শিক্ষাক্রম ও পুস্তক

বই পর্যালোচনা: তোত্তোচান জানালার ধারে ছোট্ট মেয়েটি

তোত্তোচান
তোত্তোচান; ছবিসূত্র: দুন্দুভি
লিখেছেন গৌতম রায়

জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় একজন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব তেৎসুকো কুরোয়ানাগি। তিনি তাঁর শৈশবের বিদ্যালয়কে ঘিরে যে স্মৃতিকথা লিখেছেন, তাই-ই তোত্তোচান। এই স্মৃতিকথার মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি, শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কত সুন্দর সব চিন্তাভাবনা করা সম্ভব। এই বইটি বাবা-মা, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও সকল ধরনের মানুষের জন্যই অবশ্যই পাঠ্য একটি বই।

তোত্তোচান এমন একটি বাচ্চা মেয়ে যার কি না ছিলো নিজস্ব এক জগৎ। সেই জগতে সে প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খেতো। যার কি না ক্লাসের পাঠ বাদ দিয়ে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে লাগত ভীষণ ভালো। এমন শিশুকে কি বিদ্যালয়ে রাখা যায়? তাই তো তাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল বিদ্যালয় থেকে। কিন্তু এই বের করে দেওয়াটিই তাকে দিয়েছিল সুবর্ণ এক সুযোগ।

এই সুবর্ণ সুযোগ প্রদান করেছিলেন সোশাকু কোবাইয়াশি যে কি না তোমায়ে গাকুয়েন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তোমায়ে গাকুয়েন বিদ্যালয় ছিলো প্রতিটি শিশুর স্বপ্নের মতো এক বিদ্যালয়।


সেই তোত্তোচানকেই কি না প্রধান শিক্ষক কোবায়েশি বলেন, তুমি সত্যিই খুব ভালো মেয়ে। কোবাইয়াশি মশায় তোত্তোচানকে এতোবার এই কথাটি বলেন যে, তোত্তোচানের নিজেরও মনে হতো সে খুব ভালো মেয়ে। যেহেতু সে খুব ভালো মেয়ে, তাই কোনো খারাপ কাজ সে করতে পারবে না।


তোত্তোচানের দুরন্তপনায় তাকে তার আগের বিদ্যালয়ে থাকার সুযোগ দেয়নি। কিন্তু সেই তোত্তোচানকেই কি না প্রধান শিক্ষক কোবায়েশি বলেন, তুমি সত্যিই খুব ভালো মেয়ে। কোবাইয়াশি মশায় তোত্তোচানকে এতোবার এই কথাটি বলেন যে, তোত্তোচানের নিজেরও মনে হতো সে খুব ভালো মেয়ে। যেহেতু সে খুব ভালো মেয়ে, তাই কোনো খারাপ কাজ সে করতে পারবে না।

কখনও কি চিন্তা করা যায় সত্যিকারের রেলগাড়ির কামড়া হতে পারে শ্রেণিকক্ষ? কিন্তু তোমায়ে গাকুয়েন বিদ্যালয়ের রেলগাড়ির কামড়ায় ছিলো শ্রেণিকক্ষ। তাই তো রেলগাড়ির কামড়ায় পড়ার জন্য প্রতিদিন বিদ্যালয় ছুটির পর আবার কখন বিদ্যালয়ে যাবে তা নিয়ে চিন্তা করতো তোত্তোচান।

সোশাকু কোবাইয়াশি ছিলেন একজন অসাধারণ শিক্ষক যার চিন্তাচেতনা ছিলো যুগান্তকারী। তিনি যেমন ভালোবাসতেন তোত্তেচানের মতো চঞ্চল শিশুকে, তেমনি ভালোবাসতেন ইয়াসুয়াকিকে যে ছিলো পোলিও রোগে আক্রান্ত।

কোবাইয়াশি মশাই তাঁর শিশুদেরকে এতোই ভালোবাসতেন যে, তিনি তাকাহাশি, যে বামনত্ব রোগাক্রান্ত ছিলো, সে যেন বিদ্যালয়ের বার্ষিক খেলায় অংশগ্রহণ করতে পারে এবং কোনোরকম অবজ্ঞার স্বীকার না হয়, তাই তাকে বিদ্যালয়ের বার্ষিক খেলায় প্রথম করার জন্য নতুন পদ্ধতির খেলা তৈরি করেছিলেন।

তাঁর সবকিছুই ছিল অভিনব। তিনি শিশুদেরকে সাগর থেকে কিছু, পাহাড় থেকে কিছু নিয়ে আসা খাবার দিয়েই টিফিন খাওয়াতেন। খাবারের সময় চুপ না থেকে কীভাবে গান গেয়ে কথা বলে খাবার খাওয়া যায় তা শিখিয়েছিলেন। এমনি সব চমৎকার পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন।

মানুষ দুটো চোখ নিয়ে জন্মাবে বটে, কিন্তু পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে শিখবে না। কান নিয়ে জন্মাবে কিন্তু সংগীত শুনতে শিখবে না। মস্তিক নিয়ে জন্মাবে কিন্তু সত্যের চর্চা করা শিখবে না। হৃদয় নিয়ে জন্মাবে কিন্তু তাতে আপাত অপ্রয়োজনীয় সব ভালোবাসার স্ফুলিঙ্গ থাকবে না। এরকম সমাজ তৈরি হওয়া খুবই ভয়ংকর হবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য। এসব ভেবে ভয় পেতেন প্রধান শিক্ষক।

তাই তিনি স্বপ্নের বিদ্যালয় তোমায়ে গাকুয়েন তৈরি করেছিলেন। একটি শিশুর বিকাশের জন্য যা প্রয়োজন তার সবকিছুই বিদ্যমান ছিল তোমায়ে গাকুয়েন বিদ্যালয়ে।

এই স্বপ্নের বিদ্যালয়টি ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে। যুদ্ধ সবসময়ই সৌন্দর্যকে ধ্বংস করে। যুদ্ধ মানেই মানবতার ক্ষতি। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার এক উদাহরণ তোমায়ে গাকুয়েন।

আমাদের মতো দরিদ্র্য দেশে এ-ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা যদি প্রর্বতন করা সম্ভব হতো, তাহলে সকল শিশু খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবেই শিক্ষাক্ষেত্রে প্রবেশ করতো। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নেই কোনো আনন্দ। তার ওপর দারিদ্র্যতা শিশুকে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রবেশের প্রেষণা দিতে তো পারেই না বরং বাধা দেয়।

যদিও শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানবতা, নৈতিকতা ও সৌন্দর্যবোধ তৈরি করা; কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তা তো করেই না, তৈরি করে স্বার্থপর মানব। এর প্রধান লক্ষ্যই হলো অপরকে ঠকিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল।


আমরা দেখতে পাই ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে তোত্তোচান তার সহপাঠী মিয়োচানকে খুশি করার জন্য তার প্রিয় চুলের ফিতা পরে আর বিদ্যালয়ে আসছে না। এই শিক্ষা সে তার বিদ্যালয় থেকেই পেয়েছে।


অপরের সুখেও যে সুখী হওয়া যায়, তা আমরা আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে জানতেই পারি না। কিন্ত আমরা দেখতে পাই ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে তোত্তোচান তার সহপাঠী মিয়োচানকে খুশি করার জন্য তার প্রিয় চুলের ফিতা পরে আর বিদ্যালয়ে আসছে না। এই শিক্ষা সে তার বিদ্যালয় থেকেই পেয়েছে।

আমার মনে পড়ে, আমি যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই, তখন খুব উৎসাহের সাথে ভর্তি হই।
আমার মা-বাবার ইচ্ছে ছিল আরো এক বছর পর ভর্তি করাবেন। কিন্তু আমি যখন দেখি আমার খেলার সাথী বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেছে এবং সে প্রতিনিয়তই এসে বলে বিদ্যালয়ের পাশেই একটি মাঠ আছে এবং সে নতুন বন্ধুদের সাথে ওই মাঠে খেলে, তখন আমার মনে হলো বিদ্যালয় খুবই একটি মজাদার জায়গা যেখানে খেলাধুলা করা যাবে। তাই আমি বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চেয়েছি এবং হয়েছি।

সকল শিশুই খেলতে ভীষণ পছন্দ করে। তাই যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলাচ্ছলে পড়ানো হতো,
তাহলে সকল ধরনের শিশুই বিদ্যালয়ে যেতে আগ্রহ অনুভব করবে। এতে তারা খুব ভালো শিখতেও পারবে। কিন্তু আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে এ-ধরনের প্রচেষ্টা আমরা দেখতে পাই না। বিদ্যালয়গুলোতে এখনও সনাতন পদ্ধতিতে পড়ানো হয়। শিশুদেরকে কীভাবে গাদা গাদা তথ্য মুখস্থ করানো যায় তার প্রচেষ্টা চলে।

শিশুদের বিদ্যালয়গুলো বিশেষ করে কিন্ডারগার্টেন যেসব বিদ্যালয় এখন গড়ে উঠছে, সেসব বিদ্যালয় সাধারণত দ্বিতীয় বা তৃতীয় তলা ভবনে অবস্থিত। এসব ভবনের আবদ্ধ কামরায় শিশুদের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। ফলে তারা প্রকৃতির সাথে মেশার সুযোগ পাচ্ছে না। বিদ্যালয়গুলোতে কোনো খেলার মাঠ নেই। এ-ধরনের বিদ্যালয়কাঠামো শিশুদেরকে বিদ্যালয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়।

বিদ্যালয়ের কাঠামো আকর্ষণীয় হওয়া উচিত। আমরা দেখতে পাই তোত্তোচানের স্কুলে শ্রেণিকক্ষ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল সত্যিকারের রেলগাড়ির কামরা। তেমনি আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষ আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা উচিত।

বর্তমান সময়ে কিন্ডারগার্টেনগুলোতে আমরা দেখতে পাই নার্সারিতে একটি শিক্ষার্থীদের বই সংখ্যা দশ থেকে বারোটি। নার্সারিতে পড়ুয়া একটি শিশুর জন্য এতোগুলো বইয়ের প্রয়োজন নেই। শিশুদেরকে বইয়ের মধ্যে না রেখে যদি হাতেকলমে শিখানো হয়, তাহলে শিশুর শিখন হয় দীর্ঘস্থায়ী। এই বিষয়টিই আমরা দেখতে পাই তোমায়ে গাকুয়েন বিদ্যালয়ে।

সেখানে শিশুদেরকে মাঠের শিক্ষকের সাহায্যে শিখানো হয়। শিশুরা সত্যিই দেখে এবং শিখে কীভাবে জমি প্রস্তুত করে চাষ করা হয়। আমাদের দেশের শিশুরা তাদের ইচ্ছামতো বিষয় পড়ার মতো পায় না। বরং, বাবা-মা থেকে শুরু করে শিক্ষক পর্যন্ত সকলেই চায় সব বিষয়ে শিশুটি যেন লেটার মার্ক পায়। এক্ষেত্রে বিষয়টি শিশুর ভালো লাগছে কি লাগছে না তা প্রকাশের সুযোগ নেই। ফলে শিশুটি শিখনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

কিন্তু আমরা যদি শিশুদেরকে তাদের পছন্দের মতো বিষয়ে আগে পড়ার সুযোগ দিই, তাহলে তারা পড়ার প্রতি আগ্রহী হবে। তারা নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবে কোন বিষয়টি তার অধিক প্রিয়। পরবর্তী ধাপে সে তার পছন্দমতো বিষয় পড়তে পারবে।


বিদ্যালয়ের কাঠামো আকর্ষণীয় হওয়া উচিত। আমরা দেখতে পাই তোত্তোচানের স্কুলে শ্রেণিকক্ষ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল সত্যিকারের রেলগাড়ির কামরা।


বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে শুধু বিদ্যালয়-ভীতির কারণে। তাদের কাছে মনে হয় বিদ্যালয় একটি ভয়ের জায়গা, যেখানে গেলে একগাদা তথ্য মুখস্থ করতে হবে। প্রত্যেকটি শিশুকে শিক্ষাক্ষেত্রে ধরে রাখতে চাইলে অবশ্যই তাকে আনন্দমুখর শিখন পরিবেশে শিক্ষালাভের সুযোগ দিতে হবে।

শিশুর শিখনকে আনন্দমুখর করতে ভূমিকা রয়েছে অনেকের। যেমন বিদ্যালয়, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, সহপাঠী ও মা-বাবা। তেমনি, এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন শিক্ষক। একজন আদর্শ শিক্ষক একজন আদর্শ শিক্ষার্থী গড়ে তুলতে অনেকটাই ভূমিকা রাখেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজন একজন দক্ষ শিক্ষকের। একজন শিক্ষককে অবশ্যই তাঁর শিক্ষার্থীদের মন বুঝতে হবে। শিক্ষক এক্ষেত্রে শিশুর বন্ধুর মতো আচরণ করবেন।

শিশু যদি শিক্ষককে ভয় পায়, তাহলে শিশুটি তার পড়ার ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে যদি সমস্যা থাকে শিক্ষককে তা জানাতে চাইবে না। ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যেমন দূরত্ব সৃষ্টি হয়, তেমনি দূরত্ব সৃষ্টি হয় শিক্ষার্থী ও তার বইয়ের মধ্যে। এভাবেই ঝরে যাওয়া শিশুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

আমাদের দেশে এমন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা উচিত, যে শিক্ষা শিশুদেরকে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে মানবতার সাথে। শিশুরা এমন শিক্ষা অর্জন করবে যার মাধ্যমে তারা মানবসমাজের কল্যাণ বয়ে আনবে অফুরন্ত।

বইটি এতো সুন্দর যে পড়ে শুধু আনন্দই পাওয়া যায়। বইটি পড়ে আমার মনে হচ্ছিলো, ইশ্, যদি তোমায়ে গাকুয়েন স্কুলের শিক্ষার্থী হতে পারতাম! যদি হতে পারতাম প্রধান শিক্ষক সোশাকু কোবাইয়াশি!

বইটি পড়ে আমার প্রচণ্ড মন খারাপ হয় এই ভেবে যে, আমাদের দেশের শিশুরা এমন বিদ্যালয়, এমন শিক্ষক থাকতে যে পারে তা চিন্তাও করতে পারবে না।

পরিশেষে লেখক তেৎসুকি কুরোয়ানাগিকে কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা জানাতে চাই তার এতো সুন্দর স্মৃতিটুকু জানানোর সুযোগ প্রদানের জন্য।

বই পরিচিতি

বইয়ের নাম: তোত্তোচান জানালার ধারে ছোট্ট মেয়েটি
মূল লেখক: তেৎসুকো কুরোয়ানাগি
অনুবাদক: চৈতী রহমান
প্রকাশক: দুন্দুভি
পৃষ্ঠা: ২৫৬
দাম: ২০০ টাকা

তানজিনা আক্তার রুপা: শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন