বাড়ি সাক্ষাৎকার মোঃ সাইদুল হক: “বাংলাদেশে এনজিওগুলো প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন...

মোঃ সাইদুল হক: “বাংলাদেশে এনজিওগুলো প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে, যা শিশুর শিক্ষার ভিত গঠনে সহায়ক হয়েছে”

সাইদুল হক: বাংলাদেশে এনজিওগুলো প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে, যা শিশুর শিক্ষার ভিত গঠনে সহায়ক হয়েছে
সাইদুল হক: বাংলাদেশে এনজিওগুলো প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে, যা শিশুর শিক্ষার ভিত গঠনে সহায়ক হয়েছে

গৌতম রায়: আপনি দীর্ঘদিন, প্রায় ২৪ বছর, এনজিওতে কাজ করেছেন। আমি প্রথমেই জানতে চাই, এই দীর্ঘ সময়ে আপনি শিক্ষা নিয়ে কী কী কাজ করেছেন এবং এসব কাজের স্বল্প-মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রভাব আপনি পর্যবেক্ষণ করেছেন কি না? ‌

মোঃ সাইদুল হক: আমি প্রথমেই বলে নিতে চাই, আমার পরিবারে অনেকেই সরকারি চাকুরিতে থাকলেও ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছে ছিলো এনজিওতে কাজ করার। এনজিওর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা আর মাঠেঘাটে জনগণের কাছে গিয়ে কাজ করার মানসিকতা দেখেই মূলত আমি এনজিওর প্রেমে পড়ে যাই।

প্র্রায় ২৪ বছর বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছি। আমি মূলত শিক্ষা প্রোগ্রামের প্রতিটি সেক্টরের সাথেই কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এর মধ্যে প্রাকশৈশবব শিক্ষা, মৌলিক শিক্ষা, প্রাথমিক, মাধ‌‌্যমিক এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বিভাগের সাথে কাজ করেছি। পাশাপাশি বিকল্প শিক্ষা, একীভূত শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনগত শিক্ষা, দুর্যোগকালীন শিক্ষা ইত‌্যাদি বিষয়েও কাজ করার সুযোগ হয়েছে। বিশেষত শিক্ষামূলক গবেষণা, উপকরণ উন্নয়ন, কমিউনিটিভিত্তিক আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা এসব বাস্তবায়নের জন‌্য কাজ করতে হয়েছে।

আমার এসব কাজের মধ‌্যদিয়ে উল্লেখযোগ‌্য অর্জন বলতে যা ছিলো, আমরা প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে শিক্ষানীতিতে পাকাপোক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছি। শ্রেণিকক্ষে শারীরিক শাস্তি বন্ধসহ মোবাইল ফোন ব‌্যবহার বন্ধের ঘোষণাটি নিশ্চিত করা গিয়েছে। সরকারি শিক্ষা ব‌্যবস্থায় ই-মনিটরিং সিস্টেম চালু হয়েছে। একীভূত শিক্ষার জন‌্য বিশেষ নিয়মাবলী চালু হয়েছে। বাবা-মায়েদেরকে সচেতন করার জন‌্য অভিভাবক শিক্ষা চালু হয়েছে, বিশেষ করে গর্ভাবস্থা থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের মা-বাবা ও যত্নকারীর জন‌্য। এদিকে এনজিওসমূহের কর্মতৎপরতার ফলে বিদ‌্যালয়সমূহে ভর্তি এবং শিক্ষাচক্র শেষ করার হারও উল্লেখযোগ‌্য হারে বেড়েছে।

এছাড়া আরও বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। যেমন, বাংলাদেশের শিক্ষাবিস্তারে এনজিওগুলোর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। বিশেষ করে মেয়ে শিশু ও গরিব পরিবারের শিশুদের জন্য এনজিওগুলো শিক্ষার দোর খুলে দিয়েছে। মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে সচেতনতা সৃষ্টি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, বিনামূল্যে সহায়ক শিক্ষা উপকরণ-পোশাক ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করেছে তারা। একইসাথে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের জন্য অনানুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক ও বিকল্প শিক্ষার ব‌্যবস্থা করেছে, যুবকদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ, এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বিদ্যালয় ও একীভূত শিক্ষাক্রম চালু করেছে। সংকটকালে ভাসমান বিদ্যালয়, রেডিও ক্লাসের মতো উদ্ভাবনী মাধ্যমেও শিক্ষা অব্যাহত রেখেছে এনজিওগুলো।

এ কর্মযজ্ঞের সুদূরপ্রসারী প্রভাব লক্ষ্যণীয়। স্বল্পমেয়াদে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও ভর্তি বেড়েছে; মধ্যমেয়াদে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা ও যুবদের আয়ের সুযোগ বাড়িয়েছে; আর দীর্ঘমেয়াদে বাল্যবিবাহ কমিয়ে শিক্ষিত মায়ের মাধ্যমে একটি শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করছে। মূলত এনজিওগুলো রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করে শিক্ষাকে জীবনঘনিষ্ঠ ও সবার কাছে পৌঁছে দিয়ে একটি টেকসই সামাজিক রূপান্তরের বীজ বপন করেছে।

এতো অর্জন থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যে সকল সংকটের মধ‌্য দিয়ে যাচ্ছে সেগুলো হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মধ‌্যে মানসম্পন্ন শিক্ষা ও শিখন ঘাটতি রয়ে গেছে। পাশাপাশি, পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় পাঠদান কার্যকর হচ্ছে না। দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি ও টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগার, পানীয় জলের ব্যবস্থা বা বিদ্যুৎ সুবিধা নেই। বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সীমিত এবং দক্ষতা উন্নয়ন শিক্ষাটি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি।

বাংলাদেশের শিক্ষাবিস্তারে এনজিওগুলোর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। বিশেষ করে মেয়ে শিশু ও গরিব পরিবারের শিশুদের জন্য এনজিওগুলো শিক্ষার দোর খুলে দিয়েছে। মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে সচেতনতা সৃষ্টি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, বিনামূল্যে সহায়ক শিক্ষা উপকরণ-পোশাক ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করেছে তারা। একইসাথে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের জন্য অনানুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক ও বিকল্প শিক্ষার ব‌্যবস্থা করেছে, যুবকদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ, এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বিদ্যালয় ও একীভূত শিক্ষাক্রম চালু করেছে। সংকটকালে ভাসমান বিদ্যালয়, রেডিও ক্লাসের মতো উদ্ভাবনী মাধ্যমেও শিক্ষা অব্যাহত রেখেছে এনজিওগুলো।

গৌতম: আপনার উত্তর থেকে ধারণা করছি যে, যদিও আপনি এনজিওতে কাজ করেছেন, কিন্তু এসব কাজের সুবাদে আপনাকে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে সরকার যেমন কাজ করছে, তেমনি এনজিওগুলোও কাজ করছে। একটি এলাকায় যখন একইসাথে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করে, তখন তারা কীভাবে কাজের সমন্বয় করে? এসব ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয় কি না বা বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায় কি না? আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?

সাইদুল: মূলত সরকারের কাজকে যদি হাতির সাথে তুলনা করা যায়, তাহলে এনজিও-র কাজকে তুলনা করতে হয় তেলাপোকার সাথে। সরকারকে সহযোগিতা করা ছাড়া এনজিওর আসলে এককভাবে করার মতো তেমন সাধ্য থাকে না। বেশিরভাগ এনজিওই বিদেশি সাহায্য ছাড়া কাজ করতে পারে না। যে সামান্য অর্থ থাকে সেটা দিয়ে কিছু সচেতনতামূলক কাজ আর ছোট ছোট মডেল উপস্থাপন করা ছাড়া বড় কিছু করার সাধ্য নেই এনজিওগুলোর।

যেহেতু এনজিওরা সরকারকেই সহযোগিতা করছে, তাই সরকারের দিক থেকেও এনজিওগুলোকে সহযোগিতা করা হয় যাতে কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

কখনো কখনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কিছু ব্যক্তির উদাসীনতার কারণে এনজিওর কাজ বিঘ্নিত হয়ে থাকে বটে। তবে মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নিয়ে কাজ করলে সমস্যা কম হয়।

গৌতম: আপনি কি বিশেষ করে এমন কিছু বাস্তব উদাহরণ দিতে পারেন যে, যেখানে সরকার ও এনজিওর সহযোগিতামূলক পরিবেশের কারণে কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং যেখানে সরকার ও এনজিওর মধ্যকার দূরত্ব বা অসহযোগিতার কারণে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সমস্যা হয়েছে?

সাইদুল: বেশিরভাগ বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে শিশুর সার্বিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। একজন শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে তাকে জন্মনিবন্ধনসহ খাদ্য, বস্ত্র, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সহায়ক পরিবেশ, পরিবারের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা সবকিছু নিশ্চিত করতে হয়। বাংলাদেশে এনজিওগুলো প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে, যা শিশুর শিক্ষার ভিত গঠনে সহায়ক হয়েছে।

এছাড়াও সরকারের শতভাগ জন্মনিবন্ধন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস করা, শিক্ষার প্রতি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করাসহ দাতাসংস্থার মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের অবকাঠামো উন্নয়ন, আপদকালীন শিক্ষা অব্যাহত রাখা ও শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে ব্যাপক কাজ করেছে। ছোট ছোট পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও নানারকম শিক্ষাদান পদ্ধতিগত পরিবর্তন নিয়ে এসেছে বেশ কিছু এনজিও।

সর্বশেষ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের সাধারণ ও কর্মমূখী শিক্ষা নিশ্চিতকরণে এককভাবে এনজিওগুলো সরকারের পাশে থেকেছে। এমনকি কোভিড-১৯ চলাকালীন প্রায় ১৮ মাস শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকাকালীন এনজিওগুলো নানারকম দূরশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে শিখন ঘাটতি দূরকরণের চেষ্টা করেছে।

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যেন মুঠোফোন ব্যবহার না করে, বিদ্যালয়ে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি যেন বন্ধ হয়, এগুলোর পাশাপাশি কোচিং বাণিজ্য বন্ধের জন্যও এনজিওগুলো বেশ অবদান রেখেছে। বিদ্যালয়ে ভর্তি, উপস্থিতি এবং সমাপনীর হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধিও জন্য এনজিওগুলোর অবদান অনস্বীকার্য।

তবে বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। যেমন, সকল শিশুর জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ এখনও সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে দরিদ্র, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অনেকেই এখনো প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে না। আবার যারা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ ন্যূনতম শিক্ষামান অর্জন করতে ব‌্যর্থ হচ্ছে।

এর বাইরে গুণগত শিক্ষার অভাব রয়েছে। বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান এখনো নিম্ন। বিশেষ করে সরকারি বিদ‌্যালয়সহ অন‌্যান‌্য ব‌্যক্তিমালিকানাধীন এবং এনজিও-কর্তৃক পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোতে দক্ষ ও আন্তরিক শিক্ষকের অভাব রয়ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় পঞ্চাশ ভাগ শিক্ষার্থী সঠিকভাবে শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা পড়তে জানে না। এটি কি কোনোভাবেই কাম‌্য হতে পারে?

ডিজিটাল শিক্ষার কথা বেশ আলোচিত হলেও এর তেমন সম্প্রসারণ ঘটেনি। বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় প্রযুক্তি ও ডিজিটাল শিখন সুবিধা এখনও সীমিত। ব্যানবেইসের হিসাব অনুসারে মাধ্যমিক স্তরে ভর্তির হার প্রায় ৮২%। অথচ এখনো বিশেষ করে মেয়েরা মাধ‌্যমিক শিক্ষাস্তর থেকে সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ছে।

অন্যদিকে, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণও আশানুরূপ হয়নি। মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি শিক্ষার হার মাত্র ১৪%, যা জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার অপেক্ষা অনেক কম। এখনো সৃজনশীল মূল্যায়ন পদ্ধতির যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি এদেশে। মাধ্যমিক স্তরে এখনো গতানুগতকি পরীক্ষা পদ্ধতির প্রাধান্য পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করাসহ শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে সুষ্ঠু মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকা। এ-বিষয়ে শিক্ষাপ্রশাসন যেমন উদাসীন, তেমনি জনগণের সম্পৃক্ততাও গৌণ হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। অতএব বিদ্যালয়গুলোর জবাবদিহিতা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।

ডিজিটাল শিক্ষার কথা বেশ আলোচিত হলেও এর তেমন সম্প্রসারণ ঘটেনি। বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় প্রযুক্তি ও ডিজিটাল শিখন সুবিধা এখনও সীমিত। ব্যানবেইসের হিসাব অনুসারে মাধ্যমিক স্তরে ভর্তির হার প্রায় ৮২%। অথচ এখনো বিশেষ করে মেয়েরা মাধ‌্যমিক শিক্ষাস্তর থেকে সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ছে।

গৌতম: আমি এই মুহূর্তে আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই শুধু শিশুদের শিক্ষা নিয়ে। যেহেতু আপনি এনজিওতে বিশ বছরের বেশি কাজ করেছেন এবং মূলত শিশুদের সাথে কাজ করেছেন, এই দীর্ঘসময়ে আপনি শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে কী কী পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন? আপনি কি মনে করেন, যতোটুকু পরিবর্তন হয়েছে তা যথাযথ নাকি আরও গুণগত পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিলো?

সাইদুল: এনজিওগুলো সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে শিশুদের শিক্ষা নিয়ে, বিশেষত অভিভাবক শিক্ষা, প্রাক-শৈশবকালীন শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা নিয়ে। কিছু কিছু এনজিও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে।

বড় পরিবর্তনটি এসেছে ভর্তি, উপস্থিতি এবং শিক্ষাৃচক্র সমাপ্তির হারে। শিক্ষা অনেক বেশি শিশুবান্ধব হয়েছে, হাতেকলমে শেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যেহেতু এনজিওগুলো সরাসরি শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে না, তাই গুণগতমান নিশ্চিত করার দায়িত্বটি থাকে কর্তৃপক্ষের হাতে। জেন্ডার সংবেদনশীল শিক্ষাব্যবস্থা, দুর্যোগকালীন শিক্ষা, সহপাঠক্রমিক কাজ নিশ্চিত করাসহ সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে এনজিওগুলো ভূমিকা রেখেছে।

একটি কাঠামোগত কেন্দ্রীভূত শিক্ষাব্যবস্থায় এনজিওসমূহ আর বেশি কী করতে পারতো? তবে সকল শিশুর শিক্ষা নিশ্চিতের বিষয়টি অনেকটাই ধোঁয়াশার মধ্যে রয়ে গেছে। এনজিওগুলো ধর্মীয় শিক্ষা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষার মান নিশ্চিতের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলো, যা একীভূত শিক্ষা সংস্কৃতিতে একদম বেমানান।

গৌতম: শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা এক ধরনের অস্থিরতা সবসময়ই দেখতে পাই। এক সরকারের আমলে শিক্ষা নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সরকার পরিবর্তনে তার অনেক কিছু বদলে যায়। মাঠপর্যায়ে এসব বিষয়ে আপনি শিক্ষক বা অভিভাবকদের মধ্যে কোনো আলোচনা শুনেছেন?

