উচ্চশিক্ষা শিক্ষাব্যবস্থা

বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় সূচক ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা

বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং
লিখেছেন গৌতম রায়

আবু সিদ

সেন্টার ফর ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং (http://cwur.org/) ২০১২ সাল থেকে প্রতি বছর পৃথিবীর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সালে যখন কাজটি শুরু করে, সেসময় দুনিয়া-সেরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে তালিকাভুক্ত করত। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে অনুরোধের কারণে ২০১৪ থেকে তারা সারা পৃথিবীর ২৫,০০০-এর বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুনিয়া-সেরা ১,০০০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে তালিকাভুক্ত করছে। CWUR এই তালিকাভুক্তির জন্য কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখে। তারা দেখে শিক্ষার মান (quality of education), শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ (training of students), শিক্ষকদের মর্যাদা (prestige of the faculty members) এবং তাঁদের গবেষণার মান (the quality of their research)।

যে কোনো ধরনের সূচক (index) বা র‍্যাংকিং (ranking) তৈরির জন্য কতোগুলো বিষয়বস্তু বিবেচনায় আনা হয়। বিষয়গুলোর কোনোটাকে আবার একটু বেশি কোনোটাকে কিছুটা কম গুরুত্ব (weight) দেয়া হয়। অর্থাৎ, সূচক তৈরির জন্য নির্ধারিত বিষয়বস্তু বা বিষয়বস্তুর গুরুত্ব বদলালে পুরো সূচকটিই বদলে যাবে। যেমন, CWUR সূচক ২০১৬-তে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড দুনিয়া-শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ভিন্ন কোনো সূচকে হার্ভার্ড দুনিয়া-শ্রেষ্ঠ নাও হতে পারে।

CWUR সূচক তৈরির উপায়গুলো [১] নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, সেখানে সর্বমোট ৮টি বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। এগুলো হলো:

বিষয় গুরুত্ব
১. শিক্ষার মান (quality of education) ২৫%
২. অ্যালামনাইদের কর্মসংস্থান (alumni employment) ২৫%
৩. শিক্ষকদের মান (quality of faculty) ২৫%
৪. প্রকাশনা (publications) ৫%
৫. প্রভাব (influence) ৫%
৬. প্রতিষ্ঠান/প্রকাশনার নামোল্লেখ (citations) ৫%
৭. বড় পরিসরে প্রভাব (broad impact) ৫%
৮. স্বত্ব (patents) ৫%

CWUR সূচকের দুনিয়া-সেরা ১,০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২৪টি যুক্তরাষ্ট্রে, চিনে ৯০টি, জাপানে ৭৪টি, ব্রিটেনে ৬৫টি, জার্মানিতে ৫৫টি, ইতালিতে ৪৮টি, স্পেনে ৪১টি, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩৬টি, অস্ট্রেলিয়ায় ২৭টি, তাইওয়ানে ২১টি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতে ১৬টি (world rank ৩৫৪ থেকে ৯৫১ এর মধ্যে) এবং পাকিস্তানে ১টি (world rank ৮৮৯) বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুনিয়া-সেরা ১,০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পায়নি।

তালিকাটিতে একটু মনোযোগ দিলে দেখা যাবে, সূচকের প্রথম ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫টির অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রে। কারও কাছে মনে হতে পারে যে, সূচকে মার্কিন শিক্ষা-ব্যবস্থাকে মানদণ্ড ধরে তালিকাটি করা হয়েছে! যেমন, সূচক তৈরিতে সামাজিক কল্যাণ, মানব সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান, আবিষ্কার বা উদ্ভাবন এসব থাকতে পারতো! আবার প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের থাকে এক বা একাধিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। যেমন, CWUR সূচকের দুনিয়া-সেরা ৪র্থ বিশ্ববিদ্যালয়টি তার ওয়েবসাইটে লিখেছে, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য আর্ন্তজাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়ন ঘটানো (The mission of the University of Cambridge is to contribute to society through the pursuit of education, learning, and research at the highest international levels of excellence)। মূল্যবোধের জায়গায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় দুটি বিষয়কে স্থান দিয়েছে। বিষয়দুটি বাস্তবিক অর্থে মানব জাতির মননশীলতার বিকাশে অনন্য। মূল্যবোধ দুটি হলো, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা (freedom of thought and expression) এবং অসাম্য থেকে মুক্তি (freedom from discrimination) [২]।

অন্যদিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়টির ওয়েবসাইটে খুঁজে সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যর হদিশ পাওয়া যায় না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়-সম্পর্কিত বক্তব্যের মধ্যে দেখা যায় যে, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে তা এর শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সমাজে সঞ্চালন করার একটি উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠালগ্নে ছিলো (The main purpose of the University was to create new areas of knowledge and disseminate this knowledge to the society through its students) [৩]। কিন্তু বর্তমানে সার্টিফিকেট বিতরণ ছাড়া এর অন্য কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য আছে কিনা তা অস্পষ্ট। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির কোনো ধরনের মূল্যবোধের কথা ওয়েবসাইটটি থেকে জানা যায় না।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ উচ্চ-শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো উদাহরণ, উপমা বা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে পারেনি; যেমন পেরেছে পোশাক শিল্প বা ক্রিকেট খেলায়। অর্থাৎ, আমাদের বাংলাদেশীদের দ্বারা উদাহরণ তৈরি অসম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও মনোযোগ দিলে উচ্চশিক্ষায় আমরা স্থাপন করতে পারব দৃষ্টান্ত; বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্ন্তভুক্ত হবে দুনিয়া-সেরা ১,০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেন তারা হতে পারবে না দুনিয়া-সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি? তাইওয়ানের মতো দেশটিতে যদি দুনিয়া-সেরা ১,০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি থাকতে পারে তবে বাংলাদেশে একটিও কেন নয়?

[১] সূচক তৈরির উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন http://cwur.org/preprint.pdf
[২] Retrieved from https://www.cam.ac.uk/about-the-university/how-the-university-and-colleges-work/the-universitys-mission-and-core-values on 8 October 2016
[৩] Retrieved from http://www.du.ac.bd/main_menu/the_university/about on 12 October 2016

আবু সিদ: বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে সেইভ দ্যা চিলড্রেন কর্তৃক পরিচালিত প্রকল্প ‘রিড’-এর গবেষণা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত।

লেখক সম্পর্কে

গৌতম রায়

গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন