উচ্চশিক্ষা নেতৃত্ব ও দক্ষতা বিদেশে শিক্ষা শিক্ষক ও শিক্ষা

বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি ছাড়া অধ্যাপক: ডিগ্রি অর্জনের বাস্তবতা, পদন্নোতি ও শিক্ষকদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা

উচ্চতর ডিগ্রি
উচ্চতর ডিগ্রি, ছবি-কৃতজ্ঞতা: ntvbd.com
লিখেছেন গৌতম রায়

মোঃ মাহবুব আলম প্রদীপ

বিভিন্ন সময়ে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি ছাড়া অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিয়োগ ও শিক্ষকদের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেসব প্রকাশিত সংবাদ সবার মাঝে আলোচনার খোরাক যোগায়। সংবাদগুলো এমনভাবে প্রকাশ করা হয় যে তা সমাজের সকল স্তরের মানুষের মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্মাচ্ছে। এ ধারণা আরও জোরালো হয়ে উঠে যখন শিক্ষকদের যোগ্যতা অর্জনের বিষয়ে ভুল তথ্য প্রচার করা হয়। এ প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ডিগ্রি ছাড়া অধ্যাপক বনে যাওয়া, শিক্ষকদের ডিগ্রি অর্জনের বাস্তবতা ও শিক্ষকদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা সম্পর্কে আলোচনার অবতারণা করা।

কিছুদিন আগে বাংলা ট্রিবিউন-এ “পিএইচডি ছাড়াই অধ্যাপকে ভরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যের আলোকে দেশের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ডিগ্রি ছাড়া অধ্যাপক হওয়া সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদের মূল বিষয়বস্তু এরকম—পিএইচডি ডিগ্রি ছাড়া বিশ্ববদ্যালয়ের শিক্ষকরা অধ্যাপক পদে পদন্নোতি পাচ্ছেন এবং এ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

প্রকাশিত সংবাদের আলোকে অনেকের ধারণা জন্মেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শুধু দলবাজি করেন, পড়াশোনার ধার ধারেন না। আবার অনেকে ধরে নিয়েছেন, কোনোরকম যোগ্যতা ছাড়া অধ্যাপক হচ্ছেন এবং জনগণের করের টাকা থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকের ডিগ্রি নেই এবং এ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে—এ ধরনের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে আমার একশত ভাগ সন্দেহ আছে। আমি এর পেছনে কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরছি।

প্রথমত, খুব সরলীকরণ করে বলা হয়েছে যে দেশের বিভিন্ন সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে উন্নীত শিক্ষকদের পিএইচডি ডিগ্রি নেই। এই তথ্য কতটুকু সত্য? উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যে সংখ্যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে তার সত্যতা কে যাচাই করবে? গবেষণার উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন জ্ঞান তৈরি করা। এটি সত্য যে, পিএইচডি ডিগ্রি গবেষণা শেখার একটি প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভালোমানের গবেষণা শেখা যায়। তবে অনেকেই গবেষণাভিত্তিক স্নাতকোত্তর বা এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন যার মাধ্যমেও গবেষণা শেখা যায়। এটি হয়তো প্রতিবেদকের জানা নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের তথ্য দিয়ে সারা দেশের সরকারী বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষককদের এক করে দেখা যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা নয়।

দ্বিতীয়ত, কতজন শিক্ষক পিএইচডিতে অধ্যয়নরত আছেন তার হিসাব কিন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসেনি।

তৃতীয়ত, স্বল্পসংখ্যক শিক্ষক কর্ম-অভিজ্ঞতা কিংবা কর্মসময় অতিবাহিত করার মাধ্যমে অধ্যাপক পদে উন্নীত হলেও এদের কতোজন পিএইচডিতে অধ্যয়ন করছেন, তার সঠিক সংখ্যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

চতুর্থত, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দিনে দিনে ডিগ্রি ছাড়া অধ্যাপকের সংখ্যা বাড়ছে। এ যুক্তি বা তথ্য কীসের ভিত্তিতে? বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করা বা ডিগ্রি অর্জন করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রভাষক পদে যোগদানের পর থেকেই ধাপে ধাপে এই ডিগ্রি অর্জন করতে হয়। কেউ কেউ সরাসরি পিএইচডিতে অধ্যয়ন করলেও বেশিরভাগই গবেষণাভিত্তিক স্নাতকোত্তর কিংবা এমফিল ডিগ্রি করার মাধ্যমে পিএইচডি ডিগ্রিতে ভর্তি হয়ে থাকেন। কতজন সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক এবং প্রভাষক এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন বা এমফিলে অধ্যয়ন করছেন, পিএইচডি ডিগ্রি করেছেন বা পিএইচডি ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত, তার সঠিক কোনো তথ্য দেয়া নেই। সুতরাং উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়া এটা বলা যায় না যে, এ সংখ্য বা ডিগ্রি ছাড়া অধ্যাপকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

আমি যেহেতু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত, সেহেতু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য-উপাত্তের আলোকে প্রতিবেদনের যৌক্তিকতা বিচারের চেষ্টা করবো। এই তথ্য-উপাত্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরইউ কন্টাক্ট অ্যাপসের (RU Contact Apps) ভিত্তিতে করা হয়েছে। অ্যাপটি যেহেতু হালনাগাদ করা নেই, তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আমি যে সংখ্যা তুলে ধরেছি তার চেয়ে প্রাপ্ত পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষকের সংখ্যা অবশ্যই বেশি হবে, কম নয়। কেননা, গত এক বছরে অনেক শিক্ষক পিএইচডি এবং এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ডিগ্রি অর্জনের জন্য নতুন করে অধ্যয়ন শুরু করেছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট অনুষদ ৯টি। ৯টি অনুষদের অধীনে বিভাগ আছে ৫৭টি (অ্যাপসের তথ্য অনুসারে)।  ৯টি অনুষদের অধীনে ৫৭টি বিভাগে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ১,১২৬ জন। মোট অধ্যাপকের সংখ্যা ৪৭৯ জন। এর মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত অধ্যাপকের সংখ্যা ৪৪৪ জন। ৩৫ জন শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রি ছাড়া অধ্যাপক পদে উন্নীত হয়েছেন। তবে তা কর্ম-অভিজ্ঞতা ও সময়ের আলোকে নীতিমালা মেনেই হয়েছেন। সহযোগী অধ্যাপকের সংখ্যা ২৭৬ জন। এর মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা ২০৭ এবং পিএইচডি ডিগ্রি নেই এমন শিক্ষক ৬৯ জন। ৩১৯ জন সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। এর মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত এবং ডিগ্রি ছাড়া শিক্ষকের সংখ্যা যথাক্রমে ৭৯ এবং ২২৪। প্রভাষক পদে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৫২ জন যার মধ্যে ৬ জন শিক্ষক ইতোমধ্যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৬টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। এই ইনস্টিটিউটগুলোতে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৩১ এবং পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা ২৫। ১৭ জন অধ্যাপকের সবাই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।  ৮ জন সহযোগী অধ্যাপকের মধ্যে ৭ জনের পিএইচডি ডিগ্রি আছে এবং ৬ জন সহকারী অধ্যাপকের মধ্যে ১ জন পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত। প্রভাষক পদে কোনো শিক্ষক কর্মরত নন। দেখা যাচ্ছে, ইনস্টিটিউটগুলোতে ১০০% অধ্যাপকই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

অনুষদ ও ইনস্টিটিউট মিলে মোট অধ্যাপকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯৬ জন। এর মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী অধ্যাপকের সংখ্যা ৪৬১। মোট অধ্যাপকের ৯৩% পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত। মাত্র ৭% শিক্ষক ডিগ্রি ছাড়া অধ্যাপক পদে পদন্নোতি পেয়েছেন; কিন্তু অনিয়মের মধ্যে থেকে নয়। নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেই অধ্যাপক হয়েছেন। তাছাড়া, এই ৭% শিক্ষক জীবনে গবেষণাভিত্তিক কোনো ডিগ্রি অর্জন করেননি তাও কিন্তু নয়। তাঁদের অনেকেই এমফিল কিংবা সমমান গবেষণাভিত্তিক দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। মাত্র ৭% শিক্ষকের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মান খারাপ কিংবা গবেষণার মান খারাপ, এমন সরলীকরণ সমর্থিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার মান কমে যাওয়া বা গবেষণার মান কমে যাওয়ার জন্য আরও অনেক কারণ বিদ্যমান। স্বল্পসংখ্যক শিক্ষক কেন পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করতে পারেননি—তার বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

শিক্ষকদের ডিগ্রি অর্জন না করার জন্য অনেকাংশেই রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিকে দায়ী করা হয়েছে। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে অন্য শিক্ষকরা কীভাবে ডিগ্রি অর্জন করলেন? ডিগ্রি অর্জন না করার জন্য রাজনীতি অনেকগুলো কারণের একটি। রাজনীতিই ডিগ্রি না করার একমাত্র কারণ নয়। গত নয় বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে নিম্নের কারণগুলো আমার কাছে মুখ্য বলে মনে হয়।

প্রথমত, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা বলতে মূলত ক্লাস নেওয়াকেই বুঝায়। আমাদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে গবেষণাভিত্তিক পড়াশোনা না থাকায় (কিছু কিছু বিভাগে হয়তো গবেষণাভিত্তিক স্নাতকোত্তর আছে), কেউ কেউ ডিগ্রি করা কিংবা গবেষণা শেখা এবং করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না।

দ্বিতীয়ত, জুনিয়র শিক্ষকদের কেউ কেউ সঠিক নির্দেশনার অভাবে কিংবা ভুল নির্দেশনার কারণেও ডিগ্রি অর্জন করেন না বা করতে ইচ্ছুক হন না। সিনিয়র কিছু শিক্ষক আছেন যাদের পিএইচডি নিয়ে মাথাব্যথা থাকে না এবং তিনি জুনিয়দের উৎসাহিত করেন এ বলে যে, পিএইচডি শুধু নিজের পদন্নোতির জন্য করা হয়। অ্যাকাডেমিক কোনো উপকারিতা এর নেই। কিংবা জ্ঞানার্জনের জন্য পিএইচডির দরকার নেই।

তৃতীয়ত, কিছু শিক্ষক পিএইচডিতে ভর্তি হন। কিন্তু ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক কারণে আর ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন না।

চতুর্থত, কিছু শিক্ষক বিভাগে অন্তর্গত দ্বন্দ্বের কারণে পড়ালেখা থেকে দূরে সরে যান।

এবং পঞ্চমত, কিছু শিক্ষক রাজনীতিকে মূল কাজ হিসেবেই বেছে নেন। রাজনীতিতে পুরো সময় ব্যয় করেন। পড়াশোনা করেন না কিংবা করার সময় পান না।

দেখা যাচ্ছে, পিএইচডিতে পড়াশোনা না করার জন্য অনেকগুলো কারণ বিদ্যমান। শুধু রাজনীতিই একমাত্র কারণ নয়। রাজনীতিকে একমাত্র কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলে দেশের মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছাবে।

এবার কথা বলা যাক পদোন্নতির বিষয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি হয়, আবার কারো কারো হয় না। কেউ বা আবার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। এই রাজনৈতিক বিবেচনায় যদি পদোন্নতি পেয়ে থাকেন, তাহলে ৯৩% পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষক কি রাজনৈতিক বিবেচনায় অধ্যাপক হয়েছেন? এখানে তাঁরা নিজেদের যোগ্যতার পরীক্ষা দিয়েই অধ্যাপক হয়েছেন। এটি অসত্য নয় যে, খুব কম সংখ্যক শিক্ষক পিএইচডি ছাড়াই অধ্যাপক হয়েছেন। বলা বাহুল্য, তাঁরা প্রচলিত নিয়ম মেনেই অধ্যাপক হয়েছেন। ডিগ্রি দিয়ে নয় কিন্তু কর্মসময় অতিবাহিত হওয়ার পর হয়েছেন। কিছু কিছু শিক্ষক পদোন্নতি-বঞ্চিত হয়েছেন বা দেরিতে পদোন্নতি হয়েছে—এটিও অস্বীকার করা যাবে না। কোনো প্রতিষ্ঠানই এরকম অন্যায় থেকে বিরত নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে।

এবার কথা বলা যাক, একটি নির্দিষ্ট কর্মসময় অতিবাহিত করে অধ্যাপক হওয়া প্রসঙ্গে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এর বিরোধী। একজন শিক্ষকের পদোন্নতি শুধু গবেষণাকর্মের বিচারেই হওয়া উচিত। নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত করার পর কোনো পদেই পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ থাকা যুগপোযোগী নয় কিংবা উচিতও নয়। কিন্তু এ নীতিমালা কে করবে? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দিন দিন যেন নিয়মনীতি আরও সহজ থেকে সহজতর করছে।

আমাদের ইউজিসি আছে। ইউজিসি শিক্ষক নিয়োগের একটি সর্বজনীন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ইউজিসির আদৌ কি নীতিমালা প্রণয়ন করার আইনি ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব আছে? ইউজিসি যে আইনি কাঠামোয় পরিচালিত হয়, তাতে নীতিমালা প্রণয়নের এখতিয়ার নেই। ইউজিসির প্রধান কাজ হচ্ছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অর্থ ছাড় ও সমন্বয় সাধন করা। সম্প্রতি ইউজিসি শিক্ষকদের নিয়োগ এবং পদন্নোতির যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, তা যথেষ্ট বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

কথা বলা যেতে পারে ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকেরা কেন গবেষণা কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত রাখেন না। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর গবেষণা কর্ম চালিয়ে না যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ এবং যথাযথ অর্থের অভাব। অনেক শিক্ষকের বসার অফিস নেই। সরকার থেকেও গবেষণার জন্য তেমন কোনো অর্থবরাদ্ধ নেই। একটি গবেষণাকর্ম পরিচালনার জন্য মোটামুটি মানের অর্থের প্রয়োজন হয়। এর ব্যয় বহন করা শিক্ষকদের পক্ষে সম্ভব হয় না। কিছু শিক্ষক আছেন যারা নিজের উদ্যোগে গবেষণা করছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁরা কীভাবে করছেন? তাঁরা যদি করতে পারেন তাহলে অন্যরা কেন নয়? এক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা বলে, কিছু শিক্ষক বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেন। এবং সেই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্ত ব্যবহার করে গবেষণা করছেন। এতে গবেষণার ব্যয়ভার পরোক্ষভাবে বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বহন করছে।

প্রশ্ন আসতে পারে, ডিগ্রি অর্জন করা বা গবেষণা যদি এতোই কঠিন হয়ে থাকে, তাহলে পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে কেন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না? এ বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের বাস্তবতা নিয়েও ভাবতে হবে। আমাদের দেশে স্নাতকোত্তরের পর সরাসরি শিক্ষকতায় সদ্য পাশ করা কিংবা এমফিল/পিএইচডি ডিগ্রি ছাড়া প্রার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনে সাড়ে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। স্নাতকোত্তর করার পর একজন ছাত্র/ছাত্র ডিগ্রী করবেন—খুব ভালো কথা। কিন্তু তার আর্থিক নিশ্চয়তা কে দিবে? সরকার কি গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত টাকা বরাদ্ধ করেছে? কিংবা উচ্চশিক্ষা অর্জনে বাজেটে ব্যয়ের পরিমাণ কতটুকু? ৪-৫ বছর একজন ছাত্র/ছাত্রী বেকার থেকে ডিগ্রি করবেন—এটি কতটা বাস্তবসম্মত যুক্তি? আমাদের কাছে কেউ ডিগ্রি করার জন্য জানতে চাইলে প্রথমেই যদি বলি শিক্ষকতা করতে চাও বা গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে চাও, তাহলে এমফিল বা পিএইচডি করো। তখন অবধারিতভাবে উত্তর আসে, স্যার চাই তো! তবে চাকরিটাও খুব দরকার। বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। পড়াশোনা শেষে একজন ছেলে/মেয়ে সংসারের হাল ধরবেন এটিই বাবা-মা-ভাই-বোন প্রত্যাশা করেন এবং এটিই বাস্তবতা।

দেশের শিক্ষকদের নিয়ে দেশের বাইরে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের অনেক সময় তীর্যক মন্তব্য শোনা যায়। উন্নত দেশে যারা ডিগ্রি করছেন তারা ভালো অফিস পান, কম্পিউটার পান এবং বিনামূল্যে উপকরণ পান। প্রতিমাসে যে পরিমাণ টাকা পান, তা দিয়ে নিজে চলার পাশাপাশি পরিবারের খরচও যোগাড় করেন। অনেক ক্ষেত্রে আবার পরিবারের খরচ যোগাড়ের বিষয়টি ছাড়িয়ে বাড়ি-গাড়িও করেন। সুতরাং যারা দেশ থেকে বিদেশে পড়াশোনা করতে গিয়ে বড় বড় কথা বলেন, তাদের একবার ভেবে দেখা উচিত, আমি দেশে সদ্য পাশ করা একজন শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি করতে বলছি, কিন্তু তার বাস্তবতাটুকু কোথায়? কিংবা দেশে একজন শিক্ষককে যে বিনা সুযোগ-সুবিধায় ডিগ্রি অর্জনের জন্য জ্ঞান দিচ্ছি—তার বাস্তবতাটুকু কতটুকু? আবার অনেকে বলে থাকেন, যোগ্যতা নেই বলে অনেকেই দেশে ডিগ্রি করেন। যোগ্যতা প্রমাণের সাথে অর্থের বিষয় জড়িত। প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন প্রয়োজন, যা আমাদের দেশের শিক্ষকেরা খুব কমই পেয়ে থাকেন। তারপরও অনেকেই এসব বাঁধাবিপত্তি অতিক্রম করে দেশের বাইরে থেকে ডিগ্রি করছেন কেবল ইচ্ছাশক্তি আর নিজের মেধার জোরে। তাছাড়া কলা অনুষদের এমন কিছু বিষয় আছে, যার বৃত্তির সুযোগ দেশের বাইরে নেই বললেই চলে।

অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষকের কট্টর সমালোচনা করেন। সমালোচনা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই; আপত্তি হচ্ছে ভাষাপ্রয়োগে। একজন শিক্ষার্থী নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুক তো সে জানে কি না তার শিক্ষকের কয়টি ভালো প্রকাশনা আছে। কিংবা তিনি কী কী কাজ করছেন? এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদেরও দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তত্ত্বভিত্তিক, গবেষণাভিত্তিক নয়। তাই একজন শিক্ষার্থী জানার প্রয়োজন বোধ করেন না শিক্ষকের কাজের বিষয়বস্তু কী? যদি গবেষণাভিত্তিক মাস্টার্স থাকতো, তখন শিক্ষার্থীরা নিজেই খুঁজে দেখতেন কোন শিক্ষকের কী কাজ এবং কার সাথে কাজ করা যায়। আর বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা নিজের বিভাগ এবং বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করেন ভিন্নভাবে। কোন শিক্ষক ক্লাসে ভালো পড়ান তার বাইরে যে নিয়ামকগুলো কাজ করে তার মধ্যে হলো—কোন বিভাগ বনভোজন ঝাঁকজমকভাবে আয়োজন করতে পারে, নবীন-বরণ কীভাবে করেছে, কনসার্ট আয়োজন করেছে কিনা, পহেলা বৈশাখ রমরমা হয়েছে কিনা, আন্তঃবিভাগ খেলাধুলায় বিভাগ কতো টাকা বরাদ্ধ করেছে, কোন শিক্ষক কম পড়িয়ে বেশি নম্বর দেন, কোন শিক্ষক সবচেয়ে বন্ধুসুলভ, কোনো শিক্ষকের সাথে খুব সহজে কথা বলা যায় কিংবা জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যায়। ক্লাসে পড়ানো শিক্ষকদের যোগ্যতা নির্ধারণের অনেকগুলো নিয়ামকের মধ্যে একটিমাত্র নিয়ামক; একমাত্র নিয়ামক নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের শিক্ষার্থীরা এভাবেই নিজের বিভাগ ও শিক্ষকদের মূল্যায়ন করে থাকে। তবে, এও সত্য, এ ধারণা তৈরির জন্য আমরাই দায়ী।

ফিরে আসা যাক মূল আলোচনায়। গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রি ছাড়া শিক্ষকদের শিক্ষকতা পূর্ণতা পায় না। তবে এ ডিগ্রি অর্জন এবং পরবর্তীতে গবেষণাকর্ম পরিচালিত করা এবং পদোন্নতির জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।  শিক্ষকদের ডিগ্রি অর্জনের জন্য এই বিষয়গুলো ভেবে দেখা যেতে পারে।

প্রথমত, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত একজন শিক্ষককে উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষকের জন্য বসার জায়গা দিতে হবে যেন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, দেশে যারা ডিগ্রি করতে চান তাদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এবং তত্ত্বাবধায়কের সম্মানী বৃদ্ধি করতে হবে।

তৃতীয়ত, দেশের বাইরে যারা ডিগ্রি করতে চান তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। আইএলটিএস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্থিক অনুদান দেওয়া প্রয়োজন।

চতুর্থত, অনেক দেশেই আবেদন ফি অনেক বেশি হওয়ায় তা বহন করা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনার প্রয়োজন।

শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য আমার মত হচ্ছে, কর্মসময় অতিবাহিত করার মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়ার নিয়মটি বন্ধ করতে হবে। শুধু গবেষণাকর্মের মাধ্যমে পদোন্নতির নিয়ম করা যেতে পারে। একটি স্তর থেকে আরেকটি স্তরে যেতে ভালো ইন্ডেক্সড জার্নালে প্রবন্ধ/নিবন্ধ প্রকাশিত হতে হবে। তবে, সহযোগী অধ্যাপক পদে অবশ্যই পিএইচডি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এসব শর্ত যারা পূরণ করবেন তারাই পদন্নোতি পাবেন, অন্যথায় নয়।  এ প্রক্রিয়া চালু করলে ডিগ্রি ছাড়া পদোন্নতি পাওয়া বা নিয়ম-বহির্ভূতভাবে পদন্নোতি পাওয়ার সংবাদ আমাদেরকে শুনতে হবে না। তবে, এসব নিয়ম চালু করার পূর্বে অবশ্যই শিক্ষকদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এসব সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য অবশ্যই সরকারকে একটি আলাদা গবেষণা ফান্ড গঠন করতে হবে।

সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় না এনে ডিগ্রি অর্জন এবং পদন্নোতি পাওয়ার জন্য এককভাবে শিক্ষকদের দায়ী করা যায় না। প্রতিবেদন তৈরির সময় এসব বিষয় বিবেচনা করার দরকার ছিলো। একতরফা প্রতিবেদনের মাধ্যমে একটি ব্যবস্থা সম্পর্কে খারাপ ধারণার জন্ম দেয়া যায়; কিন্তু প্রতিকার পাওয়া যায় না। শিক্ষকরা ৪৫ হাজার টাকা গাড়ি সংরক্ষণ বাবদ পান না, ৩২ হাজার টাকা বাবুর্চি খরচ বাবদ পান না, টেলিফোন বিল পান না, ৭৫ হাজার টাকা মোবাইল কেনার জন্য পান না, স্বল্প সুদে বাড়ি বানানোর জন্য ঋণ পান না, প্রটোকল পান না। সীমিত সুযোগের মাধ্যমে প্রায় সকল শিক্ষকই ডিগ্রি অর্জন করছেন এবং কমবেশি গবেষণাকর্মে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখছেন। শুধু ৫-৭% শিক্ষকের ডিগ্রি অর্জন না করার কারণে সবকিছু অশুদ্ধ হয়ে গেছে এমনটি ভাবার কারণ নেই। প্রশ্ন হতে পারে, এতো সমস্যার মধ্যেও যদি প্রায় সকল শিক্ষক ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন এবং গবেষণায় সম্পৃক্ত থাকতে পারেন, তাহলে অন্যরা কেন পারেন না? সহজ উত্তর, এতো সমস্যার মধ্যে কিছু সংখ্যক শিক্ষক সমস্যাকেই প্রধান বিষয়বস্তু হিসেবে ধরে নিয়ে শিক্ষকতা করতে পারেন। সুযোগ-সুবিধা না দিয়ে ডিগ্রি না করার জন্য যদি কাউকে দায়ী করতে হয়, তবে এই দায় অবশ্যই সরকারের নীতি নির্ধারকদের।

মোঃ মাহবুব আলম প্রদীপ: পিএইচডি গবেষক, শান্তি অধ্যয়ন বিভাগ, নিউ ইংল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া। সহকারী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

একটি মন্তব্য

মন্তব্য লিখুন

1 × 3 =