শিক্ষাক্রম ও পুস্তক

জেন্ডার সমতা বিশ্লেষণ : প্রাক-প্রাথমিকের আমার বই

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য আমার বই
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য আমার বই
শামস আল গালিব

শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। শিশুরা আশপাশের সবকিছুকে অনুকরণ করতে ভালোবাসে। এভাবে শিশুর মধ্যে জেন্ডার ধারণা গড়ে ওঠে তার সামাজিক প্রেক্ষাপট, পাঠ্যবই, সমাজ, পরিবারের ওপর ভিত্তি করে। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। শিশুরা আশপাশের সবকিছু অনুকরণ করতে ভালোবাসে। শিশুর মধ্যে জেন্ডার সমতা ও এর ধারণা বিকশিত হওয়াতে রয়েছে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম ধাপ প্রাক-প্রাথমিকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব।

জেন্ডার কী?

প্রচলিত অর্থে জেন্ডার ও সেক্সকে এক বিবেচনা করা হলেও জেন্ডার ও সেক্সের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সেক্স হলো জৈবিকভাবে সৃষ্ট নারী-পুরুষের মধ্যকার পার্থক্য যা সাধারণত অপরিবর্তনীয়। অন্যদিকে, জেন্ডার বলতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে একটি সমাজের নারী-পুরুষের প্রত্যাশিত আচরণ। অর্থাৎ, সমাজে একজন নারী-পুরুষ অথবা ছেলে-মেয়ে কী করবে, কী করতে পারবে না সমাজ কর্তৃক তা নির্ধারণ করে দেওয়াই হচ্ছে জেন্ডার। জেন্ডার অপরিহার্য বিষয় নয় বরং এটি সমাজসৃষ্ট ও পরিবর্তনযোগ্য। জেন্ডার শিক্ষার উদ্ভব মূলত সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান ভেদাভেদ দূরীকরণ।

জেন্ডার সমতা ও শিক্ষা

শিক্ষার সাথে জেন্ডারের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। জেন্ডার বৈষম্যের অন্যতম কারণ নারী-সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস। শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস দূরীকরণের মাধ্যমে মনুষ্যত্বের বিকাশসাধন করে বিজ্ঞানমনস্ক, আধুনিক, যুক্তিশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জেন্ডার বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন নারীরা। সেক্ষেত্রে নারীর নিরক্ষরতা এবং পুরুষের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষার হারকে দায়ী করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের অহিংস আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধীর মতে, “একজন পুরুষ যদি শিক্ষিত হয় তবে কেবল একজন ব্যক্তি শিক্ষিত হয়। কিন্তু যদি একজন নারী শিক্ষিত হলে গোটা পরিবার শিক্ষিত হয়।”

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর তুলনায় পুরুষ অনেকটাই এগিয়ে। নারীর ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায় হলো শিক্ষার অভাব। নারীর ক্ষমতায়নও নারীর জেন্ডার বৈষম্য সৃষ্টির পথে অন্তরায়। একজন মানুষ যখন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সে তার নিজের অধিকার সম্পর্কে অচেতন থাকে। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে নারী বিভিন্নভাবে বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে এবং এভাবেই নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্থ হয়। একজন শিক্ষিত নারী তার নিজের আইনগত অধিকার, ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন থাকেন যা তার জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তাকে আত্মনির্ভরশীল হতে শেখায়। তাই পুরুষের মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন ঘটিয়ে এবং নারীকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলে জেন্ডার সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষার বিকল্প নেই।

প্রাক-প্রাথমিকের পাঠ্যপুস্তক আমার বই

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো আমার বই নামে একটি পাঠ্যপুস্তক দেশের প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির জন্য প্রণয়ন করেছে। এটি প্রাক-প্রাথমিকের জন্য বাধ্যতামুলক পাঠ্যপুস্তক হিসেবে দেশব্যাপি পড়ানো হচ্ছে। বিশ্বব্যাপি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে দেশের জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিশুর বিকাশ ও শিশু-সংক্রান্ত দিকনির্দেশনার আলোকে বাংলাদেশ সরকার প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। পাশাপাশি, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে স্বতন্ত্র ও পৃথক শ্রেণি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুসারে, “শিশুদের জন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করার আগে শিশুর অর্ন্তনিহিত অপার বিস্ময়বোধ, অসীম কৌতুহল, আনন্দবোধ ও অফুরন্ত উদ্যমের মতো সর্বজনীন মানবিক বৃত্তির সুষ্ঠু বিকাশ এবং প্রয়োজনীয় মানসিক ও দৈহিক প্রস্তুতিগ্রহনের পরিবেশ তৈরী করা প্রয়োজন”।

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য কোন কৌশল অবলম্বন করা হবে সেখানে কৌশল হিসেবে জাতীয় শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, “অন্যান্য গ্রহণযোগ্য উপায়ের সঙ্গে ছবি, রং, নানাধরনের সহজ আকর্ষণীয় শিক্ষা উপকরণ, মডেল, হাতের কাজের সঙ্গে ছড়া, গল্প, গান ও খেলার মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হবে”। বলা চলে, মোটামুটি এগুলোর সমন্বয়ে প্রাক-প্রাথমিকের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রণয়ন করেছে আমার বই

কী কী আছে প্রাক প্রাথমিকের পাঠ্যপুস্তক আমার বইতে?

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রাক-প্রাথমিকের আমার বই-কে ১১টি অনুচ্ছেদে সাজিয়েছে। প্রতিটি ইউনিট বেশ আকর্ষণীয় গ্রাফিক্সের মাধ্যমে সাজানো হয়েছে এবং বইয়ের বিষয়াবলী শিশুবান্ধবও বটে। একনজরে যে যে বিষয়াবলী দিয়ে সাজানো আমার বই :

  • জাতীয় সংগীত
  • আমার ছবি
  • চারু ও কারু
  • ছবি পড়া
  • মিল-অমিলের খেলা
  • বর্ণমালা পরিচিতি : স্বরবর্ণ
  • বর্ণমালা পরিচিতি : ব্যঞ্জনবর্ণ
  • পরিবেশ
  • প্রযুক্তি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা
  • প্রাক-গাণিতিক ধারণা
  • সংখ্যার ধারণা

জেন্ডার সমতা : পাঠ্যপুস্তক যেভাবে শিশুকে প্রভাবিত করে

“গণি মিয়া একজন গরীব কৃষক। তিনি মাঠে কঠোর পরিশ্রম করে। গণি মিয়ার স্ত্রী গণি মিয়ার জন্য বাসায় রান্নাবান্না করেন এবং সন্তান লালন-পালন করেন”।

উদ্দীপকে উল্লিখিত গল্পটি আমাদের এক সময়কার প্রাথমিকের পাঠ্যপুস্তকের সাধারণ একটি গল্প ছিলো। গল্পটি আপাতঃদৃষ্টিতে স্বাভাবিক বলে মনে হলেও গল্পটি জেন্ডার বৈষম্যমূলক। শিশু গল্পটি পড়তে গিয়ে নিজের মনের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি করে নেবে। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের কাজ বাইরে কাজ করা। পরিবারের নারী সদস্যদের কাজ বাসায় কাজ করা ও সন্তান লালন-পালন করা। আবার পরিবারের পুরুষ সদস্য কঠোর পরিশ্রম করবেন অর্থাৎ তার কাজের স্বীকৃতি প্রদান করা হবে। অন্যদিকে নারী সদস্যদের গৃহস্থালীর কাজকে কাজ হিসেবেই ধরা হবে না বরং অবমূল্যায়ন করা হবে। গল্পের মাধ্যমেই শিশুর মধ্যে অবচেতন মনেই নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাব সৃষ্টি হবে। এর জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী পাঠ্যপুস্তকের অব্যবস্থাপনা। যদিও বর্তমান সময়ে জেন্ডার ধারণা বিকশিত হওয়ার ফলে পাঠ্যপুস্তককে জেন্ডার নিরপেক্ষ করা হচ্ছে।

প্রাক-প্রাথমিকের আমার বই : জেন্ডার সমতা বিশ্লেষণ

প্রাক-প্রাথমিকের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকে জেন্ডার সংবেদনশীলতার দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। প্রথমেই যদি বইয়ের প্রচ্ছদের দিকে লক্ষ্য করা যায় সেখানে দেখা যায় সেখানে সমান সংখ্যক ছেলেমেয়ে একসাথে বই পড়ছে। পুরো বইয়ের প্রতিটি পাতার ওপরে অংশে এবং নিচের অংশজুড়ে গ্রাফিক্স ডিজাইনে ছেলেমেয়ের সমান অংশগ্রহণমূলক উপস্থিতি লক্ষণীয়। এটি শিশুকে অবচেতন মনে ছেলেমেয়ের মধ্যে ভেদাভেদ নেই ধারণাটি গড়ে তুলতে পারে। অনুচ্ছেদভিত্তিক জেন্ডার বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো।

চারু ও কারু

মূলত জেন্ডার বিষয়টি শুরু হয়েছে বইটির ৩য় অনুচ্ছেদ চারু ও কারু’তে। অনুচ্ছেদটির গ্রাফিক্সে গাছের পাতা মাথায় দেয় একটি মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। মূলত চারু ও কারু অনুচ্ছেদ দিয়েই শুরু হওয়া বইটিতে এই অনুচ্ছেদে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন ছিলো। অনুচ্ছেদটির ৯, ১০ নং পৃষ্ঠায়ও একই বিষয় লক্ষণীয়। শুধু মেয়ের ছবি ব্যবহার না করে সেখানে ছেলেমেয়ে উভয়ের ছবি ব্যবহার করা উচিৎ ছিলো।

ছবি পড়া

আমার বইয়ের ৪র্থ অনুচ্ছেদ ছবি পড়া। অনুচ্ছেদটির ১৬ নং পৃষ্ঠায় জেন্ডার সমতার বিষয়টি বেশ ভালো লেগেছে। এই পৃষ্ঠায় চারটি ছবিতে একসাথে ছেলে-মেয়েদের ঘুড়ি ওড়াতে, ফুটবল খেলতে, দোলনায় দোল খেতে এবং বেলুন নিয়ে খেলতে দেখা যাচ্ছে। অনুচ্ছেদটির জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণের বিষয়টি প্রশংসনীয়। পাশাপাশি এ অধ্যায় থেকে শিশুরা শিখবে ছেলে-মেয়েদের খেলাধুলার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

মিল-অমিলের খেলা

বইটির ৫ম অনুচ্ছেদে রয়েছে দুটি চিত্রের মধ্যে পার্থক্য বের করার মজার খেলা: মিল-অমিলের খেলা। অনুচ্ছেদটির ২৭ নং পৃষ্ঠায় উপর-নিচে দুটি চিত্রে গ্রাম্য পরিবেশে একটি ছেলেকে ফুটবল হাতে নিয়ে এবং দুটি মেয়েকে বেলুন নিয়ে খেলতে দেখা যাচ্ছে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় মনে করা হয় ফুটবল ছেলেদের খেলা এবং হাড়ি-পাতিল, পুতুল এগুলো মেয়েদের খেলা। চিত্র দুটিতে কিছুটা জেন্ডার পক্ষপাতমূলকতা পরিলক্ষিত। চিত্র দুটি আরো বেশি জেন্ডার নিরপেক্ষ করে তোলার প্রয়োজন ছিলো।

বর্ণমালা পরিচিতি স্বরবর্ণ

বইটির ৬ষ্ঠ অনুচ্ছেদ বর্ণমালা পরিচিতিতে স্বরবর্ণ’র গ্রাফিক্সটি বেশ প্রশংসনীয়। বই হাতে একটি ছেলে এবং একটি মেয়েকে পড়তে দেখা যাচ্ছে। জেন্ডার বিশ্লেষণে অনুচ্ছেদটির গ্রাফিক্স সম্পূর্ণ জেন্ডার নিরপেক্ষ। অনুচ্ছেদটির ৩৪ নং পৃষ্ঠায় ঋতুর ছবিতে বর্ষাকালে ছাতা মাথায় দিয়ে একটি ছেলে এবং একটি মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে অনুচ্ছেদটি জেন্ডার নিরপেক্ষ। বইটির প্রতিটি অনুচ্ছেদ এমন হওয়া উচিৎ ছিলো।

বর্ণমালা পরিচিতি ব্যঞ্জনবর্ণ

পূর্বের অনুচ্ছেদের মতো এ অনুচ্ছেদেও গ্রাফিক্সটিতে একটি মেয়ে ও একটি ছেলেকে একসাথে পেড়তে দেখা যাচ্ছে। অনুচ্ছেদটির ৫৪ নং পৃষ্ঠায় বর্ণ পড়ি শিরোনামের চিত্রে একটি মেয়েকে দু’হাতে ৬টি বেলুন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সেখানে ছেলেমেয়ের উভয়ের অংশগ্রহণ প্রয়োজন ছিলো। যেমনটি দেখানো হয়েছে ৬২ নং পৃষ্ঠায় একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে হাত উঁচু করে হাসছে। ৬৫নং পৃষ্ঠায় দেখা যাচ্ছে, আষাঢ় মাসের ছবিতে একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে ছাতা মাতায় দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে দাড়িয়ে অছে। চিত্রটি জেন্ডার বিশ্লেষণে জেন্ডার নিরপেক্ষ। তবে ৬৭, ৬৮ নং পৃষ্ঠায় যথাক্রমে ‘চিৎপটাং’ এবং ‘দুঃখী’র ছবিতে দুজন ছেলেকে ব্যবহার করা হয়েছে। বিষয়টিতে জেন্ডার বৈষম্যমূলক চিত্র পরিহার করা উচিৎ ছিলো। ৭২, ৭৩, ৭৪ নং পৃষ্ঠায় ছেলে-মেয়ে উভয়ের সমান অংশগ্রহণ দেখানো হয়েছে। তবে অনুচ্ছেদটি পরিপূর্ণ জেন্ডার নিরপেক্ষ নয়। অনুচ্ছেদটির শেষে পেইজে বাড়ির উঠানে বসে ছেলেমেয়েদের একসাথে পড়তে দেখা যাচ্ছে, যেটি বেশ প্রশংসনীয় একটি ছবি।

পরিবেশ

শিশুকে পরিবেশ-বিষয়ক ধারণা প্রদানের জন্য আমার বইয়ের ৮ম অনুচ্ছেদ পরিবেশ। অনুচ্ছেদের ২য় পৃষ্ঠায় আমার পরিবেশ শিরোনামে গ্রাম্য পরিবেশে একসাথে দুজন ছেলেমেয়েকে দেখা গেছে। বিষয়টি ভালো লেগেছে। ৮৫নং পৃষ্ঠার শেষে দুপুরের ছবিতে একদল ছেলেমেয়েকে একসাথে পুকুরে গোসল করতে এবং একজন ছেলে এবং মেয়েকে বই হাতে বিদ্যালয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। ৮৬ নং পৃষ্ঠাজুড়ে বিকাল এবং সন্ধ্যার ছবিতেও একসাথে ছেলে-মেয়েদের খেলতে দেখা যাচ্ছে। তবে অনুচ্ছেদটির শেষ পৃষ্ঠায় বন্যার ছবি দেখানো হয়েছে যা থেকে বিপদে নারী-পুরুষের পরস্পর সহযোগিতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। সবমিলিয়ে অনুচ্ছেদটি পুরোপুরি জেন্ডার নিরপেক্ষ।

প্রযুক্তি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা

বইটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ এটি। অনুচ্ছেদটির গ্রাফিক্স জেন্ডার বৈষম্যমূলক। ৯৪নং পৃষ্ঠায় ‘দাঁত মাজা’ শিরোনামে একটি ছেলেকে ব্রাশ করতে দেখা যাচ্ছে। সেই ছবিটিই অনুচ্ছেদের গ্রাফিক্সে আনা হয়েছে। বিষয়টি অবশ্যই জেন্ডার সমতামূলক করা প্রয়োজন ছিলো। বিষয়টিতে শিশুর অবচেতন মনে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে স্বাস্থ্য মানে ছেলেদের স্বাস্থ্য। এমন ভুল অপ্রতাশিত ছিলো।

প্রাক-গাণিতিক ধারণা

আমার বই-তে গাণিতিক ধারণা শুরু হয়েছে এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে। অনুচ্ছেদটিতে ৯৮নং পৃষ্ঠায় মোটা-চিকন শিরোনামে শ্রমজীবী দুজন মানুষকে দেখানো হয়েছে বলে বোঝা যাচ্ছে। মানুষ দুজনই পুরষ। ছবিটি জেন্ডার বৈষম্যমূলক এবং এর মাধ্যমে শিশুর মনে ধারণা জন্মাতে পারে যে, পুরুষ সদস্য বাইরে কাজ করে এবং নারীরা বাড়ির কাজ করবে। বিষয়টির জেন্ডার নিরপেক্ষতা প্রয়োজন ছিলো। আবার ১০০ নং পৃষ্ঠায় দুজন মেয়েকে বিদ্যালয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ছবিটি নারী শিক্ষার অগ্রসরতার পরিচয় বহন করলেও ছেলের অনুপস্থিতি ছবিটিকে জেন্ডার বৈষম্যমূলক করে তুলেছে।

সংখ্যার ধারণা

প্রাক-প্রাথমিকের আমার ব্ইয়ের সর্বশেষ এবং সর্ববৃহত্তম অনুচ্ছেদ এটি। ১০৬ নং পৃষ্ঠায় ‘সংখ্যার ছড়া’ শিরোনামে ছড়ার পাশে দুটি ছবি দেয়া আছে যেখানে উভয় ছবিতেই ছেলেমেয়েদের একসাথে খেলতে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি বেশ ভালো লেগেছে।

পাঠ্যপুস্তকে জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণ জরুরি

বিশ্বে জেন্ডার ধারণা ক্রমশ বিকশিত হচ্ছে। জেন্ডার ধারণা বিকশিত হওয়াতে প্রভাব রয়েছে পাঠ্যপুস্তকের। ফলে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পাঠ্যপুস্তক জেন্ডার নিরপেক্ষ হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম স্তর হিসেবে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকের আমার বই জেন্ডার নিরপেক্ষা হওয়া অত্যন্ত জরুরি। ২০১৪ সাল থেকে প্রকাশিত প্রকাশিত জেন্ডার বিশ্লেষণে দেখা যায় বইটিতে এখনো জেন্ডার বৈষম্যমূলক বিষয়বস্তু রয়েছে যা শিশুদের প্রভাবিত করবে। ৬ বছরে বেশ কয়েকেটি মুদ্রণ হয়ে গেলেও পাঠ্যপুস্তকটির জেন্ডার সমতা নিয়ে কাজ করা হয়নি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। স্বল্পসময়ের মধ্যে বইটির জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণ জরুরি।

লেখক সম্পর্কে

শামস আল গালিব

শামস আল গালিব

শামস আল গালিব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিএড (সম্মান) ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী।

মন্তব্য লিখুন