শিক্ষক ও শিক্ষা

প্রফেসর মোহাম্মদ নাসের: নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই

মোহাম্মদ নাসের
মোহাম্মদ নাসের
লিখেছেন গৌতম রায়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর মোহাম্মদ নাসের আর আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল একই সাথে, সেই ১৯৮৫ সালে। তাঁর প্রথম ব্যাচের ছাত্র আমি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই পরিসংখ্যানের প্রতি এক ধরনের ভীতি জন্মে গিয়েছিল। যদি শুধু একটি কারণে আমি নাসের স্যারকে আজীবন স্মরণে রাখি তা হল— তিনি পরিসংখ্যানের প্রতি এই ভীতি শুধু যে কাটিয়ে তুলেছিলেন তাই নয়, বরং এর প্রতি এক ধরনের আগ্রহ সৃষ্টি করিয়ে দিয়েছিলেন।

প্রথম দিনের ক্লাসের কথা মনে পড়ে। স্যার বিষয় নিয়ে তেমন কিছুই বললেন না, শুধু তাঁর জাতটা চিনিয়ে দিলেন। আমাদের সাথে পরিচিত হলেন। বললেন নিজের কিছু কথা। বিনয় ঝরে পড়ছিল তাঁর কথায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ বাংলাদেশের সেরা এবং এখানে আসতে পেরে উনি নিজেকে ধন্য মনে করছেন একথা শুনে আমাদের খুব ভালো লাগল।

ঢাকা থেকে আসা মানুষেরা আমাদের নানাভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো, অথচ তিনি একদম ব্যতিক্রম। সাধারণ কিছু কথা বললেন যাকে অসাধারণ বললেও খুব কম বলা হয়। নিজের পান্ডিত্য জাহির করার কোনো চেষ্টা ছিল না। আমাদের বলেছিলেন আত্মশক্তিতে বলীয়ান হবার কথা। বলেছিলেন প্রতিটি মানুষই অমিত মেধা আর ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় কিন্তু তার সঠিক প্রয়োগ করতে পারে না। আমরা যেন তা পারি সেদিকে তিনি যত্নবান হবেন।

বলেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে যতো যাই কর না কেন, লেখাপড়াটাই যেন হয় তোমাদের মোক্ষ। প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে হবে। জ্ঞানই হলো শক্তি আর সে কারণেই যুগে যুগে শোষক শ্রেণি জ্ঞানীদের ভয় করে এসেছে, তাদের দমিয়ে রাখতে চেয়েছে। এই গরীব দেশের মানুষের ঘাম ঝরানো পয়সায় আমাদের পড়ার খরচ চলে। তাদের আমরা যেন কখনও অসম্মান না করি। ছাত্ররাই দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। এই দেশ এই সমাজের প্রতি আমাদের কী কর্তব্য সে কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন।

নাসের স্যার ছিলেন একজন প্রথাবিরোধী শিক্ষক। এই যে দীর্ঘদিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ধরনের পঠন-পাঠন পদ্ধতি প্রচলিত ছিল বা এখনও আছে, স্যার ছিলেন পুরোপুরিই সেই ছাঁচের বাইরে। সব ক্ষেত্রেই তিনি বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন আর সে কারণেই তিনি ফাঁকিবাজ কর্তৃত্বপরায়ণ শিক্ষকদের চক্ষুশূল হয়ে পড়েছিলেন। সেই সব তথাকথিত সহকর্মীদের মানসিক অত্যাচার তাঁকে অকালমৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না, এমনকি মৃত্যুর পরেও তাদের সেই অত্যাচার অবহেলা স্যারের বিদেহী আত্মাকে প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হচ্ছে।

নিজে ঈর্ষণীয় ফলাফলের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও স্যার ‘ভালো ফলাফল সর্বস্ব ভালো ছাত্রত্বে’ বিশ্বাস করতেন না। বরং তাঁর বিবেচনায় ভালো ছাত্র সেই যে মুখস্থ না করে বিষয়টি বোঝার এবং আত্মস্থ করার চেষ্টা করে এবং কোনো শর্টকাট ফন্দিফিকির করে ভালো ফল নয়, যাদের সত্যিই শেখার আগ্রহ আছে।


নিজে ঈর্ষণীয় ফলাফলের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও স্যার ‘ভালো ফলাফল সর্বস্ব ভালো ছাত্রত্বে’ বিশ্বাস করতেন না। বরং তাঁর বিবেচনায় ভালো ছাত্র সেই যে মুখস্থ না করে বিষয়টি বোঝার এবং আত্মস্থ করার চেষ্টা করে এবং কোনো শর্টকাট ফন্দিফিকির করে ভালো ফল নয়, যাদের সত্যিই শেখার আগ্রহ আছে।


কিন্তু আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় ‘গলাধঃকরণ এবং বমন’ প্রক্রিয়ায় পারদর্শীরাই ভালো ছাত্রের তকমা পায়, আর প্রকৃত ভালো ছাত্রেরা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে অকালে ঝরে পড়ে। তাই স্যারের প্রধান মিশনই ছিল প্রথম বর্ষ থেকেই এসব তথাকথিত ভালো ছাত্র নয়, প্রকৃত ভালো ছাত্রদের খুঁজে বের করা এবং তাদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে রেখে তাদের কাছ থেকে সেরা কিছু আদায় করে নেয়া।

তাদের অনেকেরই পরীক্ষার ফল ভালো ছিলো না। এমনকি স্যারের কাছে পাঠ নিচ্ছে এ কারণে তাদের কিছু কূপমন্ডুক শিক্ষকের অবিচারের শিকারও হতে হয়েছে। স্যার কিন্তু ছাত্রদের আগেই সতর্ক করে দিতেন যে, স্যারের কাছে আসার কারণে তারা ভবিষ্যতে নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে পারে। কিন্তু তারা প্রত্যয়দীপ্ত কন্ঠে বলত, ‘স্যার আমরা আপনার কাছে ভালো ফলের জন্য নয়, কিছু শেখার জন্যই এসেছি।‘ পরবর্তীতে এইসব ছাত্ররাই প্রতিযোগিতামূলক সব পরীক্ষায় সফল হয়েছে। আজ শুধু দেশেই নয়, সমগ্র বিশ্বেই তারা সুনামের সাথে কাজ করে চলেছে।

যে ছেলে বা মেয়েটিকে সবাই বাতিলের খাতায় রেখেছিল, তার মাঝেই অমিত সম্ভাবনার বীজ বুনে দিতে পারতেন তিনি। আর এই কারণেই প্রফেসর মোহাম্মদ নাসের আর সবার থেকে আলাদা।

একটি কথা খুব স্পষ্টভাবেই বলে রাখা ভালো যে, স্যারের পছন্দের বা প্রিয়তম ছাত্রদের তালিকায় আমার নাম ছিলো না। বরং আমার মনে হতো স্যার আমাকে খুব একটা পছন্দ করেন না। এর কারণও ছিলো। এসএসসি এবং এইচএসসিতে আমার ফলাফল ভালো ছিলো, আর তাই স্যার হয়তো ভাবতেন আমি প্রথাগত ভালো ছাত্র। আমিও স্যারকে একটু এড়িয়ে চলতাম। এর পর প্রায়ই আমাদের এমন সব জায়গায় দেখা হতে শুরু হলো যেখানে সচরাচর ভালো ছাত্ররা যায় না। রাজপথে, মিছিলে, পুলিশের তাড়া খেয়ে কখনো লেগে যেত ধাক্কা। স্যার তাঁর অফিসে যেতে বলতেন, আমি কোনোরকমে কাঁচুমাচু হয়ে হাজির হতাম। পড়ার বইয়ের বাইরে আমি জগতটাকে কতোটুকু চিনি সেটা পরখ করার চেষ্টা করতেন। একসময় তিনি হয়তো নিশ্চিত হলেন যে আমি শুধু প্রথাসর্বস্ব ভালো ছাত্র নই। তারপর থেকে আর চাইতে হয়নি, তাঁর ভালোবাসা আর অপত্য স্নেহ আমার ওপর বৃষ্টির মত ঝরে পড়েছে।

স্যার চাইলেই উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের যেকোনো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করতে পারতেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল দেশে বসেই বিশ্বমানের কাজ করা। তিনি সবসময় আমাদের বলতেন কোনো অবাস্তব বা আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখবে না। এমন স্বপ্ন দেখবে যা তোমাদের আয়ত্তের মধ্যে, যা তোমরা বাস্তবায়ন করতে পার। অবশ্য স্যারের এই দেশে বসে বিশ্বমানের গবেষণার স্বপ্নকে আমরা একসময় আকাশকুসুম কল্পনা বলেই ভাবতাম। কিন্তু স্যার যা ভাবতেন বা বলতেন তা বিশ্বাস করতেন।

তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভটি যে প্রকৃতই বিশ্বমানের হয়েছে, আজ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পরিসংখ্যানবিদদের বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে তার স্বীকৃতি মিলেছে। স্যার লেখাপড়া করতে পশ্চিমা বিশ্বে আসেননি ঠিকই, কিন্তু স্যার সম্পর্কে আমাকে এই কথাটি বলতেই হবে যে তিনি ছিলেন আমার চোখে দেখা সবচে বেশি ‘আপডেটেড’ এবং ‘ওয়েল ইনফর্মড’ শিক্ষক। জ্ঞানবিজ্ঞানে বিশ্বের কোথায় কোন অগ্রগতি হচ্ছে এর সব কিছুই ছিলো তাঁর নখদর্পনে। আর তাই অন্য শিক্ষকেরা যেসব বিষয়ের নাম পর্যন্ত শোনেননি, তিনি সেসব বিষয়ে রীতিমত গবেষণা করেছেন, করিয়েছেন।

তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁর গবেষণা দেখে আমেরিকান স্ট্যাটিসিটিক্যাল এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর জেসিকা উটস মন্তব্য করেছিলেন যে, “বাংলাদেশের কোন পরিসংখ্যান ল্যাবে যে এতো আধুনিক বিষয় নিয়ে এতো উচ্চ মানের গবেষণা হতে পারে এটি দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।“

তাঁর এই আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই অধমও বারবার উপকৃত হয়েছে। বিদেশে তাঁর কাছে পড়া কোর্সগুলোতে যতোটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছি, অন্য কোর্সের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। স্যারের কাছে পাঠগ্রহণ না করলে আমি কোনোভাবেই এতো সহজে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত ও পরিসংখ্যানে পিএইচডি করে আসতে পারতাম না এটি আমি হলফ করে বলতে পারি।

তিনি বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতেন যে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শেখার নয়, জ্ঞান সৃজনের একটি জায়গা। এখানে শিক্ষক যতোটা না শেখাবেন তার চেয়ে বেশি তিনি শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন জ্ঞানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন। স্যারের কাজটি অবশ্য ছিল আরও কঠিন। তাঁকে দুটোই করতে হতো, কেনোনা স্কুল-কলেজের প্রথাগত শিক্ষায় আমরা কিছুই শিখে আসি না। শুধু তাই নয়, তাঁর কাছে পড়তে এসে আমরা আরও বুঝলাম যে স্কুল-কলেজে আমরা যেভাবে গণিত শিখে এসেছি তার অনেক কিছুই ভুলে ভরা। স্যার মাঝে মাঝে আক্ষেপ করে বলতেন, ‘তোমরা যদি কিছুই না জানতা তাহলে তোমাদের শেখানো অনেক সহজ হতো। আমার অর্ধেকের বেশি সময় চলে যায় শুধু তোমাদের ভুল সংশোধনের পেছনেই।‘


তিনি বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতেন যে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শেখার নয়, জ্ঞান সৃজনের একটি জায়গা। এখানে শিক্ষক যতোটা না শেখাবেন তার চেয়ে বেশি তিনি শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন জ্ঞানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন। স্যারের কাজটি অবশ্য ছিল আরও কঠিন। তাঁকে দুটোই করতে হতো, কেনোনা স্কুল-কলেজের প্রথাগত শিক্ষায় আমরা কিছুই শিখে আসি না।


স্যার আমাদের গণিতের অনেকগুলো কোর্স পড়িয়েছিলেন। যখন আমরা অন্যদের কাছে গণিত শিখেছি, তা যেন শুধু শেখার জন্যই গণিত শেখা। আমরা মাঝেমধ্যে বিরক্ত হয়ে বলতাম পড়ছি পরিসংখ্যান, তো এতো গণিত শিখতে হবে কেন? কিন্তু স্যার যখন পড়াতেন, তখন গণিত হয়ে যেত পরিসংখ্যান। পড়াচ্ছেন ক্যালকুলাস, কিন্তু সব উদাহরণ দিচ্ছেন প্রোবাবিলিটি আর রান্ডম ভেরিয়েবলস থেকে। পড়াচ্ছেন লিনিয়ার এলজেবরা, আর উদাহরণ সব রিগ্রেশনের।

পশ্চিমা বিশ্বের শিক্ষাক্রমে যেভাবে বিষয়গুলোকে সংযুক্ত করা হয়, তিনি কোনোদিন পশ্চিমা মুলুকে না এসেও কী অবলীলাক্রমে কাজটি সম্পাদন করতেন। অথচ বিদেশ থেকে যারা ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরেছেন, তারা কতো সহজে গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিতেন!

আসলে ক্লাসে ভালো পড়াতে হলে শিক্ষককে ভালো করে পড়তে হয়, কীভাবে পড়ালে ছাত্ররা ভালো বুঝবে সেসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে হয়, একটা প্যাশন থাকতে হয়— আমাদের এতো সময় কোথায়?

আমরা যখন ছাত্র তখন বছরে একবার মাত্র পরীক্ষা হতো, কোনো ক্লাস টেস্ট বা অন্য কিছু থাকতো না। স্যারই আমাদের বিভাগে প্রথম ক্লাস টেস্ট চালু করলেন। এ-নিয়ে কত ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ! প্রতি কোর্সেই স্যার ৫/৬টি ক্লাস টেস্ট নিতেন। স্যার চাইতেন, এই টেস্টের নম্বরের সামান্য কিছু অংশও যেন ছাত্রদের ফাইনালের সাথে যুক্ত হয়। কিন্তু তাঁকে সেই অনুমতি দেয়া হয়নি। আমরা কিন্তু খুবই উপকৃত হয়েছিলাম এই টেস্টের বদৌলতে। কেনোনা ফাইনালের আগেই বেশ কিছু প্রস্তুতি হয়ে যাচ্ছিল আমাদের। আর আমাদের উৎসাহ বাড়ানোর জন্য স্যার নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে সুন্দর সুন্দর বই কিনে আনতেন। যারা ক্লাস টেস্টে ভালো করতো তাদের সেইসব বই উপহার দিতেন।

নাসের স্যার ছিলেন অসম্ভব সৎ ও নির্লোভ একজন মানুষ, নীতির প্রশ্নে আপোসহীন। তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ কমিউনিস্ট। এ-বিষয়ে কোনো রাখঢাক ছিলো না তাঁর। কিন্তু তাঁর এই রাজনৈতিক মতাদর্শ কোনোভাবেই তাঁর একাডেমিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলেনি।

শুধু এটুকু বললেই যথেষ্ট বলা হবে না, এক্ষেত্রে স্যার যে অতি উচ্চ একটি মান স্থাপন করেছিলেন যা হওয়া উচিত সবার অনুকরণীয়। আমরা প্রথম বর্ষে থাকতেই পরীক্ষার ঠিক আগে এক ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী স্যারের কাছে গিয়েছিলো প্রশ্নের সাজেশনের জন্য। তার ধারণা ছিলো, স্যার যেহেতু একই দল করেন তাকে তো সাহায্য করবেনই। স্যার সেদিন এতো রেগে গিয়েছিলেন যে, তাকে শুধু মারতে বাকি রেখেছিলেন। স্যারের এমন রুদ্রমূর্তি আমি আর কোনোদিন দেখিনি।

ছেলেটি বোঝাতে চেষ্টা করছিল যে, মৌলবাদী শিক্ষকেরা সমমনা ছাত্রদের প্রশ্ন বলে দেন। স্যারের কথা স্পষ্ট, তাহলে তাদের দলে যেয়েই নাম লেখাও, আমার এখানে কেন? আসলে নৈতিকতার মানদণ্ডে তিনি ছিলেন সবার ওপরে।

বিষয়টি শুধু প্রথম বর্ষেই চুকেবুকে যায়নি। মাস্টার্স পর্যন্ত আর কোনোদিন সেই ছাত্রটিকে স্যার তাঁর ঘরে ঢুকতে দেননি। অথচ কতো ভিন্নমতের ছেলেমেয়েরা স্যারের সংস্পর্শে এসে নিজেদের জীবনকে পালটে নিয়েছে, স্যার কোনোদিন তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ কী জানতেও চাননি। পরীক্ষায় ঠিক যে যা পাবার তাই পেয়েছে, তাঁর ঘোরতর নিন্দুকও কোনোদিন বলতে পারবে না যে, স্যার পরীক্ষার খাতায় কোনোদিন কোনো পক্ষপাতিত্ব করেছেন।

স্যার বিভাগীয় সভাপতির পদ গ্রহণ করতে চাননি এতে তাঁর গবেষণার সময় কমে যাবে আশঙ্কায়। আমরাই অনেক অনুনয়-বিনয় করে তাঁকে রাজি করিয়েছি। কথায় বলে ‘ভাগ্যবানের বোঝা ভগবান বয়।‘ তিনি সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিনের ভেতরেই তাঁরই প্রস্তাবিত একটি প্রজেক্ট বিশ্বব্যাংক থেকে চার কোটি টাকার অনুদান পায়। এর আগে আমরা বাইরে থেকে চার লাখ টাকারও কোনো অনুদান পাইনি। স্যারের মত সৎ একজন মানুষ সভাপতির দায়িত্বে থাকায় এর প্রতিটি টাকার সদ্ব্যবহার সম্ভব হয়েছে এবং যার ফলে রাবির পরিসংখ্যান বিভাগের অবকাঠামো আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে গেছে।

এই প্রজেক্ট অনুযায়ী একাধিকবার কনফারেন্স বা সেমিনার উপলক্ষে তাঁর বিদেশে যাবার সুযোগ ছিলো, কিন্তু নির্লোভ এই মানুষটি কখনও তা করেননি। বরং বিভাগের সবচেয়ে জুনিয়র শিক্ষকদের বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পাঠিয়েছেন যাতে দীর্ঘদিন ধরে তারা লব্ধ জ্ঞান বিভাগের উন্নয়নে প্রয়োগ করতে পারে। প্রজেক্টের টাকায় সব শিক্ষককে ল্যাপটপ কিনে দিলেও নিজের জন্য কেনেননি। এই প্রজেক্ট থেকে দু’পয়সাও নেননি তিনি।

সুবিধা নেওয়ার যায়গায় অন্যদের সামনে ঠেলে নিজে পেছনে চলে এলেও ঝুঁকি নেবার সময় তিনিই এগিয়ে যেতেন সবার আগে। খুব অল্প বয়স থেকেই ফুসফুসের জটিল অসুখে ভুগতেন তিনি, অথচ এই শরীরেই স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের গাড়িতে ঢিল ছুঁড়ে ক্যাম্পাসময় হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন। রাবিতেও যেকোনো সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রভাগে তাঁকে দেখা যেতো। ছাত্রছাত্রীদের বাঁচাতে যেয়ে একাধিকবার তিনি পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

মৃত্যুর কিছুদিন আগেও বর্ধিত বেতন ফি এবং বৈষম্যমূলক নাইট শিফট ক্লাস প্রবর্তনের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে পুলিশ ও গুন্ডাবাহিনী ছাত্রছাত্রীদের লাইবেরির ভেতরে আটকে নির্যাতন করছে— এই খবর পেয়ে স্যার বিভাগ থেকে ছুটে আসেন এবং প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে তাদের রক্ষা করেন। তাঁর এই ভূমিকার প্রশংসা তো দূরের কথা, এ-কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁকে চাকরিচ্যুত করার ফন্দিফিকির শুরু করে। পরে ছাত্ররাই আন্দোলনের মাধ্যমে এই ষড়যন্ত্র বানচাল করে দেয়।


স্যার যে নিজেই শুধু লেকচার দিতেন তা নয়, তিনি ছাত্রদের উৎসাহ দিতেন লেকচার দেবার জন্য, জটিল কিছু নয়, যা তাদের সাধ্যে কুলায়। উদ্দেশ্য ছিলো একটাই— সবার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু উপস্থাপন করতে বা লেকচার দিতে যাতে তাদের ভয় বা জড়তা যেন কেটে যায়।


এসব কারণেই স্যার সম্পর্কে কাউকে এককথায় কিছু জিজ্ঞেস করা হলে আমি নিশ্চিত অধিকাংশ উত্তর আসবে— তিনি ছিলেন একজন ছাত্র অন্ত প্রাণ শিক্ষক। তাঁর কাছে ছাত্রদের চেয়ে আর কোনো কিছুই অগ্রাধিকার পায়নি। এমনকি নিজের ব্যক্তি জীবন, ঘর সংসার কিছুই নয়। সেই সাতসকালে বিভাগে এসে ঢুকতেন, আর ফিরতেন রাত ৮টা বা ৯টার পর। প্রতিদিন বিকালেই ক্লাস শেষ হয়ে যাবার পর স্যারের ঘরে বিশেষ ক্লাসগুলো শুরু হতো। যতদিন রাবিতে ছিলাম, সাধ্যমত চেষ্টা করতাম সেখান থেকে নতুন কিছু শেখার।

স্যার যে নিজেই শুধু লেকচার দিতেন তা নয়, তিনি ছাত্রদের উৎসাহ দিতেন লেকচার দেবার জন্য, জটিল কিছু নয়, যা তাদের সাধ্যে কুলায়। উদ্দেশ্য ছিলো একটাই— সবার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু উপস্থাপন করতে বা লেকচার দিতে যাতে তাদের ভয় বা জড়তা যেন কেটে যায়।

তখন পর্যন্ত আমাদের বিভাগে ছাত্রদের কোনো বিষয় বা গবেষণা উপস্থাপন করার কোনো সুযোগ ছিলো না। আমরা প্রায়শই এমন অভিযোগ শুনতাম যে, চাকরির ইন্টারভিউয়ের সময় আমাদের ছেলেমেয়েরা একদমই মুখ খুলতে পারে না। এর প্রধানতম কারণই ছিল অনভিজ্ঞতা। স্যারের এই উদ্যোগে যাদুমন্ত্রের মতো ফল মিলেছিল। স্যারের ল্যাবের ছাত্ররা আইসিডিডিআর,বি, শফি কনসালটেন্সি অথবা অন্য যেকোনো জায়গায় কিছু উপস্থাপন করেছে সেখানেই সুনামের স্বাক্ষর রেখেছে।

লেখাপড়ার জন্য স্যারের চেম্বার এমনকি বাসার দরজা ছিল সবার জন্য অবারিত। এজন্য অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য নাজনীন ভাবী এবং স্যারের একমাত্র কন্যা নমির। তাঁদের সমর্থন ছাড়া স্যার আমাদের এতোটা সময় দিতে পারতেন না। স্যারের কাছে শুধু যে বিভাগের ছাত্রছাত্রীরাই আসতো তা নয়, অন্যান্য বিভাগের ছাত্রছাত্রী, গবেষক এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যেমন রুয়েট বা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা আসতো। আসতো বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের ছেলেমেয়েরা। শুধু পড়াশোনার ব্যাপারেই নয়, তাদের ব্যক্তিগত কোন সমস্যা দেখা দিলেও স্যার তার সমাধানে এগিয়ে আসতেন। এককথায় স্যারের কাছে সাহায্য চেয়ে কেউ বিমুখ হয়েছে এমনটা আমার জানা নেই।

স্যার ছিলেন আমাদের বর্ধিত পরিবারের একজন সদস্য। তাঁকে ঘিরে আমাদের সবার এতো কথা এতো স্মৃতি যা এই স্বল্প পরিসরে ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। স্যারকে নিয়ে গতবছর যুক্ত প্রকাশন থেকে ‘মোহাম্মদ নাসের: এক মৃত্যুহীন প্রাণ’ শীর্ষক আমার একটি স্মৃতিচারণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কেউ আগ্রহী হলে বইটি পড়বেন, অনুরোধ রইল। স্যার আজীবন এই দেশ জাতি সমাজ, এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, পরিসংখ্যান পঠন-পাঠন গবেষণা ও চর্চার যেসব স্বপ্ন দেখে গেছেন, সেসব স্বপ্ন সত্যি হোক, স্যারের বিদেহী আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক এই আমার আজকের প্রার্থনা।

ড. রহমতউল্লাহ ইমন: যুক্তরাষ্ট্রের বল স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন