নাসরীন সুলতানা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ইতোপূর্বে তিনি বাংলাদেশের নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। নাসরীন সুলতানা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা থেকে একই বিষয়ে অর্জন করেছেন দ্বিতীয় মাস্টার্স ডিগ্রি। বর্তমানে তিনি কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি গবেষণারত।
নাসরীন সুলতানা বাংলাদেশের শিক্ষার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও দর্শন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা এবং শিক্ষা-গবেষণা নিয়ে কাজ করছেন, লিখছেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পিএইচডি গবেষক হিসেবে তাঁর জ্ঞান ও দক্ষতা এবং লেখালেখিতে তিনি যেসব প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেছেন, সেগুলোর ভিত্তিতে বাংলাদেশের শিক্ষার নানা বিষয় নিয়ে নাসরীন সুলতানার সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক গৌতম রায়।
গৌতম রায়: শুরুতেই আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাকে সাক্ষাৎকার প্রদানে রাজি হওয়ার জন্য। আপনি দর্শনের শিক্ষক, শিক্ষা নিয়ে আপনার কিছু চিন্তাভাবনার সঙ্গে আমি পরিচিত ফেইসবুকে ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আপনার লেখালেখির সুবাদে। সেসবের ভিত্তিতে এই সাক্ষাৎকারে আমি মূলত শিক্ষাদর্শন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণা – এই তিনটি বিষয়ে ফোকাস করতে চাই। আমি শুরু করতে চাই বাংলাদেশের শিক্ষাদর্শন নিয়ে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত আপনি বাংলাদেশের শিক্ষার নির্দিষ্ট কোনো দার্শনিক ভিত্তি চিহ্নিত করতে পেরেছেন?
নাসরীন সুলতানা: আপনাকেও ধন্যবাদ, আমাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিছু কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য। আপনার প্রথম প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী। শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তি বলতে আমরা বুঝি, শিক্ষার লক্ষ্য, পদ্ধতি, উপযোগিতা, মূল্যবোধ, জ্ঞান, মানুষ ও সমাজ সম্পর্কে যে মৌলিক ধারণাগুলোর ওপর একটি শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে। অন্যভাবে বললে, রাষ্ট্র পরিচালিত শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে, কোন শিক্ষার মাধ্যমে কী ধরনের ব্যক্তি এবং সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব, শিক্ষার সাথে জ্ঞান ও নৈতিকতার সম্পর্ক কী, কোন পদ্ধতিতে শিক্ষাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা উচিৎ, এসব প্রশ্নের সুসংহত এবং যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তি।
আমার পর্যবেক্ষণে, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো একক, সুসংহত দার্শনিক ভিত্তি ধারাবাহিকভাবে এবং স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং এটি সময়ে সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দর্শনের প্রভাবে গঠিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনে আমরা একটি মানবতাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী ভিত্তি দেখতে পাই। সেখানে শিক্ষাকে মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই দিক থেকে একটি সুস্পষ্ট দার্শনিক অভিমুখ তখন লক্ষ্য করা যায়।
তবে পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে আশির দশক থেকে, শিক্ষানীতিতে একটি প্রয়োগমুখী ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেতে শুরু করে। বর্তমান শিক্ষানীতিতে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং কর্মসংস্থানমুখীতা গুরুত্ব পাওয়ায় একটি প্রাগম্যাটিক বা ব্যবহারিক দর্শন প্রতিফলিত হয়।
ফলে বলা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষায় দার্শনিক ভিত্তি আংশিকভাবে পরিলক্ষিত, বিশেষ করে নীতিমালার স্তরে। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে এটি পুরোপুরি সুসংহত বা ধারাবাহিক নয়; বরং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দর্শনের প্রভাব এবং ভুল ব্যাখ্যার ফলে একটি মিশ্র ও কিছুটা বিচ্ছিন্ন চিত্র দেখা যায়।
আমার পর্যবেক্ষণে, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো একক, সুসংহত দার্শনিক ভিত্তি ধারাবাহিকভাবে এবং স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং এটি সময়ে সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দর্শনের প্রভাবে গঠিত হয়েছে।
গৌতম: বিভিন্ন সময়ে একটি আলোচনা প্রায়ই আসে যে, বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে, কিংবা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। আমার প্রশ্ন হলো, আমরা কি জনশক্তি বা দক্ষকর্মী তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দিবো,নাকি শিক্ষার্থীরা যেন তাদেরকে নানাভাবে বিকশিত করতে পারে, সেদিকে আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত?
নাসরীন: আমার মতে, এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আমরা শিক্ষার কোন স্তর নিয়ে কথা বলছি তার ওপর। প্রাথমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য এক নয়, এটি স্পষ্টভাবে স্বীকার করা প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক এবং এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের একটি মৌলিক অধিকার। এই স্তরে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুর সার্বিক বিকাশ, ভাষা, যুক্তিবোধ, নৈতিকতা, সামাজিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা।
অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু ভিন্ন বিবেচনা আসে। এখানে শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয় এর উপযোগিতা, বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতা, শ্রমবাজারের চাহিদা এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বিশেষ করে জিডিপির কত অংশ এখানে বিনিয়োগ করা হবে, এসব বিষয় মাথায় রেখে।
তবে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, আমি মনে করি শুধু বাজারমুখী শিক্ষা যেমন অন্ধ, তেমনি সম্পূর্ণ বাজারবিমুখ শিক্ষাও কার্যত পঙ্গু। একদিকে দক্ষতা ছাড়া শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রাসঙ্গিকতা হারায়, অন্যদিকে নৈতিকতা ও মানবিক বোধ ছাড়া দক্ষতা সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কানাডাতে পড়াশোনা করতে গিয়ে লক্ষ্য করেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগে প্লেসমেন্ট অফিসার নামক একটি পদ আছে। বিভাগের শিক্ষকদের মধ্য থেকে পর্যায়ক্রমে একজন এই দায়িত্ব পালন করেন, যার কাজ হলো শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের জব মার্কেটের জন্য প্রস্তুত করা, প্রয়োজনীয় তথ্য, ইন্টারভিউ, সার্কুলার ইত্যাদি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া। তাছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জব মার্কেটের জন্য প্রস্তত করে গড়ে তোলার জন্য একটি বিশেষ টিম কাজ করে। তারা সিভি বা রেসুমি তৈরিতে ওয়ার্কশপ, মক ইন্টারভিউ, জব ফেয়ার ইত্যাদির ব্যবস্থা করে। আবার অন্যদিকে একাডেমিক ইন্টিগ্রিটি এবং প্রফেশনাল এথিকসের উপর প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বিশেষ ট্রেনিং নিতে হয়। তাঁরা দক্ষতাকে গুরুত্ব দেয় তবে নৈতিকতা বা মানবিকতাকে উপেক্ষা করে না, বরং সুনাগরিক তৈরির আবশ্যিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে।
সুতরাং, আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে দক্ষতা ও নৈতিকতার একটি সুষম মেলবন্ধন ঘটবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা একদিকে কর্মক্ষেত্রে সক্ষম হবে, অন্যদিকে তারা দায়িত্বশীল ও চিন্তাশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারবে।
আমি মনে করি শুধু বাজারমুখী শিক্ষা যেমন অন্ধ, তেমনি সম্পূর্ণ বাজারবিমুখ শিক্ষাও কার্যত পঙ্গু। একদিকে দক্ষতা ছাড়া শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রাসঙ্গিকতা হারায়, অন্যদিকে নৈতিকতা ও মানবিক বোধ ছাড়া দক্ষতা সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
গৌতম: আপনি যেসব বিষয় উপরে আলোচনা করেছেন, আমাদের বর্তমান বা সর্বশেষ শিক্ষানীতিতে সেগুলোর কতোটুকু গুরুত্ব পেয়েছে? আপনি কি মনে করেন, বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার আলোকে শিক্ষার কিছু বিষয় সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন, যা আমাদেরকে দীর্ঘমেয়াদে পথ দেখাবে? যদি তাই হয়, তাহলে আপনি কী কী বিষয়ে গুরুত্ব দিতে চান?
নাসরীন: আমাদের শিক্ষানীতি দক্ষতা বা নৈতিকতার কোনটিই এ-পর্যন্ত গুরুত্ব বা প্রাধান্য পায়নি। বর্তমান এআই-এর যুগে আমরা শিক্ষার্থীকে এই তথ্য দিতে পারছি না যে সে কীভাবে তার গবেষণা বা শিক্ষাকার্যক্রমে এআইকে সততার সাথে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারে।
অবশ্যই সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার আলোকে শিক্ষার কিছু বিষয় সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষার মতো সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল শিক্ষা দেশের মোট জনসংখ্যার কত শতাংশের জন্য উপযোগী সেটি বিবেচনা করার সময় এসেছে। স্নাতককে কেন টার্মিনাল ডিগ্রি করা হচ্ছে না, মাস্টার্সের মতো স্পেশালিষ্ট শিক্ষা স্নাতক পাস সকল শিক্ষার্থীর জন্য কেন জরুরি, সেটির উত্তরও রাষ্ট্রকে খুঁজতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি উচ্চপর্যায়ে কমপক্ষে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী কর্মকর্তা থাকার পরও কেন দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না, শিক্ষাব্যবস্থার গলদ কোথায় সেগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।
গৌতম: আমি যদি একটি ডকুমেন্ট হিসেবে চিন্তা করি, তাহলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে কিংবা শিক্ষার নানা ডকুমেন্টে অনেক ভালো ভালো বিষয় লেখা রয়েছে; কিন্তু বাস্তবে সেগুলো ততোটা কার্যকর নয়। যেমন, আমাদের শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক শিক্ষার পরিসর বাড়ানো থেকে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা রয়েছে। শিক্ষার দর্শনগত দিক থেকে এতো কিছু শিক্ষানীতিতে বা বিভিন্ন ডকুমেন্টে সেগুলো থাকার দরকার আছে বলে আপনি মনে করেন? নাকি, সামগ্রিক শিক্ষাদর্শন চিহ্নিত করে তার আলোকে আমাদের প্রয়োগ কৌশল নির্ধারণ করা উচিত?
নাসরীন: বস্তুত, ডকুমেন্ট যত বড় এবং জটিল হবে, তা ততটা কার্যকর করার ঝুঁকি তৈরি করবে। সুতরাং, আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ দীর্ঘমেয়াদি এবং ধীরে ধীরে যাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায় তার জন্য একটি সঠিক কর্মপরিকল্পনা।
গৌতম: আমি এখন বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে কিছু বিষয় জানতে চাই। আপনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করছেন। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার গুণগত মান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
নাসরীন:
গৌতম: আপনি কানাডার উচ্চশিক্ষার সঙ্গে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার গুণগত মানের তুলনা করলে কী পার্থক্য দেখতে পান? বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য কী কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?
নাসরীন:
গৌতম: কিছুদিন পরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব র্যাংকিঙে ভালো করতে পারছে না। কেন? আপনি কি মনে করেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি র্যাংকিঙের নানা সূচকে ফোকাস করে উন্নতির জন্য, তাহলে কি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে?
নাসরীন: বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র্যাংকিংয়ে ভাল না করতে পারার প্রথম এবং প্রধান কারণ বাজেট। আমাদের না আছে ভালো অবকাঠামো, না আছে ভালো গবেষণা করা মতো ফান্ড। শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতিও র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ার বড় কারণ। একজন ভালো শিক্ষক নিজেকে প্রতিনিয়ত আপডেট করেন, বৈশ্বিক যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথিবীকে উন্মুক্ত করতে পারেন। তার জন্য তার পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট রাষ্ট্র তাঁকে দিতে পারছে না। শিক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে শিক্ষক পিছিয়ে আছেন, শিক্ষার্থী পিছিয়ে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও পিছিয়ে আছে।
তাছাড়া যেসব সূচকের ভিত্তিতে র্যাংকিং করা হয়, সেগুলো অনেক শিক্ষক জানেন না। আমি একবার একটি টকশোতে এ-বিষয়ে কথা বলেছিলাম। বিভাগগুলো যদি কম সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাত কমিয়ে আনতে পারে, তবে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নের উপর ফোকাস করা আরো সহজ হবে। তাছাড়া, মাস্টার্স এবং পিএইচডিকে টেকনিক্যাল এডুকেশন হিসেবে বিবেচনা করে ভর্তির সংখ্যা কমিয়ে তাদের একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যতের একাডেমিয়ার জন্য বিশেষ ট্রেনিং দিতে হবে।
উচ্চশিক্ষার মতো সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল শিক্ষা দেশের মোট জনসংখ্যার কত শতাংশের জন্য উপযোগী সেটি বিবেচনা করার সময় এসেছে। স্নাতককে কেন টার্মিনাল ডিগ্রি করা হচ্ছে না, মাস্টার্সের মতো স্পেশালিষ্ট শিক্ষা স্নাতক পাস সকল শিক্ষার্থীর জন্য কেন জরুরি, সেটির উত্তরও রাষ্ট্রকে খুঁজতে হবে।
গৌতম: আমার একটি মত রয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান আসলে এককভাবে কোনোকিছুর ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা। বিশেষত, আমরা যদি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাও গুণগত মানে অনেকটা আগাবে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
নাসরীন: অবশ্যই আপনার সাথে আমি একমত। যে কোন বিল্ডিংয়ের ফাউন্ডেশন ভালো না হলে উপরের ফ্লোর যতই সুসজ্জিত হোক না কেন, তা অনেক সময় সামান্য মাত্রার ভূমিকম্প সামাল দিতে পারে না।
গৌতম: আমি এখন আলোচনা করতে চাই বাংলাদেশে গবেষণা নিয়ে। যদিও আপনার পূর্বের আলোচনায় গবেষণার বেশ কিছু বিষয় উঠে এসেছে, আমি মূলত জানতে চাই, গবেষণায় বাংলাদেশের অবস্থান কী?
নাসরীন: এখানে একটি বিষয় লক্ষনীয়। গবেষণায় বাংলাদেশের অবস্থান এবং অবস্থা দুটো বিষয়কে আলাদা করে দেখতে হবে। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে আমরা অনেক সুগার কোটিং কথা শুনি গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়ে। কিন্তু আলটিমেটলি যে বরাদ্দ দেওয়া হয় তা অপ্রতুল। ভালো গবেষণার জন্য, পাবলিকেশনের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া দরকার সেটি লক্ষণীয়ভাবে কম। তাছাড়া, গবেষণা ঠিক মতো হচ্ছে কিনা সেটি মনিটর করার জন্য কোন উপযুক্ত কমিটি নেই। এই বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা উচিৎ। অনেককে বলতে শুনেছি যে গবেষণার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়। গবেষণাকে এই জায়গা থেকে উদ্ধার করা উচিৎ। বরং এপ্রুভাল কমিটি হওয়া উচিৎ সুনির্দিষ্ট স্পেশালাইজেশন আছে এমন বিশেষজ্ঞ সদস্যদের সমন্বয়ে। সেই সাথে এথিকস মানা হচ্ছে কিনা তার জন্য এথিকস অফিসার নিয়োগ, দেওয়া উচিৎ। অর্থের বণ্টন ঠিকমতো হচ্ছে কিনা সেটির জন্য আলাদা তত্ত্বাবধায়ক থাকা উচিৎ।
গৌতম: অনেকে বলেন, গবেষণা হতে হবে প্রয়োগিক। বিশেষত বাংলাদেশের গবেষণাগুলো হওয়া প্রয়োজন বাংলাদেশের নানা সমস্যাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু কেউ যদি বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ে গবেষণা করতে চান, সেগুলোর গুরুত্ব কি কম? মনে করুন, কেউ গণিতের একটি তাত্ত্বিক সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন, কিংবা দর্শনের কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করছেন, সেক্ষেত্রে সেগুলোর সরাসরি প্রয়োগিক দিক আপাতত নেই বলে মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে কি সেগুলো আমাদের কাজে আসবে না?
নাসরীন: আমার মতে, গবেষণাকে শুধু তাৎক্ষণিক প্রয়োগিকতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগিক গবেষণার গুরুত্ব অনেক। কারণ এটি সরাসরি নীতি-নির্ধারণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং চলমান সামাজিক সমস্যার সমাধানে অবদান রাখতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, মৌলিক বা তাত্ত্বিক গবেষণার গুরুত্ব কম। আজ যেসব জ্ঞান বা প্রযুক্তি কার্যকর এবং ডিমান্ডিং, তার অনেকগুলোর ভিত্তি গড়ে উঠেছিল এমন গবেষণা থেকে, যার তাৎক্ষণিক কোনো প্রয়োগ ছিল না। গণিত, দর্শন বা মৌলিক বিজ্ঞানের বহু তত্ত্ব পরবর্তীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছে।
বিশেষ করে দর্শন ও তাত্ত্বিক গবেষণা আমাদের ধারণাগত স্পষ্টতা, যুক্তির কাঠামো এবং ক্রিটিকাল থিংকিং বা সমালোচনামূলক চিন্তাকে সমৃদ্ধ করে, যা ছাড়া কোনো প্রয়োগিক গবেষণাও সুসংহত হতে পারে না। একইভাবে, তাত্ত্বিক গণিত বা মৌলিক বিজ্ঞানের অগ্রগতি ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে।
সুতরাং, আমি মনে করি গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করা উচিত, যেখানে একদিকে দেশের জরুরি সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োগিক গবেষণাকে উৎসাহিত করা হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞানভিত্তি নির্মাণের জন্য মৌলিক গবেষণাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। কে কোন বিষয় নিয়ে গবেষণা করবেন সেটি গবেষকের নিজস্ব অর্জিত ট্রেনিং এবং অভিপ্রায় অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হতে পারে একটি টেকসই ও অগ্রসর জ্ঞানভিত্তিক সমাজ।
গৌতম: বাংলাদেশে গবেষণার বাজেট নিয়ে বড় অভিযোগ রয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট পান না। আবার এও বলা হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় এতো বেশি সময় ব্যয় করতে হয় যে, গবেষণার জন্য তাঁরা পর্যাপ্ত সময় পান না। এও অভিযোগ আছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যে, তাঁরা গুণগত গবেষনার প্রতি মনোযোগী নন। সব মিলিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
নাসরীন: এই প্রশ্নের উত্তর ইতোমধ্যে দিয়েছি। প্রতিটি অভিযোগই সত্যি। শিক্ষক কোর্স পড়ানো এবং পরীক্ষা, মূল্যায়নের কারণে ওভারলোডেড থাকেন। ফলে গবেষণার সময় পান না। বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। বিশেষ কোন চাপ না থাকায় তা শিক্ষকের রুটিন দায়িত্ব থেকেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
আমার মতে, গবেষণাকে শুধু তাৎক্ষণিক প্রয়োগিকতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগিক গবেষণার গুরুত্ব অনেক। কারণ এটি সরাসরি নীতি-নির্ধারণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং চলমান সামাজিক সমস্যার সমাধানে অবদান রাখতে পারে।
গৌতম: আমি সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। এখানে আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই আমাদের শিক্ষাক্রম নিয়ে। বাংলাদেশে কিছুদিন পরপর শিক্ষাক্রম বদল করা হয়। গত দুই বছরে শিক্ষাক্রম নিয়ে আপনার বেশ কিছু লেখা আমি পড়েছি নতুন শিক্ষাক্রমের বিপক্ষে। বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম কীভাবে সাজানো উচিত এবং কখন তা পরিবর্তন করা প্রয়োজন – এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
নাসরীন: এটা নিয়ে একটি দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে। অতি সংক্ষিপ্ত পরিসরে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষাক্রম সাজানোর আগে নিজেদের রিসোর্স, টার্গেট গ্রুপ, সংখ্যা ইত্যাদি বিবেচনা করা উচিৎ। হুট করে শিক্ষাক্রম পরিবর্তন না করে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করা উচিৎ। সমাজের অন্যান্য বিষয়ের মতো শিক্ষাব্যবস্থাতেও কিন্তু একটি অদৃশ্য বিবর্তন হয়। এটি বুঝতে হবে। সেই আলোকে ২/৩ বছর পরপর একটি দুইটি বিষয় সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
বস্তুত, শিক্ষাব্যবস্থা হলো নদীর মতো। তাতে নতুন স্রোত আসবে আবার পুরনো বিষয়গুলোর কিছুকিছু বিলুপ্ত হবে। যেমন, আমরা ছোটবেলায় স্লেটে লিখেছি। আমার সন্তানকে যদি বলি নিশ্চয়ই সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করবে স্লেট দেখতে কেমন ছিল। এখনো আমরা কাগজের ব্যবহার করছি। এক সময় কাগজ-কলম অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। মনিটারি সিস্টেমের মতো পড়াশোনা পুরোটাই ডিজিটাল হয়ে যাবে। অনেক সাবজেক্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আর পড়ানো হবে না। তার জায়গা নতুন সাবজেক্ট দখল করবে।
গৌতম: আমি আমার প্রথম প্রশ্নের সঙ্গে আপনার শিক্ষাক্রম বিষয়ে চিন্তাকে যুক্ত করতে চাই। বাংলাদেশের শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তির সঙ্গে শিক্ষাক্রমের কী ধরনের সংযোগ আপনি দেখতে চান? সেক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়কে আপনি প্রাধান্য দিতে চান?
নাসরীন: এ বিষয়ে আমি প্লেটোর সাথে একমত। প্লেটো বলেছেন শিক্ষা জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। রাস্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী আমাকে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। ডাইভার্সিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যাতে বেকার না থাকে আবার একটি বিশেষ পেশাজীবির যাতে আধিক্য না হয় এমন ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ তৈরি হতে হবে শিক্ষার মূল লক্ষ্য। সেই সাথে নৈতিকতা, শিক্ষার্থীর শারিরীক এবং মানসিক বিকাশ ইত্যাদির সঠিক সমন্বয় হলো একটি সুসংগঠিত শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি। শিক্ষাব্যবস্থা হবে পিরামিডের মতো, যতো উপরের দিকে যাওয়া যাবে তত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে থাকব, পড়াশোনার গভীরতা এবং প্রেসার বাড়তে থাকবে। শিশু শিখবে আনন্দের মাধ্যমে। তবে সব লেভেলে শিক্ষার মধ্যে নিপাট আনন্দ খোঁজার দরকার নেই। বরং দরকার নিজের আগ্রহ এবং অনুসন্ধানী মন তৈরি করা। জ্ঞানের রহস্য উন্মোচন করার সম্মোহনী শক্তি অর্জন করা।
গৌতম: আমাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আমি মনে করি, আপনি বাংলাদেশের শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তি, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা এবং শিক্ষাক্রম নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোকপাত করেছেন। হয়তো এ থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের নীতিপ্রনেতাবৃন্দ বেশ কিছু নির্দেশনা পাবেন। আপনার জন্য শুভকামনা।
লেখক পরিচিতি
গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।


