শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়া

শ্রেণিকক্ষের বাইরের শিক্ষাই প্রকৃত এবং দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষা

মাছুম বিল্লাহ: প্রকৃত শিক্ষালাভের জন্য আপনার সন্তানকে সবসময়ই নোটবই, গাইড বই, কোচিং, বইয়ের থলে আর ব্লাকবোর্ডের সাথে লেগে থাকতে হবে না। সত্যিকারের শিক্ষা শুধু ঐতিহাসিক কিছু তথ্য মুখস্থ করা কিংবা কয়েকটি গণিতের সমাধান করা নয়, বা গ্রামরের কিছু নিয়ম জানা নয়। শিক্ষা হচ্ছে একধরনের জীবনব্যাপী ইন্টারএকটিভ পদ্ধতি যেখানে থাকবে প্রশ্ন করা, আলোচনা করা, ক্রিটিক্যালি কোনো কিছু চিন্তা করা, কোনো প্রচলিত বিষয়ের মধ্যে নতুন অর্থ খুঁজে বের করা এবং প্রতিটি অবস্থায় অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করা ইত্যাদি।

ধরুন, টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত একটি খেলা দেখছেন। বিষয়টি কেমন? অবশ্যই মজার। কিন্তু ধরুন আপনি স্টেডিয়ামে বা মাঠে সমর্থক কর্তৃক বেষ্টিত হয়ে খেলা দেখছেন। দুটোতে কি একই ধরনের মজা পাবেন? বাস্তব অভিজ্ঞতার বর্ণনা কোনোভাবেই টেলিভিশনে বা প্রতিবিম্বের বা ইমেজের মাধ্যমে দেখানো সম্ভব নয়। শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। শ্রেণিকক্ষে যে শিক্ষা দান করা হয়, তা অনেক সময়ই বাস্তব অবস্থার সাথে মিল থাকে না। আমাদের শিক্ষার্থীরা ইতালিয়ান রেনেসাঁ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে বই পড়ে, সেই জানা আর যদি ইতালিয়ান ভাস্কর্য দেখে, পেইন্টিং দেখে কিংবা একুরিয়াম স্বচক্ষে দেখে, তাহলে কি একই ধারণা হবে রেনেসাঁ সম্পর্কে? আমাদের অনেক বিদ্যালয়েই বিজ্ঞান পড়ানোর যন্ত্রপাতি নেই, থাকলেও ব্যবহার করা হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান পড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে দিন দিন। শিক্ষার্থীরা প্রথমদিকে যখন ল্যাবটেরিতে কাজ শুরু করে তখন খুব উত্তেজিত থাকে; কিন্তুু কিছুদিন যাওযার পর অনেক এক্সপেরিমেনেন্টের বাস্তবের সাথে মিল থাকে না বলে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশন ইনিস্টিটিউটের অধ্যাপক মাইকেল রেইস বলেছেন, ‘ক্লাসরুমের বাইরের কার্যাবলী শ্রেণিকক্ষের চেয়ে শিক্ষাথীদের আগ্রহ বেশি বাড়ায়’।

শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য আমরা ফিল্ড ভিজিটের আয়োজন করে থাকি। মার্টিন ব্রন্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসরও বলেছেন ফিল্ড ট্রিপের কথা- ফিল্ড ট্রিপের মাধ্যমে অর্জিত শিক্ষা শিক্ষার্থীরা অনেকদিন মনে রাখতে পারে। তারা সেখান থেকে সরাসরি যে উদাহরণগুলো দিতে পারে, তা বিদ্যালয় কিংবা শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষায় সম্ভব নয় । ফিল্ড ট্রিপ শুধু বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নয়; এটি ইতিহাস, ভূগোল, গণিত, ইংরেজিসহ কারিকুলামের অন্যান্য সব বিষয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমার মনে আছে, আমরা যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম । শেক্সপিয়ারের যে নাটকটি যেদিন পড়ানো হবে, শিক্ষকরা তার আগে বলতেন আগামীকাল বা তার পরদিন ব্রিটিশ কাউন্সিলে ‘ম্যাকবেথ’ নাটক মঞ্চস্থ হবে, তোমরা সবাই নাটকটি দেখবে। নাটক দেখে আসতাম এবং পড়ার সময় বার বার কোন চরিত্র কীভাবে আচরণ করত, কী ভূমিকা পালন করত- নাটক পড়ার সময়ে চোখের সামনে ভেসে আসত। একদল শিক্ষার্থীদের যখন বায়োলজির জন্য ক্লাসরুমের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তারা ঐদিনের জন্য অন্যান্য বিষয়গুলোর ক্লাসও করতে পারছে না। কাজেই অন্যান্য বিষয়ও ফিল্ড ট্রিপের আওতায় আনা দরকার।

শিখন-শেখানো প্রকৃতিগতভাবেই স্বতস্ফুর্ত হতে পারে এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক হতে পারে যখন শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমের চার দেয়ালের বন্দিদশা থেকে বাইরের মুক্ত বাতাসে নিয়ে আসা হয়। শিক্ষার্থীরা যখন কোনো বিষয় বাস্তবজীবনে অনুশীলন করার সুযোগ পায়, তখন শ্রেণিকক্ষের বাইরে এবং ভেতরে এক ধরনের সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রাসঙ্গিকতা রক্ষা করতে পারে।

অনেকের নিকট ফিল্ড ট্রিপ মানে দীর্ঘ বাস ভ্রমণ, শুকনো বা ভারি লাঞ্চ, উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘুরে ঘুরে দেখা। অবশ্য ফিল্ড ট্রিপ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ও বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। তবে বাস্তব শিক্ষার জন্য ফিল্ড ট্রিপ একটু আলাদা, একটু পরিকল্পনামাফিক। এই ভ্রমণ বা ট্রিপ শিক্ষার্থীদের ভেতর আলাদা এক ধরনের সম্পর্ক কিংবা বন্ডিং সৃষ্টি করে। উঁচু শ্রেণিতে এই বন্ডিং বিয়ে পর্যন্ত গড়াতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেখেছি, পিকনিক করতে যেয়ে যে প্রেমের শুরু তা বিয়েতে গিয়ে শেষ হয়েছে। বাইরের ভ্রমণ একজন শিক্ষার্থীকে গভীরভাবে অবলোকন করার বা দেখার জন্য শিক্ষকদেরকেও সুযোগ তৈরি করে দেয়। একজন শিক্ষার্থী পৃথিবীকে কীভাবে দেখছে, কোন দৃষ্টিতে দেখছে পৃথিবীকে, কোন অবস্থায় কীভাবে সাড়া দিচ্ছে, তা সঠিকভাবে এবং বাস্তবসম্মতভাবে দেখার একটি সুযোগ। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের এভাবে দেখার মধ্যে তিনি জানতে পারেন কোন বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীর কতটা পরিস্কার ধারণা আছে যা শ্রেণিকক্ষে সব সময় কিংবা সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয় না।

শ্রেণিকক্ষের বাধাধরা নিয়ম বা চার দেয়ালের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসার পথ হলো শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা যাতে তারা তাদের চারপাশের মানুষের সাথে মিশতে পারে, প্রয়োজনে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে। শিক্ষার্থীরা কমিউনিটির সদস্যদের কথা বলে, আলাপ-আলোলোচনা করে কোনো বিষয় সম্পর্কে সঠিক তথ্য নিতে পারে, সুন্দরভাবে বুঝতে পারে যা তার পাঠ্যবিষয়কে আরও সুন্দরভাবে বুঝার জন্য মশলা হিসেবে কাজ করে। আর এটি যে তাদের মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, তা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। শিক্ষাবিদ লরি গার্ডিনার ও ডন কলকুইট অ্যান্ডারসনের মতে, সঠিক জ্ঞান অর্জনের জন্য আমরা কত শতাংশ সময় শ্রেণিকক্ষে ব্যয় করব আর কত শতাংশ শ্রেণিকক্ষের বাইরে ফিল্ড ট্রিপ, কমিউনিটি সার্ভিস, স্ট্যাডি ট্যুর বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করব, তার নির্দিষ্ট কোনো সূত্র নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী ও শ্রেণিকক্ষের ভেতরে এবং বাইরে শিক্ষাদানের সাথে সমন্বয় সাধন করে করা যায়। অথবা যখনই শ্রেণিকক্ষে একঘেঁয়েমি আসে তখনই বদলিয়ে কাজ করার মাধ্যমেই সত্যিকারের ও ফলপ্রসূ শিখন পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব।

মাঠের অভিজ্ঞতা ও গবেষণা অনেক ন্যাচারাল সায়েন্স এবং সোশাল সায়েন্সের মূল বিষয়। বিজ্ঞানের একটি অংশ হচ্ছে মানবতা শেখানো যা ফিল্ড ট্রিপের মাধ্যমে শেখা যায়। মানবিক শাখার অনেক অভিজ্ঞতা ফিল্ড ট্রিপের মাধ্যমে অর্জিত হয়। যেমন মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ, ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শন, স্থানভেদে অভিজ্ঞতা ইত্যাদি। এছাড়াও ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য শ্রেণিকক্ষের বাইরের অভিজ্ঞতা শিখন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ন উপাদান।

বিবিধ দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জ্ঞান আহরণের জন্য শ্রেণিকক্ষের চারদেয়ালের বাইরে যাওয়া একটি আবশ্যকীয় শর্ত । আমরা যদি উচুঁমানের শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করতে চাই, তাহলে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার সাথে বাইরের শিক্ষার সমন্বয় সাধন করতে হবে। শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়ে শেখা শিক্ষার্থীদের অনুসন্ধান করার দক্ষতা বৃদ্ধি করে, মূল্যায়ন বিশ্লেষণ করার এবং কোনো বিষয় পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। শ্রেণিকক্ষের বাইরের অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে এবং ধীরে ধীরে তারা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে। তবে শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষকদের পুরো নির্দেশনা এবং নিয়ন্ত্রিত পদক্ষেপ বা কার্যাবলী এর প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ হ্রাস করে শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতার ওপর জোর দিতে হবে।

ধরুন, কয়েকদিন ধরে আবহাওযা খারাপ ছিল, ঝড়, বৃষ্টি ছিল কিংবা মেঘলা আকাশ ছিল , গুমোট পরিবেশ বিরাজ করছিল। তারপর মেঘ কেটে গিয়ে আবহাওয়া ভালো হলো, প্রকৃতি হাসতে শুরু করল আপনি ক্লাস শুরু করলেন সেই চার দেয়ালের মাঝে । বাস্তব চিন্তা করে দেখুন আপনার কতটা ভালো লাগবে! প্রকৃতিগতভাবে দেখবেন শিক্ষার্থীরা বার বার বাইরে তাকাচ্ছে। প্রকৃতি তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে বাইরে আসার জন্য। এ সময় আপনি তাদেরকে ক্লাসরুমের ভেতরে কতক্ষণ আটকিয়ে রাখতে পারবেন? হ্যাঁ, আটকিয়ে রাখতে পারবেন তাদের দেহটা, কিন্তু মন কিন্তু বাইরে চলে যাবেই কারণ তাদের মনের ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ নেই। আর প্রকৃত শিক্ষা ঘটে থাকে তখনই যখন শরীর ও মনের ইচ্ছে একই বিন্দুতে অবস্থান করে। আপনি যদি তাদের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে আপনাকে অবশ্যই তাদের মনের ভাব বুঝতে হবে, আর বুঝতে পারাটাই হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষকের কাজ। আপনি যা পড়াচ্ছিলেন তাই পড়ান, কিন্তু শিক্ষার্থীদের মাঠে নামতে দিন, বিদ্যালয়ের আশেপাশে নিয়ে যান। দেখবেন প্রকৃতিগতভাবেই কতক্ষন পরে তাদের স্বাদ মিটে যাবে এবং নিজেরাই আবার ক্লাসরুমে ফিরে আসতে চাবে। আর না চাইলেও কতক্ষণ পরে আপনি তাদের নিয়ে আসেন, তারা আসবে কারণ মানব প্রকৃতি সব সময়ই পরিবর্তন চায়। এটিও এক ধরনের পরিবর্তন।

স্কুলে খেলাধুলা কি বন্ধ থাকে কখনও?

শ্রেণিকক্ষের বাইরের শিক্ষা দেওয়ার বা গ্রহণ করার কয়েক ধরনের সুবিধা আছে। এখানে শিক্ষা বাস্তব পরিবেশে ঘটে বলে শিক্ষার্থীদের কোনো বিষয়ের ওপর স্বচ্ছ ধারণা জন্মে, শিক্ষাগ্রহণ হয় বাস্তব এবং প্রাসঙ্গিক। যে বিষয়ের ধারণা শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের ভেতরে তৈরি করতে পারে না; উন্মুক্ত ও বিস্তৃত প্রকৃতির কোলে তা তারা সহজেই বুঝতে পারে। ধরুন, আপনি মূল, কাণ্ড, পাতা, ফুল ও ফল ইত্যাদি পড়াচ্ছেন হয় ছবি এঁকে বা উদাহরণ দিয়ে। তা না করে আপনি যদি বিদ্যালয়ের পাশে কোনো বাগানে নিযে সরাসরি গাছ দেখাতে পারেন, তা হলে সে সহজে ব্যাপারগুলো বুঝতে পারবে এবং ওই শিক্ষার কথা তারা সহজে ভুলবে না। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে আপনি তাদের পাখার ক্লিপ কিংবা বাঁধন খুলে দিলেন। তাদের মন উন্মুক্ত হলো এবং উন্মুক্ত মন এমন কিছু সৃষ্টি করবে যা সম্পর্কে আপনি প্রস্তুত ছিলেন না, আপনি আবিস্কার করতে পারেননি যে, ঐ শিক্ষার্থীরা কী কী করতে পারে। এতদিন তারা পরিবেশ পায়নি বলে করতে পারেনি। আপনি যে বিষয়েই পড়ান না কেন, সব বিষয়ের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটবে।

আমরা সবাই জানি যে, শিশুরা তখনই ভালো করে শেখে যখন তারা উৎফুল্ল , আনন্দিত ও কাজে ব্যস্ত থাকে। পর্যবেক্ষন শিক্ষা গ্রহণের একটি চমৎকার পদ্ধতি। ছোট শিশুরা পানি বালু নিয়ে খেললেও তার মধ্যে থেকে অনেক কিছু শিখে, আর বয়স্করা প্রকৃতির রহস্য খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। দুদলই বাস্তব অবস্থা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। এসব পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করলে শিক্ষার্থীরা সহজেই মোটিভেটেড হয় ক্লাসরুমে আসার জন্য কারণ তারা জানে তাদের শিক্ষা গ্রহণের জায়গা শুধু ক্লাসরুম নয়; উন্মুক্ত পৃথিবী এবং তাদের শিক্ষক সেসকল স্থান ও সুযোগ ব্যবহার করেন তাদের শিক্ষাদান করার জন্য। বাইরে যাওয়ার ফলে তাদের মধ্যে স্বভাবগত একটি পরিবর্তন ঘটে থাকে এবং তারা দায়িত্বপূর্ণ আচরণ প্রদর্শন করে। তখন তাদের আর অনেক কিছুই বলে দিতে হয় না, নিজ থেকেই করে। আর এই বিষয়গুলো শত চেষ্টা করেও আপনি ক্লাসরুমে শেখাতে পারবেন না।

আপনি ক্লাসরুমের বাইরে গিয়ে শেখালেন- এতে আপনার শরীর বিশুদ্ধ ও উন্মুক্ত বাতাস গ্রহণ করার সুযোগ পেল। শিক্ষাথীদেরও উন্মুক্ত ও বিশুদ্ধ বাতাস গ্রহণের সুযোগ হলো যা শরীর ও মনের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। বিভিন্ন ক্লাসরুমে ঢুকে দেখুন- বিশেষ করে যেসব ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীরা গাদাগাদি করে বসে, সেখানে কী বিশ্রি গন্ধ যা শিক্ষার্থীদের প্রতিমুহূর্তে তাড়না দিচ্ছে দ্রুত ক্লাস শেষ করার। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আপনাকে শিক্ষার্থীদের এক-দুই পিরিয়ড পর পর বাইরে নিয়ে যেতে হবেই। কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলোর সুফল বর্ণনা করতে হবে এবং বুঝাতে হবে।

শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষাদানের আরেকটি লাভজনক দিক হলো বিনা পয়সায় অবারিত শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার। এই উপকরণগুলো আপনাকে কিনতে হচ্ছে না। আর উপকরণ ছাড়া শিক্ষা তো সম্পূর্ন হয় না। সর্বোপরি বলা যায়, ক্লাসরুমের বাইরের শিক্ষা শিক্ষাথীদের যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ায়, নৈতিক শিক্ষা উন্নত হওয়ার সুযোগ পায় কারণ তখন তারা বাস্তব অবস্থার মুখোমুখি হয়। কোনো উদাহরনের মধ্যে তারা আবদ্ধ থাকে না, শিক্ষার্থীরা চতুর্মখী হয়, বিস্তুৃত ও উন্মুক্ত পরিবেশে কাজ করার ফলে মানসিকতা উদার হয় যা বদ্ধ ঘরে বসে সম্ভব নয় । প্রকৃতিগতভাবেই তখন তাদের ভেতর নেতৃত্বের গুণাবলী পরিলক্ষিত হয়। এ বিষয়গুলো শিক্ষাদানের বা শিক্ষা গ্রহণ করার পূর্বশর্ত। কিন্তু এখন আমরা কী দেখছি , কী করছি বা কী চাচ্ছি? শিক্ষার্থীরা শুধু একটি ভালো গ্রেড পেলেই সবাই বাহবা দিচ্ছে, সবাই খুশি হচ্ছে, গ্রেডই হচেছ সবকিছু বিচারের মানদণ্ড। অথচ এটির সাথে বাস্তব জগতের খুব একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। আপনি নিশ্চিত নন যে, শুধু গ্রেডের বদৌলতে একজন শিক্ষার্থী জীবনে অনেকদূর আগাবে। বরং যেসব শিক্ষার্থী বাস্তবজগত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছে, বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তারাই জীবনে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। বাস্তব জগতে এর অনেক প্রমাণ আছে। আমরা অনেক সময় বলে থাকি অমুক ছেলেটি ক্লাসে তেমন ভালো ছিলনা অথচ সে-ই জীবনে ভালো করেছে। আসলে তার মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা ছিল, আমরা তা আবিস্কারও করতে পারিনি কিংবা আবিস্কারের পরিবেশও তৈরি করতে পারিনি। এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা।

আমাদের দেশের ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোর কিছু কিছু কাজ খুব প্রশংসনীয়। প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীদের কিছু প্রজেক্ট ওয়ার্ক করতে হয়। যেমন- অটিস্টিক শিশুদের জন্য সহায়তা প্রদান করার নিমিত্তে তারা ফান্ড সংগ্রহ করে এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অটিস্টিকদের সহায়তা করে। বিষয়টির ওপর সেমিনারের আয়োজন করে, তাদের জন্য আর্ট এবং ছবি আঁকা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, অটিস্টিকদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করে। এগুলোর আয়োজন করা একদিকে যেমন সামাজিক দায়িত্বাবলী সম্পর্কে তাদের সচেতন করে, অন্যদিকে তাদের নেতৃত্বেও বিকাশ ঘটায়, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে মেশার দক্ষতা বৃদ্ধি করে। মাঝে মাঝে তারা রাস্তায় ট্রাফিক সিগনাল মেনে চলার জন্য পথচারীদের সচেতন করে। রাস্তার ভিক্ষুকদের স্থায়ীভাবে কিছু করার জন্য সহায়তা প্রদান করে ও মোটিভেশন দিয়ে থাকে। আমাদের বাংলামাধ্যম বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে এ ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না । তারা শুধু ক্লাস আর কোচিং নিয়েই ব্যস্ত, তাদের জগত যেন এখানেই সীমাবদ্ধ।

মাছুম বিল্লাহ: প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স এসোসিয়েশন (বেল্টা), ঢাকা, বাংলাদেশ।

লেখাটি কতোটুকু পছন্দ হয়েছে?

Leave a Comment