পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা

পাবলিক পরীক্ষার সংস্কার

বাংলাদেশের শিক্ষা
বাংলাদেশের শিক্ষা
লিখেছেন গৌতম রায়

সালমা আখতার: সম্প্রতি এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষার ফল বেশিসংখ্যক ‘এ’ গ্রেড পাওয়া, অতিরিক্ত হারে শিক্ষার্থীদের পাসের নম্বর দেওয়া, বেশি সংখ্যায় ওই দুটি পাবলিক পরীক্ষায় পাস এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান নিয়ে সব মহলেই আলোচনা চলছে। বিশেষ করে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সে সংক্রান্ত সরকারি পদক্ষেপ পর্যাপ্ত না হওয়ায় ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের নেতৃত্বে প্রতিবাদ নীতিনির্ধারকদের নতুন করে চিন্তিত করে তুলেছে। আমার এই লেখাটি ৬ জুন সমকালে প্রকাশিত ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘ভাঙা রেকর্ড’-এর সম্পূরক হিসেবেই লিখছিলাম। তবে পত্রিকায় প্রকাশের আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১১ জুনের শিক্ষাবিদদের নিয়ে সভা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। শিক্ষা সম্পর্কিত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা আলোচনা এবং সমস্যা সমাধানের জন্য দিকনির্দেশনা এ জাতীয় আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য। যে কোনো নীতি তৈরি করার আগেও এ ধরনের ‘কনসালটেশন মিটিং’ হওয়া জরুরি।

বাংলাদেশের শিক্ষা - Thumbnail

বাংলাদেশের শিক্ষা – Thumbnail

২. বিদ্যালয় পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষা অর্থাৎ এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার মধ্যে রয়েছে কেন্দ্র স্থিরকরণ, প্রশ্ন প্রণয়নকারী, মডারেটর, উত্তরপত্র মূল্যায়নকারী দল, নির্বাচন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন, মুদ্রণ, বণ্টন, সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশ। এ কাজগুলো সব দেশের সব পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। এখন প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে (ভারত ও পাকিস্তান ছাড়া) পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে হলেও বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে এ সমস্যা প্রকট কেন? ভারতেও প্রশ্ন ফাঁস হয়ে থাকে। ইন্টারনেট খুললে দেখা যায় মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায়। মহারাষ্ট্রে স্কুল অধ্যক্ষ ও পুলিশকেও গ্রেফতার করা হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য। বাংলাদেশে তো এ সমস্যা এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে, প্রশ্ন ফাঁসকারীরা ফেসবুক অর্থাৎ ইন্টারনেট মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ এরা কারা তা আমরা চিহ্নিত করতে পারছি না এবং যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়ে এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে ব্যর্থ হচ্ছি।

৩. পাবলিক পরীক্ষার সংস্কার নিয়ে অনেকদিন থেকেই ভেবে চলেছি, যেদিন থেকে প্রাথমিক স্তরে পঞ্চম শ্রেণীতে পাবলিক পরীক্ষা ও অষ্টম শ্রেণী শেষে আরেকটি পাবলিক পরীক্ষার প্রচলন করা হয়েছে। শিক্ষা বিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক হিসেবে ক্লাস ফাইভের সমাপনী পরীক্ষার আমি বিরোধী ছিলাম। কী উদ্দেশ্যে আমরা ক্লাস ফাইভ শেষে পরীক্ষা নিয়ে থাকি তা আমার কাছে আজও পরিষ্কার নয়। শিক্ষার্থীরা কী শিখেছে, কতটুকু লিখেছে, তার স্থায়িত্ব কী অর্থাৎ অর্জিত শিখন দক্ষতার মাত্রা ও সংখ্যা যাচাই করাই যদি প্রাথমিক শিক্ষার সমাপনী পরীক্ষার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে এই পরিমাপের জন্য কোটি কোটি টাকা সরকারিভাবে খরচ করার যথার্থতা কোথায়? এই পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার যে খরচ, পরিবারের কোচিং সংক্রান্ত যে খরচ এবং সর্বোপরি শিশুদের মধ্যে যে আশঙ্কা, মানসিক চাপ তা পরীক্ষা তথা অনুসন্ধান করার সময় এসেছে। পরীক্ষা সংক্রান্ত খরচ দিয়ে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির খরচ মেটানো যায়। কিংবা ভালো শিক্ষকতার জন্য শিক্ষকদের ‘ইনসেনটিভ প্যাকেজ’ প্রবর্তনের ব্যয় মেটানো যায়। আমার মতে, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা তুলে দেওয়া উচিত। জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী যখন অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও সর্বজনীন হবে, তখন অষ্টম শ্রেণী শেষে সমাপনী পরীক্ষার কথা ভাবা যাবে।

আমি দশম শ্রেণী শেষে এসএসসি পরীক্ষাও তুলে দেওয়ার পক্ষে। বিদ্যালয়ভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী শেষে পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। আমেরিকান শিক্ষা পদ্ধতিতে দ্বাদশ শ্রেণী শেষেও পাবলিক পরীক্ষা নেই। বিদ্যালয়ভিত্তিক পরীক্ষার ফল ঝপযড়ষধংঃরপ অনরষরঃু ঞবংঃ (ঝঅঞ)-এর ফল, সহ-পাঠক্রমিক কার্যাবলির সন্তোষজনক ফল, নেতৃত্ব ও কমিউনিটি সার্ভিসের রেকর্ড এবং সর্বোপরি কেন নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়তে আগ্রহী তার ওপর সৃজনশীল ও উদ্ভাবনীমূলক রচনা আমেরিকার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির মানদণ্ডরূপে বিবেচনা করা হয়। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ২০০৯ সাল থেকে পাবলিক পরীক্ষার পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যালয়ভিত্তিক ঈড়হঃরহড়ঁং ঈড়সঢ়ৎবযবহংরাব ঊাধষঁধঃরড়হ (ঈঈঊ) প্রথা চালু করা হয়েছে। এতে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক চলমান মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সর্বভারতীয় এইচএসসি পরীক্ষার মূল্যায়নের আওতায় বাধ্যতামূলক বিষয়ের ৯০ শতাংশের জন্য পরীক্ষা দিতে হয়। আর ১০ শতাংশ ব্যবহারিক পরীক্ষা (অ্যাসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট ওয়ার্ক, প্রেজেন্টেশন ইত্যাদি) বিদ্যালয়ের আওতাধীন থাকে।

৪. আমাদের দেশে বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন (ঝঅই) ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও কার্যকর করে তুলতে হবে। প্রধান শিক্ষক ও অন্য শিক্ষকদের পুনঃ পুনঃ নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে কার্যকর করে তুলতে হবে এবং দ্বাদশ শ্রেণী শেষে পরীক্ষার শতকরা ৪০ ভাগ মূল্যমান তথা নম্বর বিদ্যালয়ের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। কেবল আবশ্যকীয় বিষয়গুলোর পাবলিক পরীক্ষায় হবে। তাও ৬০ নম্বরের মধ্যে। পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা সংস্কার করতে হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ না করে তা বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে একেবারে পরীক্ষা কেন্দ্র পর্যন্ত। ডিজিটাল পদ্ধতিতে কীভাবে প্রশ্নপত্র মুদ্রন, বণ্টন এগুলো নিয়ে বিস্তর লেখা ও আলোচনা হচ্ছে- সরকার এগুলো বিবেচনা করলে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার ত্রুটি সারিয়ে তুলতে পারবে।

প্রশ্ন প্রণয়নকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচনা করতে হবে, যারা নোট ও গাইডবই লেখক, যাদের নিকটাত্মীয় পরীক্ষা দিচ্ছে, যাদের কোচিং সেন্টার রয়েছে, তারা যেন এতে নির্বাচিত না হয়। দিল্লির জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় আমার পিএইচডি গবেষণায় ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাতুল্য বিষয় হওয়ায় ওই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষার জন্য বোর্ডগুলোর ‘ঊীধস-ইুবষধংি’-এ সিক্রেসি অফিসারের পদবিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ দায়িত্ব ও ক্ষমতা রয়েছে, যারা পরীক্ষার সার্বিক গোপনীয়তা রক্ষায় নিয়োজিত। তা ছাড়াও রয়েছে ‘টিম ইভালুয়েশন’, স্পট ইভ্যালুয়েশনের জন্য ‘নোডাল সেন্টার’ (১০টি স্কুলের ক্লাস্টার) একটি সর্বসুবিধাজনক বিদ্যালয়, যেখানে দলীয়ভাবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মূল্যায়ন শেষ করে থাকে। বাংলাদেশেও এ ব্যবস্থা চালু করা যায়।

আমার আরেকটি প্রস্তাবনা হচ্ছে- এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলে বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন ফল যোগ করা হোক। বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলে সহ-পাঠক্রমিক কার্যাবলি, খেলাধুলা, কমিউনিটি সার্ভিস (নিরক্ষরকে স্বাক্ষর করা, দুস্থদের সেবাদান, ত্রাণকাজ, রক্তদান, রাস্তা, ব্রিজ মেরামতে অংশগ্রহণ ইত্যাদি) ও নেতৃত্বের রেকর্ডের ক্রেডিট পয়েন্ট যোগ করা হোক। উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য অবশ্যই ভর্তি পরীক্ষা থাকতে হবে। তবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মানও বাড়াতে হবে। বেশিরভাগ ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নাবলি থাকে মুখস্থনির্ভর অর্থাৎ ‘জবপধষষ ঃুঢ়ব’-এর প্রশ্ন। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা যেহেতু মেধা যাচাই ও মেধা নির্বাচনী পরীক্ষা_ এ প্রশ্নপত্রে থাকতে হবে জ্ঞান, দক্ষতা, আচরণিক ও বিমূর্ত যুক্তি সংবলিত প্রশ্নগুলো। কেবল ‘পলাশী যুদ্ধের সন বা তারিখ’ বা ‘বিশ্বকাপ অনুষ্ঠানের স্থান, সাল বা তারিখ’ বা ‘অমুক কবিতা কে লিখিয়াছেন’ ইত্যাদি সম্পর্কিত প্রশ্নের প্রাধান্য থাকলে সত্যিকার অর্থে মেধা যাচাই হয় না। ফলে শিক্ষার যে মান নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলছি তা বিচার হয় না সঠিকভাবে। কলা অনুষদে ভর্তি পরীক্ষায় ছোট রচনা লেখার প্রশ্নও থাকা উচিত।

সর্বশেষ বলতে চাই, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম বলে উচ্চশিক্ষার সামাজিক ও ব্যক্তিগত চাহিদা মেটাতে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অপারগ। শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আসন সংখ্যা অর্থাৎ জোগান সীমিত। প্রফেশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা খুবই নগণ্য। তা হলে এই লাখ লাখ শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ কে করে দেবে? ডিগ্রি কলেজগুলোকে সর্বদিক থেকে উন্নতমানের করতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যে চাপের মধ্যে থাকতে হয়, এর সমাধান হবে কীভাবে? জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাসের হার বাড়ছে, শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় পড়ার চাহিদা বেড়ে চলেছে। এ শিক্ষার্থীদের শিক্ষার চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা পেশামূলক উচ্চশিক্ষার জোগানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নীতিনির্ধারক ও শিক্ষাবিদসহ সমাজের সবারই ভাবনার সময় এসেছে নয় কি।

অধ্যাপক সালমা আখতার: সাবেক পরিচালক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, বাংলাদেশ।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন