জগজ্জীবন বিশ্বাস বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর (প্রশিক্ষক) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ২০০৪ সাল থেকে। পেশায় শিক্ষক-প্রশিক্ষক হলেও তিনি শিক্ষাকর্মী পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তিনি বেসরকারি পর্যায়েও শিক্ষা উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। প্রাথমিক শিক্ষায় অবদানের জন্য তিনি ২০২২ সালে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদকে ভূষিত হন। সংস্কৃতি অঙ্গনেও তিনি পরিচিত মুখ।
এই দীর্ঘ সময়ে তিনি একদিকে যেমন সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী কর্মশালা, পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক সহয়িকা, কারিকুলাম উন্নয়ন ও মূল্যায়ন নির্দেশিকা প্রণয়নের কাজ করেছেন, তেমনি মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও অ্যাকাডেমিক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে শিক্ষকদের দক্ষতাবৃদ্ধিতে তাঁর অবদান রয়েছে।
তিনি শিক্ষাবিষয়ে বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলস থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পাশাপাশি শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে তিনি একদিকে যেমন নানা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন, তেমনি বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ে শিক্ষকদের শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষক ও মেন্টর হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর রয়েছে প্রাক-প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা এবং একইসাথে শিক্ষা বিষয়ে অব্যাহত গবেষণার প্রচেষ্টা। সম্প্রতি শিক্ষা বিষয়ক সাময়িকী ‘শিক্ষাদীক্ষা’ সম্পাদনার মাধ্যমে তৃণমূলের শিক্ষাচিন্তাকে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন তিনি।
সেসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাঁর যে পর্যবেক্ষণ, সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে এই সাক্ষাৎকারে। যেহেতু শিক্ষকদের সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন, তাই এই সাক্ষাৎকারটিতে মূলত শিক্ষকদের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় জানতে চাওয়া হয়েছে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক গৌতম রায়।
গৌতম রায়: আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাদেরকে সাক্ষাৎকার প্রদানে রাজি হওয়ার জন্য। আপনার ফেইসবুকে একটি লেখা আমি দেখতে পেয়েছি, “সমাজে শিক্ষকের চেয়ে কেরানীর কদর বেশী জেনেও শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম।” আমার প্রথম প্রশ্নটি এই বাক্য থেকে শুরু করতে চাই। এই প্রশ্নের তিনটি অংশ। এক. আমাদের সমাজে শিক্ষকের কদর কম কেন বলে আপনি মনে করেন? দুই. প্রত্যেকের কাজের নিজ নিজ গুরুত্ব রয়েছে। সেক্ষেত্রে একজন শিক্ষকের কাজের চেয়ে যদি একজন কেরানীর কাজ গুরুত্বপূর্ণ হয়, যদি তাঁদের কদর বেশি হয়, তাহলে অসুবিধা কী? তিন. একটি পেশাগোষ্ঠীর সঙ্গে আরেকটি পেশাগোষ্ঠীর তুলনা কতোটুকু প্রয়োজনীয়?
জগজ্জীবন বিশ্বাস: আপনাকেও ধন্যবাদ আমাকে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়ার জন্য। আপনি আমার ফেইসবুকে লেখা বাক্যটির সূত্র ধরে তিনটি প্রশ্ন করেছেন, আমি এক এক করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি।
এক. আমাদের সমাজে শিক্ষকের কদর কম নানা কারণে, তবে সবচেয়ে বড় কারণটি শিক্ষার মানের ক্রমাবনতি বলে আমি মনে করি। আমাদের শিক্ষা শিশুদের অতখানি আত্মোপলব্ধি দিতে পারেনি যে শিশু তার শিক্ষককে কদর করবে। অতএব সমাজে শিক্ষকের কদর ক্রমশ কমেছে।
দুই. কেরানীর কাজ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মনে রাখতে হবে শিক্ষক হলেন সকল পেশাজীবী তৈরির কারিগর। আমি কাউকে ছোট করার জন্য তুলনাটা করিনি। আমি এমন অনেককে দেখেছি শিক্ষকতা ছেড়ে কেরানীর চাকরিতে যোগ দিয়েছেন এবং দিব্যি তা নিয়ে গর্ববোধ করছেন। আর্থিক মূল্যে কদর কমবেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক তবুও শিক্ষকতাকে এভাবে উপেক্ষিত হতে দেখলে খারাপ লাগে। আর সেই খারাপ লাগা থেকেই কথাটা ওভাবে বলা।
তিন. এক পেশাগোষ্ঠীর সাথে আরেক পেশাগোষ্ঠীর তুলনা আমি করতে চাই না কিন্তু শিক্ষককে অবশ্যই এগিয়ে রাখতে চাই।
আমাদের শিশুরা যে শিক্ষালাভ করছে, তার ওপর নির্ভর করে সে কতটা সম্পদ হয়ে উঠবে। আর এই শিক্ষার সুযোগ যেহেতু আজও অনেকাংশে শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু শিক্ষককে এগিয়ে না রেখে উপায় নেই। আমি যতোগুলো উন্নত দেশ দেখেছি তাদের উন্নতির মূলে রয়েছে শিক্ষা। তাদের শিক্ষায় বিনিয়োগ ও শিক্ষকের মর্যাদা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমরা যদি প্রকৃত উন্নতি চাই তবে শিক্ষককে অবশ্যই এগিয়ে রাখতে হবে যথার্থ শিক্ষার প্রয়োজনে।
শিক্ষককে কেন এগিয়ে রাখতে চাই তার বহু কারণ আছে। আমার সন্তানকে আমি যে মানুষটির কাছে শিক্ষা গ্রহণের জন্য পাঠাবো, সেই মানুষটি যদি অগ্রসর মানুষ না হন তো আমার সন্তানকে তার কাছে কেন পাঠাবো? আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠিকে জনসম্পদে পরিণত করার তাগিদ থেকেই শিক্ষককে এগিয়ে রাখতে হবে।
আমাদের শিশুরা যে শিক্ষালাভ করছে, তার ওপর নির্ভর করে সে কতটা সম্পদ হয়ে উঠবে। আর এই শিক্ষার সুযোগ যেহেতু আজও অনেকাংশে শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু শিক্ষককে এগিয়ে না রেখে উপায় নেই। আমি যতোগুলো উন্নত দেশ দেখেছি তাদের উন্নতির মূলে রয়েছে শিক্ষা। তাদের শিক্ষায় বিনিয়োগ ও শিক্ষকের মর্যাদা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমরা যদি প্রকৃত উন্নতি চাই তবে শিক্ষককে অবশ্যই এগিয়ে রাখতে হবে যথার্থ শিক্ষার প্রয়োজনে।
গৌতম: আপনি আপনার উত্তরে যা বলেছেন, তাতে মনে হয়েছে, শিক্ষকদের কাজের গুরুত্ব ও মর্যাদা আমাদের সমাজে তুলনামূলকভাবে কম। আপনি জাপান ও যুক্তরাজ্যে লেখাপড়া করেছেন। সেখানে শিক্ষকদের কাজের গুরুত্ব ও মর্যাদা কেমন? আপনার অভিজ্ঞতা থেকে যদি সেসব দেশের অবস্থার ভিত্তিতে বাংলাদেশের শিক্ষককে তুলনা করেন, তাহলে আপনি কী চিত্র দেখতে পান?
জগজ্জীবন: চিত্রটা খুবই হতাশাজনক। উপরোক্ত দেশগুলিতে শিক্ষক হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্ররা, আর আমাদের দেশে তার উল্টোটা। কেবল সেরা ছাত্র হলেই হয় না; শিক্ষক হওয়ার জন্য বিশেষ শিক্ষাও তাদেরকে গ্রহণ করতে হয় বিশেষায়িত কলেজ/বিশ্বাবিদ্যালয় থেকে। শিক্ষকতায় সেরা ছাত্ররা আসে কারণ শিক্ষককে রাষ্ট্র ও সমাজে সেরার মর্যাদা দেওয়া হয় ওসব দেশে। আর্থিক মূল্যেও শিক্ষকতাকে কদর করে ওসব দেশ।
অপরদিকে, আমাদের দেশে শিক্ষক হতে কোনো বাড়তি যোগ্যতা লাগে না। যেকোনো বিষয়ে ন্যূনতম গ্রাজুয়েট হলেই হলো। আর ওই যে, কেরানীর কদর বেশি সেটা মূলত আর্থিক বিচারে। রাষ্ট্র আজও কৃষিকাজ বা পশুপালনে যতওটা গুরুত্ব দিচ্ছে, মানব সন্তান প্রতিপালনে ততটাই উদাসীন! সেজন্য শিক্ষায় বিনিয়োগকে অপচয় মনে করে রাষ্ট্র! এর মধ্যে যে দু-একজন মানব সন্তান ভালোমানের শিক্ষা অর্জন করছে, তা পরিবারের উদ্যোগের ফল।
জাপানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা একটি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত পেশা। শিক্ষক হতে হলে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স এবং প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষার মধ্যদিয়ে যেতে হয়। শিক্ষকের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে রয়েছে উচ্চ সম্মানের ব্যবস্থা। জাপানিজ সেনসেই বা স্যার শব্দটি কেবল শিক্ষকদের জন্যই ব্যবহার করা হয় বিশেষ সম্মানার্থে।
যুক্তরাজ্যেও প্রাথমিক শিক্ষক হতে হলে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রয়োজন যা বেশ শ্রমসাধ্য। অন্যদিকে শিক্ষকদের জন্য রয়েছে তুলনামূলক ভালো বেতন, শক্তিশালী পেনশন, প্রশিক্ষণ, স্থিতিশীল ক্যারিয়ার আর উচ্চ সামাজিক মর্যাদা। এভাবেই মানব শিশুর প্রতিপালন এবং শিক্ষায় এসব দেশ অধিকতর যোগ্যদেরকে জায়গা করে দিয়েছে অত্যন্ত সচেতনভাবে।

গৌতম: আপনি যদি বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদের তুলনা করেন, তাহলে সেখানে কাজের গুরুত্ব ও মর্যাদা বিষয়ে কী পার্থক্য দেখতে পান?
জগজ্জীবন: এটাও এক মজার ব্যাপার প্রাথমিকের শিক্ষক সবচেয়ে অবহেলিত! যারা শিক্ষার ভিত্তি রচনা করেন, তারা হলেন সবচেয়ে কম মর্যাদাবান! এভাবে ক্রমান্বয়ে মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকগণ অধিক মর্যাদা পেয়ে থাকেন। অথচ সকলেই শিক্ষক! রাষ্ট্রীয়ভাবেই এমন বৈষম্যমূলক বিধিব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে!
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা যে উপরের স্তরের তুলনায় অধিক সংবেদনশীল, এই সত্যটি স্বীকার করতেও অনেকের আপত্তি। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষককে একধরনের তাচ্ছিল্য করবার প্রবণতা দৃশ্যমান। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় যারা নিয়োজিত তাদের অধিকাংশের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা না থাকলেও শিক্ষককে সব ধরনের নির্দেশনা প্রদান করেন তারাই!
অন্যদিকে যেকোনো বিশেষজ্ঞ পরামর্শের জন্য ডাকা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সাথে যাঁর কোনো সংযোগ নেই। একইভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষককেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় না! শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ভার অশিক্ষকের উপরই ন্যস্ত!
তুলনামূলক সম্মানজনক অবস্থানে থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণও শিক্ষকতার পরিবর্তে নানাবিধ প্রশাসনিক ক্ষমতার চর্চাকে অধিক সম্মানজনক মনে করেন! কাজেই গুরুত্ব ও মর্যাদার বিচারে প্রশাসনিক কর্মকর্তাও শিক্ষকের তুলনায় এগিয়ে! আবার শিক্ষকদের মধ্যে এগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তারপর মাধ্যমিক স্তর এবং সবার নিচে প্রাথমিক শিক্ষক।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা যে উপরের স্তরের তুলনায় অধিক সংবেদনশীল, এই সত্যটি স্বীকার করতেও অনেকের আপত্তি। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষককে একধরনের তাচ্ছিল্য করবার প্রবণতা দৃশ্যমান। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় যারা নিয়োজিত তাদের অধিকাংশের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা না থাকলেও শিক্ষককে সব ধরনের নির্দেশনা প্রদান করেন তারাই!
গৌতম: প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় – এই তিন পর্যায়ে শিক্ষকদের কাজ তিন ধরনের হওয়ার কথা। আপনি কি মনে করেন, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সচেতনভাবে একেক পর্যায়ে শিক্ষককে একেকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি? দিলে সেটি কি যথাযথ হচ্ছে? এ ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ কী?
জগজ্জীবন: তিন পর্যায়ে কাজের পার্থক্য আছে ঠিকই কিন্তু শিক্ষক হওয়ার মানদণ্ডে কোনো পর্যায়েই কমবেশি করার সুযোগ নাই। অর্থাৎ যিনি শিক্ষক হবেন তাঁকে শিক্ষক হবার একটা মান অর্জন করেই আসতে হবে যদি আমরা ভালোমানের শিক্ষা চাই। সেজন্য আমি সব পর্যায়ের শিক্ষককে সমান গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে। কাজের বিভিন্নতা থাকবেই কিন্তু শিক্ষক হিসেবে আমরা তাঁকে সেই মানদণ্ডে মেপে দেখব যে মানে আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে যাবার প্রত্যাশা করি।
গৌতম: প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের সঙ্গে আপনার দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার ভিত্তিতে বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের দক্ষতা, গুরুত্ব ও মর্যাদা প্রসঙ্গে কী কী চাহিদা রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
জগজ্জীবন: গুরুত্ব ও মর্যাদা প্রসঙ্গে চাহিদা তো আকাশ সমান! কিন্তু শিক্ষকদের দক্ষতার বিচার করতে গেলে আপনি হতাশ হবেন। আপনি হয়তো সম্প্রতি আমাদের নবনিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রীর সাথে শিক্ষকনেতাদের সাক্ষাতের ভিডিওটি দেখেছেন। মন্ত্রীমহোদয় বারবার একটি প্রশ্ন করেছেন তা হলো, শিক্ষার উন্নয়নে শিক্ষকের প্রতিশ্রুতি কী? অথচ সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর কোনো শিক্ষকনেতা দেননি বা দিতে পারেননি।
গৌতম: এসব চাহিদা নিরসনে সরকার ও সমাজ কী করতে পারে? আমি আপনার পরিকল্পনা জানতে চাই।
জগজ্জীবন: সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজেরই লাভ। সেজন্য আর্থিক বিচারেও শিক্ষককে মর্যাদা প্রদানের জায়গাটি নিশ্চিত করা জরুরি। আমি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য প্রচলিত গ্রেড দিয়ে শিক্ষককে মূল্যায়ন করার পক্ষপাতি নই। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা প্রজাতন্ত্রের চাকর।
আমি মনে করি, শিক্ষককে চাকরতুল্য ভাবলে তাঁকে দিয়ে শিক্ষকতা হবে না। শিক্ষককে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং দৃশ্যমানভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয় যাতে স্থানীয় চাহিদার আলোকে জাতীয় শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে নিজস্ব পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এগোতে পারে সেরকম সক্ষমতা ও সুযোগ দিতে হবে। আর জবাবদিহিতার জায়গাটিকে খুব স্পষ্ট করতে হবে।
একই সাথে শিক্ষককের জন্য আলাদা ও সম্মানজনক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে যাতে শিক্ষক হিসেবে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারে। এসব কাজে সরকারকে প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষকতার মানদণ্ডে প্রতিনিয়ত শিক্ষকের মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে এবং অযোগ্যদের পেশা বদলের সুযোগ দিতে হবে বাধ্যতামূলকভাবে। যাতে শিক্ষকের মর্যাদা সমুন্নত রাখা যায়।
গৌতম: আমি আপনার পরামর্শগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে মোটামুটি একমত। প্রশ্ন হলো, আমাদের শিক্ষক সমাজও কি তাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন? কিছু সাধারণ অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। যেমন, অনেক শিক্ষক ঠিকমতো ক্লাসে পড়ান না, অনেকে দক্ষতা কম, অনেকে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি অন্যান্য কাজের সঙ্গে যুক্ত ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব অভিযোগ সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? এসব সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে শিক্ষকদের প্রতি আপনার কোনো পরামর্শ রয়েছে?
জগজ্জীবন: এসব সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অনেকেই সচেতন। কিন্তু আমাদের এককেন্দ্রিক শিক্ষাকাঠামোয় শিক্ষকের স্বাধীনতা নেই বললেই চলে। স্বাধীনতা না থাকলে জবাবদিহিতাও তৈরি হয় না। শিক্ষকগণ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে যখন যেটুকু করতে বলা হয় তাই করেন। নিজেরা তেমন কিছুই ভাবেন না বা পরিকল্পনা করেন না।
কাজেই জবাবদিহিতার প্রশ্নে সকলেরই একই উত্তর কর্তৃপক্ষ যেভাবে নির্দেশ দিয়েছে সেভাবেই তো কাজ করেছি, ভালোমন্দের দায় তো আমার না। শিক্ষার বেসরকারি উদ্যোগগুলো অনেক ক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়েছে। তাদের সফলতার মূলে রয়েছে স্থানীয় চাহিদার আলোকে নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা ও জবাবদিহিতা। তাদের শিক্ষকগণের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারা বদ্ধপরিকর।
সর্বোপরি শিশুর অভিভাবকদের সাথে তাদের যোগাযোগটা নিবিড়। অন্যদিকে সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকগণ নিজেদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও কতৃপক্ষের মুখাপেক্ষি। কোনো সংকটের আশু সমাধান তাদের দ্বারা সম্ভব হয় না। তাঁরা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকেন। এজন্য একই শিক্ষক বিদ্যালয়ে ভালো পাঠদান না করলেও কোচিং সেন্টারে সেরা শিক্ষক হয়ে ওঠেন।
শিক্ষককে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং দৃশ্যমানভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয় যাতে স্থানীয় চাহিদার আলোকে জাতীয় শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে নিজস্ব পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এগোতে পারে সেরকম সক্ষমতা ও সুযোগ দিতে হবে। আর জবাবদিহিতার জায়গাটিকে খুব স্পষ্ট করতে হবে।
গৌতম: শিক্ষকদের বেতন তো গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়, বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন অত্যন্ত কম। এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত কী? যদি শিক্ষকদের বেতন অনেক বাড়ানো হয়, আপনি কি মনে করেন, তাতে শিক্ষকদের গুণগত মান অনেক বাড়বে? শিক্ষকদের বেতনের সঙ্গে কি তাদের মর্যাদার সম্পর্ক রয়েছে?
জগজ্জীবন: শিক্ষকের বেতন বাড়ালে গুণগত মান বাড়বে এমন আশা করার কোনো কারণ নেই। তবে বেতনের সাথে সামাজিক মর্যাদার সম্পর্ক রয়েছে। শিক্ষকদের মান বাড়াতে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কাজের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করতে হবে।
গৌতম: বাংলাদেশের প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের কাজের চাপ অনেক বেশি, এমনটা বলা হয়ে থাকে। আপনিও কি তাই মনে করেন? বিশেষত, অনেকে বলেন যে, শিক্ষকদেরকে শিক্ষার বাইরে নানা ধরনের কাজ করতে হয়। যেমন, জরিপ করা, বা নির্বাচনের কাজ করা ইত্যাদি। আপনি কি মনে করেন, এসব কাজ শিক্ষকদের স্বাভাবিক শিক্ষার কাজকে ব্যাহত করে?
জগজ্জীবন: এটার সাথে আমি একমত। শিক্ষককে কেনো শিক্ষকতার বাইরে অন্যান্য কাজে ব্যবহার করবে রাষ্ট্র? এটা শিক্ষকতার কাজকে অবশ্যই ব্যাহত করে।
গৌতম: আপনি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, দিচ্ছেন। এসব প্রশিক্ষণ শিক্ষকরা কতোটুকু গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেন? প্রশিক্ষণের পর শিক্ষকরা কি তাদের অর্জিত জ্ঞান শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করতে পারেন?
জগজ্জীবন: ওই যে বললাম, শিক্ষক তো স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। কাজেই প্রশিক্ষণও তিনি নেন কতৃপক্ষের নির্দেশে। তাঁর প্রয়োজন বা চাহিদা এক্ষেত্রেও উপেক্ষিত। সেজন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োগেও তাঁর কোনো দায় নেই!

গৌতম: আপনি বলেছেন, শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত অনেককিছুই শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করতে পারেন না। সেক্ষেত্রে কী করণীয়? শিক্ষকরা যাতে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারেন, সেজন্য সরকার, স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রধান শিক্ষক বা অভিভাবকরা কী করতে পারেন?
জগজ্জীবন: শিক্ষা ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে পরিবর্তন না হলে কিছুই করার নেই। শিক্ষাকে শিক্ষকের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্তরে অশিক্ষকের দৌরাত্ম বন্ধ করতে হবে। শিক্ষা প্রশাসনের বড়কর্তা যিনি কোনোদিন শিক্ষকতা করেননি বা শ্রেণিকক্ষের বর্তমান বাস্তবতার সাথে পরিচিত নন, তিনি যখন শিক্ষককে নির্দেশ দেন তখন প্রকৃত শিক্ষকের পক্ষে তা হজম করা কঠিন হয়ে ওঠে। আপনি ভাবেন তো কৃষিকাজে অনভ্যস্ত কেউ যখন কৃষকের জন্য উপদেশ নিয়ে হাজির হন তখন কী পরিণতি হয় ফসলের!
এক্ষেত্রে জাপান ও যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতাকে খুব প্রাসঙ্গিক মনে করি। শিক্ষার প্রতিটি স্তরের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা প্রণয়ন করা এবং সেটিকে মানদণ্ড ধরে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে স্থানীয় চাহিদা ও সুযোগকে শিক্ষাক্ষেত্রে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
আমরা যদি দেশের দু-একটি সফল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে দৃষ্টি দিই, তাহলেও ব্যাপারটি অনুধাবন করতে পারবো। যেমন, প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শহরগুলোতে কিছু বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন বেশ ভালো করছে এবং অভিভাবকগণ অনেক টাকা খরচ করে সেসব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের পাঠাচ্ছেন।
এদের সাফল্যের পেছনে কিন্তু শিক্ষাবিজ্ঞান বা পেডাগজির কোনো ম্যাজিক নেই। বরং এইসব প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও ভালো করছে তাদের নিজস্ব পরিকল্পনার কারণে। তারা নিজেদের শিক্ষা-পরিকল্পনা নিজেরাই প্রণয়ন করে। প্রয়োজনে তারা জাতীয় শিক্ষাক্রমকেও পাশে ফেলে এগিয়ে যায়! তারা প্রাধান্য দেয় স্থানীয় শিশু এবং অভিভাবকদের চাহিদাকে।
আর নিজেদের বাণিজ্যিক সাফল্য বা টিকে থাকার লড়াইকে। আর তাদের নিজস্ব পরিকল্পনায় এসব অগ্রাধিকারকে তারা কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে কোনোরকম কর্তৃপক্ষীয় নির্দেশনার অপেক্ষা না করেই। নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাদের প্রচেষ্টাও তাই আন্তরিক।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও সম্পদের যোগান থাকা সত্ত্বেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে অক্ষম! সুতরাং শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক তার শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অক্ষমতাকে মেনে নিয়ে নির্বিকার দিন কাটায়।
শিক্ষা প্রশাসনের বড়কর্তা যিনি কোনোদিন শিক্ষকতা করেননি বা শ্রেণিকক্ষের বর্তমান বাস্তবতার সাথে পরিচিত নন, তিনি যখন শিক্ষককে নির্দেশ দেন তখন প্রকৃত শিক্ষকের পক্ষে তা হজম করা কঠিন হয়ে ওঠে। আপনি ভাবেন তো কৃষিকাজে অনভ্যস্ত কেউ যখন কৃষকের জন্য উপদেশ নিয়ে হাজির হন তখন কী পরিণতি হয় ফসলের!
আমাদের সকল শিক্ষকের বা সকল বিদ্যালয়ের অতটা সক্ষমতা নেই জানি। আর সেজন্যই তো ক্লাস্টার, উপজেলা ও জেলাভিত্তিক আমার মতো শিক্ষাকর্মীরা নিয়োজিত তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। অথচ আমরাও নির্বিকার কর্তৃপক্ষের আজ্ঞাবাহী! আর অশিক্ষক কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকের চাহিদা কিংবা গবেষণাজাত জ্ঞানকে পাশে রেখে ব্যস্ত থাকেন নানাবিধ অভিনব কায়দায় রাতারাতি শিক্ষার উন্নয়ন ঘটাতে।
আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলব, শিক্ষকরা যাতে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারেন, সেজন্য সরকার, স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রধান শিক্ষক বা অভিভাবক সবাই মিলে শিক্ষককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে এবং প্রয়োজনে শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে সহায়ক হিসেবে, কর্তৃত্ব ফলাতে নয়।
গৌতম: প্রশ্নটি এখন আপনাকেই সরাসরি জিজ্ঞাসা করি। আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলসে লেখাপড়া করেছেন। সেখান থেকে আপনি যা শিখেছেন, সেগুলো কি আপনার কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারছেন? না পারলে সমস্যাটি কোথায়?
জগজ্জীবন: কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মতো কাজ করতে হয় আমাদের এখানে কোনো বাড়তি যোগ্যতা বা চিন্তাশীলতা প্রয়োগের সুযোগ নেই। এখানে শিক্ষক বা প্রশিক্ষক বা অ্যাকাডেমিক কাজে দক্ষ লোকজনের কোনো গুরুত্ব নেই। এখানে প্রশাসকের নির্দেশই শেষ কথা! এখন বুঝতে পারছেন আমার ফেসবুকে লেখা বাক্যটি কেনো?

গৌতম: একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। আপনি গ্রামপর্যায়ে শিক্ষকদের সঙ্গে যেমন কাজ করেছেন, তেমনি শহরপর্যায়েও শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। গ্রাম ও শহরের শিক্ষকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতে পান কি?
জগজ্জীবন: উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য নেই। তবে গ্রামে বেসরকারি উদ্যোগ কম বলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপরই ভরসা করেন অভিভাবকেরা। শহরে বহু বিকল্প আছে তাই বিদ্যালয়ের শিক্ষকের ওপর নির্ভরতা কম।
গৌতম: আমি যদি আপনাকে এভাবে জিজ্ঞাসা করি যে, দুই যুগ আগে যখন আপনি শিক্ষাসেক্টরে কাজ শুরু করেছিলেন, তখন বাংলাদেশের শিক্ষার ও শিক্ষকদের যে মান ছিলো, দুই যুগ পর কি আপনি একই মান দেখতে পান? এই পার্থক্যটুকু কেন হলো?
জগজ্জীবন: একই মান দেখতে পাই কি না জানতে হলে তো একটা মানদণ্ড থাকতে হবে। আমাদের আজও কোনো স্বীকৃত মানদণ্ড নেই। অতএব মানের বিচার করার সুযোগ নেই। শুধু এটুকু খালি চোখে দেখতে পারি আমাদের শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা তলানিতে। আর একটা পরিবর্তন দেখতে পাই তা হলো বহু বিকল্পধারা তৈরি হয়েছে শিক্ষার। ফলে একধারার সাথে আরেক ধারার ব্যবধানও বেড়েছে। আর এভাবে একই দেশে নানা ভাবধারার সমাবেশে এক বিচিত্র ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। যেখানে রাষ্ট্রেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই!
দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ হিসেবে শিক্ষক শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন। যারা শিক্ষক হবেন তারা যেন ন্যূনতম একটা বিশেষায়িত ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষক হবার প্রতিযোগিতায় নামেন এটা নিশ্চিত করতে হবে।
গৌতম: আমরা সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে। বাংলাদেশের শিক্ষকদের মান ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে স্বল্প-মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
জগজ্জীবন: শিক্ষকদের মান বৃদ্ধি পেলে মর্যাদা এমনিতেই বাড়বে। সেজন্য শিক্ষকদের মান নির্ণয়ের একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড নির্ধারণ করা আগে দরকার। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে এই মানদণ্ড নির্ধারণ ও সেই আলোকে সকল স্তরের শিক্ষকের মান যাচাইয়ের কাজটি করা যেতে পারে। এতে শিক্ষকগণ রাজি নাও হতে পারেন কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থে কাজটি করা জরুরি মনে করি।
অতঃপর, মানবিচারে কাউকে অযোগ্য মনে হলে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তাকে সেই মান অর্জনের সুযোগ দেওয়া এবং তাতেও সফল হতে না পারলে বিকল্প পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এরপরই শিক্ষকদের জবাবদিহিতার বিষয়টি খুব স্পষ্ট করতে হবে। আর জবাবদিহিতার জন্য শিক্ষককে কাজের স্বাধীনতা দিতে হবে তার নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে। অশিক্ষকের খবরদারি থেকে শিক্ষককে রক্ষা করতে হবে।
মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ হতে পারে শিক্ষকদের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন পরিকল্পনার বিকেন্দ্রীকরন। অর্থাৎ স্থানীয় চাহিদার আলোকে বিদ্যালয়কে স্বাধীনভাবে বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের সুযোগ দিতে হবে। স্থানীয়ভাবে একটি বিশেষজ্ঞ দল সেই পরিকল্পনা যাচাই ও অনুমোদন করবে এবং এর আলোকেই শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ হিসেবে শিক্ষক শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন। যারা শিক্ষক হবেন তারা যেন ন্যূনতম একটা বিশেষায়িত ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষক হবার প্রতিযোগিতায় নামেন এটা নিশ্চিত করতে হবে।
গৌতম: আমার শেষ প্রশ্ন। বাংলাদেশের শিক্ষা ও শিক্ষকদের নানা বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, সেগুলোর কতোটা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে এবং কতোটা গবেষণার ওপর ভিত্তি করে। এক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?
জগজ্জীবন: শিক্ষাবিষয়ক সিদ্ধান্ত গবেষণালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতেই হওয়া দরকার কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ভাবনা ও ব্যক্তি অভিজ্ঞতার প্রতিফলনই প্রাধান্য পায়। আমাদের শিক্ষা গবেষণার ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষাবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
গৌতম: সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ করার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আশা করি, আপনার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতালব্ধ মতামত থেকে অনেকে উপকৃত হবেন।
জগজ্জীবন: আপনাকেও ধন্যবাদ।
লেখক পরিচিতি
গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

