শিক্ষায় তথ্য, যোগাযোগ প্রযুক্তি ও কম্পিউটার শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়া

ফেসবুক যুদ্ধ: কেন আমরা ক্লাসে ল্যাপটপ, আইপ্যাড ও স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করেছি

ফেসবুক
লিখেছেন গৌতম রায়

সম্প্রতি আমি কোপেনহেগেন বিজনেস স্কুলে আমার কোর্সে অতিথি বক্তা হিসেবে একজন উচ্চপদস্থ ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তাঁর বক্তৃতার সময় আমি শিক্ষার্থীদের মাঝে গিয়ে বসলাম। যেহেতু পরবর্তীতে ওই কনসালটেন্ট হবেন তাদের পরীক্ষার একজন কেস ম্যাটারিয়্যাল বা ঘটনার উপকরণ, তাই তাদেরকে আমি নোট নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলাম। এরপরেও আমি দেখলাম, আমার থেকে এক মিটারেরও কম দূরত্বে বসে একজন শিক্ষার্থী দুই-ঘণ্টাব্যাপী লেকচারের প্রায় পুরোটাই ফেসবুক ও ব্যক্তিগত ইমেইল করে পার করলো।

ওই দুই ঘণ্টায় আমি খুব মনোকষ্ট নিয়ে বুঝতে পারলাম যে, শিখন-শেখানো পদ্ধতিকে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় কার্যক্রম হিসেবে তুলে ধরতে আমাদের ইদানিংকালের প্রচেষ্টায় কোথাও বিরাট একটা গড়বড় আছে।  

সম্প্রতি একটি স্কান্ডিনেভিয়ান গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভার্চুয়াল ক্লাসে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী তাদের ফেসবুক এ্যাকাউন্ট খুলে রাখে। আমার নিজের অভিজ্ঞতায় ও একটি প্রকাশনায় (ডেনমার্কে যেটি বেশ বিতর্ক তৈরি করেছে) দেখা গেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি লেকচারে গড়ে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশের মতো শিক্ষার্থী অনলাইনে সামাজিক মাধ্যমে উপস্থিত থাকে। এমনকি, আমরা যদি সবচেয়ে রক্ষণশীল অনুমানকেও বিবেচনায় আনি, তাহলেও দেখা যায়, বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থার সকল পর্যায়ে এ সমস্যাটি বেশ প্রকট।


বাস্তবতা হলো, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ক্লাসে মানসিকভাবে উপস্থিত থাকে না। কিছু শিক্ষার্থীর স্ক্রিনে ফেসবুক লোগোটি যখন জ্বলজ্বল করে, তখন বাকিদের মনে হয় তারা বোধহয় কিছু মিস করে যাচ্ছে; এটি অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ বিভ্রান্তিকর। ফলে শিক্ষক ও সামাজিক মাধ্যমের মধ্যে এক নির্মম প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এটি এমন এক প্রতিযোগিতা যেখানে সবচেয়ে ভালো শিক্ষকও হেরে যাবে।  


বাস্তবতা হলো, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ক্লাসে মানসিকভাবে উপস্থিত থাকে না। কিছু শিক্ষার্থীর স্ক্রিনে ফেসবুক লোগোটি যখন জ্বলজ্বল করে, তখন বাকিদের মনে হয় তারা বোধহয় কিছু মিস করে যাচ্ছে; এটি অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ বিভ্রান্তিকর। ফলে শিক্ষক ও সামাজিক মাধ্যমের মধ্যে এক নির্মম প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এটি এমন এক প্রতিযোগিতা যেখানে সবচেয়ে ভালো শিক্ষকও হেরে যাবে।  

সামাজিক মাধ্যমের সফলতা

জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকরা প্রায়ই একটি কথা বলেন যে, এখনকার শিক্ষার্থীরা তাদের পূর্বসূরীদের থেকে অনেক বেশি অলস, যেটি একদমই ঠিক নয়। শিক্ষার্থীরা কঠোর পরিশ্রম করে এবং লেকচারে তারা যে সময়টুকু ব্যয় করে, তার মূল্যমান অনেক বেশি। সমস্যাটা হলো যে, এই মূল্যমান তাদের ব্যক্তিগত শিক্ষাগত যোগ্যতায় যোগ হয় না কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান উৎপাদনেও ভূমিকা রাখে না। অবশ্য ফেসবুকের ক্ষেত্রে এর মূল্য আছে, যার কারণে ফেসবুক ইতোমধ্যে ২০০ বিলিয়ন ডলারের করপোরেশনে পরিণত হয়েছে।

এই মূল্যমানের বড় একটি অংশ এসেছে বিশ্বব্যাপী লেকচার হলগুলো থেকে। এই অবদান ফেসবুকের স্টক ভ্যালুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পরিণতি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং এর শিক্ষার্থীদের জন্য ভয়াবহ; সময় ও সৃজনশীল মেধার এ এক বিরাট অপচয়!

মনোযোগ সহকারে পড়ালেখার মাধ্যমে অর্জিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনাকে একটি চাকুরির নিশ্চয়তা দিতে পারে। অন্যদিকে, ফেসবুক সাইটে আপনার বন্ধুর বহর আর হাজার হাজার আপডেট/নোটিফিকেশন ইঙ্গিত করে কীভাবে আপনি আপনার মূল্যবান সময় বিনামূল্যে ফেসবুকের পিছনে ব্যয় করেছেন।


মনোযোগ সহকারে পড়ালেখার মাধ্যমে অর্জিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনাকে একটি চাকুরির নিশ্চয়তা দিতে পারে। অন্যদিকে, ফেসবুক সাইটে আপনার বন্ধুর বহর আর হাজার হাজার আপডেট/নোটিফিকেশন ইঙ্গিত করে কীভাবে আপনি আপনার মূল্যবান সময় বিনামূল্যে ফেসবুকের পিছনে ব্যয় করেছেন।


আবহমানকাল ধরে আমাদের পূর্বসূরীরাও যেটা জেনে আসছে যে, বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হয়েছিল সৃজনশীল কাজের জন্য, সময় নষ্ট করার জন্য নয়। এটি খুবই বিরক্তিকর যে, এই সাধারণ কথাটাই আমরা বুঝতে পারি না। আশ্রমে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, সময় নষ্ট করা উচিৎ নয় কেননা তার মালিক কেবল স্রষ্টা; আমাদের সবসময় নিজেদের প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন কারণ যেকোনো সময় স্রষ্টা তা ফেরত চাইতে পারেন।

বেনেডিক্টের নিয়মনীতি

আশ্রমের নিয়মনীতির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম সেইন্ট বেনেডিক্ট কতোগুলো নিয়মনীতি মেনে চলার প্রয়োজন বুঝতে পেরেছিলেন। এসব নিয়ম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও এখনও সমানভাবে প্রযোজ্য। ল্যাটিন ভাষায় তাঁর ছোট্ট একটি সূত্র হলো ora et labora যার অর্থ হলো “ভাবো এবং কাজ করো” (এর আক্ষরিক অর্থ অবশ্য “প্রার্থনা করো এবং কাজ করো”)। আজকের দিনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘চিন্তাভাবনা’ করাকে মেনে নিলেও ‘কাজ’ করাকে কম গুরুত্ব দেয়। তারা কঠিন কঠিন সব বই পড়ে, সমস্যার সমাধান করে এবং নতুন আইডিয়ার মাধ্যমে বস্তুগত ফলাফল তৈরির দিকে গভীর মনোযোগ দেয়।

ইচ্ছামতো কথাবার্তা বলা আর কল্পনায় ভেসে বেড়ানোর এক ধরনের ক্যাফে সংস্কৃতি এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রবেশ করেছে। আসলে যতবেশি সম্ভব শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে আধুনিক কর্পোরেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। গ্রাজুয়েটদের সংখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে মূল্যায়ন করাও এই সমস্যারই অংশ।

এটিকে প্রতিরোধ করতে আমার কিছু আইডিয়া আছে যা মূলত সেইন্ট বেনেডিক্টের মতাদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত। তাঁর “ভাবো এবং কাজ করো” নীতিটি আধুনিক যুগের শিক্ষার্থীদের জন্য মূলমন্ত্র হওয়া উচিৎ।

ল্যাপটপ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে

ফেসবুকের ওই নীল আলো, লেকচার হলে চকচকে অ্যাপলের আলো এবং সামাজিক মাধ্যমে আচ্ছন্ন শিক্ষার্থীদের মুখগুলো দেখে কিছুটা রাগান্বিত হয়েই আমি আমার সহকর্মীদের নিয়ে কয়েকটি বেনেডিক্ট নিয়ম প্রয়োগ করে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। এই শরতকালে কোপেনহেগেন বিজনেস স্কুলের দর্শন এবং ব্যবসায় শিক্ষা এই দুটি কোর্সে নিয়মগুলো আমরা প্রয়োগ করলাম।

প্রথমত, সকল ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করে দিলাম, স্ক্যান্ডেনেভিয়ান শিক্ষার্থীদের কাছে ব্যাপারটি একদম অপরিচিত। যেহেতু এই নিয়ম ভঙ্গ করলে কাউকে আমরা আইনত শাস্তি দিতে পারি না, একে আমরা সত্যিকার আশ্রমের মতোই শিক্ষার্থীদের ইচ্ছের ওপর ছেড়ে দিলাম। এরপর আমরা শিক্ষার্থীদের নামের ব্যাজ পরার কথা বলে দিলাম। এও বলে দিলাম যে, শিক্ষক চাইলে যেকোনো সময় যে কাউকে প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য ডাকতে পারেন কিংবা আলোচনায় অংশ নিতে বলতে পারেন। সবচেয়ে বড় নিয়ম হলো, ক্লাসে ল্যাপটপ, আইপ্যাড কিংবা স্মার্টফোন ব্যবহার করা যাবে না। তবে তারা চাইলে বিরতির সময় আলাপ-আলোচনা করতে পারে।


উচ্চশিক্ষায় ফেসবুকের আগ্রাসন ঠেকাতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল ভূমিকা ‘চিন্তা করা ও কাজ করা’ সুপ্রতিষ্ঠিত করতে আরও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে হবে।


তাৎক্ষণিকভাবে এই নিয়মগুলো মেনে নিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ খুব বিস্ময় প্রকাশ করলো। কেউবা খুব অনিচ্ছাসত্ত্বেও ল্যাপটপ বন্ধ করলো। তবুও সেই সময়ে দুই মাস পর যখন প্রথম মূল্যায়ন প্রতিবেদন বের হলো তখন দেখা গেলো, এই ল্যাপটপ ব্যবহার বন্ধ করার বিষয়টি ছিলো হাফ ছেড়ে বাঁচার মতো। অধ্যাপকগণের দিক থেকে লেকচার হলের পরিবর্তন ছিল দেখার মতো কারণ শিক্ষার্থীরা এখন শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লাসে উপস্থিত। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তাদেরকে এখন আর ফেসবুকের স্টক ভ্যালু বৃদ্ধির জন্য আর শ্রম দিতে হচ্ছে না। ক্লাসের শেষ সারি পর্যন্ত সবাই এখন শুনতে এবং অংশগ্রহণ করতে প্রস্তুত।

উচ্চশিক্ষায় ফেসবুকের আগ্রাসন ঠেকাতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল ভূমিকা ‘চিন্তা করা ও কাজ করা’ সুপ্রতিষ্ঠিত করতে আরও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে হবে। তবু কোনো জায়গা থেকে শুরু করার জন্য বেনেডিক্টের নিয়ম বেশ কাজের।

মূল লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে দ্যা কনভারসেশন ওয়েবসাইটে। লেখকের অনুমতিক্রমে বাংলাদেশের শিক্ষা ওয়েবসাইটে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়েছে।

মূল লেখক বেন মেয়ার সোরেনসেন: অধ্যাপক, দর্শন ও বাণিজ্য, কোপেনহেগেন বিজনেস স্কুল, ডেনমার্ক। 
অনুবাদক জি এম রাকিবুল ইসলাম:  সহকারী অধ্যাপক, শিক্ষা প্রশাসন বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন