্বিকভাবে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে শূন্যস্থান তৈরি করবে। আর এর অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসেবে একসময় সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। আমার মনে হয় আমার সে দিকে কিছুটা হলেও এগিয়ে যাচ্ছি।

পরীক্ষার সময়গুলোতে গণমাধ্যমগুলোতে পরীক্ষাকেন্দ্রের নানা খবর আসে। দিন শেষে হিসাব দেয়া হয় পরীক্ষায় নকল করার দায়ে কতো শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়েছে সেই সংখ্যার। আবার মাঝে মাঝে শিক্ষকদেরও এই অসাধু কাজের সাথে জড়িত থাকার খবর বেরোয়, যা আমাদের আশাহত করে।

একবার এক কর্মকর্তা পরীক্ষার হলের দায়িত্ব পালন শেষে সন্ধ্যাকালীন আড্ডায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “শিশুদের কাছে নকল সরবরাহ বন্ধই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। অভিভাবক-শিক্ষক যে যেভাবে পারছেন নকলের সাপ্লাই অব্যাহত রাখছেন। তারা তো আদতে শিশুটির ভবিষ্যৎই নষ্ট করছেন।” আসলে ফলাফল-নির্ভর পরীক্ষায় এমনটিই হওয়ার কথা। কেনো না রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষক কিংবা অভিভাবক কারো কাছেই শিশুর শিখন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারা চায় ফলাফল, এ প্লাস।

এই ফলাফলকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কারণে আমরা শিশুদের শেখানোর চেয়ে মুখস্থকরণের প্রতি বেশি জোর দিচ্ছি। আর অভিভাবকরা রীতিমতো শিশুদের বইয়ের পাতা মুখস্থ করে গেলানোর চেষ্টা করছেন। শিক্ষা কর্মকর্তারাও একইভাবে ভালো ফলাফলের ওপর জোর দিচ্ছেন। এই ফলাফল নিয়ে কোথাও কোথাও শিক্ষা কর্মকর্তাদের দ্বারা শিক্ষকদের শোকজ, বেতন বন্ধসহ নানা উদ্যোগের কথা শোনা যায়।

কিন্তু শিশুর শিখন প্রক্রিয়ার উন্নয়নে উদ্যোগের খবর খুবই কম শোনা যায়। তাই কিছু শিক্ষক তাদের সুনাম-সুখ্যাতি ছড়াতে বা বেতন-ভাতা চালু রাখতে শিশুদের পরীক্ষার হলে প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত রাখেন। দুষ্ট লোকজন এসব সহযোগিতাকে ‘নকল’ বললেও শিক্ষক নেতারা তা মানতে নারাজ। তাদের ভাষ্য, কোমলমতি শিশুরা যাতে ঝরে না পরে এজন্যই এ ব্যবস্থা।

এর ধরনের শিক্ষকদের বলছি— একটি বারও কি ভেবে দেখেছেন যে, আসলে আপনি আপনার নিজের দায়িত্বের সাথেই প্রতারণা করছেন? আপনার সম্মান আপনি নিজেই নষ্ট করছেন? ওই শিশুটি আপনার সন্তান হলে কি তার হাতেও আপনি নকল তুলে দিতেন? তবে এমন অনেক শিক্ষক আছেন যারা নকলের সাথে আপোষ করেননি। বিনিময়ে তাদের পরীক্ষার হলের কক্ষ পরিদর্শকের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার খবরও গণমাধ্যমে এসেছে।

আসলে যেকোনো সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে সমস্যাটি স্বীকার করতে হবে। তারপর সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা বিষয়টি অনুধাবন করলেও কেউই মুখ খুলছি না। সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছি না।


আমরা ফলাফলনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে শিখননির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন চাই। আমরা এমন শিক্ষাব্যবস্থা চাই যেখানে শিশুরা নকল করতে চাইবে না। কোনো অভিভাবক কিংবা শিক্ষকেরও সম্মানহানির ঘটনা ঘটবে না। সেখানে শিক্ষকদের মূল কাজ হবে শিশুদের মেধার বিকাশে সহযোগী হিসেবে কাজ করা।


আসুন, শিশুদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে একটি সামাজিক আন্দোলন শুরু করি। এর শুরুটা আমাদেরকেই করতে হবে। আসলে আমরা কী চাই সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে। ফলাফল নাকি শিখন— কোনটি আমার শিশুর জন্য জরুরি তা নির্ধারণ করতে হবে। আমার মনে হয় শিখনটাই মূখ্য হওয়া উচিত। যদি শিশু শিখতে পারে তবে সে তো পরীক্ষার খাতায় কারো সহযোগিতা ছাড়াই লিখতে পারবে। আর ভালো লিখলে তো ভালো ফলাফল আশাই করা যায়। তাই নয় কি?

আমরা ফলাফলনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে শিখননির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন চাই। আমরা এমন শিক্ষাব্যবস্থা চাই যেখানে শিশুরা নকল করতে চাইবে না। কোনো অভিভাবক কিংবা শিক্ষকেরও সম্মানহানির ঘটনা ঘটবে না। সেখানে শিক্ষকদের মূল কাজ হবে শিশুদের মেধার বিকাশে সহযোগী হিসেবে কাজ করা। আগামীর বাংলাদেশের জন্য নীতিনির্ধারকবৃন্দ কি বিষয়টি ভেবে দেখবেন?

সালাহউদ্দিন সোহাগ: শিক্ষা বিষয়ক গবেষক।

লেখাটি কতোটুকু পছন্দ হয়েছে?

Leave a Comment

14 − twelve =