সাইদুল: এটি একটি ভিন্নরকম অভিজ্ঞতা। এসব পরিবর্তনে শিক্ষার্থীর চেয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন থাকতে দেখা যায় অভিভাবকদের। পরিবর্তনকে অভিভাবকগণ নানা কারণে মেনে নিতে চান না। এর প্রথম এবং অন‌্যতম কারণ হচ্ছে অভিভাবকদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা।

আসলে যেকোনো পরিবর্তনে সর্বাধিক চ‌্যালেঞ্জে পড়তে হয় শিক্ষকদেরকে। কেননা পরিবর্তিত বিষয়গুলোকে আত্মস্থ করানেোর মূল দায়িত্বটা থাকে শিক্ষকের ওপর। যেহেতু শিক্ষকদেরকে পরিবর্তিত বিষয়ে যথাযথভাবে তৈরি করা হয় না, তাই তাঁরা সকল পরিবর্তনের দায় সরকারকে দিয়ে নিজেরা নিরাপদ থাকতে চান। অভিভাবকদেরকে নানারকম চাপে রাখেন এবং রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়ভাবে বিভিন্ন ইস‌্যু তৈরি করে সরকারের বিরুদ্ধে অভিভাবকদেরকে ক্ষেপিয়ে দিতেও দেখা গেছে। তাই পরিবর্তনে শিক্ষার্থীদের কতোটা উপকার হবে, সেটি বিবেচনায় না নিয়ে সরকারকে গালমন্দ করতে থাকেন অভিভাবকগণ।

গৌতম: সরকারের তরফ থেকে আসা এসব পরিবর্তন সরাসরি বিদ্যালয়ে কী ধরনের পরিবর্তন আনে? এসব পরিবর্তন কি ইতিবাচক বা নেতিবাচক?

সাইদুল: একতরফাভাবে কোনো পরিবর্তনকে ইতিবাচক বা নেতিবাচক বলা ঠিক হবে না। তবে বেশিরভাগ পরিবর্তনই ইতিবাচক হয়ে থাকে; কেনোনা পরিবর্তনগুলো সাধারণত কোনো না কোনো গবেষণার ফসল হয়ে থাকে।

জাতিগতভাবে আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পরিবর্তন হলেই একটি অন্ধ সমালোচনার ঝড় তুলতে হবে— এ যেন একটি নির্ধারিত কাজ। আমরা ব্রিটিশবিরেোধী আন্দোলন করেছি, পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়েছি, স্বাধীন হয়েছি, কিন্তু আমরা মুক্তচিন্তার মানুষ হতে পারছি না। পৃথিবী প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে, অথচ এই পরিবর্তিত অবস্থার সাথে যে নিজেকেও বদল করতে হবে সে বিষয়টি আমাদের ভাবনায় অনুপস্থিত।    

গৌতম: আপনি প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সবগুলো পর্যায়েই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করেছেন। এগুলোর মধ্যে কোন পর্যায়ে সরকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় বলে আপনার মনে হয়? কোন পর্যায়ের শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব প্রদান করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

সাইদুল: আমার মতে স্তরভেদে শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনা করার প্রক্রিয়াটি সঠিক নয়। প্রতিটি স্তরের শিক্ষা শিক্ষার্থীর জীবনে ভিন্ন ভিন্ন অবদান রাখে, তাই সরকারের গুরুত্ব থাকা উচিত সকল স্তরের প্রতিই। লোকবল, বাজেট বরাদ্দ, ভৌত-অবকাঠামো ইত‌্যাদির বিবেচনায় প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারের গুরুত্ব অত‌্যধিক।

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এখনো অত‌্যন্ত অবহেলিত। অথচ শিশুকে তৈরি করার জন‌্য এখানে সরকারের গুরুত্ব দেয়া উচিত সর্বাধিক, তারপর প্রাথমিক শিক্ষাকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। কোনো শিক্ষার্থী যদি প্রাথমিক শিক্ষা সফলতার সাথে শেষ করতে পারে তারপরের স্তরের শিক্ষাটা নিজে নিজেই অর্জন করার জন‌্য তৈরি হয়ে যায়।

আসলে যেকোনো পরিবর্তনে সর্বাধিক চ‌্যালেঞ্জে পড়তে হয় শিক্ষকদেরকে। কেননা পরিবর্তিত বিষয়গুলোকে আত্মস্থ করানেোর মূল দায়িত্বটা থাকে শিক্ষকের ওপর। যেহেতু শিক্ষকদেরকে পরিবর্তিত বিষয়ে যথাযথভাবে তৈরি করা হয় না, তাই তাঁরা সকল পরিবর্তনের দায় সরকারকে দিয়ে নিজেরা নিরাপদ থাকতে চান। অভিভাবকদেরকে নানারকম চাপে রাখেন এবং রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়ভাবে বিভিন্ন ইস‌্যু তৈরি করে সরকারের বিরুদ্ধে অভিভাবকদেরকে ক্ষেপিয়ে দিতেও দেখা গেছে। তাই পরিবর্তনে শিক্ষার্থীদের কতোটা উপকার হবে, সেটি বিবেচনায় না নিয়ে সরকারকে গালমন্দ করতে থাকেন অভিভাবকগণ।

গৌতম: শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে একটি প্রশ্ন করতে চাই। যেহেতু আপনি বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই সেক্টরে কাজ করছেন, বিশ বছর আগে ও বর্তমানে শিক্ষার গুণগত মানে আপনি কী পরিবর্তন দেখতে পান? এসব পরিবর্তন কি বৈশ্বিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য বলে আপনার মনে হয়?

সাইদুল: একটা বড় পরিবর্তন আমার চোখে ধরা পড়েছে। ভৌত-অবকাঠামোর পরিবর্তনের বাইরেও বিষয়বস্তু, শিখন-শেখানো পদ্ধতি, মূল‌্যায়ন ব‌্যবস্থা, ডিজিটালাইজেশন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা স্তর সম্পন্নের হার প্রভৃতির যথেষ্ট পরিবর্তন এবং উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। পক্ষান্তরে শিক্ষকদের আন্তরিকতা, অভিভাবকদের সাথে বিদ‌্যালয়ের সম্পৃক্ততা, লেখাপড়ার মান, নীতি-নৈতিকতা এসবের অনেকটাই অধঃপতন ঘটেছে।

আমরা সকল শিক্ষার্থীর জন‌্য আদর্শ মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে বৈশ্বিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম এখন একটি ভালো অবস্থান করে নিয়েছে। জানামতে, এখন প্রায় সকল বিশ্ববিদ‌্যালয়েই স্বাতক-সম্মান চার বছরের করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক গণিত কিংবা বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অবস্থান করে নিচ্ছে। তবে পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গণিত ইত‌্যাদি বিষয়সহ ইংরেজি বিষয়ে অনেক বেশি জোর দিতে হবে।

গৌতম: সেক্ষেত্রে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক— সব পর্যায়ে কী ধরনের পরিবর্তন আপনি দেখতে চান?

সাইদুল: আমি আগেও বলেছি, শিক্ষা কোনো পণ‌্য নয়; শিক্ষার উদ্দেশ‌্য হতে হবে প্রথমত মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ তৈরি করা। হঠাৎ করে মানবিক গুণাবলীর বিকাশ সাধন সম্ভব নয়, তাই পরিবর্তন করতে হবে শিক্ষককে, অভিভাবককে, সমাজকে। কেনোনা শিশুরা কেবল বই থেকে শেখে না, বরং অনেক বেশি শেখে পরিবেশ থেকে।

মানবিক গুণাবলীর পাশাপাশি বিজ্ঞান, তথ‌্যপ্রযুক্তি, গণিত, ইরেজি বিষয়ের ভিত প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকেই তৈরি করতে হবে। পর্যায়ক্রমে মাধ‌্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় এসবের প্রায়োগিক শিখন উচ্চতর হতে থাকবে। যেহেতু বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক পিছিয়ে থাকা একটি দেশ তাই কারিগরি শিক্ষার জনপ্রিয়তা বাড়নো যেতে পারে।

গৌতম: ইন্টেরিম সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অনেকে আশা করেছিলেন যে, একটি শিক্ষা সংস্কার কমিটি হবে। এই সরকারের গৃহীত শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন উদ্যেগের বিষয়ে আপনার মতামত কী?

সাইদুল: এ বিষয়ে আশা করাটা কেবলই বোকামি হবে। এর আগেও দেখেছি ইন্টেরিম সরকার আসলে বড় ধরনের কোনো সংস্কার করার ক্ষমতা রাখে না বা পরিবর্তন করার সময়ও পায় না। তাঁরা বেশিরভাগ সময়ই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার দায়িত্ব নিয়ে আসেন। অতএব, তাঁরা কোনো পরিবর্তন করতে গেলেই মব শুরু হয়ে যাবে, তাই তাঁরা শিক্ষার সংস্কারে কালক্ষেপনই করেছেন কেবল।

গৌতম: যেহেতু আপনি সরাসরি শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করেছেন, শিক্ষকদের প্রসঙ্গেও আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই। দুটো বিষয়। এক. আপনি কি মনে করেন, আমাদের বাংলাদেশের শিক্ষকদের গুণগত মান যথাযথ? দুই. যদি যথাযথ না হয়, শিক্ষকদের গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কী কী করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

সাইদুল: আমার পর্যবেক্ষণ হলো, বাংলাদেশের শিক্ষকদের গুণগত মান এখনো আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছায়নি। এখানে বৈচিত্র্য আছে, কিছু উৎসর্গীকৃত ও মেধাবী শিক্ষক আছেন, যারা শত প্রতিকূলতায়ও দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে, বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।

প্রাথমিকভাবে, শিক্ষক প্রস্তুতির প্রক্রিয়া দুর্বল, যা প্রায়শই তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জীবনের মধ্যে ফারাক রাখে। দ্বিতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকতা পেশাটি মর্যাদা ও আকর্ষণ হারিয়েছে, ফলে মেধাবীরা এ-দিকে কম আসছেন। তৃতীয়ত, শ্রেণিকক্ষে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী, অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজের চাপ এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও অনুপ্রেরণার অভাব গুণগত শিক্ষাদানে বাধা সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশে শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ নয়, বরং শিক্ষক শিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। প্রথমত, প্রাক-সেবা ও সেবাকালীন প্রশিক্ষণকে আরও ব্যবহারিক, নিয়মিত ও ফলাফলভিত্তিক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে মেধাবী ও আত্মনিবেদিত মানুষ এই পেশায় আকৃষ্ট হন। তৃতীয়ত, নিরবিচ্ছিন্ন পেশাদার উন্নয়নের একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষকরা সহকর্মীদের কাছ থেকে শিখতে পারেন, নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারেন এবং তাদের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। সর্বোপরি, শিক্ষকদেরকে কেবল পাঠদানকারী নয়, জাতিগঠনের মূল কারিগর হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

গৌতম: আমার সর্বশেষ প্রশ্ন। সম্প্রতি আপনি অ্যাকাডেমি অব ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ নামে একটি প্রতিষ্ঠান শুরু করেছেন। কেন? এই ধরনের প্রতিষ্ঠান তো বাংলাদেশে অনেক রয়েছে। তাদের সঙ্গে আপনার প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য কী হবে?

সাইদুল: প্রতিষ্ঠানটি শুরু করার পেছনে মূল কারণটি হলো, আমি দেখেছি যে বাংলাদেশে অনেক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলোর কার্যক্রম প্রায়শই সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক বা প্রচলিত ধারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আমাদের লক্ষ্য হলো গবেষণাভিত্তিক ও প্রায়োগিক জ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটানো।

আমরা শুধু প্রশিক্ষণই দেবো না, বরং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন পদ্ধতি কার্যকর হয়, শ্রেণিকক্ষের বাস্তব সমস্যাগুলো কী সেসব বিষয়ে নির্দিষ্ট ও প্রাসঙ্গিক গবেষণা পরিচালনা করবো এবং সেই গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করব। পার্থক্য হবে ফোকাস এবং পদ্ধতিতে। আমরা শিক্ষক, শিক্ষাবিদ এবং নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে একটি জীবন্ত সেতু তৈরি করতে চাই, যাতে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা গবেষণা ও নীতিতে প্রতিফলিত হয় এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞান আবার মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো প্রশিক্ষণকে ইভেন্ট না ভেবে একটি ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানো।

মানবিক গুণাবলীর পাশাপাশি বিজ্ঞান, তথ‌্যপ্রযুক্তি, গণিত, ইরেজি বিষয়ের ভিত প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকেই তৈরি করতে হবে। পর্যায়ক্রমে মাধ‌্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় এসবের প্রায়োগিক শিখন উচ্চতর হতে থাকবে। যেহেতু বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক পিছিয়ে থাকা একটি দেশ তাই কারিগরি শিক্ষার জনপ্রিয়তা বাড়নো যেতে পারে।

গৌতম: আপনার উত্তরের ভিত্তিতে আরেকটি প্রশ্ন মনে এলো। আপনি কি মনে করেন, বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে যেসব উদ্যোগ বিভিন্ন সময়ে গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলোর মূল চালিকাশক্তি মূলত ব্যবসায়িক? এ বিষয়ে আপনার অবস্থান বা মন্তব্য কী?

সাইদুল: এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত প্রসঙ্গ। এটা সত্য যে গত কয়েক দশকে শিক্ষাখাতে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় বেসরকারি ও ব্যবসায়িক উদ্যোগের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। এটিকে সমস্যা হিসেবে দেখার যথেষ্ট কারণ আছে। কেনোনা শিক্ষা যখন লাভ-ক্ষতির হিসাবের ওপর চালিত হয়, তখন এর গুণগত মান, সহজলভ্যতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা ঝুঁকিতে পড়ে। অনেকক্ষেত্রে শিক্ষা হয়ে ওঠে পণ্য, এবং শিক্ষার্থী হয় ভোক্তা।

তবে অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সীমাবদ্ধতায় বেসরকারি বিনিয়োগ শিক্ষার সুযোগ প্রসারে ভূমিকা রেখেছে বলেও মানতে হবে। আমার মূল বক্তব্য হলো, চালিকাশক্তি কী সেটি নয়, বরং নিয়ন্ত্রণকারী মূলনীতি ও চূড়ান্ত লক্ষ্যটি কী সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার উদ্যোগ যেই গ্রহণ করুক না কেন, তার কেন্দ্রে মানবিক মূল্যবোধ, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবেশাধিকার এবং জাতীয় উন্নয়নে শিক্ষার ভূমিকা এই দর্শনটি অটুট থাকা আবশ্যক। শিক্ষায় সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক, মাননিয়ন্ত্রক ও সমন্বয়কারী হিসেবে, যাতে ব্যবসায়িক স্বার্থ কখনোই শিক্ষার নৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্যকে ব‌্যাহত করে না ফেলে।

গৌতম: আপনার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক এসব মন্তব্য নিশ্চয়ই শিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করছেন, তাঁদের কাজে লাগবে। সাক্ষাৎকারে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

সাইদুল: চমৎকার এ সাক্ষাৎকার পর্বে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলোর জন্য আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ। শিক্ষার এই সংকট ও সম্ভাবনার যাত্রায় আমরা সবাই একসাথে কাজ করলে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এই আলোচনা তারই একটি অংশ।

লেখক পরিচিতি

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Exit mobile version