প্রাথমিক শিক্ষা শিক্ষক ও শিক্ষা শিক্ষাব্যবস্থা

বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা এবং শিক্ষকদের দায়

শিক্ষক, ছবিসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন (http://cdn.banglatribune.com/contents/cache/images/800x0x1/uploads/media/2016/06/03/e449aae2396c83166ea8f4d408cf774e-5750ad210810c.jpg)

মিহির হালদার

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষাদান বিষয়ে এক জায়গায় বলেছেন— “বিদ্যা হল আহরণের বস্তু, শিক্ষা আচরণের”। আমরা এ-বিষয়টি মাঝেমধ্যে ভুলে যাই। আমরা মনে করি, আমাদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেলেই তো হলো, আর বিশেষ কী যোগ্যতা দরকার? মূলত পরীক্ষার ফল ভালো করা এক জিনিস; আর প্রকৃত শিক্ষা লাভ করা আরেক জিনিস। আগের আমলের একটি প্রবাদ আছে— উঠন্তি মূলো পত্তনেই চেনা যায়। একজন শিশুর ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা তার প্রাথমিক স্তরেই বোঝা যায়।

আলোচনা করা যাক প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন কি দৃশ্যমান? আমাদের কি টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা (এসডিজি, ২০১৬-২০২০)-এর শিক্ষাবিষয়ক লক্ষ্যটি সহজে অর্জন করতে পারার সক্ষমতা আছে? আমাদের শিশুদের প্রাথমিক স্তরের পাঠশেষে ‘দৈহিক, মানবিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক, আবেগিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক বিকাশ সাধন এবং দেশাত্ববোধ, সৃজনশীলতা, বিজ্ঞানমনষ্কতা ও উন্নত জীবনের স্বপ্নদর্শনে’ উদ্বুদ্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু সত্যিই কি এসব বিকাশ শিশুদের হচ্ছে? যখন একজন সদ্য জিপিএ ফাইভ পাশ করা শিক্ষার্থীকে ‘আমি জিপিএ ফাইভ পেয়েছি’-এর ইংরেজি অনুবাদ করতে বলা হলে সে তার উত্তর দিতে পারে না, তখন উপর্যুক্ত প্রশ্ন মনে আসাটা একজন সচেতন নাগরিকের পক্ষে স্বাভাবিক।

এদেশে প্রায় দু’কোটি শিশু প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে সমাপনী পরীক্ষায় (পিইসিই) পাশ করে প্রায় বিশ লাখ। এরপর জুনিয়র লেভেল, মাধ্যমিক বা সমমান স্তর, উচ্চ-মাধ্যমিক স্তর বা সমমান স্তর উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চস্তরে বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক পাশ করে প্রায় চার লাখের মতো শিক্ষার্থী। প্রতি বছর নতুন করে পাশ করা শিক্ষার্থীদের সাথে পুরানো মিলিয়ে প্রায় আশি লাখের মতো বেকার থাকে। প্রথম আলোর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশের যুবক শ্রেণির মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশ তাদের কর্মসংস্থান নিয়ে চিন্তিত। অর্থাৎ, উচ্চবিদ্যা লাভের পরও তারা কর্মহীনতার গ্রাসে পড়ে নিজেদেরকে অপরাধী মনে করছে এবং এর পরিণতিতে তাদের মধ্যে একধরনের মানসিক বিভক্তি তৈরি হচ্ছে। আর এ-বিভক্তিই গভীর দুঃখের কারণ। এক জরিপে দেখা যায়, বেকারদের মধ্যে উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্তরাই এদেশে সংখ্যায় বেশি। আর বেকারত্বের মূল কারণ হলো, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূল ভিত্তির দুর্বলতা। শুধু পাশ করার জন্য বিদ্যার্জনে লাভ নেই; বরং যে শিক্ষা অন্তর দিয়ে গ্রহণ করা যায় তা বাস্তবে কাজে লাগানো যায়। সেক্ষেত্রে চাকুরি না করলেও ব্যবসায় উদ্যোগ গ্রহণ, সৃজনশীল কিছু কাজ যেমন, লেখালেখি, গবেষণা ইত্যাদি করা সম্ভব। এতে দেশের কল্যাণ সাধন হবে।

এবার আসি আমাদের শিক্ষকদের বিষয়ে। আমাদের দেশে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় চার লাখের মতো। তাদের বেশির ভাগেরই স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে। আমাদের জাতীয় সংবিধানের সতেরো (১৭) নং অনুচ্ছেদে প্রাথমিক স্তরে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে, সাথে সাথে গুণী ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দানের কথা বলা হয়েছে। আমরা প্রাথমিক স্তরে সার্টিফিকেটধারী শিক্ষক পাচ্ছি কিন্তু তারা পাঠদানে যোগ্যতাসম্পন্ন বা পেডাগজিতে (শিশুদের পাঠদান পদ্ধতির বিজ্ঞান) দক্ষ নয়। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, অনেক শিক্ষক (৪৭%) এখনো শিক্ষার্থীদের জন্য সৃজনশীল প্রশ্ন প্রস্তুত করতে পারেন না। যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন তাহলে কীভাবে তারা করবে সে বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। শিক্ষার্থীদের উন্নত ও আনন্দময় শিখন নিশ্চতকল্পে সরকার ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে পাঠদানের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠদান করার অনুষঙ্গ ল্যাপটপের অপ্রতুলতা লক্ষ করা যায়। একসাথে সব শ্রেণিতে ডিজিটাল পাঠদান নিশ্চিত করা এখনো সম্ভব হয়নি। অনেক সময় বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দেখা যায়, শিক্ষকরা সঠিকভাবে শিখনফল অর্জন করানো এবং ডিজিটাল পাঠদানের জন্য পেডাগজি ও আইসিটির ইন্টিগ্রেশন বা সমন্বয় ঘটানোতে ব্যর্থ হচ্ছে। এসব কারণে শিক্ষার্থীরা কোচিং ও হাউস টিউটরদের দ্বারস্থ হচ্ছে। আগে শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের প্রগাঢ় সম্মান ও শ্রদ্ধা ছিলো, শিক্ষকেরাও শিক্ষার্থীদের অনুরূপ স্নেহ-আদর দিতো যা এখন আর তেমন দেখা যায় না। উপর্যুক্ত আলোচনায় শিক্ষকগণের দায়বিষয়ক সমসাময়িক চিন্তাকে কেন্দ্র করে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা ও শিক্ষণের জন্য শিক্ষকগণের আশুকরণীয় কিছু সুপারিশ নিচে দেয়া হলো:

১. শিক্ষার্থীদের পাঠদান হতে হবে আনন্দময় যাতে সকল শিশু আগ্রহ নিয়েই বিদ্যালয়ে আসে এবং আনন্দ পায়। বাড়িতে পড়ার চাপ দেয়া মোটেও ঠিক হবে না। আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি যেমন, গঠনবাদ, প্রশ্নোত্তর, পরীক্ষণ, আলোচনা, দলে কাজ, বিতর্ক ইত্যাদি পদ্ধতিতে বা কৌশলে মাল্টিমিডিয়ার সাহায্যে পাঠদান করতে হবে। পাঠের উপস্থানের ক্ষেত্রে ও গাঠনিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনীমূলক ও সৃজনশীল হতে হবে। অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রায়ই বলেন, “শিশুরা হলো ফুলবাগানের মতো, ভালোভাবে যত্ন নিলে এরা প্রস্ফুটিত হবেই”। সুতরাং শিক্ষার্থীর শিখন চাহিদা, বয়স ও মনস্তত্ব বিবেচনা করে তাদের পাঠদানে জড়িত করে তাদেরকে প্রশ্ন করার জন্য মুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাহলে শিখবে প্রতিটি শিশু।

২. শিক্ষার্থীদের গাইড বই ও নোট বই নির্ভরতা কমাতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষককে যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও খাতা মূল্যায়নে আপ-টু-ডেট ধারণা থাকতে হবে। শিক্ষকদেরকে আধুনিক বিশ্বে চলমান বিভিন্ন শিক্ষাবিষয়ক ধারণা, তত্ত্ব ও তথ্য সম্পর্কে ওয়াকেবহাল থাকতে হবে ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্তির সুযোগ রাখতে হবে।

৩. প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই)-তে শিক্ষকদের জন্য বর্তমানে যে শিক্ষক শিক্ষা কোর্স প্রচলিত, সেটি আছে ইন-সার্ভিস কোর্স হিসেবে। এটিকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মতো প্রি-সার্ভিস কোর্স করলে শিক্ষার গুণগত মান বাড়বে। একজন শিক্ষক হওয়ার জন্য মনেপ্রাণে আগ্রহী সচেতন নাগরিক পেতে গেলে এর বিকল্প নেই।

৪. শিক্ষার্থীদেরকে শুধু চাকুরি নয়, বরং ভালো লেখক, ফটোগ্রাফার, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, বক্তা, অভিনেতা, খেলোয়াড়, রাজনীতিবিদ, গবেষক ইত্যাদি হয়েও সমাজে খ্যাতি লাভ করা সম্ভব এটি বোঝাতে হবে।

৫. প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা হতে হবে জীবনব্যাপী এবং চলমান। তাহলে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আর তার জন্য শুধু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নয়, অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো এক গবেষণায় জানিয়েছে, শিশুদের বিকাশের জন্য জানতে শেখা, করতে শেখা, মিলেমিশে থাকতে শেখা দরকারি। বিদ্যালয়ে একজন শিশু উক্ত বিষয়াদি সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে এটিই প্রত্যাশা।

৬. শিক্ষাখাতে অন্যান্য দেশের মত জিডিপির অন্যূন ৪% বরাদ্দ রাখা দরকার। আমাদের দেশে শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারের মাথাপিছু খরচ পাশের দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। এটি বাড়াতে হবে।

প্রাথমিক শিক্ষার ভিতকে মজবুত না করে মাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের উন্নত করে কোনোভাবেই যোগ্য মানবসম্পদ তথা মানব পুঁজি তৈরি করা সম্ভব নয়। সাসটেনেইবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রা চার-এ বিধৃত গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে যোগ্য শিক্ষক প্রস্তুত করার পাশাপাশি তাদের যথাযথ মর্যাদা দিয়ে সমাজে স্থান দেয়া দরকার যাতে শিক্ষকগণ সম্মানের সাথে সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে বাঁচতে পারে। সর্বোপরি সরকারকে শিক্ষকবান্ধব শিক্ষা-নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই কেবল গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

মিহির হালদার: প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট খুলনাতে ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কর্মরত।

লেখক সম্পর্কে

সম্পাদক বাংলাদেশের শিক্ষা

এই লেখাটি সম্পাদক কর্তৃক প্রকাশিত। মূল লেখার পরিচিত লেখার নিচে দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন