স্বামী বিবেকানন্দ
স্বামী বিবেকানন্দ, ছবিসূত্র: eibela.com

বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ! সাধারণের কাছে এটিই তাঁর পরিচয়। কেউ আরেকটু ভেতরে ঢুকলে বলতে পারেন মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক কিংবা দার্শনিক। কেউ কেউ আবার দেবতা জ্ঞান করে এই মানুষটিকে সাধারণের থেকে আলাদা করে মন্দিরের লোক বানিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু বিবেকানন্দকে শিক্ষাবিদ হিসেবে কেউ বোধহয় খুব একটা ভাবেন না। অথচ বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শন অনেক বড় বড় শিক্ষাবিদের চিন্তার ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি দেড়শো বছর আগে যা ভেবেছেন, অনেক শিক্ষাবিদ তা এখন বলছেন এবং নিজের বলে দাবি করছেন।

বিবেকানন্দের জন্মের বেশ আগে পশ্চিমা শিক্ষাভাবনায় ‌‘Blank slate’ বলে একটি কথা খুব প্রচলিত ছিলো। John Locke নামক একজন পশ্চিমা চিন্তাবিদ এ-কথা বলে খুব জনপ্রিয় হলেন। অনেকে শুনলেনও তাঁর কথা। তার মানে, শিশু খালি মাথা নিয়ে জন্মায় আর দিনে দিনে নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে শেখে। শিশু অনেক শক্তি আর সামর্থ্য নিয়েই জন্মায়—প্রকারান্তরে তিনি তা অস্বীকার করলেন। তাঁর এ ভাবনা বিবেকানন্দের কথায় উড়ে যায় যখন তিনি শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বললেন, “Education is the manifestation of the perfection already in man”।

তার মানে, শিশুর শক্তি-সামর্থ্য জন্মগতভাবেই পাওয়া আর আমাদের কাজ হলো তার বিকাশ সাধনে কাজ করা। এটুকু অনুধাবন করতে পারলে কোন কৌশলে তা করা যায় তার একটি পথ ঠিকই বের করা যায়। অথচ বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শন নিয়ে এই কথা অনেকেই শুনলেন না, যারা শুনলেন তাদের খুব কমই তা কাজে লাগাতে পেরেছেন। বহু পশ্চিমা পণ্ডিত বিবেকানন্দের সাথে একই সুরে কথা বলেছেন। এখন আমরা শুনছি শিক্ষায় মানুষের innate ability-এর কথা (Noam Chomsky)। বর্তমান শিক্ষাভাবনা এ দর্শনের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে বলা যায়।

আমরা নিজেরা কতোটুকু মানুষ হয়ে উঠেছি, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু শিশুদের আমাদের মতো করে ‘মানুষ’ করতে আমরা চেষ্টা করি। ভুলে যাই যে, তাদেরকে ‘মানুষ’ করার ধৃষ্টতা আমরা দেখাতেই পারি না। বিবেকানন্দ গাছের চারার বেড়ে ওঠার উদাহরণের মাধ্যমে চমৎকারভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। আমরা কেবল বেড়ে ওঠার পথের বাধাগুলো সরিয়ে দিতে পারি। যেমন, মাটি খুঁড়ে দেওয়া বা বেড়া দিয়ে দেওয়া। এর বেশি আর কিছুই নয়। বাকিটুকু আপনা-আপনিই হয়, শিশুর অন্তর্নিহিত প্রকৃতি অনুসারেই তার শিক্ষা ও বিকাশ ঘটে। তাঁর অন্তত এ-কথাটি যদি বিবেচনায় রাখি, “কেউ কাউকে শেখাতে পারে না। শিক্ষাকে শেখাচ্ছি বললেই সব মাটি। শিশুর ভিতরেও সব আছে। কেবল সেইগুলি জাগিয়ে দিতে হবে—এইমাত্র শিক্ষকের কাজ।”


আমরা নিজেরা কতোটুকু মানুষ হয়ে উঠেছি, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু শিশুদের আমাদের মতো করে ‘মানুষ’ করতে আমরা চেষ্টা করি। ভুলে যাই যে, তাদেরকে ‘মানুষ’ করার ধৃষ্টতা আমরা দেখাতেই পারি না। বিবেকানন্দ গাছের চারার বেড়ে ওঠার উদাহরণের মাধ্যমে চমৎকারভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।


কালে কালে শিশুশিক্ষায় অনেক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে মুক্তি মেলেনি। শিশুকে নিজের মতো করে ভাবতে ও বাড়তে তো দিই-ই না, বরং আমাদের ভাবনাগুলোকে ওদের ওপর চাপাতে থাকি। অন্তর্নিহিত পূর্ণত্বের বিকাশে সাহায্য না করে আমরা শিশুদের তথ্যভাণ্ডার বানাতে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার ফাঁদে ফেলে দিই। বিবেকানন্দ বলেছেন, “তথ্য সংগ্রহ করাই যদি জ্ঞান হয়, তাহলে লাইব্রেরির থেকে জ্ঞানী তো আর কেউ নেই।”

পশ্চিমা মনীষি B. F. Skinner জানালেন, মানুষ শেখে বারবার অনুশীলনের মাধমে। তাঁর মত অনুসারে মানুষ আর অন্য প্রাণীর শিক্ষায় বিশেষ কোনো প্রভেদ রইলো না। তিনি অবশ্য নিজ দেশেই ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে পড়লেন এবং পরে অনেকে প্রমাণ করলেন যে, তিনি মোটেও গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেননি। এদিকে বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শন অনুসারে, “বহির্জগৎ কেবল তোমার নিজ মনকে অধ্যয়ন করবার উত্তেজক কারণ-উপলক্ষ্য মাত্র, তোমার নিজ মনই সর্বদা তোমার অধ্যয়নের বিষয়।” এই সত্যিটা পশ্চিমা মনীষীরা জানালেন এতো পরে!

আমরা মুখে শিশুকেন্দ্রিক শ্রেণীকক্ষ তৈরির কথা বলছি, আর বাস্তবে গায়ের জোরে সবকিছু মুখস্থ করানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছি। যে যতো মনে রাখতে পারে, তাকে ততোটা মেধাবী বলছি। অথচ সে কিছু সৃষ্টি করতে পারছে কি-না, তা খুব একটা আমলে নিচ্ছি না। অনেকগুলো বই মুখস্ত করে পাশের পর পাশ দিয়ে চাকরি জোটাবার শিক্ষার দিকে হাঁটছি সবাই। কেরানি তৈরির যে শিক্ষাকে স্বামীজী কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন, তারই আদলে চলছে নতুন ধারার শিক্ষা।

বিবেকানন্দ ভারত ঘুরে জানলেন জনমানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা। দেখলেন, কীভাবে শ্রেণিবৈষম্য সাধারণ মানুষকে কোণঠাসা করে রেখেছে। কীভাবে সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষগুলো শিক্ষা থেকে, সকল আর্থ-সামাজিক সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত। তিনি তাঁর পরিব্রাজক গ্রন্হে লিখলেন, “এরা সহস্র সহস্র বৎসর অত্যাচার সয়েছে, নীরবে সয়েছে- তাতে পেয়েছে অপূর্ব সহিষ্ণুতা। সনাতন দুঃখ ভোগ করেছে- তাতে পেয়েছে অটল জীবনীশক্তি। এরা একমুঠো ছাতু খেয়ে দুনিয়া উল্টে দিতে পারবে; আধখানা রুটি পেলে ত্রৈলোক্যে এদের তেজ ধরবে না; এরা রক্তবীজের প্রাণ-সম্পন্ন। আর পেয়েছে অদ্ভূত সদাচার বল, যা ত্রৈলোক্যে নাই। এত শক্তি, এত প্রীতি, এত ভালোবাসা, এত মুখটি চুপ করে দিনরাত খাটা এবং কার্যকালে সিংহের বিক্রম!”

তিনি এই খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের শক্তিকে পুঁজি করলেন। পরামর্শ দিলেন আধুনিক শিক্ষার, জোর দিলেন বিজ্ঞানশিক্ষার প্রতি। আর নিশানা করলেন সমাজের শিক্ষিত, সম্পদশালী মানুষদের যারা এতোকাল ঠকিয়ে এসেছেন নীরিহ মানুষদের। সমাজের উপরতলার মানুষদের আত্মিক উন্নয়নের মাধ্যমে মানবিক বোধসম্পন্ন করে চালান করলেন সাধারণ মানুষের সেবার কাজে। কোনো পক্ষকে কারও বিরুদ্ধে না নামিয়ে তাদের বিদ্যমান শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উভয়ের মঙ্গল সাধনের পথ দেখিয়ে দিলেন।

বিবেকানন্দ দেখলেন, যুবসমাজের পেটে খাবার নেই, গায়ে বল নেই, মগজে বিদ্যে নেই, জীবনে কিছু করার স্বপ্নও নেই। বিজ্ঞানচর্চা তো নেই-ই। যার ইহজগৎই নেই, সে পরকালের সঞ্চয় হিসেবে ধর্ম পালন করে যাচ্ছে। খালি পেটে হরি হরি বলে কীর্তন করছে আর অহেতুক লাফাচ্ছে। এই অশিক্ষিত, আত্মবিশ্বাসহীন লক্ষ্যভ্রষ্ট যুবসমাজকে জাগিয়ে তুলতে তিনি যেন একটু ঝাঁকুনি দিলেন। এদের উদ্দেশ্যেই পরামর্শ দিলেন, গীতা পাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলা শ্রেয়। তাতে শরীর গঠন হবে। আর সবল দেহ যেকোনো ভালো কাজের পূর্বশর্ত।


মেরুদণ্ড ঠিক থাকলে বাকি সব এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়। আর হালে চলছে শিক্ষার বাণিজ্যিকিকরণের উৎকৃষ্টতম কর্মযজ্ঞ। বিবেকানন্দ চেয়েছিলেন শিক্ষাকে দরিদ্র বালকের দরজায় পৌঁছে দিতে। এটি অনেকখানি কাজে এসেছে বহুবিধ সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টায়। তবু হাজারো শিশু রয়ে গেছে শিক্ষার আলোর বাইরে।


মেরুদণ্ড ঠিক থাকলে বাকি সব এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়। আর হালে চলছে শিক্ষার বাণিজ্যিকিকরণের উৎকৃষ্টতম কর্মযজ্ঞ। বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শন থেকে জানা যায়, তিনি চেয়েছিলেন শিক্ষাকে দরিদ্র বালকের দরজায় পৌঁছে দিতে। এটি অনেকখানি কাজে এসেছে বহুবিধ সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টায়। তবু হাজারো শিশু রয়ে গেছে শিক্ষার আলোর বাইরে। তিনি আরও চেয়েছিলেন পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানশিক্ষা আর প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতার মিশেলে আদর্শ মানুষ তৈরি করতে। বিজ্ঞানশিক্ষা এসেছে অনেকখানি, কিন্তু আধ্যাত্মিকতা জায়গা হারিয়েছে প্রায় পুরোটাই। তাই শিক্ষিতজনে নগদ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা যতোটা প্রবল, মানবসেবার ভাবনা ততোটাই মলিন। প্রচলিত শিক্ষায় আর্থিক উন্নয়ন হচ্ছে বেশ, তবে সেটিকে আত্মিক উন্নয়নে রূপ দিতে হবে। এখানেই বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শনের প্রাসঙ্গিকতা অবশ্যম্ভাবী।

বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শন থেকে বুঝা যায়, একজন গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে কী চমৎকারভাবে সে-সময় কতো আধুনিক চিন্তার পরিচয় দিয়েছেন দারিদ্র্য বিমোচনে তাঁর চিন্তা ও কাজের মাধ্যমে! তিনি দারিদ্র্য দূরীকরণের মূল জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাধারণ মানুষকে জাগিয়ে তোলার মাধ্যমে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিব্যবস্থায় আধুনিকায়নের কথা বললেন। বললেন, সাধারণ মানুষকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসতে। সাধারণ মানুষের জেগে ওঠার মাঝেই দেখলেন জাতীয় জাগরণ! যুবকদের পরামর্শ দিলেন কেরানি তৈরির শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়ে বিজ্ঞানমনষ্ক হতে, যা দিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখা যায়। তিনি চাকরি না খুঁজে কাজ তৈরি করার উপদেশ দিয়েছিলেন সেই কালে। আর এতো পরে এসে এখন আমরা শুনছি চাকরি না খুঁজে উদ্যোক্তা হতে পরামর্শ দিচ্ছেন বিজ্ঞজনেরা। কারণ, এতো চাকরি তো এখন নেই!

শিক্ষাই হোক উন্নয়নের মূল হাতিয়ার। সে উন্নয়ন হোক ভেতরে ও বাইরে। বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের মাধ্যমে হোক আমাদের আত্মিক ও আর্থিক উন্নয়ন। আর বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শন ছাতার মতো আগলে রাখুক সেই উন্নয়নের ধারা। আমাদের অন্তর্নিহিত পূর্ণত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করুক—এটিই হোক আজ আমাদের প্রত্যাশা।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here