শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়েও শিক্ষার্থীদের শিখতে হবে; ছবিসূত্র: Financial Times
শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়েও শিক্ষার্থীদের শিখতে হবে; ছবিসূত্র: Financial Times

আমরা যখন শিক্ষা অর্জনের কথা বলি, তখন আমাদের মাথায় প্রথম যে ভাবনাটা আসে, তা হলো বিদ্যালয়। নিঃসন্দেহে আমরা সেখান থেকে বিদ্যা অর্জন করি। শিক্ষক শেখান এবং শিক্ষার্থীরা শেখে। এই শেখানোর প্রক্রিয়া সাধারণত শ্রেণীকক্ষেই সম্পন্ন করা হয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনেক বিদ্যালয়ে বছরে একবার বিদ্যালয়ের বা শ্রেণীকক্ষের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। একই সাথে বিনোদন ও শিক্ষাসফর দুটি কাজ করার পরিকল্পনা থাকে তাতে।

উদ্যোগটি ভালো হলেও বছরে একবার বিদ্যালয়ের বাইরে নিয়ে গেলেই শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বইয়ের সাথে বাস্তব জগতের সম্পৃক্ততা অনুধাবন করতে পারে না। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে জায়গা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া হয় সুযোগ ও সুবিধারভিত্তিতে। কাজেই পাঠ্য বইয়ের সাথে তার সম্পৃক্তা অনেক সময়েই থাকে না। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যালয়ের বাইরে নিয়ে শিক্ষা অর্জনের ব্যবস্থা করা, পাঠের বিষয়ের সাথে বাস্তব জীবনের সম্পৃক্ততা অর্জন অনেক্ষেত্রে তাই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয় না। আমাদের দেশের সামাজিক অবস্থা এ উপায়ে শিক্ষা অর্জনের জন্য ইতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি করে না। তারপরও এই ধরনের শিক্ষার একটি গুরুত্ব রয়েছে। অনেক আগে বিখ্যাত দার্শনিক রুশো বলেছিলেন যে, শিশুদের প্রকৃতির মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হোক। তারা প্রকৃতি থেকে শিখবে। তাদের এই শিক্ষাটা হবে স্বতঃস্ফূর্ত এবং আনন্দময় কারণ এভাবে তারা নিজের মতো পর্যবেক্ষন করে আপনা-আপনি শিখবে।

এভাবে অর্জিত শিক্ষা অবশ্যই দীর্ঘস্থায়ী হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক লেখায় বলেছিলেন, ধানগাছে তক্তা হয়, না ধান হয় তা ধানক্ষেতে গিয়ে দেখা উচিত। সারা বিশ্বে এখন শ্রেণীকক্ষের বাইরে শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। গ্রামগঞ্জে থাকা বিদ্যালয়ের কাছেই রয়েছে বাস্তব পরিবেশ যেখানে শিক্ষার্থীদের শিখন কার্যক্রমকে আনন্দদায়ক ও দীর্ঘস্থায়ী করা যায়। শহরে এই ধরনের পরিবেশ একেবারে হাতের কাছে পাওয়া মুশকিল। তবে যতখানি সম্ভব বাইরে নিয়ে বাস্তব পরিবেশে শিক্ষাদান করা ভালো, কারণ তাতে শিখন অর্থপূর্ণ হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যদিও সম্ভব হয় না। তবে ডিজিটাল ক্লাসরুমের ব্যবস্থা করা গেলে অন্ততপক্ষে শিক্ষার্থীদের কম্পিউটারের মাধ্যমে যেকোনো ইমেজ, অডিও বা ভিডিও দেখানো যেতে পারে। তারপরও একথা সত্য যে, হাতেকলমে শিক্ষার একটি মূল্য আছে।

‘Out-of-school learning’অর্থাৎ‘বিদ্যালয়ের বাইরে শিখন’শীর্ষক শিক্ষা-সম্পর্কিত ধারণাটি Lauren Resnick প্রথম প্রবর্তন করেন ১৯৮৭ সালে। এই ধারণাটি বলে, এটি শিখনের ক্ষেত্রে অসামর্থ্যতা দূর করে, শিখন ফলকে শক্তিশালী করে, শ্রেণীকক্ষের বাইরে এসে বাস্তব জগতে হাতেকলমে শিক্ষা, শিখনের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে। UCLA National Center for Research on Evaluation, Standards, and Student Testing (CRESST)-এর একটি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বিদ্যালয়ের বাইরে শিক্ষার বিষয়টি শিক্ষা এবং বিদ্যালয় দুটোর প্রতিই আগ্রহ তৈরি করে। উন্নত দেশগুলোতে মিউজিয়াম দেখা, খেলাধুলায় অংশগ্রহণ, হোমওয়ার্ক ক্লাব, স্টাডি ক্লাব (বর্ধিত কারিকুলামের জন্য), মেন্টরিং (সহপাঠী ও অভিভাবক উভয়েরই অংশগ্রহণের মাধ্যমে), শিখন সম্পর্কে শিক্ষা, কমিউনিটি সার্ভিস, রেসিডেন্সিয়াল কার্যক্রমসহ অনেক কিছু করা হয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শ্রেণীকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঠ্যবইয়ের বাইরের কারিকুলামের চর্চাটা সহজ ব্যাপার নয়। বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়ায় একটি বড় রকমের চাপ থাকে। কোচিং, প্রাইভেট ইত্যাদি সামাল দিয়ে শেখাটা মুশকিল। তবে অসাধ্য নয় কিছুই! এখন আমাদের দেশে সৃজনশীল ব্যবস্থা চালু হয়েছে। মিউজিয়াম নিয়ে যাওয়া, বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে যাওয়া, পাঠ-সংশ্লিষ্ট প্রজেক্ট প্রদান, শিক্ষার্থীদের দিয়ে বেশ কিছু সামাজিক কাজ করানো, যেমন- ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সতর্কতা সৃষ্টি, ময়লা ফেলার নির্দেশনা, জেব্রা ক্রসিং সম্পর্কে জানানো, বয়স্ক শিক্ষা, ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ, পথশিশুদের মৌলিক শিক্ষা প্রদান ইত্যাদি কাজে তাঁদের অংশগ্রহন বৃদ্ধি করানো যেতে পারে। এতে একদিক থেকে যেমন তারা নাগরিকের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠার সুযোগ পাবে, ঠিক তেমনি পাঠ্য বইয়ের বিষয়বস্তুর সাথে বাস্তবের সামঞ্জস্যতা খুঁজে পাবে। কাজেই এটা স্পষ্ট যে, হাতেকলমে কাজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা গড়ে তুলতে সহযোগিতা করে। কাজেই শিক্ষার্থীদের শিখনের ক্ষেত্রে বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি করতে হবে।

Wallace Foundation-এর একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের বাইরে শিক্ষা মেধা তৈরি করা ও আবিষ্কার করার একটা ভালো সুযোগ হতে পারে। কারণ শিক্ষার্থীরা যেমন শ্রেণীকক্ষের ভেতরে থেকে শিক্ষালাভ করতে পারে, তেমনি বাইরে বেরিয়েও শিক্ষা অর্জন করতে পারে। মূলত বিদ্যালয়ের বাইরে শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে আলোচনার সুযোগ থাকে। একে অপরের জ্ঞানের পরিসীমা যাচাই করতে পারা যায়। উন্নত দেশগুলোতে যেসব শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের বাইরে শেখার সুযোগ পেয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এ ধারার শিখন কেবল তাদের শ্রেণীকক্ষের জ্ঞানকেই বর্ধিত করে না; বরং একই সাথে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই শিখনকে অর্থবহ করে তোলে। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং পারিবারিক দায়িত্ব শ্রেণীকক্ষের বাইরে শিক্ষার ক্ষেত্রে একটা বড় রকমের বাঁধা। উন্নত দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষার মান বৃদ্ধিকরণের ক্ষেত্রে একথা অনুধাবনে আনতে হবে যে, বিদ্যালয়ই শিক্ষার্থীদের শিখনের জন্য একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়- সামার ক্যাম্প, মিউজিক ক্লাস এবং বাড়ির পরিবেশেও শিক্ষার্থীরা শেখে। তাই প্রচলিত স্কুলের সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটানো, সমৃদ্ধ করা অথবা স্কুলের অতিরিক্ত ফায়দা যোগানোর জন্য পাবলিক স্কুলের সমান্তরালে নানারকমের সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার এক রিপোর্টে দেখা গেছে, এসব অনানুষ্ঠানিক কার্যক্রম কীভাবে শিক্ষার্থীদের ইন্টার-পার্সোনাল স্কিল বাড়িয়ে তোলে, এমনকি অন্যান্য ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করে। এ ধরনের শিক্ষা টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অবদান রাখে। তবে এই ধরনের শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষণ এবং শিখনের ক্ষেত্রে একটি স্ট্রাটেজি নির্ধারণ করতে হয়। একই সাথে যথাযথ পরিকল্পনা, শৃঙ্খলারক্ষা, রিস্ক ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রেও ভাবনার প্রয়োজন আছে। বিদ্যালয়ের বাইরের শিক্ষার ক্ষেত্রে অভিভাবকরা বড় অবদান রাখতে পারে। নতুন বিষয় শিখনের ক্ষেত্রে, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির ক্ষেত্রে, প্রেষণা প্রদানের ক্ষেত্রে, শ্রেণীকক্ষে উপস্থিতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে, ভালো ফলাফলের ক্ষেত্রে, নতুন বন্ধু তৈরি করার ক্ষেত্রে সুযোগ সৃষ্টি করে। এ ধারার শিক্ষার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সজাগ উপস্থিতি তাই সর্বাগ্রেই কাম্য।

কিছুদিন আগে আমি সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলাম। সেখানে পথ চলতে গিয়ে দেখলাম বেশীরভাগ মানুষের হাতে হাতেই ইন্টারনেট। ক্রমাগত ব্রাউজিং করে চলেছে তারা। যেসব শিক্ষার্থীরা নিজেরা ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হওয়ার খরচ যোগাতে পারছে না, দেশটির সরকার সেসব ছেলেমেয়েদের হাতে বিনে পয়সায় টেকনোলজি পৌঁছে দিচ্ছে। আমাদের দেশে ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোতে ছেলেমেয়েদের দিয়ে বেশ কিছু সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত করানো হয়। তারা হাতেকলমে বাস্তব পর্যায়ে কিছু কাজ করার সুযোগ পায়। কিন্তু আমাদের কথা হল, বইতে যা শিখছি তা বাস্তবে দেখতে চাই। গাছ নিয়ে যখন পড়ছি তখন বোটানিক্যাল গার্ডেনে যেতে চাই। এই জাতীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে বাইরে না গিয়ে স্থায়ী শিক্ষার আর কোনও বিকল্প থাকতে পারে না। তবে যা বলেছি, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শ্রেণীর সব শিক্ষার্থীদের বাইরে নিয়ে গিয়ে শিক্ষাদান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হবে না। সেজন্য প্রথমত ডিজিটাল ক্লাসরুমের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাও না হলে শিক্ষক নিজেই সহজে একটি ল্যাপটপ ক্লাসে আনতে পারেন। আজকাল খুব কম খরচে ল্যাপটপ বাজারে পাওয়া যায়। এই খরচ বহন করাটা কঠিন হলে সরকার সাহায্যের হাত বাড়াবেন। একটু ভেবে দেখুন তো, একটা সময় মোবাইল আমাদের হাতের মুঠোয় ছিল না। এখন অনেকের হাতে হাতেই মোবাইল। অনেকের ঘরেই এখন কম্পিউটার। তবে তাদের সকলেই ইন্টারনেটের সাথে এখনও যুক্ত হতে পারেনি। এক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সরকারের একান্ত চেষ্টা থাকলে অদূর ভবিষ্যতে আরও অনেকের হাতেই কম্পিউটার পৌঁছে যাবে। আর শিক্ষকের জন্য এর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। একটি কম্পিউটার শিক্ষকের হাতে পৌঁছালে শিক্ষক খুব সহজেই শিক্ষার্থীদের বাস্তব জগতের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারবেন। তবুও শ্রেণীকক্ষের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে শিক্ষার একটি আলাদা গুরুত্ব আছে।

সব সময় শিক্ষকের পক্ষে সব শিক্ষার্থীকে একসাথে দলগতভাবে বাইরে নিতে না পারলে তিনি পৃথকভাবে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে পারেন, যাতে নিজস্ব উদ্দ্যোগে তারা পরিবারের সাথে স্থানগুলোতে যায়। শিক্ষার্থীরা যদি বইয়ে সোনারগাঁ সম্পর্কে পড়ে, তবে কোনো এক সময়ে পরিবারের সাথে উক্ত স্থান দেখতে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষকের দায়িত্ব হলো স্থান পরিদর্শনে সহায়তা করা। সেখানে গিয়ে তারা কী দেখবে বা কীভাবে পাঠের সাথে সম্পৃক্ততা খুজবে, সে বিষয়ে সাহায্য করবেন। প্রয়োজন হলে তারা নোট নেবে বা ছবি তুলে নিয়ে আসবে এবং শিক্ষক ও ক্লাসের অন্যান্য সহপাঠীদের সাথে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নেবে। আসলে জানবার ইচ্ছা থাকলে সেটা যে কোনো উপায়েই জানা যায়। ইচ্ছা থাকলেই উপায় বের করা সম্ভব। মনীষীরা অকারণেই বলেননি যে, জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীনে যাও। তাই বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বাহিরে শিখন-শেখানো কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা উচিত। শিক্ষকদের গতানুগতিক শিক্ষাপ্রদান থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। শ্রেণীকক্ষের বাইরে যে শিক্ষা কার্যক্রম আরও ফলপ্রসূ করা যায় এই ভাবনাটা শিক্ষকদের ভেতরে তৈরি করতে হবে। একই সাথে অভিভাবকবৃন্দও যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে শিক্ষকের কাজ অনেকখানি সহজ হয়ে যায়। একটি দেশের ভবিষ্যতকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর সেই শিক্ষায়ই যদি অপূর্ণতা রয়ে যায়, তবে এই ধরনের অসম্পূর্ণ জ্ঞান নিয়ে আর যাই হোক উন্নয়নের উচ্চ শিখরে পৌঁছনো যাবে না তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। আর একই সাথেই উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে পরিণত হওয়া বাংলাদেশের জন্য হয়তো একটা স্বপ্নই রয়ে যাবে।

Website | + posts

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে