উচ্চশিক্ষা

নিষেধাজ্ঞা, রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়

রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়
লিখেছেন গৌতম রায়

প্রায় একসঙ্গেই নানা প্রতিবাদ-বিক্ষোভে মুখর হয়েছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবল ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছেন স্বেচ্ছাচারী-স্বৈরাচারী উপাচার্য। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিষেধাজ্ঞা-প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। 

তবে সম্প্রতি আমাদের মনোজগত আচ্ছন্ন করে ছিল একটি নাম— আবরার। স্বাধীন মতপ্রকাশের দায়ে যাকে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। এরপর আন্দোলন হলো, অনেকেই গ্রেপ্তার হলো, জানা গেল কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গড়ে উঠেছে টর্চার সেল; কীভাবে শিক্ষার্থীদের হীনমন্য, দাস বানিয়ে রাখার জন্য প্রবল ক্ষমতা প্রয়োগ করা হচ্ছে সরকার ও প্রশাসনের মদদে। এবং সবশেষে বুয়েটে দ্বিতীয়বারের মতো (এর আগে ২০০২ সালে) সাংগঠনিক ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধের মাধ্যমে আন্দোলন স্থগিত করা হলো।

শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বৈরাচারী উপাচার্যের স্বেচ্ছাচার চলছিল অনেকদিন ধরেই। এবার তার গদি ধরে টান মেরেছে একটিমাত্র প্রশ্ন। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?’ প্রশ্নটা ফেসবুকে লিখেছিলেন শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক জিনিয়া। খুবই সহজ, সাধারণ ও মৌলিক প্রশ্ন। কিন্তু এটাই সহ্য হলো না উপাচার্য নাসিরের। হম্বিতম্বি করলেন, কুৎসিত আচরণ করলেন। আর সেটার রেকর্ডিং ফাঁস হওয়াতেই পড়লেন বিপাকে। ফুঁসে উঠলেন শিক্ষার্থীরা আর শেষমেষ পদত্যগ করতে বাধ্য হলেন উপাচার্য। রাতের আঁধারে শিক্ষার্থীদের দুয়োধ্বনি শুনতে শুনতে একপ্রকার পালিয়েই গেলেন।

‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?’

পরবর্তীতে বুয়েটে আবরার হত্যাকাণ্ড, ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ, জাবিতে ভিসির দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন, শাবিপ্রবিতে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন ইত্যাদি ঘটনা পরপর ঘটতে দেখে মনে হচ্ছে জিনিয়ার সেই প্রশ্নটাই এখন সর্বত্র জোরেসোরে তোলা দরকার। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?’ কেন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, পড়ায়? এর সঙ্গে মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্রের সংযোগ কোথায়, সম্পর্ক কী?

রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রমরমার শুরু খুবই নিকট অতীতের ঘটনা। তার আগে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে ছিল শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সব এক আইনে পরিচালিত হয় না। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে অধ্যাদেশ জারি করে চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে (ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর) স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিল। কারণ তখনকার স্পিরিট ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা। নতুন বাংলাদেশ এমন বিশ্ববিদ্যালয় চেয়েছিল যেখানে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করা যাবে। স্বাধীনভাবে সভা, সমিতি, সেমিনার, সংগঠন ইত্যাদি করা যাবে। রাষ্ট্র বা সরকার সেখানে বাধা দিতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কোনো সিদ্ধান্তে তারা নাক গলাতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী ঢুকবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার ব্যবস্থাপনা করবে। অপরদিকে বুয়েট পরিচালিত হতো ৬১-র অধ্যাদেশ অনুযায়ী, যাতে রাষ্ট্র ও সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রত্যক্ষ।


নতুন বাংলাদেশ এমন বিশ্ববিদ্যালয় চেয়েছিল যেখানে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করা যাবে। স্বাধীনভাবে সভা, সমিতি, সেমিনার, সংগঠন ইত্যাদি করা যাবে। রাষ্ট্র বা সরকার সেখানে বাধা দিতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কোনো সিদ্ধান্তে তারা নাক গলাতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী ঢুকবে না।


স্বাধীন বাংলাদেশের স্পিরিট এটাই ছিল যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমাজের কল্যাণে কাজ করবে, জনমানুষের মঙ্গলের উদ্দেশে কাজ করবে। সেই লক্ষ্যে নতুন জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা করবে, সৃজন করবে। এবং নতুন কিছু সৃজনের জন্য চাই স্বাধীনতা। যদি চিন্তার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, মুক্ত বিচরণের অধিকার না থাকে তাহলে কিভাবে নতুন কিছু ভাবতে পারা যাবে? বোধহয় সম্ভবও না। তাই পাকিস্তানের কবল থেকে বেরিয়ে এসে প্রথমেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেওয়া হয়েছিল চিন্তার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যৌথ চিন্তাচর্চা অনুশীলনের জন্য সংগঠন করার স্বাধীনতা।

মনে রাখা দরকার এগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বলা হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছে কিন্তু পাবলিক। শিক্ষকদের বেতন দিচ্ছে কিন্তু পাবলিক। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আরও তলিয়ে দেখলে দেখা যায় যে, টাকাটা আসলে আসছে কৃষক-শ্রমিকদের শ্রমঘামে সিক্ত উৎপাদনশীল ক্ষেত্রগুলো থেকেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কিন্তু এই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। জনগণের কল্যাণে, সমাজের কল্যাণের স্বার্থে, অগ্রগতির স্বার্থে কাজ করার কথা এই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। এজন্যই তাদেরকে জ্ঞানচর্চার সুযোগ করে দেয় পাবলিক। যেন সমাজের মঙ্গলের জন্য তারা নতুন দিশা দিতে পারেন। নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে পারেন, নতুন কোনো আইডিয়ার কথা বলতে পারেন। এভাবেই হয়েছে মানবসভ্যতার অগ্রগতি। নতুন চিন্তাচর্চার ফলে। এবং এই কাজগুলোই করার কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। পাবলিক এগুলোই করার জন্য টাকা দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়কে। বাবা-মা আমাদের ভরণ-পোষণ করে, আমাদের পড়ালেখা শেখায় এজন্য যেমন তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে; ঠিক একই রকম দায়বদ্ধ অনুভব করা উচিৎ পাবলিকের কাছেও।

পিটিয়ে শিক্ষার্থী মেরে ফেলা, টর্চার সেল বানিয়ে অসীম সম্ভাবনাময় ছেলেমেয়েদের মানসিকভাবে পঙ্গু বানিয়ে ফেলা, নারী শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়ন, সর্বত্র প্রশাসনিক ও একাডেমিক হয়রানি, উন্নয়নের নামে লুটপাট; এগুলো করার জন্য পাবলিক টাকা দেয় না। অথচ এগুলোই হয়ে চলেছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। আর সমাধান হিসেবে দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্র-প্রশাসনের আরো স্বেচ্ছাচারী-স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার টোটকা। বন্ধ করে দিতে বলা হচ্ছে ছাত্র রাজনীতি। কেড়ে নেওয়া হচ্ছে সংগঠন করার অধিকার।

নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতা

ছাত্র-রাজনীতি বন্ধ করলে, শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নিলে কী অবস্থা দাঁড়ায়, তা খুব প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৯ সালে শিবির বনাম ছাত্রলীগের সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। দুই-আড়াই মাস পর ক্যাম্পাস খোলার পর প্রশাসন জারি করেছিল ‘জরুরি অবস্থা’। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ, কারোরই সভা-সমিতি, মিটিং-মিছিল কিচ্ছু করা যাবে না। শিবির ঠেকানোর নাম করে জারি করা সেই নিষেধাজ্ঞা কাগজে-কলমে এখনো বলবৎ আছে বলে জানি। এবং এই ১০ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কী দাঁড়িয়েছে তা পত্রপত্রিকা মারফত সবাই কমবেশি অবগত আছেন।

২০০৫-০৬ সালের দিকে রাবিতে অনেকগুলো সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রবলভাবে সক্রিয় ছিল। মাঝেমধ্যেই এখানে ওখানে আয়োজিত হতো পথনাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এমনও হয়েছে যে একই দিনে একই সময়ে দুই-তিন জায়গায় পথনাটক হচ্ছে। অনেক ছোটবড় প্রকাশনা বের হতো। সেগুলো ঘিরে একধরনের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক চিন্তাচর্চার পরিবেশ ছিল। আড্ডা, পড়াশোনা, তর্কবিতর্ক, গান-নাটক দিয়ে মুখরিত থাকত মতিহারের ক্যাম্পাস।

একদিকে শিবিরের প্রবল দাপট অন্যদিকে এই সব মুক্তিমুখিন ও প্রতিরোধী চর্চা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের মিছিল গেলে মিনিট দশেক ক্লাস থামিয়ে রাখতে হতো। এক মাথায় দাঁড়ালে আরেক মাথা দেখা যেত না। এরকম একটা আবহের মধ্যেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ টিকিয়ে রেখেছিল প্রগতিশীল কর্মীরা। শিবিরের নিপীড়ন-নির্যাতনের কারণে বাম    রাজনীতি, সাংস্কৃতিক সংগঠন, ছোটকাগজ ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা হলে থাকতে পারতেন না। মারধর, হুমকিধামকির মুখে পড়তে হতো। হলগুলোতে শিবিরের নিয়ন্ত্রণ, দখলদারিত্ব, টর্চার সেল ছিল।

কিন্তু নানাবিধ চিন্তার প্রাণবন্ত মুক্তিমুখিন চর্চাগুলো সেই সময়টাতে ছিল। এটা নাই হতে শুরু করে ২০০৯ সালের সেই নিষেধাজ্ঞার পর থেকে। এই নিষেধাজ্ঞা কিন্তু আবার ছাত্রলীগের জন্য প্রযোজ্য ছিল না। ছাত্রলীগ অস্ত্র নিয়ে প্রক্টরের সঙ্গে হেঁটেছে। সেই সময়ের প্রক্টর, ড. জাকারিয়া এখন উপ-উপাচার্য হয়েছেন। যার নিয়োগ সংক্রান্ত টাকা চাওয়ার অডিও ফাঁস হয়েছে কিছুদিন আগে। অন্য সবার মুখ বন্ধ করে ছাত্রলীগকে দেওয়া হয়েছিল অবাধ স্বাধীনতা। এবং শিবির দমনের নামে যা নয় তা করেছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। মারধর করেছে, চাঁদাবাজি করেছে, ‘শিবির বলে ধরিয়ে দিব’ এমন হুমকি দিয়ে হেনস্তা করেছে। সর্বশেষ বুয়েটে আবরারকেও কিন্তু ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়েই মারা হয়েছে। ছাত্রলীগ-প্রশাসনের সেই মৈত্রী এখনো অটুঁট আছে।

সেসময় কোনো ছাত্র-সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানায়নি। গত ১০ বছরে এসব সংগঠনের বেশ কিছু বিলুপ্ত। কতক সংগঠন টিকে আছে নামকাওয়াস্তে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধহীনভাবে।

পথনাটকের সেই ক্ষুরধার প্রতিবাদ স্তিমিত। চতুর্থ বর্ষ বা মাস্টার্সের কোনো শিক্ষার্থী বোধহয় ১-২টা পথনাটক বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেখেছে কিনা, সন্দেহ আছে। ক্যাম্পাস থেকে প্রকাশিত কোনো পত্রপত্রিকা হাতে নিয়েছে কিনা, সন্দেহ আছে। অন্যান্য জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক চিন্তাচর্চার কথা বাদই দিলাম। পড়ালেখা-গবেষণার পরিমাণ, সেগুলোর মান কোনোকিছুই ধর্তব্যের মধ্যে আনলাম না।

তো, এই হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পিছু হাঁটা। মুক্তিমুখিন প্রতিরোধের যাবতীয় চর্চাকে ভুলণ্ঠিত করা। যা মৌলবাদীরা পারেনি, তা অত্যন্ত কৌশলে সম্পন্ন করেছে বকধার্মিক ও আওয়ামী চেতনাধারীরা। প্রাণবন্ত প্রাণময় এক দশা থেকে প্রাণহীন প্রাণীর দশায় রূপান্তর। আর এসব কিছুর মূলে ছিল ২০০৯ সালের সেই নিষেধাজ্ঞা এবং সেটা বিনা চ্যালেঞ্জে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত।

প্রশ্ন! প্রশ্ন!! প্রশ্ন!!!

নিষেধাজ্ঞার রাজনীতিতে তাই ভরসা রাখা কঠিন। বরং প্রশ্ন তোলা শুরু করা দরকার আরো মৌলিক জায়গা ধরে। কেন স্বায়ত্তশাসন থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে সরকার। কেন শিক্ষকরা সরকারি অনুগ্রহের আশায় ক্ষমতার পদলেহন করতে থাকে? কেন সরকার বদলালে রাতারাতি প্রশাসন বদলে যায়? উপাচার্য বদলে যায়? ক্যাম্পাসে দখলদার ছাত্র সংগঠন বদলে যায়? এবং অবশ্যই, জোরেসোরে তুলতে হবে সেই মোক্ষম প্রশ্ন: ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?’ যে জনগণের করের টাকায় এবং কৃষক-শ্রমিকের প্রত্যক্ষ অবদানের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পাচ্ছে, শিক্ষকরা শিক্ষকতা করার সুযোগ পাচ্ছে; তাদের কাজ কী আসলে?

এসব প্রশ্ন না তুলে শুধু ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দেওয়া অর্থহীন। এতে বরং শঙ্কা বাড়ে, শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তাচর্চার পরিবেশ আরো সঙ্কুচিত হয়ে যাবে না তো? প্রশাসনিক ও একাডেমিক নিপীড়ন আরো বাড়বে না তো? শিক্ষার্থীরা কথা বলতে পারবে তো সরকার-প্রশাসনের গণবিরোধী, শিক্ষার্থীবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে? নিজেদের শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে তো?

এখানেই আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত ও তৎপরতার প্রশ্ন। তারা যদি সংগঠিত হওয়ার নতুন পদ্ধতি-পন্থা ভাবতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী এই প্রশ্ন সামনে এনে জনকল্যাণমুখি তৎপরতায় সামিল হতে পারেন; তাহলে সেটাই হবে সত্যিকারের পরিবর্তন, বিশ্ববিদ্যালয়কে জনকল্যাণমুখি করে তোলার পথে যাত্রা। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা প্রধান কাজ হলো: জনকল্যাণার্থে নতুন জ্ঞানের চর্চা  ও সৃজন করা। মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার পর এই লক্ষ্যেই প্রণয়ন করা হয়েছিল ৭৩-এর অধ্যাদেশ। কিন্তু সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়কে এতো স্বাধীনতা দেওয়ার পরেও তাহলে কেন বজায় থাকছে না সেই কাঙ্ক্ষিত মুক্ত পরিবেশ?


প্রশ্ন না তুলে শুধু ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দেওয়া অর্থহীন। এতে বরং শঙ্কা বাড়ে, শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তাচর্চার পরিবেশ আরো সঙ্কুচিত হয়ে যাবে না তো? প্রশাসনিক ও একাডেমিক নিপীড়ন আরো বাড়বে না তো? শিক্ষার্থীরা কথা বলতে পারবে তো সরকার-প্রশাসনের গণবিরোধী, শিক্ষার্থীবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে? নিজেদের শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে তো?


বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রের শুঁড় (স্বায়ত্তশাসন যখন আয়ত্তশাসন)

বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই চলে আইনি আয়ত্তশাসন। ৭৩-এর অধ্যাদেশের নামে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলেও তাতে রাষ্ট্র-রাজনীতির শুঁড় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। সেজন্যই বারবার দেখা যায়, সরকার পরিবর্তন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য-প্রশাসননিক পদগুলো পরিবর্তন হয়ে যায়। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন সে দলের ছাত্- সংগঠন ক্যাম্পাসগুলোতে দাপট দেখায়। তাদের সন্ত্রাসের মুখে জিম্মি হয়ে থাকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কীভাবে রাষ্ট্রের শুঁড় প্রবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে?

প্রবেশ করে উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাটিউট বা নীতি নির্ধারণের সর্বোচ্চ ফোরাম সিনেট। সিনেটরদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত তিন জনের প্যানেল থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি। বলাবাহুল্য, রাষ্ট্রপতির এ নিয়োগও হয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুসারে, তথাকথিত পরামর্শ নামে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মানেই দলীয় চূড়ান্ত ক্ষমতা। আর তাই উপাচার্য হতে গেলেও পার্টিজান হতে হবে। আর এ কারণেই দেখা যায়, রাষ্ট্র ক্ষমতায় পার্টি বদলালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য বদলে যান।’ আবার ‘উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। বিশ্ববিদ্যালয়ে কি দৃশ্যমান, কি অদৃশ্যমান, সকল ক্ষমতার মালিক তিনি।’ ফলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ই এই উপাচার্যের আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ে। এবং অন্যদিকে উপাচার্য রাষ্ট্র-সরকারের পদলেহন করতে থাকেন।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এসব অন্যায্য ক্ষমতা-কর্তৃত্বের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে হলে এসব প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো, উপাচার্যের ক্ষমতা, রাষ্ট্র-বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক ইত্যাদি অনেক কিছু নিয়েই প্রশ্ন তুলতে হবে। নতুন কাঠামো প্রণয়নে সংগ্রাম করতে হবে। 

সক্রিয়তাই আশা

সেজন্য শিক্ষার্থীদের চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে রাষ্ট্র-প্রশাসনকে। মুক্ত চিন্তাচর্চার স্বাধীন পরিবেশের জন্য লড়াই চালাতে হবে। যেমনটা চালাচ্ছেন সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে, সবক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা, নজরদারির বিরুদ্ধে তারা তুলেছেন জোর আওয়াজ। প্রশাসনের অন্যায্য কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে তারা গড়ে তুলছেন অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন। তারা মানছেন না কোনো নিষেধাজ্ঞা। সংগঠিত হচ্ছেন সৃজনশীল সব উপায়ে। শাবিপ্রবির এসব মুক্তিমুখিন ও সৃজনশীল প্রতিবাদ-আন্দোলন নিশ্চিতভাবেই অনেক প্রেরণা জোগাচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও অনেক দমনপীড়ন সত্ত্বেও আন্দোলন জারি রেখেছে দুর্নীতিবাজ উপাচার্যের বিরুদ্ধে।

এভাবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কেই সোচ্চার হতে হবে তাদের নিজ নিজ ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়ে। এবং ভাবতে হবে এসব থেকে উত্তরণের উপায়। ভাবতে হবে কর্তৃত্বপরায়ণ সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে সংগঠিত হওয়ার পথ।  যেখানে সবার মত প্রকাশের সমান অধিকার থাকবে। বড়ভাই বা নেতার কথার বিরুদ্ধে কথা বললে যেখানে তিরস্কার বা বহিস্কারের মুখে পড়তে হবে না। সবার সমান মর্যাদা থাকবে।

যেমন একটা উদাহরণ দেওয়ার জন্য বলা যায়: হলগুলোতে টর্চার সেল বন্ধ ও গেস্টরুম-গণরুম কালচার বন্ধ করার জন্য শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হতে পারে ব্লক ধরে ধরে। সবগুলো ব্লক নিয়ে গঠন করা যেতে পারে হল ফেডারেশন। যে ফেডারেশন কাজ করবে ব্লকগুলো থেকে আসা প্রতিনিধিদের সমন্বয়ের মাধ্যমে। এই প্রতিনিধিদেরও বিশেষ কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তারা স্বেচ্ছাচারিতা করতে পারবে না। পুরো ব্লকের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। কোনো অনিয়ম চোখে পড়লে প্রতিনিধিকে রিকল করা যাবে।


প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কেই সোচ্চার হতে হবে তাদের নিজ নিজ ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়ে। এবং ভাবতে হবে এসব থেকে উত্তরণের উপায়। ভাবতে হবে কর্তৃত্বপরায়ণ সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে সংগঠিত হওয়ার পথ।  যেখানে সবার মত প্রকাশের সমান অধিকার থাকবে।


একই রকমের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে বিভাগেও। যেখানে শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হবে শিক্ষাবর্ষ ধরে। সব ব্যাচের শিক্ষার্থীদের এভাবে সমন্বয় হবে বিভাগীয় কমিটির মাধ্যমে। এখানেও একই রকমভাবে থাকবে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া। প্রতিটা ব্যাচ থেকে কিছু প্রতিনিধি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষ থাকবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য। কোনো আকামকুকাম করলে তাকে জবাবদিহি করতে হবে এবং সেই জবাব সন্তোষজনক মনে না হলে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া যাবে।

এই রকম বিভাগ-ভিত্তিক ইউনিট বিভাগগুলোতে শিক্ষার্থীদের আরো বেশি বেশি অংশগ্রহণের দাবি উঠাতে পারে। শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু, কোর্স প্রণয়নের সময় শিক্ষার্থী প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তি, ইত্যাদি আরো দাবি উঠাতে পারেন। এমন পরিবেশ তৈরির দাবি তুলতে পারেন যেখানে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করতে পারবে না এখনকার মতো। তাদেরও জবাবদিহিতার জায়গা থাকবে শিক্ষার্থীদের কাছে।

টর্চার সেলওয়ালা, প্রশাসনিক কারাগারওয়ালা, প্রাণহীন একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে রাতারাতি জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার আদর্শ পরিবেশে পরিণত করা সম্ভব না। কিন্তু রূপান্তরের প্রক্রিয়াটা শুরু হোক। একটু একটু করে আরো নানা কিছু নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করুক শিক্ষার্থীরা। সংগঠিত হোক, চিন্তা-চর্চার শিখা প্রজ্জলিত রাখুক, মুক্তচিন্তা ও বিবেকের অধিকার সমুন্নত রাখুক।

তথ্যপঞ্জি

আরিফ রেজা মাহমুদ (২০১৫) বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন অর্থায়ন। রাষ্ট্র-বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্ক পাঠ: মুক্তিপরায়ণ রূপকল্প, অরাজ

সেলিম রেজা নিউটন (২০০৮) আইনের শাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ, অরাজ

(লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো অরাজ.কম-এর সাময়িকীতে। লেখকের অনুমতিক্রমে ও অরাজ-এর সহযোগিতায় লেখাটি এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হলো।)

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন