ই-শিক্ষা

উচ্চশিক্ষায় মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন পদ্ধতি: বাস্তবতা ও কিছু প্রস্তাবনা

বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
লিখেছেন গৌতম রায়

প্রেজেন্টেশনভিত্তিক শিখন-শেখানো পদ্ধতিকে কীভাবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা পরিসরে আরও কার্যকর করে তোলা যায়, সে সম্পর্কে এখানে কিছু বিশ্লেষণ ও প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো

জি. এম. রাকিবুল ইসলামরিদওয়ানুল মসরুর: বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ভূমিকা যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখনকার শিক্ষাব্যবস্থায় বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। তার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে সরকারিভাবে ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরির প্রশিক্ষণ, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনসহ নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা কার্যকরভাবে হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ থেকেই যায়।

উচ্চশিক্ষায় যে সকল ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষ্যণীয় তার একটি হলো মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন পদ্ধতি। অনেক সময় শিক্ষক নিজে ক্লাসে মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন করেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর প্রশ্ন-উত্তরের মধ্যদিয়ে শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়া চলতে থাকে। আবার অনেক সময় শিক্ষার্থীদের ওপর অর্পিত কাজ হিসেবে এই প্রেজেন্টেশন দেয়া হয়। সেক্ষেত্রে পুরো ক্লাসের সামনে একজন উপস্থাপক বা একদল শিক্ষার্থী একটি বিষয় উপস্থাপন করেন। সচরাচর যেটা দেখা যায় তা হলো, যিনি বা যে দলটি উপস্থাপন করেন তিনি বা তারা খুব সিরিয়াস থাকে বা থাকার চেষ্টা করে। আবার অনেক সময় একটু ভয়েও থাকে বোধ হয়, শিক্ষক তাঁর মতো করে পর্যবেক্ষণ করেন, বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত থাকে। আর যে দলটি এ দলের পরে উপস্থাপন করবে (সেদিন বা অন্যদিন) তারা তাদের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকে (অনেক সময় তারা কাজের চাপে ওইদিন উপস্থিত হতে পারে না!)। এভাবে চলতে থাকে উপস্থাপনা। উপস্থাপনা শেষ হলে প্রশ্ন-উত্তর পর্ব শুরু হয় (অনেক সময় ক্লাসের সময় স্বল্পতার কারণে বা সময় শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে এ পর্বটি বাদ দেয়া হয়)। এ পর্বে শিক্ষার্থীরা কিছু প্রশ্ন করেন, যে বিষয়গুলো তারা জানতে চান; আবার কখনও কখনও উপস্থাপককে আটকানোর জন্য কিছু প্রশ্ন করা হয়। আবার কেউ কেউ উপস্থাপকের শিখিয়ে দেয়া কিছু প্রশ্ন করেন। তারপর শিক্ষক চাইলে বিষয়টি নিয়ে কিছু কথাবার্তা বলে ইতি টানেন। প্রশ্ন হলো- শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, শিখনফল এক্ষেত্রে কতোটা অর্জিত হলো? অনেকেই মনে করে থাকেন যে- এই প্রেজেন্টেশন পদ্ধতির দুর্বলতা আছে। আবার অনেকে মনে করেন এ পদ্ধতি যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না।

একথা সত্যি যে, কোনো জিনিস কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে এর ফলাফল। তাই এক্ষেত্রেও একথা বলা যায় যে, উচ্চশিক্ষায় মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন পদ্ধতির যথাযথ ব্যবহারের ওপর এর সুফল পাওয়া নির্ভর করে। সুপ্রাচীন অথচ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বহুলপ্রিয় ও সীমিত পরিসরে কার্যকর ‘লেকচার মেথডের’ চেয়ে এটা যে অধিক কার্যকর তা বোধকরি সবাই স্বীকার করবেন। কিন্তু এই মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশনভিত্তিক শিখন-শেখানো পদ্ধতিকে কীভাবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা পরিসরে আরও কার্যকর করে তোলা যায়, সে সম্পর্কে এখানে কিছু বিশ্লেষণ ও প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো:

বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে শিক্ষার্থীর মনে বিষয়ভিত্তিক সুগভীর চিন্তার ধারাকে জাগ্রত করা তথা শিক্ষার্থীদের চিন্তাশীল করে তোলা শিক্ষার একটি অন্যতম লক্ষ্য। মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের চিন্তাধারাকে উস্কে দিতে অসাধারণ একটি পদ্ধতি হতে পারে যদি তা যথাযথ ও পরিকল্পিত উপায়ে ব্যবহৃত হয়। অনেক সময় শিক্ষক বা শিক্ষার্থী– যিনি উপস্থাপন করেন তিনি কেবল তোতা পাখির মতো স্লাইডের লেখা গড়গড় করে পড়ে যান- কার তাতে কী লাভ হলো, কে কী বুঝলো কোনো কিছুই যেন বিবেচনার বিষয় নয়। এমনটি এ ব্যবস্থার ব্যর্থতাই কেবল নিয়ে আসতে পারে। অথচ স্লাইডে কম লিখে (মূল বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে) যদি তিনি মুখে বিষয়গুলো ঠিক গৎবাধা বুলির মতো না বলে খানিকটা হাস্যরস-সহকারে আলোচনা করেন তবে শিখন-শেখানো কার্যক্রম অনেকটা ফলপ্রসূ হতে পারে। অন্তত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে দশ-বিশ মিনিটের প্রেজেন্টেশনে শিক্ষার্থীদের কোনো বিষয় সুগভীরভাবে বুঝিয়ে দিতে গিয়ে যে চরম বিরক্তি উৎপাদিত করে বসেন অনেকেই- সে বিষটি সচেতনভাবে এড়িয়ে যেতে হবে অবশ্যই। আর প্রেজেন্টেশনে জ্ঞান না দিয়ে ওই জ্ঞান কোথায় পাওয়া যাবে ও কীভাবে এবং খানিকটা সারমর্ম উপস্থাপন করাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়।

স্লাইডসমূহ তথ্যভারাক্রান্ত না করে অল্প কথায় করতে হবে। স্লাইডগুলো যেন হয় সহজ ও সাধারণ, যেন একদৃষ্টিতে বোঝা যায় ওই স্লাইডে কী উপস্থাপিত হয়েছে। মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশনে শুধু টেক্সট ব্যবহার না করে অডিও, ভিডিও ইত্যাদি বিভিন্ন মিডিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে (তাহলেই প্রেজেন্টেশনটা মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন হবে)। প্রেজেন্টেশন হতে হবে তত্ত্ববিচারে সারগ্রাহী অথচ বিনোদনমূলক। তবে বিনোদনমূলক উপকরণের অতিরিক্ত ব্যবহারে তা যেন অ্যাকাডেমিক ভাবগাম্ভীর্য না হারায় সেটাও খেয়াল রাখতে হবে।

এক মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন দিয়েই ক্লাস শেষ না করে বরং নানা কার্যক্রমের সাথে ৫-৭ মিনিটের প্রেজেন্টেশন করা উত্তম। অন্যথায় দীর্ঘ ৪০ মিনিটের প্রেজেন্টেশনের মধ্যে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। যেমন- ‘সমাজ জীবনে শিক্ষার প্রভাব’ সংক্রান্ত মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশনভিত্তিক শ্রেণি কার্যক্রম এভাবে সাজানো যেতে পারে- প্রথমে শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ও মন্তব্য জেনে নেওয়া, এরপর সমাজকে ম্যাক্রো ও মাইক্রো পরিসরে স্লাইড ব্যবহার করে উপস্থাপন, এরপর সমাজের সাথে শিক্ষার সম্পর্কের ইতিহাস লেকচার পদ্ধতিতে উপস্থাপন (স্লাইডের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে- তবে আলোচনা হতে হবে প্রাণবন্ত ও গল্পের মতো বা গল্প বলার ঢঙে), এরপর স্লাইড ব্যবহার করে ‘শিক্ষার প্রভাব’ উপস্থাপন, তারপর শিক্ষার্থীদের মতামত, ভাবনা ও প্রশ্নালোচনা, এবং সবশেষে এমন কোনো ছবি বা ভিজ্যুয়াল উপকরণ দেখানো বা প্রশ্ন করা যাতে তারা শ্রেণিতে যা শিখলো-দেখলো সেগুলো নিয়ে ভাবনাচিন্তা শেষ না করে দেয়।

মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন শিক্ষক বা উপস্থাপকের দুর্বলতা উত্তরণে যেমন সাহায্য করে তেমনি একজন দক্ষ উপস্থাপককে শ্রেণিতে বাজিমাত করার সুযোগও এনে দেয়। সফল হতে হলে অবশ্যই একরাতে তৈরি মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন নিয়ে সবার সামনে দাঁড়াবেন না, বরং শুরু থেকেই পরিকল্পনা করুন, ভাবুন অসাধারণ কী করা যায়। মনে রাখুন 5P (PPPPP): Prior Preparation Prevents Poor Performance. লক্ষ্য রাখবেন, প্রজেক্টরের পর্দা আর বইয়ের পর্দাকে এক মনে করে শুধু বক্তৃতা শিক্ষার্থীকে কেবল বিরক্তই করবে না, আপনিও ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করাতে পারলে কাজটি তারাও যেমন উপভোগ করবে, তেমনি শিখনটাও স্থায়ী হবে। তাই সবার সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ভাবগাম্ভীর্যকে দূরে ঠেলে শ্রেণিতে আনন্দঘন পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করুন। শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করলে এই শিখন অভিজ্ঞতা সে সহজে ভুলবে না। জাতিগতভাবেই বাঙালির মেধা, ভাবাবেগ ও পর্যালোচনা শক্তি অসাধারণ। কাজেই, নিজের সবটুকু নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ুন শ্রেণি উপস্থাপনায় সফল হবার জন্য। কৌশলী হোন, কুশলী হয়ে উঠতে দেরি হবে না।

গ্রন্থপঞ্জী
Berk, R. A. (2008c). Star tech: The net generation. In C. C. Craig & L. F. Deretchin (Eds.), Teacher education yearbook XVI: Imagining a renaissance in teacher education (pp.131–145). Lanham, MD: Rowman & Littlefield Education.

Borko & Pittman, M. E. (2008). Video as a tool for fostering productive discussions in mathematics professional development. Teaching and Teacher Education, 24(2), 417–436.

Boyatzis, C. J. (1994). Using feature films to teach social development. Teaching of Psychology, 21, 99–101.

Champoux, J. E. (2001a). Animated films as a teaching resource. Journal of Management Education, 25(1), 78–99.

Champoux, J. E. (2004). Our feature presentation: Management. Mason, OH: South-Western.

DiSibio, R. R. (2006). Reel lessons in leadership. Montebello, CA: Paladin-Eastside Services.

Gardner, H. (2000). Can technology exploit our many ways of knowing? In D. T. Gordon (Ed.), The digital classroom: How technology is changing the way we teach and learn (pp. 32–35). Cambridge, MA: President and Fellows of Harvard College.

Mayer, R. E. (2001). Multimedia learning. Cambridge, UK: Cambridge University Press.

Moreno, R., & Valdez, A. (2007). Immediate and delayed effects of using a classroom case exemplar in teacher education: The role of presentation format. Journal of Educational Psychology, 99(1), 194–206.

Zull, J. E. (2002). The art of changing the brain: Enriching the practice of teaching by exploring the biology of learning. Sterling, VA: Stylus.

জি. এম. রাকিবুল ইসলাম: প্রভাষক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, রংপুর, বাংলাদেশ ও রিদওয়ানুল মসরুর: কর্মকর্তা, কমিউনিকেশনস ও রিসোর্স মবিলাইজেশন, সেভ দ্য চিলড্রেন, ঢাকা, বাংলাদেশ।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন