শিক্ষক ও শিক্ষা

সুলতানা সারওয়াত আরা জামান: বাংলাদেশে ‘বিশেষ শিক্ষা’র পথিকৃৎ

সুলতানা সারওয়াত আরা জামান
সুলতানা সারওয়াত আরা জামান
লিখেছেন ফুয়াদ পাবলো

বর্তমান পৃথিবী নিকট ভবিষ্যতে যে কয়টি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘প্রতিবন্ধিতা’। নানা কারণে সারা বিশ্বেই আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ তো বটেই, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করায় সবার আগে প্রয়োজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা।

মূলধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যাপারটি বলা যতোটা সহজ, তাদের সমাজজীবনের চলার উপযোগী করে গড়ে তোলাটা ঠিক ততোটাই কঠিন। কেনোনা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এসব শিশুদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে সবার আগে প্রয়োজন প্রয়োজনীয় দক্ষ মানবসম্পদ ও যুগোপযোগী গবেষণার। কিন্তু এসবের কোনোটা করার জন্যই আমাদের দেশে ছিলো না কোনো প্ল্যাটফর্ম।

এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন এক স্বপ্নবাজ। তিনি কঠিনকে ভালোবাসতেন। কঠিনকে ভালোবাসতেন বলেই সবচেয়ে অবহেলিত এসব মানুষদের অধিকার আর শিক্ষা নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তিনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও মনোবিদ ড. সুলতানা সারওয়াত আরা জামান।

ড. সুলতানা সারওয়াত আরা জামান

জন্ম ও শিক্ষা

১৯৩২ সালের ৯ জুন খান বাহাদুর মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম ও রাহাত আরা বেগমের কোলে জন্ম নেন সুলতানা সারওয়াত আরা জামান। ১৯৩৮ সালে কলকাতার ইংরেজি মাধ্যম ডাইওসেসন স্কুলে তার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন। পরে ১৯৪৩ সালে বেগম রোকেয়ার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তাঁরা সপরিবারে দেশে চলে আসেন।

দেশে ফিরে তিনি ১৯৪৮ সালে অপর্ণাচরণ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও হলিক্রস কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ও যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জনকালে ড. সুলতানা সারওয়াত আরা জামান; ছবিসূত্র: Lubna Marium/facebook

বিশেষ শিক্ষায় অবদান

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এ-সময় তিনি অনুধাবন করতে লাগলেন বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষাস্তরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও এসকল  শিক্ষার্থীদের সার্বিক উন্নতির জন্য গবেষণার যুগোপযোগী গবেষণার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। তখন থেকেই তিনি প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে জ্ঞানীয় উন্নয়ন, গবেষণা ও শিক্ষার প্রসারে একটি পৃথক বিভাগ খোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যান। বহু দিনে ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সফল হন ড. সুলতানা সারওয়াত আরা জামান।

১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের দশটি বিভাগের মধ্যে অন্যতম বিভাগ হিসেবে যাত্রা শুরু করে বিশেষ শিক্ষা বিভাগ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই বিভাগ থেকে বের হয়ে গ্রাজুয়েটরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করছেন যা বাংলাদেশে একীভূত শিক্ষার ধারণা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়াও তিনি প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে বেশকিছু গবেষণাপত্র ও বই রচনা করেছেন যা এই বিষয়ে জ্ঞান অর্জনে শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে উপকৃত করছে।

সমাজ সেবায় সুলতানা সারওয়াত আরা জামান

ড. সুলতানা সারওয়াত আরা জামান সবসময় সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নিয়ে ভাবতেন। তাই তাঁর সমাজসেবার অন্যতম বড় লক্ষ্যদল ছিলো প্রতিবন্ধী শিশু ও নারীরা। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালে ছিন্নমূল শিশু ও নারীদের সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ঢাকার মালিবাগে দীপশিক্ষা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।   ১৯৮৪ সালে তিনি প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন ।

এ ছাড়া প্রতিবন্ধী নারী ও শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষাদান এবং প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে তিনি সোসাইটি ফর দ্য কেয়ার অ্যান্ড এডুকেশন ফর মেন্টালি রিটার্ডেড চিলড্রেন নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীতে সুইড বাংলাদেশ নামে পরিচিতি লাভ করে। সংগঠনটি বর্তমানে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে এসব শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। 

স্বামী মুক্তিযুদ্ধের সাত নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল কাজী নুরুজ্জামানের সাথে ড. সুলতানা সারওয়াত আরা জামান; ছবিসূত্র: Lubna Marium/facebook

বই ও অন্যান্য প্রকাশনা

ড. সুলতানা সারওয়াত আরা জামান ৩৫টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সেমিনারে গবেষণা বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এছাড়াও তিনি মনোবিজ্ঞান ও বিশেষ শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা ও গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত ‘মানব বিকাশে মনোবিজ্ঞান’ তাঁর রচিত অন্যতম বই।

এছাড়া ১৯৯৮ সালে ভারতের বিশেষ শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বিষ্ণুপদ নন্দের সাথে যৌথভাবে রচনা করেন ‘ব্যতিক্রমধর্মী শিশু’ নামের আরেকটি বই। এই বইটিতে বিভিন্ন প্রকার প্রতিবন্ধকতার কারণ, এসব শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।  প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে জানতে বাংলা ভাষায় এটি একটি অন্যতম বড় উৎস। এছাড়া ২০০৮ সালে তিনি প্রকাশ করেন ‘শিশু বিকাশ মতবাদ’ নামের আরেকটি বই। 

মেয়ে লুবনা মরিয়মের সাথে ড. সুলতানা সারওয়াত আরা জামান; ছবিসূত্র: Lubna Marium/facebook

এছাড়া ড. সুলতানা সারওয়াত আরা জামান প্রকাশ করেছেন বেশ কিছু গবেষণাপত্র।  এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো:

  • Research on Mental Retardation in Bangladesh, 1990
  • Early Intervention and Community Based Rehabilitation Programme and current trends of Education for children with special needs in Bangladesh – 2003
  • Scientific Study on developmental disabilities in Bangladesh
  • From Awareness to Action – Ensuring Health, Education and Rights of the Disabled

পুরষ্কার ও সম্মাননা

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিবন্ধী শিশু সনাক্তকরণে ১০টি প্রশ্নমালা প্রস্ততে অগ্রণী ভূমিকা রাখা এ লোকহিতৈষী নানা সময় নানা পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:        

২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের কাছ থেকে রোকেয়া পদক নিচ্ছেন ড. সুলতানা সারওয়াত আরা জামান; ছবিসূত্র: Lubna Marium/facebook
  • আন্তর্জাতিক রোটারি পুরস্কার (১৯৮৩ ও ১৯৮৯)
  • হেনরি কেসলার পুরস্কার (১৯৯৬)
  • সাপ্তাহিক অনন্যা পুরস্কার (১৯৯৬)
  • রোটারী ডিষ্ট্রিক মিলিনিয়াম এওয়ার্ড (২০০২)
  • অগ্রদূত পুরষ্কার (২০০৩)
  • বেগম রোকেয়া পদক (২০০৮)
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ (২০০৮)

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ ২০০৮ সালে তাঁকে সুপারনিউম্যারি প্রফেসর পদে ভূষিত করে।

তথ্যসূত্র

লেখক সম্পর্কে

ফুয়াদ পাবলো

ফুয়াদ পাবলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর শিক্ষার্থী।

মন্তব্য লিখুন

six + 16 =