শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা শিক্ষাব্যবস্থা

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা

স্বামী বিবেকানন্দের পরিচয় আমাদের কাছে নানাভাবে, নানামাত্রায়। সাধারণভাবে তাঁকে চিনি একজন বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ হিসেবে! কেউ আরেকটু ভেতরে ঢুকলে বলতে পারেন, মানবতাবাদী বিবেকানন্দ, সমাজ সংস্কারক বিবেকানন্দ, চিন্তানায়ক বিবেকানন্দ কিংবা দার্শনিক বিবেকানন্দ । কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দকে আমরা শিক্ষাবিদ হিসেবে খুব বেশি চিনি না বোধহয়। অথচ স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা তাঁর বাণী ও রচনার বিরাট এক জায়গা জুড়ে আছে। তিনি আজ থেকে একশো বিশ বা ত্রিশ বছর আগে যা ভেবেছেন, তার মাহাত্ম্য আমরা হয়তো এখন একটু একটু বুঝতে পারছি, কতোটা কাজে লাগাতে পারছি সে আরেক প্রশ্ন। 

অনেকে হয়তো জানেন না যে, স্বামী বিবেকানন্দ সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করার আগে, মানে নরেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে স্বামী বিবেকানন্দ হওয়ার আগে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন কিছুদিন। শুধু ছিলেন না, তিনি সেই সময় ঊনিশ শতকের বিখ্যাত দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ হার্বার্ট স্পেন্সার-এর লেখা Education: Intellectual, Moral, and Physical বইটি বাংলায় অনুবাদ করেন।

তিনি শিক্ষাবিষয়ে আলাদা কোনো বই লেখেননি। স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা ছড়িয়ে আছে তাঁর বাণী ও রচনার নানা স্থানে। সেই ছড়িয়ে থাকা অংশগুলোকে একসাথে করেই পরবর্তীতে কোলকাতার উদ্বোধন কার্যালয় থেকে একটি বই প্রকাশ করা হয়; যার শিরোনাম ‘শিক্ষা প্রসঙ্গ’। আজকে আমাদের আলোচনার মূল ভিত্তি এই বইটিই। স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা নিয়ে কথা বলব আসলে তাঁর কথা দিয়েই।

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা সহজে বোঝার জন্যে আমরা একে কয়েকটি ভাগে করে দেখতে চাইবো।

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা: শিক্ষার সংজ্ঞা

স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষার সংজ্ঞায় বলছেন—

“শিক্ষা হচ্ছে, মানুষের ভিতর যে পূর্ণতা আগে থেকেই বিদ্যমান, তারই প্রকাশ।”

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা অনুসারে, যাবতীয় জ্ঞান আমাদের মধ্যে আগে থেকেই বিদ্যমান এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাজ সেটি আবিষ্কার করা। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি ভিন্নচিত্রই অবশ্য আমরা দেখতে পাব, যেখানে অনেক বেশি জ্ঞান বাইরে থেকে প্রবেশ করানো হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীর মাথাকে একেকটি তথ্যভাণ্ডার বানানোর প্রক্রিয়া চলছে।

শিক্ষার উদ্দেশ্য

স্বামীজি বলছেন—

“অশেষ জ্ঞান ও অনন্ত শক্তির আকর ব্রহ্ম প্রত্যেক নরনারীর অভ্যন্তরে সুপ্তের ন্যায় অবস্থান করিতেছেন; সেই ব্রহ্মকে জাগরিত করাই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য।”

শিক্ষার এই প্রকৃত উদ্দেশ্যকে দুটো ভাগে ভাগ করেছেন তিনি। এক হলো, চরিত্রগঠন করা, আর দুই হলো, মানুষ তৈরি করা। তিনি বলছেন—

”মস্তিষ্কের মধ্যে নানা বিষয়ের বহু বহু তথ্য বোঝাই করিয়া, সেগুলিকে অপরিণত অবস্থায় সেখানে সারাজীবন হট্টগোল বাধাইতে দেওয়াকেই শিক্ষা বলা চলে না। সৎ আদর্শ ও ভাবগুলিকে এমনভাবে সুপরিণামলাভ করাইতে হইবে, যাহাতে তারারা প্রকৃত মনুষ্যত্ব, প্রকৃত চরিত্র ও জীবন গঠন করিতে পারে।”

এ-প্রসঙ্গে স্বামীজি একটি ‍উপমার ব্যবহার করে আরও বলেছেন—

“পাঁচটি সৎভাবকে যদি তুমি পরিপাক করিয়া নিজের জীবনে ও চরিত্রে পরিণত করিতে পার, তাহা হইলে যিনি কেবল একটি পুস্তকাগার কণ্ঠস্থ করিয়া রাখিয়াছেন, তাঁহার অপেক্ষা তোমার শিক্ষা অনেক বেশি।”

শিক্ষার উদ্দেশ্য যেহেতু সামগ্রিক উন্নয়ন, তাই সেই শিক্ষা হতে হবে জীবনের উন্নতির সমার্থক। তিনি বিষ্ময় প্রকাশ করে বলছেন—

“যে বিদ্যার উন্মেষে ইতর-সাধারণকে জীবনসংগ্রামে সমর্থ করিতে পারা যায় না, যাহাতে মানুষের চরিত্রবল, পরার্থপরতা, সিংসসাহসিকতা আনিয়া দেয় না, সে কি আবার শিক্ষা?”

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা: শিক্ষাপদ্ধতি

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেদান্ত দর্শনের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপরে। তিনি বলেছেন—

”বহিঃপদার্থ ও বাহিরের উপায়সকল তাহার অন্তরে কোনোপ্রকার জ্ঞান বা শক্তি প্রবিষ্ট করাইয়া দিতে পারে না, কিন্তু যে সকল আবরণ উহার অন্তরে জ্ঞান বা শক্তি প্রকাশের অন্তরায় হইয়া দণ্ডায়মান, সেই সকলকে অপসারিত করিতে মাত্র তাহাকে সহায়তা করিতে পারে।”

তাঁর মতে, মানুষের আত্মাতেই অনন্ত জ্ঞান ও শক্তি রয়েছে। মানুষ এ সম্বন্ধে জানলেও আছে, না জানলেও আছে। ছোট্ট বীজ দেখে যেমন বোঝা যায় তার মধ্যে ভবিষ্যতে মহীরুহ হওয়ার সম্ভাবনা আছে, মানব শিশুর বেলায়ও তাই ঘটে।

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা থেকে বিশেষ একটি অন্যতম মৌলিক ধারণা পাওয়া যায়। সেটি হচ্ছে, কেউ কাউকে কিছু শেখাতে পারে না। তিনি বলেছেন—  

“শিশু নিজে নিজেই শিখিয়া থাকে। তবে তাহাকে তাহার নিজের ভাবে উন্নতি করিতে আপনারা সাহায্য করিতে পারেন। সাক্ষাৎভাবে কিছু দিয়া আপনারা তাহাকে সাহায্য করিতে পারেন না, তাহার উন্নতির বিঘ্নগুলি দূর করিয়া পরোক্ষভাবে সাহায্য করিতে পারেন। নিজস্ব নিয়মানুসারেই জ্ঞান তাহার মধ্যে প্রকাশিত হইয়া থাকে। মাটিটা একটু খুঁড়িয়া দিন, যাহাতে অঙ্কুর সহজে বাহির হইতে পারে। চারিদিকে বেড়া দিয়া দিতে পারেন, যাহাতে কোনো জীবজন্তু চারাটি না খাইয়া ফেলে; এইটুকু দেখিতে পারেন যে, অতিরিক্ত হিমে বা বর্ষায় যেন তাহা একেবারে নষ্ট হইয়া না যায়- ব্যাস, আপনার কাজ ঐখানেই শেষ!”

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা মূলত বেদান্তপ্রসূত। বেদান্ত অনুসারে জ্ঞান অন্তর্নিহিত। তাই শিক্ষার মূল বিষয়ই হলো শিক্ষার্থীকে তার উপলব্ধি বা জাগরণের পথে সহায়তা করা।

বৈদিক শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বিশেষ দিক হলো গুরুগৃহে অবস্থানের মাধ্যমে গুরুর সান্নিধ্যে থেকে শেখা। এই গুরুকুলের শিক্ষাকে তিনি শিক্ষাদানের আদর্শ একটি উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন—

“একটা জ্বলন্ত চরিত্রসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে ছেলেবেলা থেকে থাকা চাই, জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত দেখা চাই। কেবল ‘মিথ্যা কথা বলা মহাপাপ’ বলিলে কচুও হইবে না।”

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা থেকে আরেকটি মৌলিক দিক পাওয়া যায়। তা হচ্ছে, প্রাচ্যের বেদান্ত চিন্তা ও পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান ও প্রযক্তির সাথে সমন্বয় করা। তাঁর দৃষ্টিতে শিক্ষা ও ধর্ম সম্পূর্ণ অভিন্ন, কারণ উভয়েরই লক্ষ্য মানুষের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার উপলব্ধি করা। তাছাড়া, তিনি প্রযুক্তিবিদ্যার শিক্ষার সাথে সংযুক্ত করেছেন আত্মনির্ভরশীলতার ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টিকে।

স্বামীজির শিক্ষাপদ্ধতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি মাতৃভাষাকেই শিক্ষার বাহন হিসেবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং একইসাথে বিদেশি ভাষা শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার সঠিক অনুশীলনের জন্যে ইংরেজি ভাষার চর্চার কথাও বলেছেন, কিন্তু সেটি শিক্ষার বাহন হিসেবে নয়।

শিক্ষকের কর্তব্য

স্বামী বিবেকানন্দের নিম্নের কথা দিয়েই বোঝা যায় শিক্ষকের কর্তব্য বিষয়ে স্বামী বিবেকানন্দ কী পরামর্শ দিয়েছেন—

”কেউ কাউকে শিখাতে পারে না। শিক্ষকে শেখাচ্ছি মনে করেই সব মাটি করে।”-

এ-বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রত্যেককেই নিজে নিজে শিক্ষালাভ করতে হবে। শিক্ষক কেবল বাইরে থেকে উদ্দীপনা প্রদান করবেন। আগেই বলেছি, তিনি একটি চারাগাছের বড় করার প্রক্রিয়ার উদাহরণ দিয়ে শিশুশিক্ষার প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের কর্তব্যের কথা ব্যাখ্যা করেছেন।

তিনি বলছেন—

“শিশুদের শিক্ষা দিতে হলে তাদের প্রতি অগাধ বিশ্বাস-সম্পন্ন হতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে যে, প্রত্যেক শিশুই অনন্ত ঈশ্বরীয় শক্তির আধারস্বরূপ, আর আমাদেরকে তাহার মধ্যে অবস্থিত সেই নিদ্রিত ব্রহ্মকে জাগ্রত করিবার চেষ্টা করিতে হইবে।”

শিক্ষকের কর্তব্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলছেন—

“তিনিই প্রকৃত শিক্ষা দিতে পারেন, যাঁহার দেবার কিছু আছে; কারণ শিক্ষাপ্রদান বলিতে কেবল কথা বলা বোঝায় না, তাহা কেবল মতামত বোঝানো নয়; শিক্ষাপ্রদান বলিতে বোঝায় ভাব-সঞ্চার।”

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা: শিক্ষালাভের উপায়

স্বামীজি বলেছেন—

“বোধহয় জগতে কোনো দেশে এমন কোনো বালক জন্মায় নাই, যাকে বলা হয় নাই, মিথ্যা কহিও না, চুরি করিও না ইত্যাদি, কিন্তু কেউ তাহাকে এইসকল অসৎ কর্ম হইতে নিবৃত হইবার উপায় শিক্ষা দেয় না। শুধু কথায় হয় না।”

শিক্ষালাভের উপায়ের কথা বলতে গিয়ে স্বামীজি বলছেন—

“প্রথমত নিজের প্রতি বিশ্বাসসম্পন্ন হও। নিজের উপর বিশ্বাস কখনও হারিও না, এ জগতে তুমি সব করিতে পার। কখনও নিজেকে দুর্বল ভাবিও না, সব শক্তি তোমার ভিতর রহিয়াছে।”

একাগ্রতা জ্ঞানলাভের একমাত্র উপায়। ফোকাস করতে শেখা তাই খুব জরুরি। এই একাগ্রতার প্রসঙ্গে স্বামীজি বলছেন—

“আমরা দাবি করি, মনের শক্তিসমূহকে একমুখী করাই জ্ঞানলাভের একমাত্র উপায়। বহির্বিজ্ঞানে বাহ্যবিষয়ে মনকে একাগ্র করতে হয়- আর অন্তর্বিজ্ঞানে মনের গতিকে আত্মাভিমুখী করতে হয়। আমরা মনের এই একাগ্রতাকে যোগ আখ্যা দিয়ে থাকি।“

এ-প্রসঙ্গে তিনি পৃথিবীর বড় বড় কর্মকুশল ব্যক্তির উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁদের জীবনী পাঠ করলেও দেখা যায় তাঁরা অদ্ভূত শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, কিছুই তাঁদের মনের একাগ্রতাকে নষ্ট করতে পারতো না।

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তায় আরেকটি বড় দিক হলো প্রকৃতির সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়। তিনি বলছেন—  

“প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত বাস করিলে তাহা থেকেই যথার্থ শিক্ষা পাওয়া যায়। অভিজ্ঞতাই আমাদের একমাত্র শিক্ষক। আমরা সারাজীবন তর্কবিচার করিতে পারি, কিন্তু নিজেরা প্রত্যক্ষ অনুভব না করিলে সত্যের কণামাত্র বুঝিতে পারিব না।”

আমরা অন্যেরটা দেখে শিখতে চাই। শিখতে গিয়ে আবার অনুকরণ করে ফেলি। এ প্রসঙ্গে স্বামীজি বলছেন—

“তোমাদের ভিতরে যাহা আছে, নিজ শক্তিবলে তাহা প্রকাশ কর, কিন্তু অনুকরণ করিও না; অথচ অপরের যাহা ভালো তাহা গ্রহণ কর।”

আবার বলছেন—

“আপরের নিকট ভালো যাহা কিছু পাও শিক্ষা কর, কিন্তু সেইটা নিয়া নিজেদের ভাবে গঠন করিয়া নিতে হইবে- অপরের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করিতে গিয়া তাহার সম্পূর্ণ গ্রহণ করিয়া নিজের স্বাতন্ত্র হারাইও না।”

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেহেতু চরিত্র গঠন, সে-প্রসঙ্গে তিনি বলছেন—

“টাকায় কিছুই হয় না, নামেও হয় না, যশেও হয় না, বিদ্যায়ও কিছু হয় না, ভালোবাসায় সব হয়- চরিত্রই বাধা-বিঘ্নরূপ বজ্রদৃঢ় প্রাচীরের মধ্য দিয়ে পথ করে নিতে পারে। শত শত যুগের কঠোর চেষ্টার ফলে একটা চরিত্র গঠিত হয়।”

আবার মানুষ হওয়ার শিক্ষার কথা বলতে গিয়ে বলছেন—

“আমাদের এখন এমন ধর্ম চাই, যাহা আমাদিগকে মানুষ করিতে পারিবে। আমাদের এমনই সব মতবাদ আবশ্যক, যেগুলি আমাদগিকে মানুষ করিয়া তোলে। যাহাতে মানুষ গঠিত হয়, এমন সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ শিক্ষার প্রয়োজন।”

মানুষ হওয়াই যখন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য, তখন সেই মানুষকে হতে হবে উদার মানুষ, চোখ মেলে দেখার দৃষ্টি তার থাকতে হবে, আঞ্চলিকার ঊর্দ্ধে উঠতে হবে তাকে। স্বামীজি বলছেন—

“এস, মানুষ হও। নিজেদের সংকীর্ণ গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে গিয়ে দেখ, সব জাতি কেমন উন্নতি পথে চলেছে। আর তোরা কী করছিস? এত বিদ্যা শিখে পরের দোরে ভিখারির মতো ‘চাকরি দাও’ ‘চাকরি দাও’ বলে চেচাচ্ছিস।”

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা থেকে তাঁর সময়ে প্রচলিত পাশ্চাত্য শিক্ষার কঠোর সমালোচনা পাওয়া যায়। সে প্রসঙ্গে আমরা পরে আসবো। শিক্ষালাভের উপায়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলছেন—

“আজকাল আমরা পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত যে সকল ব্যক্তি দেখতে পাই, তাদের প্রায় কারও জীবন বড় আশাপ্রদ নয়।”

এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে বলছেন—

“আমাদের চাই কী জানিস- স্বাধীনভাবে স্বদেশী বিদ্যার সঙ্গে ইংরেজি আর সায়েন্স পড়ানো, চাই টেকনিক্যাল এডুকেশন, চাই যাতে ইন্ডাস্ট্রি বাড়ে, লোকে চাকরি না করে দুপয়সা করে খেতে পারে।”

”মেয়েদের পূজা করেই সব জাতি বড় হয়েছে। যে দেশে যে জাতে মেয়েদের পূজা নেই, সে দেশ- সে জাত কখনই বড় হতে পারেনি, কস্মিনকালে পারবেও না।”

নারী শিক্ষা নিয়েও স্বামী বিবেকানন্দের সুনির্দিষ্ট ভাবনা এবং তা বৃহত্তর উন্নয়নের প্রেক্ষাপট চিন্তা করেই। তিনি নারীদের এমনভাবে শিক্ষিত হওয়ার কথা বলেছেন, যাতে তারা স্বাবলম্বী হয় এবং নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরাই করতে পারে। তিনি বলছেন—

“আমাদের কাজ হচ্ছে স্ত্রী-পুরুষ-সমাজের সকলকে শিক্ষা দেওয়া। সেই শিক্ষার ফলে তারা নিজেরাই কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ সব বুঝতে পারবে এবং নিজেরা মন্দটা ছেড়ে দেবে।

স্বামীজি এ-প্রসঙ্গে আরও বলছেন—

”পজিটিভ কিছু শেখা চাই। খালি বই পড়া শিক্ষা হলে হবে না, যাতে ক্যারেক্টার ফর্ম হয়, মনের শক্তি বাড়ে, বুদ্ধির বিকাশ হয়, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে পারে, এই রকম শিক্ষা চাই।”

তিনি যুবকদের পরামর্শ দিয়েছেন কেরানি তৈরির শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়ে বিজ্ঞানমনষ্ক হতে, যা দিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখা যায়। তিনি চাকরি না খুঁজে কাজ তৈরি করার উপদেশ দিয়েছেন সেই কালে। আর এখন এতো পরে এসে আমরা বলতে শুনছি, চাকরি না খুঁজে উদ্যোক্তা তৈরি হতে পরামর্শ দিচ্ছেন বিজ্ঞজনেরা। কারণ, এতো চাকরি তো এখন নেই!

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা কতোটা আধুনিক হলে আজ থেকে একশো বিশ-ত্রিশ বছর আগে এমন চিন্তা করা যায়! আর কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব আমরা সবে বুঝতে শুরু করেছি, যদিও তার বাস্তবায়ন এখনও অত্যন্ত নাজুক। আর বিজ্ঞান শিক্ষার দশা এখনও যথেষ্ট দুর্দশার মধ্যেই আছে।

শিক্ষালাভের উপায় বলতে গিয়ে আরও বলছেন—

“আমি বলি, এদেশের সমস্ত বড়লোক আর শিক্ষিত লোক যদি একবার করে জাপান ঘুরে আসে তো লোকগুলোর চোখ ফোটে। সেখানে এখানকার মতো শিক্ষার বদহজম নেই। তারা সাহেবদের সব নিয়েছে, কিন্তু তারা জাপানীই আছে, সাহেব হয় নাই।”

সাধারণ মানুষের শিক্ষিত স্বাবলম্বী হওয়ার ভেতর দিয়েই তিনি জাতীয় জাগরণ দেখেছেন। তিনি বলছেন—

“দরিদ্র লোকেরা যদি শিক্ষার নিকট পৌঁছিতে না পারে, তবে শিক্ষাকেই চাষীর লাঙ্গলের কাছে, মজুরের কারখানায় এবং অন্যত্র সব স্থানে যেতে হবে।”

এ-কথা স্বামীজি যখন বলেছেন, তার বহুকাল পরেও, এমনকি এখনও এই শ্রেণির অনেক মানুষ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত।

স্বামীজী সারা ভারত ঘুরে আবিষ্কার করলেন, জনমানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা। সেখানে দেখলেন, কীভাবে শ্রেণিবৈষম্য সাধারণ মানুষকে কোণঠাসা করে রেখেছে। কীভাবে সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষগুলো শিক্ষা থেকে, সকল আর্থ-সামাজিক সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত। স্বামীজি তাঁর পরিব্রাজক গ্রন্থে লিখলেন—

“এরা সহস্র সহস্র বৎসর অত্যাচার সয়েছে, নীরবে সয়েছে- তাতে পেয়েছে অপূর্ব সহিষ্ণুতা। সনাতন দুঃখ ভোগ করেছে- তাতে পেয়েছে অটল জীবনীশক্তি। এরা একমুঠো ছাতু খেয়ে দুনিয়া উল্টে দিতে পারবে; আধখানা রুটি পেলে ত্রৈলোক্যে এদের তেজ ধরবে না; এরা রক্তবীজের প্রাণ-সম্পন্ন।”

স্বামীজী এই খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষের শক্তিকে পুঁজি করেছেন। পরামর্শ দিয়েছেন আধুনিক শিক্ষার, জোর দিয়েছেন বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি। নিশানা করেছেন সমাজের শিক্ষিত, সম্পদশালী মানুষদেরকে যারা এতোকাল ঠকিয়ে এসেছেন এই নীরিহ মানুষদের। সমাজের এই উপরতলার মানুষদের আত্মিক উন্নয়নের মাধ্যমে মানবিক বোধসম্পন্ন করে চালনা করেছেন সাধারণ মানুষের সেবার কাজে। এখানে কোনো পক্ষকে কারও বিরুদ্ধে না নামিয়ে, বরং তাদের মধ্যে বিদ্যমান শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উভয়ের মঙ্গল সাধনের পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন।

শিক্ষালাভের উপায় নিয়ে সবচেয়ে বড় কাজের কথা হলো স্বামীজির সেই উক্তি—

“ওঠো, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থামিও না।”

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে স্বামীজির উক্তি হচ্ছে—

”ঐ শিক্ষায় মানুষ তৈরি হয় না- ঐ শিক্ষা সম্পূর্ণ নাস্তিভাবপূর্ণ।”

আপাদমস্তক ইতিবাচক স্বামী বিবেকানন্দের দৃষ্টিতে এমনই ছিল তাঁর সময়ের শিক্ষাব্যবস্থা যা ইউরোপ থেকে এনে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এদেশের মানুষের উপরে, যার উদ্দেশ্য ছিল brown British বা অন্য কথায় আজ্ঞাবহ কেরানি তৈরি করা। চরিত্র গঠন, মানুষ তৈরি সেসব তো বহু দূরের কথা।

এ-প্রসঙ্গে স্বামীজি বলছেন—

“বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষাপ্রণালীতে প্রায় সবই দোষ। কেবল চুড়ান্ত কেরানি-গড়া কল বইত নয়। কেবল তাই হলেও বাঁচতুম। মানুষগুলো একেবারে শ্রদ্ধা-বিশ্বাস বর্জিত হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেছেন—

“মাথায় কতকগুলো তথ্য ঢোকানো হলো, সারাজীবন হজম হলো না- অসম্বন্ধভাবে মাথায় ঘুরতে লাগল- একে শিক্ষা বলে না।”

স্বামীজিও বলেছেন, এরকম একটি শিক্ষাব্যবস্থায় শতকরা বড়জোর একজন কি দুজন দেশের লোক শিক্ষালাভের সুযোগ পেয়েছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা ওই সুযোগ পেয়েছেন, তারাও দেশের ভালোর জন্যে কিছু না করে বরং দেশের ক্ষতি করেছেন নানাভাবে।

এই শিক্ষাকে ধিক্কার জানিয়ে তিনি বলছেন—

“কতকগুলি পরের কথা ভাষান্তরে মুখস্থ করিয়া মাথার ভিতরে পুরিয়া পাশ করিয়া ভাবছিস, আমরা শিক্ষিত! ছ্যাঃ! ছ্যাঃ! এর নাম আবার শিক্ষা! তোদের শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? হয় কেরানিগিরি, না হয় একটা দুষ্টু উকিল হওয়া, না হয় বড়জোর কেরানিগিরিরই রূপান্তর একটা ডেপুটিগিরি চাকরি- এই তো! এতে তোদেরই বা কী হইলো আর দেশেরই বা কী হইলো?”

প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে স্বাবলম্বী করে, ভেতর থেকে পাল্টে দেয় মানুষকে। ঐপনিবেশিক শিক্ষায় সে সুযোগ ঘটেনি। তাই স্বামীজি বলছেন—

“যে শিক্ষায় জীবনে নিজের পায়ের উপর দাাঁড়াতে পারা যায়, সেই হচ্ছে শিক্ষা। বর্তমান শিক্ষায় তোদের বাহ্যিক হালচাল বদলে দিচ্ছে, অথচ নতুন নতুন উদ্ভবনী শক্তির অভাবে তোদের অর্থাগমের উপায় হচ্ছে না।”

কালে কালে শিক্ষায় অনেক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে আমাদের মুক্তি মেলেনি। আমরা শিক্ষার্থীদেরকে নিজের মতো করে ভাবতে আর বাড়তে তো দিই-ই না, বরং আমাদের ভাবনাগুলোকে অন্যায়ভাবে ওদের ওপর চাপাতে থাকি। অন্তর্নিহিত পূর্ণত্বের বিকাশে সাহায্য না করে আমরা শিশুদের তথ্যভাণ্ডার বানাতে সম্পুর্ণ মুখস্থনির্ভর শিক্ষার ফাঁদে ফেলে দিয়েছি।

আমরা মুখে শিশুকেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষ তৈরির কথা বলছি, আর বাস্তবে গায়ের জোরে সবকিছু মুখস্থ করানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছি। যে যতো মনে রাখতে পারে, তাকে ততো মেধাবী বলছি। অথচ সে কিছু সৃষ্টি করতে পারছে কি না, তা খুব একটা আমলে নিচ্ছি না। অনেকগুলো বই মুখস্ত করে পাশের পর পাশ দিয়ে আমরা একটা চাকরি জোটাবার শিক্ষার দিকেই হাঁটছি সবাই।

কেরানি তৈরির যে শিক্ষাকে স্বামীজি কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন, তারই আদলে চলছে আমাদের নতুন ধারার শিক্ষা। বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষায় কিছু মানুষের আর্থিক উন্নয়ন হচ্ছে ভালোই, কিন্তু তা আত্মিক উন্নয়নে রূপ দিতে পারছে না। চরিত্র গঠন আর মানুষ তৈরির শিক্ষা তাই থেকে যাচ্ছে অনেক দূরে। তার মানে, স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা থেকে তাঁর সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার যে কঠোর তিনি সমালোচনা করেছিলেন, তার অধিকাংশ বৈশিষ্ট্য এখনও বর্তমান।

শিক্ষাই হোক উন্নয়নের মূল হাতিয়ার। সে উন্নয়ন হোক ভেতরে ও বাইরে। বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের মাধ্যমে হোক আমাদের আত্মিক ও আর্থিক উন্নয়ন। চরিত্রের উন্নয়ন হোক, তৈরি হোক ভালো মানুষ। আমাদের অন্তর্নিহিত পূর্ণতার পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করুক—  এটাই হোক আজ আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক সম্পর্কে

সুদেব কুমার বিশ্বাস

সুদেব কুমার বিশ্বাস পেশায় একজন শিক্ষাজীবী এবং কাজ ক‌রেন এক‌টি আন্তর্জা‌তিক উন্নয়ন সংস্থায়।

মন্তব্য লিখুন