বাড়ি উচ্চশিক্ষা আমাদের উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যর্থতা

আমাদের উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যর্থতা

শ্রেণিকক্ষে হীনমন্যতার সংস্কৃতি

বাংলাদেশের যেকোনো বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে দেখুন। দেখবেন, সেখানে মোটামুটি পাঁচ ধরনের ছাত্রছাত্রী রয়েছে।

৫ম বেঞ্চ দল: যারা সবার পেছনের বেঞ্চে বসে বিদ্যালয় ফাঁকি দেওয়া, মারপিট হইচই করা একটি দল যারা পড়াশোনা খুব একটা বোঝে না, বুঝতে চায় ও না, বাসা এবং বিদ্যালয়ের চাইতে বাইরের মুক্ত জগতটাই তাদের প্রিয়। তারা পেছনের বেঞ্চে বসে কারণ সেটি শিক্ষকের অবস্থানের চাইতে সবচেয়ে দুরে।

৪র্থ বেঞ্চ দল: যাদের মনে কার হয় বোকা এবং হাবা যারা আসলেও অনেক কিছুই ঠিকমত বোঝে না কিন্তু তারা মারপিট হইচই ততোটা করে না, অর্থাৎ এরা বোধে পিছিয়ে থাকলেও শৃঙ্খলা মেনে চলতে পারে।

৩য় বেঞ্চ দল: যারা সত্যিকারভাবে সবকিছু বুঝতে চায় এবং বুঝতে সক্ষম কিন্তু তাদের প্রতিক্রিয়া ধীরগতির। তারা বুঝতে বুঝতে শিক্ষক অনেক দুর এগিয়ে যান। এরা খুব একটা চতুর নয় এবং রেসপনসিভ নয়, যার ফলে শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর এরা চটপট দিতে পারে না। শিক্ষকের চোখে এরা ৪র্থ বেঞ্চ দলেরই মতো।

২য় বেঞ্চ দল: এরা সব কিছুতেই মিটিমিটি হাসে। খুব একটা কথা বলে না, বসে বেঞ্চের দুই কোনায় যথাসম্ভব দেয়াল ঘেঁষে। এরা পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করে। পরীক্ষায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় সাধারণত এরাই হয়। এরা অনেকেই ইনট্রোভার্ট, আবেগপ্রবণ এবং সামাজিক লাজুকতায় ভোগে।

১ম বেঞ্চ দল: যারা ১ম বেঞ্চের মাঝখানে শিক্ষদের সবচেয়ে কাছাকাছি বসা একটি দল যারা ৫ম বেঞ্চের সমাজবিরুদ্ধদের মতোই বেপরোয়া, যারা অন্য ছাত্রছাত্রীদের প্রতি বুলি করে থাকে, সর্বদা পিছিয়ে পড়া বা ততোটা চতুর নয় যারা তাদের হেয় করে থাকে নিয়মিত। ৫ম বেঞ্চের সাথে এদের তফাত হলো পরীক্ষায় এরাও ২য় বেঞ্চের মতো খুব ভালো ফল করে।

এরা বিদ্যালয়ে বা মহাবিদ্যালয়ে যায় জানার আনন্দ নিয়ে। নতুন কিছু শেখা, সেটা বুঝতে পারা, প্রকাশ করার আনন্দ শেয়ার করতে, তার জন্য প্রশংসিত হতে তারা সবসময়ই অতি চতুর কিন্তু অসামাজিক, অ্যাবিউসিভ, বুলিকারি ১ম বেঞ্চের দ্বারা বুলি ও হেনস্তার শিকার হয়। বিষয়টা এমন যে, মনে করা হয় সে কতটা গর্ধভ যে কোনোকিছু বুঝতে চাচ্ছে। আরে বোকা বুঝে কী দরকার! পরীক্ষায় আসবে কি না এবং আসলে কী লিখলে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে সেটা বোঝা দরকার – এই হচ্ছে এদের মনোভাব। 

সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় হলো, এই দলটির প্রতি শিক্ষকদের অপ্রতিরোধ্য আবেগ ও আকর্ষণ। শিক্ষকরা যখন এই দলটির প্রতি সংযুক্ত হন, তখন তাদের চেহারায় যেন দ্যুতি খেলে যায়। শিক্ষকরা যেন তাঁদের আকর্ষণ ও আবেগ আটকে রাখতে পারেন না, সেটি তাদের মুখ চোখ আচরণে এতোটাই প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

১ম বেঞ্চের এই দলটির মধ্যে স্পষ্টতই অমানবিক, নির্যাতনকারী, সাইকোপ্যাথিক অ্যান্টিসোশ্যাল চরিত্র বিদ্যমান যারা মানুষের মনে আঘাত দেয় কিন্তু তাদের এর জন্য কোনো অনুশোচনা থাকে না।

