সাক্ষাৎকার

ড. এনায়েতুর রহীম: “ডেটা সায়েন্স একাধারে যেমন উচ্চস্তরের টেকনিক্যাল বিষয়, তেমনি পুরোপুরি নন-টেকনিক্যাল ডেটা সায়েন্টিস্টও হওয়া সম্ভব”

ডেটা সায়েন্স একাধারে যেমন উচ্চস্তরের টেকনিক্যাল বিষয়, তেমনি পুরোপুরি নন-টেকনিক্যাল ডেটা সায়েন্টিস্টও হওয়া সম্ভব
ডেটা সায়েন্স একাধারে যেমন উচ্চস্তরের টেকনিক্যাল বিষয়, তেমনি পুরোপুরি নন-টেকনিক্যাল ডেটা সায়েন্টিস্টও হওয়া সম্ভব
লিখেছেন গৌতম রায়

ডেটা সায়েন্স নিয়ে বিশ্বব্যাপী আগ্রহ বাড়ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাকুরি-সম্পর্কিত জরিপে দেখা গেছে যে, আগামী দিনগুলোতে যেসব সেক্টরে প্রচুর দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হবে, ডেটা সায়েন্স, পরিসংখ্যান, মেশিন লার্নিং সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। আর গবেষণার কদর তো সবসময়ের জন্যই, হোক সেটি অ্যাকাডেমিয়াতে, কিংবা ইন্ডাস্ট্রিতে। গবেষণা, পরিসংখ্যান ও ডেটা সায়েন্স নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন ড. এনায়েতুর রহীম। তিনি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পরিসংখ্যানে শিক্ষকতা দিয়ে। পরবর্তীতে আমেরিকাতে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং শিক্ষকতা ছেড়ে বর্তমানে হেলথকেয়ার/ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন। ‘বাংলাদেশের শিক্ষা’র পক্ষ থেকে ডেটা সায়েন্স, পরিসংখ্যান ও গবেষণার নানা বিষয় সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা ও মতামত জানতে চেয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক গৌতম রায়

গৌতম রায়: ঠিক জানি না, প্রশ্নটি বিব্রতকর হবে কি না আপনার জন্য, হলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কিন্তু কৌতুহল থেকেই জানতে চাই, আপনি দেশে ও দেশের বাইরে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করেছেন। সেটি ছেড়ে দিলেন কেন? এখন যেখানে কর্মরত, সেখানে আপনাকে মূলত কী ধরনের বিশ্লেষণী কাজ করতে হয়? শিক্ষকতা ও বর্তমান পেশার ফারাক দেখেন কোথাও? 

এনায়েতুর রহীম: এই প্রশ্ন এর আগেও আমাকে অনেকেই করেছেন। আমি মোটেও বিব্রত নই। বাংলাদেশ যে পরিবেশে আমরা বড় হই, সেটি নানাভাবে আমাদের চিন্তা-চেতনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, উচ্চাশা সবকিছুকেই প্রভাবিত করে। এ-বিষয়টিকে মাথায় রাখলে আমার উত্তরগুলো বুঝতে সুবিধা হবে।

বাবা ছিলেন কলেজের শিক্ষক। সম্ভবত সেখান থেকেই শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়ার এক ধরনের অনুপ্রেরণা কাজ করেছে। বাবার ইচ্ছে ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করার। তিনি সেটি করতে পারেননি। হয়তো এই ব্যাপারটি আমাকে আরও বেশি করে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা করার। সেই সুযোগও হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পরিসংখ্যান বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স করে একই ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। 

এর ধারাবাহিকতায় কানাডায় পিএইচডি করাকালীন কানাডা বা আমেরিকায় শিক্ষকতা করার স্বপ্ন দেখা শুরু করি। যদিও পিএইচডি ক্যান্ডিডেসি অর্জন করার পর আমি স্থানীয় সরকারের পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্টে পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে চাকরি পেয়েছিলাম, তবুও ফাকাল্টি পজিশন পাওয়ায় কানাডা ছেড়ে আমি সপরিবারে ইউএসএতে চলে যাই। কানাডায় পড়াশোনাকালীন কানাডার সাথে অ্যাডাপ্ট হয়ে যখন শিকড় গজিয়ে গিয়েছিলো, ঠিক তখনই সেই সংযোগ নিজে থেকে বিচ্ছিন্ন করে সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশে ভিন্ন পরিবেশে একেবারে শূন্য থেকে আবার জীবন শুরু হয়। 

এটি বলার কারণ এটা বোঝানো যে, অ্যাক্যাডেমিয়াতে কাজ করার কী পরিমাণ অনুপ্রেরণা ও ইচ্ছে আমার ছিলো। 

আমেরিকায় এসে অ্যাকাডেমিয়াতে চার বছর গ্রাজুয়েট লেভেলের পরিসংখ্যান পড়িয়েছি। আস্তে আস্তে নতুন পরিবেশ এবং নতুন দেশে নিজেদেরকে অভিযোজিত করে নেয়া শুরু হয়। আমেরিকা সম্পর্কে বুঝতে শিখি, জানতে শুরু করি। আমেরিকা যে আসলেই অপার সম্ভাবনার দেশ, সেই বিষয়টি ধীরে ধীরে অনুধাবন করি।

শৈশব থেকে এই মধ্যবয়স পর্যন্ত যে জিনিসটি কখনোই কল্পনা করার সাহস পাইনি, সেই জিনিসটি আমেরিকার পরিবেশ আমাকে প্রলুব্ধ করে। আমি আমেরিকান স্বপ্ন দেখা শুরু করি। আমেরিকানদের কাছে আমেরিকান স্বপ্ন বলতে বাড়ি-গাড়ি এসব বোঝায়। আমার কাছে আমেরিকান স্বপ্ন হল আমার স্বপ্ন–সেটি নতুন হোক কিংবা পুরনো–সেই স্বপ্নকে তাড়া করা এবং স্বাধীনভাবে ইচ্ছেমতো নতুন কিছু করার যে স্বপ্ন, সেটি।

আনুমানিক ২০১৪ বা ২০১৫ সালের কথা। ঠিক এই সময়ে বিগ ডেটা এবং ডেটা সায়েন্স নিয়ে ইন্ডাস্ট্রি, সোশ্যাল মিডিয়া, ও পত্রপত্রিকায় এক ধরনের শোরগোল পড়ে যায়।  আমি সবসময়ই অনলাইনে সক্রিয় থেকেছি। যে-কারণে আমার সমবয়সী বা সহপাঠী অনেকের তুলনায় এ-বিষয়ে বেশি অবগত ছিলাম সেটি বলতে পারি। আর তখনই অ্যাকাডেমিয়া ছেড়ে ইন্ডাস্ট্রিতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত মোটামুটি নিয়ে ফেলি। 

এই বিষয়টি যখন বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের সাথে শেয়ার করি, তখন তারা অবাক হয়ে যায়। সবার আশঙ্কা অমূলক ছিলো না। কেন একটি স্টেবল চাকুরি ছেড়ে আমি ইন্ডাস্ট্রিতে ভোলাটাইল চাকুরিতে যোগ দিতে যাচ্ছি, সেটি নিয়ে নিকটাত্মীয় থেকে শুরু করে দূরের এবং কাছের বন্ধুদের অনেকেই এক ধরনের হতাশা, ভয় এবং মিশ্র অনুভূতি প্রকাশ করে। বলা বাহুল্য, অনেকেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন। কিন্তু আমি সিদ্ধান্তে স্থির থাকি এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সামনে এগিয়ে যাই। এভাবেই আমার অ্যাক্যাডেমিয়া ছেড়ে ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন জীবন শুরু হয়।

অ্যাকাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ। যদি এভাবে বলি, অ্যাকাডেমিয়ার লোকজন ইন্ডাস্ট্রির কাজ বোঝে না এবং ইন্ডাস্ট্রির লোকজন অ্যাকাডেমিয়ার উচ্চ স্তরের কাজকর্মের গুরুত্ব দেয় না, তাহলে খুব একটা ভুল বলা হবে না। কারণ দুই জগতের চাহিদা, গুরুত্ব ও কাজের ধারা সম্পূর্ণ আলাদা। 

অনেকক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে যে, অ্যাক্যাডেমিয়াতে কাটিং এজ ডেভলপমেন্ট বা গবেষণা যাই বলেন না কেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ওগুলোর রিয়েল লাইফে তাৎক্ষণিক ব্যবহার নেই। অন্যদিকে ইন্ডাস্ট্রির কাজকর্ম হলো মানি ড্রিভেন। মানে, আপনার সাফল্য কোম্পানির কতোটা লাভ বা ক্ষতি হচ্ছে তার সাথে সংযুক্ত। বিষয়টি লিখে প্রকাশ করা সহজ নয়। হয়তো এটি নিয়ে কোনো একদিন আলোচনা করা যাবে।

অ্যাকাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ। যদি এভাবে বলি, অ্যাকাডেমিয়ার লোকজন ইন্ডাস্ট্রির কাজ বোঝে না এবং ইন্ডাস্ট্রির লোকজন অ্যাকাডেমিয়ার উচ্চ স্তরের কাজকর্মের গুরুত্ব দেয় না, তাহলে খুব একটা ভুল বলা হবে না। কারণ দুই জগতের চাহিদা, গুরুত্ব ও কাজের ধারা সম্পূর্ণ আলাদা।

আমি কাজ করি ডেটা সাইন্টিস্ট হিসেবে। আমার কাজ বড় আকারে ডেটা সেট থেকে তথ্য বের করে সেগুলো প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড ও উন্নয়নের পেছনে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তাতে সহায়তা করা। 

অ্যাকাডেমিয়াতে যেমন আপনি একাই নিজের সমস্যা বের করে সেটি সমাধান করে একা একাই প্রকাশ করবেন, ইন্ডাস্ট্রিতে একা একা বলে কিছু নাই। সেখানে আপনি একটি দলের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। ফলে প্রথম যে দক্ষতা আপনার লাগবে সেটি হলো কীভাবে নন-টেকনিক্যাল ও ব্যবসায়িক জ্ঞানসম্পন্ন অংশীজনদের সাথে একজন টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ হিসেবে একসাথে কাজ করবেন সেটি। 

এটি এখন যতো সহজে আমি বলছি, বাস্তব জীবনে এই আত্মীকরণ ততো সহজ নয়। বিশেষ করে, যারা দীর্ঘদিন অ্যাক্যাডেমিক পরিবেশে এই কাজ করেছে, তাদেরকে অনেক কিছুই আনলারন করতে হয়। আবার অনেক কিছুই নতুন করে শিখতে হয়।

ইন্ডাস্ট্রির ডেটার পরিমাণ বিশাল। অ্যাকাডেমিয়াতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছোট ছোট ডেটা নিয়ে আমরা কাজ করি এবং শিক্ষার্থীদের পড়াই। এর যথেষ্ট কারণও রয়েছে। যদিও বাস্তব জীবনের ডেটার সাথে সেই ডেটাগুলোর খুব কমই মিল থাকে। বাস্তব জীবনের ডেটা অনেক মেসি। 

ইন্ডাস্ট্রিতে তিন মাস ব্যয় করে কোনো মডেলের পারফরম্যান্স এক শতাংশ বাড়ানোকে বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হয় না। কারণ, ইন্ডাস্ট্রি ওই এক শতাংশ পারফরম্যান্স অর্জন করার চেয়ে কতো দ্রুত ডেলিভারি করতে পারবে, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ, একটি মডেল যদি ৭০% কাজে দেয়, সেটি দিয়েই কাজ শুরু করবে এবং আস্তে আস্তে ও ধাপে ধাপে সেটির পারফরম্যান্স বাড়ানোর চেষ্টা করবে। ইন্ডাস্ট্রির কাজ আমার কাছে ভালোলাগে কারণ আমার কাজের প্রভাব সরাসরি দেখতে পাই। 

একটি কথা বলে রাখতে চাই যে, ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞতা অর্জনের পর শিক্ষক হিসেবে আমার দক্ষতা, ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞতা অর্জনের আগের যে শিক্ষক আমি তার থেকে অনেক পরিণত। ‌যা অধিকতর ভালো পড়াতে সাহায্য করে বলে আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি। যা হোক,  একাডেমিয়াতে কাজ না করলেও শিক্ষকতার মানসিকতা, অর্থাৎ জ্ঞান বিতরণের যে স্পৃহা, সেটি এখনও রয়েছে। যে কারণে সুযোগ পেলেই এডজানংকট ফ্যাকাল্টি হিসেবে গ্র্যাজুয়েট লেভেলের কোর্স পড়াই। ‌

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদের মানুষ যেরকম মর্যাদার চোখে দেখেন, কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর কী অবস্থা? আপনার নিজ অভিজ্ঞতা থেকেই জানতে চাই।

আমার ২০ বছর কানাডা ও আমেরিকার প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে চাই যে, এখানে আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাকি বাগানের মালি এই প্রশ্নটিই কেউ কখনো করে না। সামাজিক জমায়েত বলেন কিংবা কোথাও সার্ভিস নিতে গিয়ে বলেন, যেকোনো হিউম্যান ইন্তেরাকশনে ব্যক্তি হিসেবেই আপনি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কী করেন সেটি এদের সমাজে গুরুত্বহীন।

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় শিক্ষকতা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা, যেমন একটি সম্মানের পেশা হিসেবে ধরা হয়; এখানের সমাজব্যবস্থায় আপনি কী করেন তার সাথে সম্মানের বিষয়টি জড়িত নয়। এখানে আপনি কীভাবে একজন মানুষের সাথে ব্যবহার করছেন, সেটিই আপনার পরিচয়। অর্থাৎ, আপনার আচরণ ও ব্যবহার আপনাকে চিহ্নিত করে। সেটিই আপনাকে সম্মান এনে দেয়। 

প্রকৃতপক্ষে, কোথাও যদি আপনি আগ বাড়িয়ে পেশার ব্যাপারটি যদি উল্লেখ করেন, তাহলে সেটি খুবই খারাপ দেখাবে। তাদের কাছে বিষয়টি অপ্রত্যাশিত মনে হবে। তারা ঠিক বুঝতে পারবে না কেন আপনি পেশার কথা বলছেন। 

শুধু একটি ক্ষেত্রে–তাও যদি প্রাসঙ্গিক হয়–তাহলে পেশার ব্যাপারটি কিছুটা প্রভাব বিস্তার করে বা করতে পারে বলে আমার মনে হয়েছে। সেটি হলো, বিমানবন্দরে যদি কোনো কারণে আপনাকে থামিয়ে ওরা জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায়, তখন আপনার পেশার বিষয়টি সামনে চলে আসতে পারে। ‌

আমার ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে। যেমন, একবার আমি একা একা ভ্রমণ করছিলাম এবং আমেরিকাতে ফেরতের সময় কাস্টমস অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন– আমি কেন একা ভ্রমণ করছি? পরিবারকে নিয়ে যাইনি কেন? সেই প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কী করি। ইন্ডাস্ট্রিতে ডেটা সাইন্টিস্ট হিসেবে কাজ করি শুনে তিনি বলেছিলেন তোমার জন্য বেড়ানোর খরচ তো বড় হওয়ার কথা নয়! ব্যস, ওই পর্যন্তই।

কিছুদিন ধরে আপনি ইউটিউবে গবেষণা ও পরিসংখ্যান নিয়ে একাধিক টিউটোরিয়াল প্রকাশ করেছেন। এই কাজটি কেন করছেন?

আমি মনে করি, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অর্জনের পরে আমার নিজস্ব কিছু ধারণা তৈরি হয়েছে। শেখানোর নিজস্ব ধরন তৈরি হয়েছে। সর্বোপরি, যে জিনিসগুলো আমি শিক্ষার্থী হিসেবে বুঝতে পারিনি, সেই জিনিসগুলো চেষ্টা করি তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে সহজবোধ্য উপায় তুলে ধরতে। এটি আমার মোটিভেশন।

পরিসংখ্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আমরা সেরকম গুরুত্ব দিয়ে শিখি না। প্রকৃতপক্ষে, আমেরিকা-কানাডাতেও একই অবস্থা।  পরিসংখ্যানের গুরুত্ব বোঝা যায় যখন থিসিসের কাজ শুরু হয়। ‌আবার অনেকেই চাকুরিক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে যাবার পর আবারও পরিসংখ্যানভিত্তিক কোর্স করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টটাইম ভর্তি হয়। এসব দেখে আমি নিজে অনুপ্রাণিত হই এবং তা থেকে তরুণদের মাঝে এই বিষয়গুলো পৌঁছে দিতে চেষ্টা করি।

আপনার কি মনে হয় এভাবে শিক্ষার্থীরা গবেষণা ও পরিসংখ্যানে আকৃষ্ট হবে? আদৌ কি এভাবে কিছু শেখা যায়?

এভাবে মানুষ পরিসংখ্যানকে পুনরায় আবিষ্কার করতে পারে। অনলাইন শিক্ষা প্রথাগত শিক্ষার বিকল্প বলে আমি মনে করি না। অনলাইনে যখন কেউ কিছু শিখতে আসেন, তিনি শুন্য থেকে শুরু করেন না। তার প্রাথমিক ধারণা আছে, কিন্তু হয়তো আরও বুঝার জন্য অনলাইনে কোর্স করেন কিংবা ইউটিউবে ভিডিও দেখেন। এভাবে নতুন জিনিস শেখা যায় এবং অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়।

আমি নিজে প্রচুর অনলাইন কোর্সে অংশ নিই। এটি জানার জন্য যে, একটা জিনিস কতোজন কতোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। এতে নিজের জ্ঞান সমৃদ্ধ হয় এবং অন্যের সাথে সেই জ্ঞান শেয়ার করার অনুপ্রেরণা পাই।

অনলাইন শিক্ষা প্রথাগত শিক্ষার বিকল্প বলে আমি মনে করি না। অনলাইনে যখন কেউ কিছু শিখতে আসেন, তিনি শুন্য থেকে শুরু করেন না। তার প্রাথমিক ধারণা আছে, কিন্তু হয়তো আরও বুঝার জন্য অনলাইনে কোর্স করেন কিংবা ইউটিউবে ভিডিও দেখেন। এভাবে নতুন জিনিস শেখা যায় এবং অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়।

পরিসংখ্যানে লেখাপড়ার সাথে গবেষক হওয়ার কি কোনো যোগবোধক সম্পর্ক আছে? বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রচুর গ্র্যাজুয়েট বের হয় পরিসংখ্যান থেকে। তাদেরকে কি গবেষণা কাজে যুক্ত করা হচ্ছে যথাযথভাবে? বা তাদের জন্য কি বাংলাদেশে পর্যাপ্ত চাকুরির ব্যবস্থা আছে? 

পরিসংখ্যানের অন্যতম প্রয়োগ হচ্ছে গবেষণায়। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশে গবেষণাকে উদ্দেশ্য করে পরিসংখ্যানবিদ নিয়োগ দেওয়ার চর্চা সীমিত। বিদেশে ডিভিশন অফ লেবার বিষয়টি সুন্দরভাবে বাস্তবায়িত হয়। যেমন, আমি যখন হাসপাতালে কাজ করতাম, তখন কোনো টিম মিটিংয়ে আমি পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে উপস্থিত থাকতাম। এমন নয় যে, পরিসংখ্যানের আহামরি জটিল কোনো কৌশল সেখানে প্রয়োগ করা হবে যার জন্য আমাকে থাকতেই হবে। বরং, ‌এমন ডাক্তারদের সাথে আমি কাজ করেছি যারা পরিসংখ্যান বিষয়ে গ্র্যাজুয়েট পরিসংখ্যানবিদের মত জ্ঞান রাখেন। তারপরেও তাদের সিস্টেম একজন প্রতিষ্ঠিত পরিসংখ্যানবিদকে এ ধরনের মিটিংয়ে রাখার বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছে। ‌

এখানেই উন্নত বিশ্বের সাথে আমাদের পার্থক্য।  বাংলাদেশে আপনি এরকম সুযোগ খুব কমই পাবেন। আমি মিথ্যা বলবো না, বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনেকেই আছেন, যারা পরিসংখ্যানকে খুবই নিম্নস্তরের বিষয় হিসেবে মনে করেন। আর কিছু কিছু বিষয়কে রয়েল বিষয় হিসেবে মনে করেন। তো, সেই রয়েল বিষয়ের কেউ যদি অল্পবিস্তর পরিসংখ্যান শিখে ফেলেন, তখন তারাই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করতে চান। আমার নিজে এ-বিষয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে।

বিদেশে পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে আপনি বিশেষজ্ঞ। ফলে আপনার মতামত সেখানে দিতে পারবেন। তারা সেটি মানবে কি মানবে না সেটি ভিন্ন বিষয়; কিন্তু আপনার মতামত রেকর্ডেড থাকবে। ফলে পরবর্তীতে কোনো দায় বা অবহেলার বিষয় আসলে সেই রেকর্ড আপনাকে রক্ষা করবে।

অল্প কথায় এভাবে বলা যায় যে, আপনি একটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছেন এবং তারা সেই দক্ষতাকে তাদের কার্যধারায় অন্তর্ভুক্ত করবে এবং আপনাকে একটি দায়িত্ব অর্পণ করবে এবং আপনি তার দায়দায়িত্ব নেবেন। ‌সফল হলে কৃতিত্ব পাবেন এবং বিফল হলে তার দায় নেবেন।

আমি যে-সময় বাংলাদেশে ছিলাম, সে-সময় পর্যন্ত এরকম পরিবেশ দেখিনি। মোটাদাগে ওইভাবে পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। এখনো যে পরিবেশ গড়ে উঠেছে, তেমনটি বলা যায় না, তবে এখন ইন্টারনেটের প্রসারের কারণে, আর সেইসাথে তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন নতুন কোম্পানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান খোলার কারণে আমি আশা করবো একসময়ে পরিসংখ্যানবিদের পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে চাকরীর সুযোগ তৈরি হবে।

বিভিন্ন সময়েই দেখেছি, আপনি ডেটা সায়েন্স ও পরিসংখ্যানকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। কেন? 

আসলে ইন্টারনেটের প্রসারের কারণে ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারটি এখন একেবারে সামনে চলে এসেছে। যে-কারণে এই বিষয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এই বিষয়টিকে প্রমোট করি এবং এই বিষয়ের প্রতি তরুণ শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা বজায় রাখি। 

কারণ যেখানেই ডেটা আছে, সেখানেই পরিসংখ্যানবিদদের অবদান রাখার সুযোগ আছে। এটি শুধু বিষয়ের প্রমোশন নয়, বরং এটি হতে পারে রিওয়াডিং একটি ক্যারিয়ার। 

একসময় প্রচুর মানুষ বিবিএ-তে ভর্তি হতো। ভর্তি হতো কম্পিউটার সায়েন্সে। দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট সময় আসে যখন কিছু বিষয়ে পড়ার জন্য মানুষজন প্রাণপন চেষ্টা করে এবং একসময় আবার সেই বিষয়ের চাহিদা কমে যায়। ডেটা সায়েন্সের ক্ষেত্রেও কি এমন কিছু হতে পারে?

অবশ্যই হতে পারে। বিশেষ করে বাজারে চাহিদা থাকলেই সেদিকে ঝাঁপিয়ে পড়লে ফলাফল এরকম হতে পারে। তবে, বিবিএ করার পরও যখন ইমেইল ড্রাফট করতে পারে না সেরকম ঘটনা যেমন আছে, তেমনি ডেটা সায়েন্টিস্ট দাবি করে ডেটা ধরিয়ে দিলে সেটি নিয়ে কাজ করতে পারে না, এমন ডেটা সায়েন্টিস্টও ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গিয়েছে। 

ডেটা সায়েন্স একাধারে যেমন উচ্চস্তরের টেকনিক্যাল বিষয়, তেমনি পুরোপুরি নন-টেকনিক্যাল ডেটা সায়েন্টিস্টও হওয়া সম্ভব। সে-কারণে এই ফিল্ডে স্যাচুরেশন আসতে কিছুটা সময় লাগবে বলে মনে হয়। কারণ এই ক্ষেত্রটি ইনহেরেন্টলি ডাইভার্স। এবং ডাইভার্স ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষজনের ডেটা সায়েন্টিস্ট হিসেবে অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে।

পরিসংখ্যান জানা না থাকলে কি ডেটা সায়েন্স ড়া যাবে না? খুব কঠিন কিছু কি? গণিত, পরিসংখ্যান বা বিজ্ঞান জানে এমন কেউ যদি ডেটা সায়েন্স পড়তে চায় বা এমনকি নিজে নিজে শিখতে চায়, তাদের জন্য একটি গাইডলাইন দিতে পারেন?

ডেটা সায়েন্সের ক্ষেত্র এতো বড় যে, পরিসংখ্যান থাকতেই হবে এমন নয়; তবে পরিসংখ্যানের জ্ঞান থাকলে অনেক সুবিধা হবে। ডেটা সায়েন্সের অনেক কাজ রয়েছে যার জন্য পরিসংখ্যানের গভীর ধারণা না থাকলেও হবে। মৌলিক কিছু বিষয় ভালোভাবে রপ্ত করা থাকলে সেটি যথেষ্ট হতে পারে। নির্ভর করে কী ধরনের দায়িত্ব এবং কী ধরনের কাজ আপনি করছেন তার ওপর।

ডেটা সায়েন্টিস্টরা বর্তমানে পরিসংখ্যানবিদরা যা করে সেই কাজ যেমন করতে পারে, তেমনি সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা যে-ধরনের কাজ করে সে ধরনের কাজও করে থাকে। এই যে পুরো স্পেক্ট্রাম জুড়ে ডেটা সায়েন্টিস্টদের বিচরণ, সেই কারণেই ডেটা সায়েন্সে কাজের ক্ষেত্র অনেক বড়।

ডেটা সায়েন্টিস্টরা বর্তমানে পরিসংখ্যানবিদরা যা করে সেই কাজ যেমন করতে পারে, তেমনি সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা যে-ধরনের কাজ করে সে ধরনের কাজও করে থাকে। এই যে পুরো স্পেক্ট্রাম জুড়ে ডেটা সায়েন্টিস্টদের বিচরণ, সেই কারণেই ডেটা সায়েন্সে কাজের ক্ষেত্র অনেক বড়।

ডেটা সায়েন্স জগতে বাংলাদেশের অবস্থান কী? বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি ডেটা সায়েন্সের জন্য আমাদের তরুণদের তৈরি করতে পারছে বলে মনে করেন?

আমার কাছে ডেটা সায়েন্স একেবারে যে নতুন কিছু ব্যাপারটা তেমন মনে হয় না। ডেটা সায়েন্সের বিরাট একটি অংশ জুড়ে রয়েছে ডেটা ম্যানেজমেন্ট ও ডেটাকে সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারটিকে সহজ করা। নতুন যা তা হলো, আগে কিছু সমস্যা আমরা সমাধান করতে পারতাম না। যেমন, সেলফ ড্রাইভিং কার। এখানে ডিপ লার্নিং ব্যবহার করে এর সমাধান করা হচ্ছে।

যেটি বলতে চাইছি, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডেটা সায়েন্স বিষয়ে শিক্ষাদানের রিসোর্সের অভাব নেই। দক্ষ শিক্ষক আছেন এবং আগ্রহী শিক্ষার্থী আছেন। কোথায় আমরা ডেটা সায়েন্স কাজে লাগিয়ে কোন সমস্যার সমাধান করব সেটি মূল বিবেচ্য।

উন্নত বিশ্বে ব্যবসায় ডেটা সায়েন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করা হচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বা কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ অর্জনের লক্ষ্যে। আমাদের দেশে এই বিষয়ে কিন্তু ডেটার ব্যবহার এখনও সীমিত। 

আমি যতোটা পর্যবেক্ষণ করেছি, তা থেকে বলতে পারি আমাদের দেশ যথেষ্ট প্রস্তুত এবং তারা টেকনিক্যালি দক্ষ ডেটা ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডেটা সায়েন্টিস্ট তৈরি করতে পারছে। কিন্তু শুধু টেকনিক্যাল দক্ষতাই নয়, সেই সাথে ডেটা সায়েন্সের অন্যতম দক্ষতা অর্থাৎ কমিউনিকেশনের দক্ষতা অর্জন জরুরি।

দুঃখজনক হলো, এই কমিউনিকেশনে দক্ষতা ও সফট স্কিল বিষয়গুলো অ্যাকাডেমিয়াতে শেখানোর সুযোগ কম। এ-বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে স্টার্টআপ কোম্পানি বা প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হতে হবে। সেটিও হচ্ছে বলে মনে হয়। বাংলাদেশে অনেক স্টার্টআপ কোম্পানি গড়ে উঠেছে। এদের কতোগুলো শেষমেষ সফল হবে তা জানার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কেমন হয় বলে আপনি মনে করেন? মানে একটা সার্বিক মূল্যায়ন চাচ্ছি, এবং অবশ্যই কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুলনা করেই।

বাংলাদেশের কিন্তু গবেষণায় একেবারে হচ্ছে না, এমনটি বলা যাবে না। আমি সব ডিসিপ্লিনের কথা বলতে পারবো না; শুধু আমাদের ডিসিপ্লিন যেমন পরিসংখ্যান ও জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে কিছুটা বলতে পারি। 

জনস্বাস্থ্যে বাংলাদেশ থেকে কিন্তু ভালো ভালো জার্নালে ভালো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে। 

আরেকটি বিষয় আমি উল্লেখ করতে চাই। সেটি হল ফান্ড ছাড়া গবেষণা করার মধ্যে উন্নত দেশে কোনো ক্রেডিট নেই। আমরা যেমন গর্ব করে বলে থাকি যে, কোনোরকম ফান্ডিং ছাড়াই কাজ করছি বা প্রকাশনা করছি, উন্নত বিশ্বে এটিকে আসলে ডিসক্রেডিট বা অগৌরব হিসেবে ধরবে। তারা তো জানে না আমাদের ফান্ডিং-এর অবস্থা!

কানাডা ও আমেরিকার সাথে তুলনা করলে যে-বিষয়টি সর্বাগ্রে উঠে আসবে সেটি হলো, গবেষণার সংস্কৃতি ও গবেষণা করার প্রণোদনা। এখানকার গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ছোট ছোট গ্র্যান্টের জন্য আবেদন করে এবং সেই গ্র্যান্ট নিয়ে গবেষণা করে এবং ফলাফল প্রকাশ করে। ‌আমাদের এরকম গ্র্যান্ট নাই, যে-কারণে এই সংস্কৃতিও তৈরি হয়নি। অল্পকিছু গ্রান্ট যেগুলো আছে সেগুলোতে ধরাধরিসহ নানারকম দুর্নীতি আচ্ছন্ন। আবার বিষয়ভেদেও গ্রান্ট পাওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করে। আমার অভিজ্ঞতা অন্যের সাথে না মেলার সম্ভাবনা বেশি।

আরেকটি বিষয় আমি উল্লেখ করতে চাই। সেটি হল ফান্ড ছাড়া গবেষণা করার মধ্যে উন্নত দেশে কোনো ক্রেডিট নেই। আমরা যেমন গর্ব করে বলে থাকি যে, কোনোরকম ফান্ডিং ছাড়াই কাজ করছি বা প্রকাশনা করছি, উন্নত বিশ্বে এটিকে আসলে ডিসক্রেডিট বা অগৌরব হিসেবে ধরবে। তারা তো জানে না আমাদের ফান্ডিং-এর অবস্থা!

বাংলাদেশে যেখানে গবেষণার সুযোগ সীমিত, সেখানে শিক্ষার্থীরা কেন মাস্টার্সে গবেষণা করবে? কেন উচ্চতর গবেষণার জন্য তারা সুযোগ খুঁজবে?

বাংলাদেশ গবেষণা করে খুব একটা নীতিতে পরিবর্তন আনা যায় এমনটা এখনো দেখিনি। কারণ, ওই সংস্কৃতিটাই তো গড়ে ওঠেনি যে, গবেষণালব্ধ ফল সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহৃত হবে। তাহলে মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা গবেষণা কেন করবে?

এর উত্তর হচ্ছে, তারা গবেষণা করবে নিজেদের প্রোফাইল তৈরি করার জন্য। এটি একটি স্বার্থপর চিন্তাভাবনা, কিন্তু এটিই বাস্তবতা। বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা কিছু গবেষণা করে। সেসব জায়গায় চাকরির সুবিধা পেতে নিজেদের গবেষণার প্রোফাইল ভালো হলে সুবিধা পাওয়া যাবে। ‌

আর দ্বিতীয়ত, গবেষক হিসেবে এক ধরনের খ্যাতি বা পরিচিতি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে যেটি অনেক ক্ষেত্রেই চাকুরির সাক্ষাৎকারে কাজে লাগে। 

সর্বোপরি, গবেষক হিসেবে নিজের ট্র্যাক রেকর্ড তৈরি হলে যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে চায়, তারা উপকৃত হবে। একটা সময় ছিলো, যখন গবেষণার ট্র্যাক রেকর্ড আশা করা হতো না, বিশেষ করে তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। কিন্তু পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। একই পদের জন্য যখন দশজন আবেদন করবে, তাদের কারো কারো যদি ভালো গবেষণা-প্রবন্ধ থাকে, তারা কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই অন্যদের থেকে বাড়তি কিছুটা সুবিধা পাবে। 

উত্তর আমেরিকায় আপনি দীর্ঘদিন ধরে আছেন। ঠিক কোন কোন ক্ষেত্রে আপনি সেখানকার উচ্চশিক্ষার সাথে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার পার্থক্য করবেন?

এর উত্তর দিতে গেলে অনেক কিছু বলতে হবে এবং অনেকেই তাতে মন খারাপ করবে। 

আমাদের সার্বিক সংস্কৃতিকেই আমি দায়ী করবো। যে-সংস্কৃতিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের দায় রয়েছে। 

প্রথমত মাস্টার্স পাশ করা তরুণ একজন শিক্ষার্থী, যার নিজেরই কোনো অভিজ্ঞতা নেই, তার কাছে থেকে আপনি কি-ই বা আশা করতে পারেন?

আমরা বিদ্যালয়ে বিএসসি শিক্ষক দিয়ে পড়াই। কলেজে পড়াই মাস্টারডিগ্রি অর্জন করা শিক্ষকদের দিয়ে। সেই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য নিদেনপক্ষে পিএইচডি ডিগ্রি অবশ্যই থাকা দরকার। আমি ধারাবাহিকতার কথা বললাম। কিন্তু আমাদের সেই সুযোগ এখনও নেই কিংবা ওই ধরনের সংস্কৃতি এখনো তৈরি হয়নি। 

আমি যখন প্রভাষক হিসেবে যোগদান করি, তখন আমার একজন সহকর্মী যিনি পিএইচডিধারী, তিনি বলেছিলেন, পিএইচডি করে আসার পর আমি যখন পড়ানো শুরু করেছি, তখন মনে হয়েছে প্রভাষক হিসেবে পড়িয়ে তিনি এক ধরনের অপরাধ করেছেন। তিনি হয়তো কিছুটা বাড়িয়ে বলেছেন; তবে আমি এই বক্তব্যের সাথে অনেকাংশেই একমত। 

আমরা বিদ্যালয়ে বিএসসি শিক্ষক দিয়ে পড়াই। কলেজে পড়াই মাস্টারডিগ্রি অর্জন করা শিক্ষকদের দিয়ে। সেই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য নিদেনপক্ষে পিএইচডি ডিগ্রি অবশ্যই থাকা দরকার।

প্রভাষক থাকাকালীন আমার আবেগ ও উৎসাহের কমতি ছিলো না, কিন্তু শিক্ষক হিসেবে যে-ধরনের অভিজ্ঞতা দরকার হয়, জ্ঞানের যেরকম গভীরতার প্রয়োজন হয়, সেটি অবশ্যই একজন প্রভাষকের কাছে প্রত্যাশা করা যায় না। দুঃখজনকভাবে, আমাদের প্রভাষকদের উপরেই পড়ানোর চাপ বেশি দেয়া হয়। আর, অধ্যাপক হয়ে গেলে তাঁরা কম ক্লাস নেন। অথচ হওয়ার কথা ছিলো উল্টোটি। প্রভাষকদের সময় দেবেন গবেষণার কাজ করতে, আর অভিজ্ঞ শিক্ষকরা পড়াবেন বেশি করে। ‌

শিক্ষার্থীদের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, আমাদের শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট সময় নিয়ে নিতে পারে না। যে-কারণে তারা ক্রিকেট খেলা থেকে শুরু করে সময় নষ্ট করার যতো রকমের কর্মকাণ্ড আছে সবগুলোতে পুরোদস্তুর নিমগ্ন থেকেও ভালোভাবেই পরীক্ষায় পাস করতে পারে। এর একটি কারণ হচ্ছে, আমাদের অ্যাসাইনমেন্ট ও পরীক্ষাগুলো খুব একটা চ্যালেঞ্জিং না। ‌

আরেকটা বিষয় আমি বিদেশে এসে শিখেছি সেটি হলো, পাঠ্যবই কীভাবে পড়তে হয়। ‌কোনো এক অদ্ভুত কারণে বাংলাদেশে আমাদের মানসিকতা এরকম যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠলেই আমাদের আর পাঠ্যপুস্তক পড়তে হবে না। প্রফেসর বিভিন্ন জার্নালের প্রবন্ধ আর টুকটাক রেফারেন্স দেবেন যেগুলো পড়ে আমরা মহাপণ্ডিত হয়ে যাবো। আমি পরিসংখ্যানের কথা বলতে পারি যে, উন্নত দেশে বিশ্ববিদ্যালয় উঠেই মোটা মোটা পাঠ্যবই থাকে। এগুলো প্রতিটি অক্ষর এখানকার শিক্ষার্থীরা পড়তে বাধ্য হয়। 

ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ‘ডিজাইন অফ এক্সপেরিমেন্ট’ নামে একটি টপিক বা বিষয় আছে। সেই বিষয়ে ডগলাস মন্টগোমারির একটি বই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের পড়ানো হতো। ডিজাইন অফ এক্সপেরিমেন্ট-এর প্রকৃত স্বাদ অর্জন করতে পেরেছি যখন আমি কানাডায় পড়তে গিয়েছি। আপনার কাছে হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হবে– কল্পনা করুন, এরকম একটি বই নিয়ে আমি স্থানীয় পার্কের বেঞ্চে বসে পড়তে পড়তে নিমগ্ন হয়ে গিয়েছি। প্রকৃতির সাথে এতোটাই মিশে গিয়েছি যে কাঠবিড়ালিগুলো নির্ভয়ে ছোঁয়ার দূরত্বে এসে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে। একটুও বাড়িয়ে বলছি না। এই জিনিস আমার ক্ষেত্রে ঘটেছে। ডিজাইন অফ এক্সপেরিমেন্ট আমি নিজেই পাঠ্যবই পড়ে শিখেছি, যখন বই পড়তে বাধ্য হয়েছি। অথচ এই বই কিন্তু বাংলাদেশেও আমরা ব্যবহার করেছি। কিন্তু সেভাবে শিখতে পাইনি এবং এর মজাও পাইনি।

আরেকটি পার্থক্য হলে ভালো বইয়ের অভাব। এখানকার শিক্ষার্থীরা যে-ধরনের পুস্তক পাঠ্যবই হিসেবে পায়, আমাদের দেশের বইয়ের গুণগত মান এর ধারেকাছেও না। উদাহরণ হিসেবে ক্যালকুলাস বইয়ের কথা বলতে পারি। ইন্টারমিডিয়েটে থাকতে দাস-মুখার্জির ক্যালকুলাস বইয়ের খুব নাম শুনেছি সিনিয়রদের মুখে। সেই বই যখন প্রথম দেখি, তখন আমার মনে হয়েছিলো এত ছোট বই! ক্যালকুলাস আর এমন কী জিনিস! আর বিদেশে এসে যখন দেড় হাজার পাতার ক্যালকুলাস বই দেখলাম এবং সেটি পড়তে বাধ্য হলাম, তখন বুঝতে পারলাম ক্যালকুলাস কী আর আমরা কী ক্যালকুলাস শিখেছি। 

আমাদের দেশে গণিতের যেসব বই পড়ানো হয়, সেগুলো বড়জোর অনুশীলনী বই। অর্থাৎ, পাঠ্যবই পড়ার পর আপনি এই বইগুলো দিয়ে চর্চা বা অনুশীলন করবেন। এর জন্য ঠিক আছে। কিন্তু শেখার জন্য এগুলো কোনো কাজের বই নয়। আর পরিসংখ্যানের তো ভালো কোনো বই আমাদের নেই। সব বিদেশি লেখকের বই আমরা পড়েছি। বিদেশি বই যদি পাওয়া যায়, আমি বরং সেসব বই পড়ার পরামর্শ দিব।

আমাদের দেশে গণিতের যেসব বই পড়ানো হয়, সেগুলো বড়জোর অনুশীলনী বই। অর্থাৎ, পাঠ্যবই পড়ার পর আপনি এই বইগুলো দিয়ে চর্চা বা অনুশীলন করবেন। এর জন্য ঠিক আছে। কিন্তু শেখার জন্য এগুলো কোনো কাজের বই নয়।

সেগুলো বাংলায় অনুবাদ করলে কেমন হয়? কী মনে হয় আপনার?

আমি ধরে নিচ্ছি অনুবাদ বলতে আক্ষরিক অর্থে অনুবাদ আপনি বুঝাননি। হ্যাঁ, বিদেশি বই বাংলায় ব্যাখ্যা করা এবং বিদেশি বইয়ের আদলে বাংলায় বইগুলো তৈরি করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। ‌

যতোই ইংরেজি পড়ি না কেন, যেহেতু আমরা বাংলা ভাষাভাষীদের মাঝে বাস করি, আমাদের বোঝাপড়া কিন্তু বাংলাতেই হয়। ‌জ্ঞানার্জনে মাতৃভাষার কোনো বিকল্প আছে বলে আমার মনে হয় না। যদিও আমি এখন ইংরেজি প্রেফার করি, কিন্তু এটি অনুধাবন করি যে, আমাদের যদি ভালোমানের বাংলা বই থাকতো যেগুলো পড়ে আমরা পরিসংখ্যানের অনেক ধারণা আরও ভালো করে বুঝতে পারতাম! ফলে পরিসংখ্যানের বুনিয়াদ শিক্ষার্থী থাকাকালীনই পোক্ত হতো। যেটি হতে অনেক সময় লেগেছে।

সংক্ষেপে বিদেশি বইয়ের আদলে বাংলা বই তৈরির উদ্যোগ আমার কাছে ভালো মনে হয়। কিন্তু এরকম বই লেখা খুবই শ্রমসাধ্য ব্যাপার। 

যতোই ইংরেজি পড়ি না কেন, যেহেতু আমরা বাংলা ভাষাভাষীদের মাঝে বাস করি, আমাদের বোঝাপড়া কিন্তু বাংলাতেই হয়। ‌জ্ঞানার্জনে মাতৃভাষার কোনো বিকল্প আছে বলে আমার মনে হয় না। যদিও আমি এখন ইংরেজি প্রেফার করি, কিন্তু এটি অনুধাবন করি যে, আমাদের যদি ভালোমানের বাংলা বই থাকতো যেগুলো পড়ে আমরা পরিসংখ্যানের অনেক ধারণা আরও ভালো করে বুঝতে পারতাম!

আপনি উপরে যেসব পার্থক্যের কথা বললেন, সেগুলো কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে আপনার স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরামর্শ আছে?

পরামর্শ দিতে পারব না। কারণ সমস্যা কোথায় সেটি আমরা সবাই জানি। আমাদের তরুণদের গ্র্যাজুয়েশন করার পর বিষয়ভিত্তিক চাকুরির সুযোগ নেই বললেই চলে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আপনি বিসিএস দিয়ে পুলিশে ঢুকলেন। বা, মেডিকেল কলেজে পড়ে বিসিএস দিয়ে ট্যাক্স অফিসার হলেন। সেটিই যদি উদ্দীষ্ট হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি যে বিষয়ে পড়লেন, সেখানে আপনি তো সিরিয়াস হবেন না। কারণ, আপনি জানেন দিনশেষে এই বিষয়ের জ্ঞান অর্জন না করলেও চলবে।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যারা গবেষণা শিখতে চায়, তাদের জন্য আপনার কোনো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ?

গবেষণা শিখতে গেলে ভালো মেন্টর বা পরামর্শদাতার সংস্পর্শে আসতে হয়। আসলে পরামর্শদাতা ছাড়া গবেষণা শেখা যায় না। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের ফাঁকিবাজি মানসিকতা হোক, কিংবা শিক্ষকদের দিক থেকে অবহেলাই হোক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক গবেষণার পথে বিরাট এক অন্তরায়। আমাদের মধ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক অনেকটা রাজা-প্রজার সম্পর্কের মতো। এভাবে গবেষণা করা যায় না। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পরিবেশ সেভাবে গড়ে ওঠেনি দেখেই আমরা যতোটা গবেষণা করতে পারতাম সেই পর্যায়ে যেতে পারিনি।‌

ইদানিং গবেষণা করা ও গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশ করার বিশাল এক ধরনের জোয়ার এসেছে। এটি ভালো। কিন্তু এর একটি খারাপ দিকও আছে। শর্টকাটে গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশের পদ্ধতি এদেরকে শেখানো হচ্ছে, যেগুলো দিয়ে প্রকাশনা হলেও প্রকৃতপক্ষে গবেষক তৈরি হচ্ছে না।

এখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেকেই গবেষণা করছেন ও সফল হচ্ছেন। ইদানিং গবেষণা করা ও গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশ করার বিশাল এক ধরনের জোয়ার এসেছে। এটি ভালো। কিন্তু এর একটি খারাপ দিকও আছে। শর্টকাটে গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশের পদ্ধতি এদেরকে শেখানো হচ্ছে, যেগুলো দিয়ে প্রকাশনা হলেও প্রকৃতপক্ষে গবেষক তৈরি হচ্ছে না। একজন গবেষক একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বা ক্ষেত্রে তার ট্র্যাক রেকর্ড তৈরি করবেন। গবেষক হওয়ার যে মানসিকতা তৈরি করতে হয়, সেই ব্যাপারটি আমি অনুপস্থিত দেখি। আর শর্টকাটে পুরস্কৃত হওয়ার বা পুরষ্কার পাওয়ার যে প্রচলন শুরু হয়েছে, এটি দিয়ে প্রকাশনা নামের জঞ্জাল তৈরি হচ্ছে কিনা তা সময়ই বলে দেবে।

একইভাবে যেসব শিক্ষার্থী দেশের বাইরে উচ্চতর শিক্ষার জন্য যেতে চায়, তাদের জন্য যদি কোনো পরামর্শ দেন।

দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য আমি সবাইকেই পরামর্শ দেই। আপনারা দেশের বাইরে চলে যান। গিয়ে দেখেন পৃথিবীটা কত বড়। অনুভব করেন মানুষের মন কতো বড়। আমরা একটি ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে বাস করি; যা বিদেশে না গেলে কখনোই অনুধাবন করা যায় না।

বিদেশে যাওয়ার জন্য চতুর্থ বর্ষ থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। গবেষণা পদ্ধতি শিখে ফেলুন। ডেটা অ্যানালাইসিস বা তথ্য বিশ্লেষণ এবং ডেটা  ব্যবস্থাপনা শিখে ফেলুন। ইংরেজিতে লেখার চেষ্টা করুন এবং সেটিকে ক্রম উন্নত করার চেষ্টা করুন। একটি বা দুটো কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ কিংবা বিষয়ভিত্তিক জনপ্রিয় সফটওয়্যারে দক্ষতা অর্জন করুন। সর্বোপরি বিদেশে যাওয়া কিংবা কোনো সুযোগ সামনে এলে সেটি লুফে নেয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন।

আপনি বর্তমানে একটি জার্নাল প্রকাশের সাথে জড়িত। এ-সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই। কেন এটি প্রকাশ করলেন? প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন নামকরা প্রতিষ্ঠান তো জার্নাল প্রকাশ করছেই, আপনি কেন এই উদ্যোগ নিলেন এবং এতে কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন?

জার্নাল অনেকটা মিডিয়ার মত। আপনার বক্তব্য যদি প্রচার করতে চান, সেক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হচ্ছে নিজেদের মিডিয়া। এই ভাবনাটি একটি কৌশলের অংশ। একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হবে।

আমাদের অনেক গবেষণা যেগুলো বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, অথচ পাশ্চাত্য বা উন্নত বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, সে-ধরনের গবেষণা আমরা তথাকথিত ইম্প্যাক্ট জার্নালে প্রকাশ করার জন্য মনোনীত করাতে পারিনি।

সম্পাদক আমাদের কাজের মানের প্রশংসা করেছেন, লেখার গুণগত মানের প্রশংসা করেছেন, কিন্তু সেই সাথে এও বলেছেন যে, এই গবেষণাপত্রটি দক্ষিণ এশিয়া বা সেই অঞ্চলের কোনো প্রাসঙ্গিক জার্নালে জমা দিতে।

তাহলে বুঝুন, ভালো কাজ করলেই যে ভালো ভালো জার্নালে প্রকাশ করা যায়, সেটি ক্ষেত্রবিশেষে ঠিক নয়। আমরা যে জার্নালগুলোকে ভালো বলি, সেগুলোতে একই রকম কাজ যদি আমেরিকার বা উন্নত বিশ্বের উদাহরণ দিয়ে আমরা করতাম, তাহলে প্রকাশের জন্য মনোনীত বলে আমরা মনে করি। ‌তার মানে ব্যাপারটা দাঁড়ালো আপনি আপনার সমস্যা সমাধান করে গবেষণা করলেন সেটা শীর্ষ পর্যায়ের জার্নালে প্রকাশিত হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। 

দ্বিতীয়ত, জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের খরচ। আমাদের পক্ষে দুই থেকে পাঁচ হাজার ডলার খরচ করে গবেষণাপত্র প্রকাশ করা আকাশকুসুম কল্পনামাত্র। উপরন্তু, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাগজে-কলমে হয়েছে বলে অধিকাংশ জার্নাল প্রকাশনা সংস্থা বাংলাদেশের লেখকদেরকে আর্টিকেল প্রসেসিং ফি মওকুফ করে না। ফলে এরকম একটি জার্নালে গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশ করতে গেলে কী পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা খরচ করতে হবে সেটিও বিবেচনার বিষয়। মানে ভেবে দেখতে হবে ওই খরচটি আসলে উপযুক্ত কিনা।

এসব থেকেই একটা সময়ে আমার মনে হয়েছে, আমাদের নিজেদের ভালো মানের প্রকাশনা তৈরি করতে হবে। 

সর্বশেষ প্রশ্ন। গবেষণা হোক, পড়ালেখা হোক, চাকুরি হোক বা যে কোনো কাজেই নৈতিকতার বিষয়টি নিয়ে আপনি একাধিকবার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় কথা বলেছেন। কেন এটিকে এতো গুরুত্ব দিচ্ছেন? উদাহরণসহ জানতে চাই আসলে।

আমার মনে হয় এটি স্বভাবগত। প্রতিটি মানুষ স্বভাবগতভাবেই নীতিবান। পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে মানুষ নীতিভ্রষ্ট হয়। আবার যে পারিবারিক মণ্ডলে বেড়ে ওঠা এবং অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ যেমন শিক্ষক বা খুব ভালো বন্ধুর প্রভাবে মানুষের এই নীতির দিকটি প্রকাশিত হয় অথবা প্রকাশিত হয় না। 

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়ি তখন শ্রদ্ধেয় প্রয়াত অধ্যাপক হুমায়ূন কবির একটি কথা বলেছিলেন। তোমরা ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হও আর যাই হও ভালো মানুষ হইতে হবে। ‌ভালো মানুষ না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমরা নিবো না। এ-কথাটি আমার স্বভাবের সাথে, আমার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে এতোটাই মিলে যায় যে, এরকম ছোট ছোট নীতিকথাগুলো আমাকে ভীষণ অনুপ্রেরণা দেয়।  কথাগুলো আমার মনে সবসময় বাজে। 

চেষ্টা করি সবসময় এটি বাজায় রাখতে। তবে মানুষ হিসেবে কেউ ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। আমাদের মধ্যে অসঙ্গতি আছে, থাকবে। তবুও চেষ্টা করে যেতে হবে নীতি বজায় রাখতে। অন্তত জেনে-বুঝে নীতি ভঙ্গ হয়, এমন কিছুর সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়া যাবে না।

কেন এই ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিই, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারবো না। হয়তো আনমনে নীতির ব্যাপারটিকে সর্বোচ্চ মানদণ্ড মনে করি। যার মাপকাঠিতে অন্য সব কিছুকেই বিচার করি। 

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন