Home ভাষা শিক্ষা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়: ভুল নাকি ভাষাপুলিশদের খবরদারি?

উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়: ভুল নাকি ভাষাপুলিশদের খবরদারি?

বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সঠিক বা সঠিকতর ব্যবহার, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় লেখা কি ভুল?
বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সঠিক বা সঠিকতর ব্যবহার, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় লেখা কি ভুল?

বাংলাদেশের প্রচুর বিদ্যালয়ের নামে এখনো ‘উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়’ বা ‘উচ্চ বালক বিদ্যালয়’ আছে দেখা যায়। আগে এই ব্যবহার আরও অনেক বেশি ছিলো। মাঝেমধ্যেই অনেকে এর ভুল ধরেন। কেউ কেউ হাসি-তামাশাও করেন। কেনোনা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় দিয়ে নাকি উচা-লম্বা বালিকাদের বিদ্যালয়কে বুঝানো হয়! এরকম সমালোচনা, হাসি-তামাশার পরে অনেক বিদ্যালয়ই, বিশেষ করে প্রায় সব সরকারি বিদ্যালয় নাম পাল্টে বা সংশোধন করেছে এভাবে— ‘বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’! বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সঠিক বা সঠিকতর ব্যবহার, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় লেখা কি ভুল?

আমার মতে, এই ‘উচ্চ’কে মাঝখান থেকে সামনে নিয়ে আসলেও তাতে খুব ক্ষতি কিছু নেই, ভুলও নেই।

‘বালিকা বিদ্যালয়’ বা ‘বালক বিদ্যালয়’ – এই দুইয়ের মানে হচ্ছে বালিকাদের বা বালকদের বিদ্যালয়, এখানে পরপদ বিদ্যালয়ই প্রধান অর্থবাচক, যা বিশেষ্য পদ। বালক বা বালিকাও বিশেষ্য পদ হলেও এখানে তার ব্যবহার বিদ্যালয়ের সিগনিফায়ার রূপে। বাংলায় আমরা সমাস ও সন্ধি এরকম অনেক কিছুতে অভ্যস্থ যেখানে সিগনিফায়ার পরপদের আগে এমনভাবে লেগে গিয়ে পরপদ বিশেষ্যটাকেই নির্দেশ করে।

পূর্বপদ বিশেষ্য হলেও বস্তুত তার ব্যবহার বিশেষ্য হিসেবে নয়, বরং পরপদের সিগনিফায়ার রূপে। কখনো কখনো পূর্বপদ ও পরপদ একত্রে মিলে একশব্দে পরিণত হয়। যেমন, সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন, প্রসবের বেদনা = প্রসববেদনা, অশ্বের ডিম্ব = অশ্বডিম্ব, ধর্মপুত্র = ধর্মের পুত্র, মনস্কামনা = মনের কামনা, আঁখিপল্লব = আঁখির পল্লব প্রভৃতি।

আবার কখনো কখনো পূর্বপদ ও পরপদ মিলে এক শব্দে পরিণত না হলেও শব্দদুটো প্রচলিত অর্থে এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যে, তা অনেকটা মানিকজোড়ের মতই যুগলবন্দী শব্দ হিসেবে থাকে। যেমন, ঘোড়ার ডিম, কলুর বলদ, ছাতার মাথা, সোনার পালঙ্ক, নারী পুলিশ, চলচ্চিত্র ম্যাগাজিন, স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রভৃতি। সমাসবদ্ধ ও সন্ধিতে যুক্ত হয়ে এক শব্দে পরিণত হলে সমস্যাটা কম, কারণ সেই বিশেষ্যের সামনে অন্য বিশেষণ বা সিগনিফায়ার নির্বিঘ্নে বসানো যায়। ‘ভীষণ প্রসববেদনা’ বললে সবসময়ই বেদনা যে ভীষণ সেটা বুঝায়, প্রসব ভীষণ বুঝায় না। ‘প্রসব’-এর ব্যবহার হচ্ছে কেবল বেদনার ধরন বুঝানোর লক্ষে, মানে বেদনাটা হচ্ছে প্রসবের।

একইভাবে, ‘বড় ও ভারী সিংহাসন’ বললে ওই আসনটি বড় ও ভারী বুঝায়, মোটেও বড় ও ভারী সিংহকে বুঝানোর কথা নয়। একইভাবে সেই দুই বিশেষ্য মিলে যে শব্দজোড়, যেখানে পূর্বপদ সিগনিফায়ারের কাজ করে মাত্র, সেক্ষেত্রেও অধিকাংশ সময়েই বিশেষণ বা সিগনিফায়ারকে পূর্বপদের সামনেই বসাতে হয়, পূর্বপদ ও পরপদের মাঝখানে নয়। এবং সেই বিশেষণ পূর্বপদের সামনে বসলেও সেটি পূর্বপদকে নয়, পরপদ বিশেষ্যকেই বিশেষায়িত করে। যেমন, ‘কি বড় ও সুন্দর সোনার পালংক’! এখানে সোনা বড় ও সুন্দর নয়, পালংককেই সুন্দর বলা হচ্ছে। বিশেষণকে যদি মাঝখানে নিয়ে আসা হয়, তাহলে ভাষার মাধুর্যই নষ্ট হয়ে যাবে। যেমন, ‘সোনার কি বড় আর সুন্দর পালংক’!

‘পরীক্ষায় তুমি পেয়েছো আস্ত এক ঘোড়ার ডিম’— এখানে এমন বুঝাচ্ছে না যে ঘোড়াটা আস্ত বা একট ঘোড়া। বরং বুঝাচ্ছে, ডিমটা আস্ত এবং একটা ডিম। এটিকেই যদি বলা হয় ‘তুমি পেয়েছো ঘোড়ার আস্ত এক ডিম’, তাহলে আর শ্রুতিমধুর লাগছে না।  যদি বলা হয় ‘জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ম্যাগাজিন’, তার মানে বুঝায় না, শুধু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র বিষয়ক কোনো ম্যাগাজিন এটি। বরং বুঝায় চলচ্চিত্র-বিষয়ক এই ম্যাগাজিনটিই জনপ্রিয়। এবং ‘চলচ্চিত্র জনপ্রিয় ম্যাগাজিন’ বলারও উপায় নেই, ম্যাগাজিনের সামনে ‘জনপ্রিয়’ বিশেষণকে আনতেই যদি হয়, বলতে হবে ‘চলচ্চিত্র বিষয়ক জনপ্রিয় ম্যাগাজিন’!

তার মানে দাঁড়াচ্ছে, এরকম দুই বিশেষ্য পদ যোগে যে শব্দযুগল, যেখানে পূর্বপদ বস্তুত সিগনিফায়ারের ভূমিকায় থাকে, সেখানে বিশেষণ পূর্বপদের আগে বসলেও সবসময় তা পূর্বপদ বিশেষ্যকে সিগনিফাই করে না, বরং পরপদ, মূল অর্থবাচক বিশেষ্যকেই বিশেষায়িত করছে।

তবে, এই নিয়মটি কি সর্বক্ষেত্রেই একই রকম? তা নয়। উদাহরণ দেয়া যাক। ‘আজ আমি রান্না করেবো মজাদার মাছের ডিম ও ঝাল আলুর ভর্তা’। এখানে দুটো রেসিপি হচ্ছে ‘মাছের ডিম’ ও ‘আলুর ভর্তা’। ফলে মাছ মজাদার নয়, ডিমের এই রান্নাটা মজাদার, এবং ভর্তাটা ঝাল বুঝিয়েছে, আলু নয়। কিন্তু আমি যদি বলি ‘বড় মাছের ডিম’ বা ‘মিষ্টি আলুর ভর্তা’ তাহলে ডিম নয়, মাছটি বড় বুঝায়, এবং ভর্তা নয়, আলু যে যে মিষ্টি সেটা বুঝায়।  তাহলে, ‘ঝাল আলুর ভর্তা’ আর ‘মিষ্টি আলুর ভর্তা’ – এই দুটিতে ‘ঝাল’ ও ‘মিষ্টি’ পূর্বপদের বসলেও, যথাক্রমে ভর্তা ও আলুকে বিশেষায়িত করেছে। অর্থাৎ, একই রকম গঠন হলেও দুইরকম ব্যবহার আমরা পাচ্ছি, এবং ভাবপ্রকাশে ও বুঝতে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না, বা বুঝার সুবিধার্তে ‘আলুর ঝাল ভর্তা’ লিখতে হচ্ছে না!

এই যে একইরকম গঠনের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহার, সেটাই তো ভাষার সৌন্দর্য। কিন্তু, ধরা যাক সাধারণ আলু দিয়ে এমন ভর্তা বানানো হলো, যেটায় মরিচ-লবণের পরিবর্তে চিনি দেয়া হয়েছে, তাহলে সে মিষ্টি ভর্তা বুঝাতে কীভাবে লিখতে হবে? সেক্ষেত্রে ‘মিষ্টি আলুর ভর্তা’ না লিখে ‘আলুর মিষ্টি ভর্তা’ লিখতে হবে বৈকি!

তার মানে এরকম দুই বিশেষ্য পদ সহকারে যে শব্দযুগল, সেখানে পূর্বপদের সামনে বিশেষণ বসলে তা আসলে পূর্বপদ, নাকি পরপদকে বিশেষায়িত করবে, তা অনেকটা ধারণা বা কমনসেন্স বা প্রচলিত অর্থের উপরে নির্ভর করে। ‘ঝাল আলুর ভর্তা’য় সহজেই বুঝতে পারি ভর্তাটা ঝাল, কেননা আলু তো কখনো ঝাল হতে পারে না। কিন্তু, ‘মিষ্টি আলুর ভর্তা’য় আলুর একটি প্রকরণ যেমন মিষ্টি হতে পারে, তেমনি ভর্তা যে কখনোই মিষ্টি হয় না, তাও না- কিন্তু প্রচলিত খাদ্যাভ্যাসে ভর্তা সাধারণত মিষ্টি হয় না। তাহলে, বুঝা যাচ্ছে একইরকম গঠনের পরেও কোনো ভাব বা অর্থ প্রকাশ করবে, তা নির্ভর করে অনেকটা কমনসেন্স বা আক্কেলের উপরে।

এবারে, আবার সেই উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় বনাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রসঙ্গে ফিরি। ‘উচ্চ’ কোথায় বসবে— সে আলাপের আগে অন্য একটি সিগনিফায়ার বসিয়ে দেখা যাক। ‘সরকারি বালিকা বিদ্যালয়’— এর মানে কী? বালিকারা সরকারি, নাকি বিদ্যালয়টি সরকারি বুঝায়? নিশ্চয়ই এখানে বিদ্যালয়টি সরকারি বুঝাচ্ছে, তার জন্যে কেউ কখনো ‘বালিকা সরকারি বিদ্যালয়’ লিখে না। ‘সরকারি বালিকা বিদ্যালয়’— এখানে পরপদ বিশেষ্য হচ্ছে বিদ্যালয়, তার সামনে দুটি সিগনিফায়ার বিদ্যালয়কে সিগনিফাই করছে। বালিকা শব্দটি বিশেষ্য হলেও, এখানে ‘বালিকাদের’ পরিবর্তিত, ও সংক্ষেপিত, হয়ে বালিকা হয়েছে, ফলে ‘বালিকা বিদ্যালয়’-এ ‘বালিকা’ শব্দটা বিশেষ্য নয়, সেটিও সিগনিফায়ার।

বিশেষ্যের সামনে একাধিক সিগনিফায়ার যখন থাকে, তখন সবগুলো সিগনিফায়ার সেই বিশেষ্যকেই নির্দেশ করতে পারে। এখন মুশকিল হচ্ছে যে, ‘উচ্চ বালিকাদের বিদ্যালয়’-এর ‘উচ্চ’ যেহেতু বালিকাদেরকেও সিগনিফাই করতে পারে, সেই হিসেবে ‘বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ বলাটা অধিকতর সঠিক এবং যেহেতু আমাদের দেশে আক্কেলহীন ‘শিক্ষিত’ ‘ভাষাপুলিশ’ মানুষের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। কিন্তু, এই সঠিকতর ব্যবহারটি কেন সারাদেশের মানুষ এতদিনেও করে উঠতে পারেনি? কেন, আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত ‘ভাষা মোড়ল’দের এতো ওজর আপত্তি, হাসি-তামাশার পরেও সারাদেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তিত হয়ে যায়নি?

কারণ, জনমানসে বালিকা বিদ্যালয় বা বালক বিদ্যালয় বলতে বিদ্যালয়ের দুই ধরনকে বুঝাতে বহুল প্রচলিত এবং পরস্পর পাশাপাশি বসে একটা শব্দ যুগল হিসেবে ব্যবহৃত হয়! সেই জন্যে ওই জোড়কে না ভাঙতেই অনেকে উচ্চ শব্দটাকে মাঝখানের বদলে সামনে নিয়ে আসে। এতে জনগণের মাঝে ভাবপ্রকাশে কোনো অসুবিধা হয় না এবং এমন ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ আক্কেলজ্ঞানেই সবাই বুঝতে পারে যে, উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় মানে এই বালিকাদের বিদ্যালয়টি উচ্চ, বা এখানে প্রাথমিকের উপরের শ্রেণির পাঠদান হয়।

বস্তুত একটি ‘বালিকা বিদ্যালয়’ প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক, প্রাক-প্রাথমিক প্রভৃতি কি না তা বুঝাতে সবসময়ই ‘বালিকা বিদ্যালয়’কে একসাথে রেখেই তার আগে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক, প্রাক-প্রাথমিক বসানো হয়। যেমন, ‘প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়’, ‘মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়’, ‘উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়’, ‘প্রাক-প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়’ ইত্যাদি। কেউ কোনোদিন ‘বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়’ বা ‘বালিকা উচ্চ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ বলে না। ফলে, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক, প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এরকম একটি ধরন হচ্ছে ‘উচ্চ’, যা মূলত ‘মাধ্যমিক’-এর জায়গায় ব্যবহৃত হয়। ফলে, ‘বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ যেমন বলা হয় না, তেমনি মাধ্যমিককে প্রতিস্থাপন করা ‘উচ্চ’ শব্দটিও সাধারণ আক্কেল দিয়ে মাঝখানে না বসানোর চলটিও ব্যাপকভাবে রয়ে গিয়েছে।

‘বালিকা বিদ্যালয়’-এর মতো অন্য উদাহরণ দেয়া যেতে পারে— ‘মহিলা কলেজ’, ‘মহিলা মাদ্রাসা’। সেখানেও যদি বলা হয় ‘বহুমুখী মহিলা কলেজ’, তাহলে আক্কেল দিয়েই সবাই বুঝে নেয় ওই কলেজে পড়তে আসা মহিলারা ‘বহুমুখি’ নয়, বরং মহিলাদের সেই কলেজটি ‘বহুমুখি’! একইভাবে যখন বলা হয় ‘আমাদের জেলার শ্রেষ্ঠ বালিকা বিদ্যালয়’, ‘দেশের নামকরা বালিকা বিদ্যালয়’, এসব আলাপে ‘শ্রেষ্ঠ’, ‘নামকরা’ এই বিশেষণগুলো বালিকার সামনে হলেও, কোনোটিই বালিকাকে না, বরং বিদ্যালয়কেই বিশেষায়িত করে। আক্কেল দিয়েই তা সবাই বুঝি। কেউ যদি প্রশ্ন করে এর মাধ্যমে ওই বিদ্যালয়ে সব নামকরা বালিকারা বা শ্রেষ্ঠ বালিকারা পড়ে, তাহলে তার আক্কেল নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। তাহলে, ‘উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়’ এখানে কেন বিদ্যালয়টিকে ‘উচ্চ’ বুঝতে সমস্যা হবে, এখানে কেন আক্কেল লোপ পাবে?

একইভাবে, শিক্ষিত ‘ভাষা মোড়ল’রা আরেকটি ভুল ধরেন— ‘খাঁটি গরুর দুধ’। এখানেও ‘খাঁটি’ বিশেষণটি আসলে গরুকে নয়, দুধকেই বিশেষায়িত করেছে। যেহেতু ‘অস্ট্রেলিয়ান গরুর দুধ’ লিখলে সেখানে ‘অস্ট্রেলিয়ান’ যেমন গরুকে সিগনিফাই করছে, বা ‘কালো গরুর দুধ’-এ ‘কালো’ বিশেষণটি গরুকে বিশেষায়িত করছে, সেহেতু ‘খাঁটি’ বিশেষণও গরুকে, না দুধকে সিগনিফাই করবে, আক্কেল যাদের কম তাদের মধ্যে এমন দ্বিধা তৈরি হতে পারে বিধায় ‘গরুর খাঁটি দুধ’ বলা ভালো। কিন্তু, যখন ‘খাঁটি গরুর দুধ’ বলা ভুল, ‘গরুর খাঁটি দুধ’-ই বলতে হবে, এমন চাপিয়ে দেয়া হয়, তখন সেটা কি ভাষা মোড়লদের খবরদারি নয়? আমরা যখন বলি, ‘গরম গরুর দুধ খাচ্ছি’, ‘ঠাণ্ডা গরুর দুধ খেতে ভালো লাগে না’, তখন গরু গরম বা ঠাণ্ডা বুঝায় না, তা দুধকেই নির্দেশ করে। তাহলে, ‘খাঁটি গরুর দুধ’-এ সমস্যা হবে কেন?

‘উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়’কে ভুল হিসেবে দেখার আরেকটি কারণ হচ্ছে ইংরেজি থেকে অনুবাদ। বাংলা ভাষার গঠন, ব্যাকরণের অনেক কিছুই বৃটিশ উপনিবেশের কল্যাণে ইংরেজি ভাষার অনুরূপ। ফলে এখনো আমাদের ভাষার সঠিকতা, বেঠিকতা নিরূপণে ইংরেজিকে অনুকরণ করার চেষ্টা করে যাই। কেনোনা Boys’ High School বা Girls’ High School-এর জায়গায় High Boys’ School বা High Girls’ School দিলে অর্থ সম্পূর্ণ পাল্টে যাচ্ছে।

এখানে একটা ব্যাপার আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, ইংরেজিতে এই ‘s বা s’ বা of এর ব্যবহারটা বাংলা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অফ (of) বা এপোস্টপি এস (‘s / s’) কিন্তু দুটো বিশেষ্যকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়। ফলে দুটো বিশেষ্যের মধ্যে যার আগে সিগনিফায়ার বসে, সেটা ওই বিশেষ্যকেই সিগনিফাই করবে। যেমন, Leaves of tree, tree’s leaves আর tree-leaves এই তিনটাই গাছের পাতা বুঝালেও তাদের মাঝে গঠনগত পার্থক্য হচ্ছে— Leaves of green tree ও green tree’s leaves দুটোই গাছটি যে সবুজ তা বুঝায়। কিন্তু green tree-leaves মানে গাছ সবুজ না, বরং পাতাগুলো সবুজ বুঝাবে। বালিকা বিদ্যালয়ের গঠন-ব্যবহারও তেমন।

এর সাথে তুলনীয় হচ্ছে— Large health complex, Vibrant boy scout, dirty cow dung— এগুলোতে বড় স্বাস্থ্য না, লার্জ কমপ্লেক্স বুঝায়, ভাইব্রেন্ট বালক না, ভাইব্রেন্ট স্কাউট বুঝায়, ডার্টি গরু না, ডার্টি গোবরকেই বুঝায়। এমন আরো আছে, smart city girls, tall town buildings, big home ground, wooden chess board, heavy milk cream… ইত্যাদি। সেগুলোতে যদি বিশেষণগুলোকে Girls’ high school-এর মতো মাঝখানে ঢুকানো হয়, তাহলে কেমন হবে?

বসিয়েই দেখি— city smart girls, town tall buildings, home big ground, chess wooden board, milk heavy cream— কোনো ভাব কি প্রকাশ করতে পারছে? নাকি এখন একটা অফ বা এপোস্টপি এস এর অভাব বোধ হচ্ছে? যেমন, city’s smart girls, town’s tall buildings বা smart girls of the city, tall buildings of the town? এই উদাহরণগুলো থেকে আশা করি পরিস্কার হবে, কেন High girls’ school না হয়ে Girls’ high school হয়। অন্ধ অনুকরণে একইভাবে বাংলায় উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় শব্দগুলোকে ভুল বলাটাও তাই ভুল।

শেষ করবো, আমাদের শিক্ষিত ‘ভাষাপুলিশ’ বা ‘ভাষামোড়ল’দের নিয়ে। ভাষার কোনো একটি গঠন বা প্রকরণের বহুল ব্যবহারকে যখন কোনো প্রেক্ষিত বাদেই আমাদের শিক্ষিত শ্রেণি ‘ভুল’ বলে উড়িয়ে দেন, তাদের কথিত ‘সঠিক’ গঠন বা প্রকরণকে চাপিয়ে দেন, তা ভাষার জন্যে ভীষণ ক্ষতিকর। এভাবে ভাষাকে যতো আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে দেয়া হয়, তার ঘাড়ে নানা নিয়মের বেড়াজাল চাপিয়ে দেয়া হয়, তখন ভাষার মধ্যে যে স্বাভাবিক গতিময়তা তা নষ্ট হয়ে যায়।

এই যে পরপদ-পূর্বপদ বিশেষ্য-যুগলের সামনে, মাঝখানে বিশেষণ বসানোর চল, আক্কেল বা উইট ব্যবহার করে ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা, তা ভাষাকেই সচল করে, সুন্দর করে। একে রোধ করে কেবল যে বিশেষ্যের বিশেষণ, তার সামনেই সেই বিশেষণকে বসানোর একরোখা নিয়ম আরোপ করে দিলে ভাষার সেই গতিময়তা, সৌন্দর্য অনেকখানিই নষ্ট হয়ে যায়।

উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়-এ তো ব্যকরণগত কোনো ভুলও নেই, কিন্তু অসংখ্য ব্যাকরণগত ভুল বাক্য, শব্দও ব্যাপকভাবে মানুষ যখন ব্যবহার করতে থাকে, বুঝতে হবে সেই ভুলও তাদের পারস্পরিক ভাবের আদান প্রদানে কোনো বাঁধা তৈরি করতে পারছে না। ভাবের আদান-প্রদানে বাধা তৈরির বিষয় শুধু নয়, এমন ভুল ব্যবহারে মানুষ বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে বলেই সঠিক ব্যবহারকে এড়িয়ে যাচ্ছে। সেখানে এসে যদি খবরদারি চালানো হয়, তাহলে বস্তুত ভাষাকে বন্দী করা হয়, ভাষার গতি সেখানে হারিয়ে যায়।

ভাষার অত্যন্ত প্রাথমিক যে বৈশিষ্ট্য, সেই পরিবর্তনশীলতা এসব ক্ষেত্রে ব্যাহত হয়। বাংলা ভাষার (এবং যেকোনো ভাষার) উৎপত্তি, এর শব্দভাণ্ডার সবই এসেছে এই পরিবর্তনশীলতার হাত ধরেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আজকের যতো তদ্ভব, অর্ধ-তৎসম শব্দ আছে, সেগুলো আসল সংস্কৃত শব্দগুলোকে বিকৃত করে, মানে ভুল উচ্চারণে ব্যবহার করতে করতেই তৈরি হয়েছে। আর ভাষা যেখানে স্থবির, বুঝতে হবে ভাষার ধ্বংসও সেখানে অবশ্যাম্ভাবী।

ফলে, আমাদের এমন শিক্ষিত ‘ভাষা পুলিশ’রা যতোই ভাবেন, তাদের এমন খবরদারি ভাষার মঙ্গলার্থে, বস্তুত এহেন খবরদারির ফল ভয়ানক। ভাষার শুদ্ধচারিতা, ভাষার বিশিষ্টতা ও ভাষার একমুখিনতার চর্চা তারা ব্যক্তিগতভাবে ও নিজস্ব আখড়ায় করতেই পারেন, কিন্তু যখন তারা ‘ভাষাপুলিশ’ বা ‘ভাষামোড়ল’ এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ভাষার উপরে খবরদারি, মোড়লগিরি বা পৌরোহিত্য চালান, তা ভাষার জন্যে কোনো মঙ্গল তো বয়ে আনেই না, বরং অনেক ক্ষতিই সাধন করে।

+ posts

এই লেখাটি সম্পাদক কর্তৃক প্রকাশিত। মূল লেখার পরিচিত লেখার নিচে দেওয়া হয়েছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here