৫ম বেঞ্চের রেবেলদের মধ্যেও একটা আত্মসচেতনতা থাকে যে তারা দুষ্ট এবং তারা সেরা নয়। কিন্তু ১ম বেঞ্চের এরা নির্যাতনকারীরা এমপ্যাথিহীন হয়েও মনে মনে করে যে তারা সেরা, তারাই সফল এবং সামনের ভবিষ্যতটা তাদেরই।

প্রশ্ন হলো, কেন শিক্ষকেরা এটা বুঝতে পারেন না বরং তারা যেন গোপনে ঈর্ষা করেন এই দলটাকে। শিক্ষক এবং এই ১ম বেঞ্চের অ্যান্টিসোশ্যালরা মিলে বাংলাদেশের প্রতিটা শ্রেণিকক্ষ পরিণত হয় এক-একটি উপহাস কক্ষে। যেখানে প্রকৃত মেধা ও জ্ঞানচর্চাকে হেয় করে স্মার্টনেস বা চতুরতা, স্মৃতি প্রতিযোগিতা আর দাপুটে রেবেলিয়াস উপহাস সংস্কৃতিকে লালন করা হয়।

কিন্তু কেন শিক্ষকেরা এই ভালো শিক্ষার্থী কিন্তু সমাজবিরোধীদের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে পছন্দ করেন? এর কারণ হতে পারে যেটি কিছুটা বলা হয়েছে আগের পর্বে। আমাদের শিক্ষকেরা বেশিরভাগই চেতনে বা অবচেতনে মনে করেন যে, তাঁরা সমাজে শ্রেষ্ঠতম মেধার অধিকারী। সেটি হতেই পারে বা এই চিন্তা তাঁরা করতেই পারেন। কিন্তু সমস্যা হলো, একই সাথে তারা মনে করেন তাঁরা ব্যর্থ। তাঁরা মনে করেন তাঁরা অবমূল্যায়িত এবং তাঁদের মেধার মূল্য সমাজ দিচ্ছে না। তাঁদের ঠকানো হচ্ছে, সমাজের সব সম্পদ, আনন্দ, উপভোগ অশিক্ষিত ও মেধাহীনেরা ভোগ করে ফেলছে যেটি আসলে তাঁদের পাওনা।

একইসাথে যখন একজন মানুষ ভাবে সে শ্রেষ্ঠতম এবং সে ব্যর্থতম – এই সমমাত্রার বিপরীত বোধ তাকে মানসিকভাবে পঙ্গু ও স্থবির করে ফেলে। তখন সে অন্য মানুষের মাধ্যমে নিজের কল্পিত সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে চায়। অশিক্ষিত মা যেমন চায় তার মেয়েটি শ্রেষ্ঠতম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সনদ পাক। আমাদের শিক্ষকেরাও ভাবেন তাদের জীবনে যে ব্যর্থতা সেটা পুরণ করতে পারবে ১ম বেঞ্চে বসা এই ভাল শিক্ষার্থী ও অ্যান্টিশোসালেরা। কারণ তারা একই সাথে একদিকে চরম মেধাবী (তাঁদের চিন্তায়) এবং অসম্ভব বুদ্ধিমান (চতুর) ও ক্যাপাবল, যাদের দমন করে রাখা যাবে না যেটা তাঁদের নিজেদের ক্ষেত্রে হয়েছে।

আমাদের উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় একটি কারণ হচ্ছে বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের এই অসুস্থ সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি প্রকৃত খোলা মনের জগৎ সম্পর্কে জানতে উৎসাহীদের শুধু অসহযোগিতাই করে না, তাদের প্রতিদিন দলগতাভাবে অপমান করে, অবহেলা করে, তাদের উপহাস করে। আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো ভালো নম্বর পাওয়া সমাজবিরোধী সংস্কৃতির সুতিকাগার।

এই উক্তির প্রমাণ হলো, পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশে মানুষ যতো শিক্ষিত হয় সিভিলিটি, সামাজিক শৃঙ্খলা ততো বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় মানুষ সুশৃঙ্খল হয়। অথচ আমাদের হচ্ছে তার উল্টো। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো সবচেয়ে বেশি দাপট আর মাস্তানির স্থান। একদল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এলে আপনাকে শঙ্কিত হতে হবে, সাবধান হতে হবে। শহরে রাস্তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলোর আচরণও এই অরাজক সংস্কৃতিই প্রকাশ করে।

বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের এই অসুস্থ সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো জ্ঞানার্জনে প্রকৃত উৎসুক ও প্রকৃত মেধাবীদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানার্জনে অনুৎসাহী করে ফেলা। অসুস্থ পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে অনেকেই সেটি থেকে মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। আবার কেউ কেউ কোনোরকমে টিকে থাকলেও তারা পিছিয়ে পড়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। যার ফলে পথ বন্ধ হয় তার উচ্চশিক্ষা লাভের।

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Exit mobile version